দেবায়ন চৌধুরী

“মাইল মাইল দিগন্তের ভিতর, দিগন্ত পেরিয়ে আরো আরো দিগন্তের ভিতর, নদীঘেরা মানুষঘেরা অরণ্যঘেরা গানঘেরা বাজনাঘেরা জীবনের অনন্ততা ছুঁয়ে কোথাও কি যাবার থাকে মানুষের!প্রশ্ন নয়, প্রত্যাশাহীন সংশয় হয়ে কবে কার কতকালের জীবন যেন মায়াকুহকময়তায় জীবনেরই বন্দনাগান।… আবহমানের আবহমানতায় চিরসত্য হয়ে জীবন যেন নুড়িভাষা নদীর অঞ্চলকথার অত্যাশ্চর্য চোরাটান।’’- কবি সুবীর সরকারের সাম্প্রতিক গদ্যের বই ‘উত্তরজনপদবৃত্তান্ত’ পড়তে গিয়ে শুরুতেই উদ্ধৃত করতে ইচ্ছে করল লেখকের ‘টরেয়া’ শীর্ষক একটি লেখার অংশ। কবির গদ্য পড়তে হলে কিছু কবিতা অনিবার্যভাবেই চলে আসে অনুভবের উঠোনে। যেমন- ‘বৃত্তান্ত’

বৃত্তান্তে যাবো না বরং গন্তব্যে

পৌঁছই

ফের নীরবতা।

উনুনে গুঁজে দেব

টুপি

‘দোয়েল’ নামের একটি কবিতা পড়ছি পড়ার আনন্দেই-

ভাঙা দেওয়ালে পা। দেওয়ালে দোয়েল বসে

থাকে

কত কত জন্মের পুলক!

ভরসন্ধ্যেয় পালকি এসে

থামে

আমরা জানি নব্বই দশকের কবি সুবীর সরকার জীবনে ও যাপনে ছুঁয়ে থাকেন উত্তরজনপদ। আঞ্চলিক ইতিহাস, লোককথা থেকে তুলে আনতে চান অন্তহীন বাঁচার রসদ। যে বাঁচা নাগরিক মধ্যবিত্তের নয়। যেকোনো একরৈখিক ধারণাকে নস্যাৎ করে বহুমাত্রিক অনুভবেই তিনি খুঁজতে চান বাতাসের ভেতর আরোগ্য। স্বপ্ন দেখেন সাদা ঘোড়া, কবিতাগ্রাম এবং রবিশস্যে ভরা খামারবাড়ির। ‘কত কত জন্মের পুলক’- কে পেতে হলে এক জীবনে কী করতে হবে মানুষকে?

মধ্য হেমন্তের নরম রোদের মধ্য দিয়ে কইকান্তের হন্তদন্ত হেঁটে আসার সূত্র ধরে আখ্যান শুরু হয়। রাধাকান্ত, কইকান্ত, ফণিমোহনের বন্ধুত্ব- পরবর্তী প্রজন্মে বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমে আত্মীয়তা পাতাবার তাগিদ আমাদের আখ্যানের সময়কে নিজের মত করে গড়ে নেয়। সন তারিখ দিয়ে এই সময় বোঝা যায় না। বিহান বেলার রোদে আলস্য মাখতে মাখতে আমরা পাই কইকান্তের গৃহিণী নন্দরাণীর কথা। উত্তরাঞ্চলের এক ভরা সংসারের কর্ত্রীর কাজের ফাঁকে নিজের আসামের বাড়ির কথা মনে পড়ে। আসে আবহমান হাতিমাহুতের গান – “ ও মোর গণেশ হাতির মাহুত রে/ মোক নিয়া যান বাপ ভাইয়ার দেশে।’’ স্মৃতি থেকে ‘সংসারের বাস্তবতার দৈনন্দিনতায়’ ফিরতে হয় তাকে। এই ফেরা না ফেরার সূত্রে পাই রাধাকান্ত কিংবা সোমেশ্বরীকে। পুরোনো দেশকালের গল্প জুড়ে বিষণ্ণ সন্ধে নামার প্রসঙ্গে সচেতন পাঠক লক্ষ্য করতেই পারেন সময়ের চলনকে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল, তারপর সন্ধে—চরিত্রেরা পাল্টে যায়। প্রসারিত হতে থাকে দীর্ঘশ্বাসের ডালপালা—“ হালকা কুয়াশায় স্মৃতির স্তরে স্তরে ফেলে আসা সময়ের মহার্ঘ্য টুকরোগুলি কিছুতেই কিন্তু জোড়া লাগে না।’’

