মহিলামহল-আলাদা এক দুনিয়া৷ এক পৃথিবীর ভিতরেই, সে জগতের আছে আলাদা ভাষা, আলাদা নিয়ম৷ স্বতন্ত্র আবেগ, অনুভবের সে জগত চিরকালই পুরুষের নাগালের বাইরে৷ স্বভাব কৌতূহলে পুরুষ কতবার সে গোপন দুনিয়ায় উঁকি দিয়েছে৷  জানতে চেয়েছে মেয়েদের কথা৷ তবু কিছু কথা গোপনই থেকে যায় আজীবন৷ লিখছেন সুলয়া সিনহাsulaya-Sinha

‘তারপর বল, হাবির সঙ্গে কেমন চলছে? রোজ সেক্স করিস নাকি?’-ক্যাপুচিনোতে চুমুক দিয়ে প্রশ্ন করল তানিয়া৷ মাছি ওড়ানোর ভঙ্গিতে সঞ্চারি সে প্রশ্ন উড়িয়ে দিল৷ বলল, ‘ধুর প্রথম প্রথম বেশ লাগত৷ আমারই একটু বেশি ইচ্ছে করত৷ মুখে অন্য কথা বলতাম৷ ছেলেদের তো জানিসই৷’’ বলে মুচকি হাসিতে ভরিয়ে দিল ক্যাফে৷ ফুট কেটে নীলাদ্রিতা বলল, ‘‘ছেলেদের কথা ও জানবে কী করে৷ ও কি আর তোর মতো খেলুড়ে ছিল নাকি৷ সত্যি মাইরি, কলেজে ছেলেগুলোকে কী খেলানোই না খেলাতিস৷ অথচ মুখে এমন ভাব দেখাতিস যেন, ভাজা মাছ উলটে খেতে জানিস না৷ সঞ্চারি বলল, ‘ছেলেদের অত ভাও দিতে নেই গুরু৷ সুতো ছাড়ো, কিন্তু লাটাই হাতে৷’’ স্নেহা ফ্যাচর ফ্যাচর করে হেসে বলে উঠল, ‘ বুঝলাম, লাটাই আজকাল হাত থেকে ছাড়ছিসই না৷’

চার সখীর খিলখিলিয়ে হাসি৷ ভরা বর্ষায় যেন রোদ হাসা ছুটি খেলে গেল শহরের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ক্যাফে কফি ডে-তে৷  তানিয়া, স্নেহা, সঞ্চারি আর নীলাদ্রিতা৷ কলেজ লাইফে এই চারমূর্তিকে কখনও আলাদা দেখা যায়নি৷ জুনিয়র থেকে সিনিয়র সকলেই জানত, এদের একে অপরের জন্য ‘জান ভি হাজির হ্যায়৷’ তিন বছরের কোর্সে বন্ধুত্বের আয়ু কত লম্বা হবে, তা নিয়ে নানা মহলে নানা মত ঘোরা ফেরা করতেই থাকত৷ তবে কলেজের হ্যাপেনিং চার সুন্দরী যে দিনের পর দিন আলোচনার কেন্দ্রে থেকেছে, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই৷ সেসব দিন শেষ হয়ে পাঁচবছর কেটে গিয়েছে৷ সেই সঙ্গে অবশ্য বন্ধুত্বটাও অনার্সের পর মাস্টার্স করে এখন ওয়েল সেটেল্ড৷ রোজ দেখা-সাক্ষাৎ সম্ভব না হলেও হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে আড্ডাটা বেশ জমজমাট Gossip-02হয়৷ বিয়ে করে বেঙ্গালুরুতে কনটেন্ট রাইটারের চাকরি করছে স্নেহা৷ তানিয়া শহরের একটি অ্যাড এজেন্টিতে কাজ করছে৷ নীলাদ্রিতা সরকারী স্কুলের শিক্ষিকা আর সঞ্চারী চুটিয়ে সংসার করছে৷ গ্রুপ চ্যাটেই ঠিক হয়ে গেল৷ সকলেই যখন শহরে তখন একবার দেখা করা যেতেই পারে৷ কথামত আবির্ভাব ঘটল চার বন্ধুর৷ সঞ্চারি আর স্নেহার বিয়ের পর চারজনের এই প্রথম দেখা৷

সুতরাং কথাবার্তা লাগামছাড়া৷ একেবারে আনসেন্সরড৷ আরে বাড়িতে কেউ সুশীলা গৃহবধূ, অফিসে কেউ গুরুগম্ভীর কর্মী, তাই বলে আড্ডাতেও ওসব চলে নাকি! তাও তো সম্ভ্রান্ত ক্যাফে বলে ওই শব্দ বেশি বেরচ্ছে না মুখ থেকে৷ নচেত মিউজিক সিস্টেমে এতক্ষণে গান বন্ধ হয়ে বিপ বিপ আওয়াজ শুরু হয়ে যেত৷

সে কথা মনে পড়তেই নীলাদ্রিতা বলল, ‘এই সেই ক্যাবলাটাকে মনে আছে? কী যেন দেবোপম না দেবোত্তম? জুনিয়র ছিল…’

সঞ্চারি  বলল, ‘ আরে হ্যাঁ, হ্যাঁ কাত্তিক ঠাকুরটা তো৷ মালটা তোর মুখে একদিন খিস্তি শুনে লজ্জায় পুরো বিলিতি  বেগুন হয়ে গিয়েছিল৷নীলাদ্রিতা বলল, হ্যাঁ হ্যাঁ ওই কথাই বলছিলাম৷ স্নেহা বলল, আচ্ছা ছেলেগুলো কেন ভাবে বলত যে, মেয়েরা গালি দেয় না? তানিয়া বলল,  কিচ্ছু না, সব হয় Gossip-06নেকুপুষু, নয় গা*৷ সঞ্চারি মুখে আঙুল ছুঁইয়ে বলল, আস্তে রে৷  তারপর নীলাদ্রিতার দিকে ঘুরে বলল,   ‘তুই বল তোর লাভ-লাইফের কথা৷’ নীলাদ্রিতা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল, ‘দূর৷ আর ভালো লাগে না৷ সেই একই ঝামেলা৷ এই জানিস তো, অফিসে একটা ছেলেকে বেশ লাগে৷ এই রিসেন্টলি একসঙ্গে একটা মুভিও দেখে এলাম৷ এসব তো আর হাবি আর বয় ফ্রেন্ডের সামনে বলা যাবে না৷ উল্টো সন্দেহ করবে৷ এসব তো পার্ট অফ লাইফ৷ কী বলিস? বয় ফ্রেন্ড তো আছে৷আর একজনকে কী জাস্ট ভালো লাগতে পারে না?’ স্নেহা বলল, ‘হ্যাঁ রে৷ কিছু কিছু জিনিস যেমন ছেলেদের থেকে আমরা লুকিয়ে রাখি, এটাও তার মধ্যে একটা৷ এই যেমন আমাদের ভ্যানিটি ব্যাগটা খুলে দেখার অনুমতি আমাদের হাবিদেরও নেই৷’ তানিয়া বলে উঠল, ‘ব্যাগ খোলার কথায় মনে পড়ল৷ বয়ফ্রেন্ড সঙ্গে থাকলে শপিং করতে গিয়ে তো পার্স খুলতেই ইচ্ছে করে না৷ মুখ ফুটে সবসময় বলতে পারি, ওগো বিলটা তুমিই দিয়ে দাও৷ তবে মনের কথাটা পড়ে ফেলতে পারলে বেশ লাগে৷ ওই কয়েকটা ছেলে একটু বোকা বোকা হয় না? মেয়েদের পিছনে অকারণে টাকা খরচ করে৷ ওদের সঙ্গে রেস্তরাঁয় গিয়ে মজা আছে৷ নো খরচা, ডু ফুর্তি৷’ সংসারী স্নেহা বলল, ‘তা যা বলেছিস৷ চল, একবার চারজন একসঙ্গে কোথাও ঘুরে আসি৷ নো হাসব্যান্ড, নো বয়ফ্রেন্ড৷ বিন্দাস বুজ করা যাবে৷ একটা জিনিস খেয়াল করেছিস? আমরা অতিরিক্ত ড্রিঙ্ক করতে বা বিরাট কোহলিকে দেখে একটু বেশিই উত্তেজনা দেখাতে ভালোবাসি৷ কিন্তু ছেলেরা সেটা নিয়ে বললেই গায়ে লাগে৷’ ‘হট প্যান্ট পরে পারফেক্ট মেক-আপ নিয়ে রাস্তা দিয়ে যাব, আর পাশ থেকে ভালো কমপ্লিমেন্ট শুনতে পাব না, ভালো লাগে বল? সবচেয়ে মাথা গরম হয় কেউ বয়স জিজ্ঞেস করলে৷ বিয়ে হয়ে যাওয়া মানেই কি বয়স হয়ে গিয়েছে অনেক? আশ্চর্য!!’ বিরক্তি প্রকাশ সঞ্চারির৷

গল্পে মশগুল মহিলা ব্রিগেড৷কথায় বলে মেয়েদের চেনা এত সহজ নাকি! মোটেও না৷ আরও কঠিন মহিলামহলের এই গোপন কথা আঁচ করা৷ পুরুষ ভাবে, মেয়েদের তারা বেশ বোঝে৷ মেয়েদের কথা জানে৷ আসলে ছাই জানে৷