সোমেশ্বরীর বাবা হরমোহন ছিলেন জোতদার। সোমেশ্বরী বাল্যস্মৃতির কাছে আকুল হয়ে পেতে চায় আশ্রয়। কিন্তু… সে জানে তাকে ফিরতে হবেই মাছের ঝাঁকের কাছে- “ হায় রে জীবন! আদিগন্ত এক মানব জীবন।’’ বদলে যাওয়া জীবনের অসহায়তার কথা বারেবারেই তুলে আনেন লেখক। বাতাসের ভেতর আরোগ্য খুঁজতে চেয়ে হয়তো গাড়িয়াল গান তোলে চরাচরের বুকে। যেখানে গদ্য থেমে যায়, গান আসে সেখানে। কিংবা যেখানে গান থামে, সেখানে নিস্তব্ধতা নামে। একটা নিম কাঠের দোতরা চোখের শূন্যতার মিশে যেতে থাকবার ছবিতে বুঝতে পারি এই গদ্য কেবল একজন কবির পক্ষেই লেখা সম্ভব। কুশাণের পালা, মঞ্চ জুড়ে বহুবর্ণিল গীতিময়তার মধ্য থেকেই মানুষ খুঁজে নিতে থাকে হয়তো জীবনের রসদ- “ঘরবাড়ি বিভ্রমের শিশিরেই ভিজে যায়। রাধাকান্তরা জীবনের পরতে পরতে এইভাবে কেবল উৎসব সাজিয়ে যায়।’’ হাটের দিনে পাগলের গল্পে জমতে থাকে কুয়াশার মিথ। গদ্যকার বলেন- “ এক একটা হাট তো তাকে এক এক জন্মের স্বাদ এনে দেয়।’’ এই বই কাহিনিসর্বস্ব হয়ে উঠতে চায়নি কোথাও। ফলে ঘটনা খুব একটা থাকে না। যা থাকে তা হল উত্তরজনপদের চিরায়ত জীবন ইতিহাস। গানে-গল্পে-স্মৃতিতে-যাপনে।

কুদ্দুস, ইয়াসিন, নাসিরুদ্দীন ব্যাপারী, গজেন বর্মণ, বান্ধে ওরাউ, হীরামতি নার্জিনারী, আব্রাহাম রাভা – সবাই মিলে তৈরি করে উত্তরের আত্মপরিচয়। শেকড়ের সন্ধানে ঢুকে পড়তে হয় বহমান জীবনের গভীরে- “সোমেশ্বরীর পাকঘর থেকে মুসুরির ডালের গন্ধ আর প্রাচীনা আবোর মজাগুয়ার মিশ্রণে উত্তরের বিলপুকুরের হাঁসগুলি তাদের চলাচলের ভেতর দিয়ে আবহমানের সব গল্পকথাগুলিকেই হাহাকারের মতন সাজিয়ে দিতে থাকে, একধরনের বাধ্যবাধকতাতেই হয়তো উত্তরকথার খুব খুব ভেতরেই।’’ এই সেজে ওঠা ফুরোয় না কখনো। লেখা যেখানে থেমে যায়, হাওয়া চলে আসে। আবাড় জমতে থাকে উত্তরের কথকতা…

বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে কবি উত্তম দত্তকে। কৌশিক আচার্যের অসামান্য ছবি গ্রন্থের প্রচ্ছদকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে। চিত্রাঙ্গী যত্ন করে প্রকাশ করেছে এই বই। উত্তরজনপদ নিয়ে আরো লিখুন গদ্যকার- এমন দাবি করা যেতেই পারে।


উত্তরজনপদবৃত্তান্ত
সুবীর সরকার
চিত্রাঙ্গী
প্রথম প্রকাশ- নভেম্বর, ২০১৭
মূল্য- ১২০ টাকা