ছেলেদের কথা ও জানবে কী করে৷ ও কি আর তোর মতো খেলুড়ে ছিল নাকি৷ সত্যি মাইরি, কলেজে ছেলেগুলোকে কী খেলানোই না খেলাতিস৷ অথচ মুখে এমন ভাব দেখাতিস যেন, ভাজা মাছ উলটে খেতে জানিস না৷ সঞ্চারি বলল, ‘ছেলেদের অত ভাও দিতে নেই গুরু৷ সুতো ছাড়ো, কিন্তু লাটাই হাতে৷


প্রসঙ্গ পালটে সঞ্চারি বলল, জানিস, একটা দারুণ গল্প মনে পড়ল, ফেসবুকে দেখছিলাম৷ নীলাদ্রিতা বলল, প্লিজ আঁতেল টাইপ কিছু বলিস না৷ সঞ্চারী বলল, আরে না, শোনই না৷ এক তল্লাটে শাশুড়ি আর বউমাদের খুব ভাব৷ ঠিক হয়েছে সকলে মিলে পাহাড়ে বেড়াতে যাবে৷ একটা বাসে সব শাশুড়ি , আর একটাতে বউমারা৷ শাশুড়িদের বাসটা আগে আগে চলছিল, হঠাৎ দুর্ঘটনায় পড়ল৷ একজন শাশুড়িও বাঁচল না৷এমন সময় সব বউমারা দেখল, একজন বউমা হাপুস নয়নে কাঁদছে৷ সকলে তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে৷ কিন্তু তার কান্না আর থামে না৷ তখন সকলে জানতে চাইল, ব্যাপার কি? তোমার শাশুড়ি তোমায় কী এমন ভালোবাসত? বউটা কাঁদতে কাঁদতে বলল, আমার শাশুড়ি ওই বাসটায় ছিল না৷ লেট হয়েছে বলে শাশুড়িদের গাড়ি ওনাকে রেখেই চলে এসছিল৷

গপ্পো শুনে আবার একচোট হাসির ছররা বয়ে গেল চার বান্ধবীর মধ্যে৷ আসলে এ একান্তই মেয়েদের কথা৷ এই দুনিয়ায় ছেলেদের প্রবেশ মানা৷ কেউ কেউ তর্ক তুলে বলতে পারেন,আরে মেয়েদের নিয়ে সব কবিতা বলো গান বলো, গল্প বলো -সে সবের লেখক তো পুরুষই৷  তো কী হয়েছে৷ ওসব ওপর ওপর জানা৷ চারুলতার কথা কি ভূপতি বুঝেছিল নাকি? নাকি চন্দরাকে চিনেছিল ছিদাম? আর ওসব যদি ছেড়েও দেওয়া হয়, মা-ঠাকুমাদের হিসেবখাতার যে গোপন কথা সে কি কেউ জানে? ছেলেরা তো মাসের শেষে হাত তুলে দিয়েই খালাস৷ মেয়েরাই জানে কী করে কী সামলাতে হয়৷ সেই যে পুকুরঘাটে  মা-কাকিমারা গল্পে মেতে যেতেন৷ জ্যাঠা- কাকারা ভেবেই পেতেন না কী যে এত গল্প করে মেয়েরা! পুরুষ এই কথাটিই বুঝে পেল না, কী গল্প করে! আসলে মেয়েদের নিজস্ব কথা থাকে, থাকে নিজস্ব ভাষা৷ পুরুষ তার নাগাল পায় না৷Gossip-05

তানিয়া, সঞ্চারি, নীলাদ্রিতা, স্নেহার কথার কিঞ্চিত মাত্র শোনা গেল৷ ওদের আরও অনেক কথা আছে, যা ওই চার বন্ধুই জানে, ওদের স্বামী বা বয়ফ্রেন্ড জানে না, জানবেও না৷ স্নেহার বাড়ির চৌহদ্দি যেমন জানবে না, রোজ রাতে ওর জোরজবরদস্তি ভালো লাগে না৷ কিন্তু অনন্যোপায়৷ এই যেমন নীলাদ্রিতার ভালো লাগার কথা চিরকাল গোপনই থেকে যাবে খোলা দুনিয়ার কাছে৷

কত গোপন কথা তো গোপনেই থেকে গিয়েছে৷ এই ভরা বর্ষায় বাড়িতে ভরপুর ইলিশের মজলিশ বসত যখন, পুরুষদের খাওয়ার শেষে, ছোট দু’একটা টুকরো যখন মেয়েরা পাতে নিয়ে বসত, তখন তাদের মনের কথা কেউ কোনওদিন জেনেছে নাকি৷ নাহ, হাসিমুখ তো সব কথা বলে দেয় না৷ কিছু কথা বরং গোপন থেকে যাওয়াই ভালো৷