ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়
ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

একটা সময় ছিল যখন বসন্তের প্রথমদিনে লালগোলাপ দিয়ে ভালোবাসার কোর্টশিপ চালু হত । দোল রঙীন হত নীল খামে পারফিউম মাখানো চিঠির ভাঁজে লিপষ্টিকের চুমু দিয়ে । লুকিয়ে চুরিয়ে পার্কে গিয়ে দেখা করে কিম্বা কলেজ পালিয়ে কফিহাউসের টেবিলে মুখোমুখি হয়ে, হেদুয়া থেকে শ্যামবাজার গা ঘেঁষে ঘেঁষে হেঁটে বাসে ওঠা । আবার মনখারাপের পার্টির তোড়জোড় । আবার কবে হবে দেখা ? বাড়ির বড়দের চোখ এড়িয়ে চুপিচুপি লেটারবাক্স হাতড়ে চিঠি খোঁজা । দোলের চিরকূট অথবা ফাগের গুঁড়ো ভরা রঙীন লেফাফা। শুনেছি এমন অনেক পুরোণ চিঠির কথা। টানটান উত্তেজনায় চিলেকোঠার দুপুরগুলোয় সেই কফিহাউসের স্মৃতির লালন চলত আবার যতদিন না দেখা হয় দুটিতে ।

মনের মধ্যে কিসের বাজনা? কেন আবীরে রাঙালি মন? সত্যি কি রং দেওয়া বা রং মাখানো মানেই ভালোবাসাবাসির মেসেজ? সে সদুত্তর আজো পাইনি।

নিকুচি করেছে রোজ ডে, চকোলেট ডে, টেডি ডে, প্রোপোজ ডে, কিসিং ডে, ভ্যালেন্টাইন্স ডে, হাগ ডে… আসলে সবকিছুকে ছাড়িয়েই তো আমাদের সর্বজনীন প্রেমের দিন রং ডে থুড়ি দোল দে কিম্বা দোলা দে। গরম পড়বার আগেই মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা। আসুক নতুন রং। ঘুচুক দুষ্ট রং। প্রকৃতি ভরুক মিষ্টি রং এ। দোলের ন্যাড়াপোড়ার আগুণে শুচি হোক ধরা। ভালোবাসার আঁচে সেঁকে নিক দুটি এবং বহু হৃদয়। এই সব দিনগুলো তো ঢাকা চাপা দেওয়া পুরাতন প্রেমগুলোকেই রাঙিয়ে নেবার । ওইদিন গুলো সব দোলের প্রস্তাবনা। অতএব গোলাপের লালটুকুনি, চকোলেটের বাদামীটুকু, ভ্যালেন্টাইন্স ডে এর গোলাপিটুকু জড়িয়ে থাক। এবার আবীরে থাকুক সব রঙ । আর থাকুক গাছের রঙ। অশোক পলাশ, শিমুল, রুদ্রপলাশ। যেন একা লালে রক্ষে করে ফাগুণ মাসের ঘর।

ফাগুনের শুরুতেই ভাবতে বসি ঠান্ডাটা পুরোপুরি চলে গেলে কি হবে তাই নিয়ে। এই শীত-বসন্তের সন্ধিক্ষণের ফাগুনটাকে আরো বেশী করে কাছে পেতে ইচ্ছে করে। আর এই বসন্তেই একের পর এক হাতছানি ভালোবাসাবাসির উত্সবের। এইসব উত্সবের পণ্যের পসরার তাত নিতে নিতেই ঠান্ডা ফাগুণে আগুণ লেগে দোল এসে পড়ে। আকাশে রং, বাতাসে ফুলের রেণু , জলে স্থলে আবীর-গুলাল, আবারো পণ্য পসরায় হোলির আগুণ রঙ ..সব মিলিয়ে যেন বসন্তকে বলে ওঠা,” যেও না রজনী লয়ে তারাদলে..”.মাইকেল বিজয়া দশমী উপলক্ষ্যে বলেছিলেন।

গোলাপ ছুঁলেই আগুণ। সফ্ট টয়েস তাও? নাকি বর্ষশেষের স্টক ক্লিয়ারেন্স সেল? চকোলেটগুলোতেও বেষ্ট বিফোর ডেট ফুরোয়। তারপরেই তোমায় ছোঁয়া, ঠোঁটে চুমু। সত্যি না মিথ্যে? মনের রঙ ছলকে ওঠে। ঠিক তেমনি দোলও । ডিজিটাল দোলের কত রঙ! যে জন দোলের স্বাদ জানেনা, তার সাথে নেই লেনাদেনা।

বৃন্দাবনের দোল, নবদ্বীপের দোল…কত কত দোলের রঙ্গীন কাহিনী শুনে আসা সেই ছোট্টবেলা থেকে। দোলের পূর্ণিমায় আমার একান্ত আপন চাঁদের রূপোলী আলো ছিলনা তখন। ডিজিটাল দোলের আঙিনায় তখনো হোঁচট খায়নি আমরা। আমাদের দোলের সকাল ছিল সত্যনারায়ণ পূজোর, ফুটকড়াই-মুড়কি আর রঙীন মঠের। কত রঙ সেখানে! আমাদের দোলের সকাল ছিল বাড়ির সকলের পায়ে ফাগ দিয়ে প্রণাম আর বিনিময়ে মিষ্টিমুখ। কাজের লোকটির কপালেও ফাগ দেওয়া আর তারপরেই বালতিতে রং গুলে রঙ খেলা। বাথরুমের পেতলের কলে ছোট্ট রঙ্গীন বেলুন বেঁধে জল ভরে ছোঁড়া ওপরের বারান্দা থেকে। পথচারীকে উদ্দেশ্য করে সেই বেলুন ছোঁড়া যেন যুদ্ধজয়ের আনন্দ এনে দিত।

দোল মানেই আগেরদিন থেকে প্রস্তুতি । কিছুই যেন রয় না বাকী। ন্যাড়াপোড়া থেকে দোল পালন অবধি। প্রতিবার নতুন করে হোলিকা দহনের গল্প ঝালিয়ে নেওয়া। রাধাকৃষ্ণের কীর্তণ শেখা অথবা গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর জন্মদিনটি পালন করা। আধ্যাত্মিক বাতাবরণটুকুনি খুব জরুরী ছোটদের জীবনে। নিজের দেশের সংস্কৃতিকে ধরে রাখবেই বা কে এবং কারা? জানতেই হয় এগুলি নয়ত কে‌ই বা হবে এর বাহক?

সব ইগো, সব শত্রুতার অবসান হোক্‌ না এই দোলে। যুদ্ধ, বিবাদ দ্বেষ হিংসা ঘুচে যাক না দেশ কাল সবকিছুর সীমানা পেরিয়ে। তাই তো দোল। আর তার আগের দিনে ন্যাড়াপোড়া বা হোলিকা দহন।

ইগোর দ্বন্দ। কিসের ইগো? বাপ্-বেটার ইগো। কেন ইগো? এ হল ধর্মান্ধতার ইগো। বাপ হলেন স্বৈরাচারী দৈত্য রাজা হিরণ্যকশিপু আর ব্যাটা হল বিষ্ণুর আশীর্বাদ ধন্য প্রহ্লাদ। আর বাপ হলেন গিয়ে অ্যান্টি বিষ্ণু। বাপ রাজা তাই can do no wrong। আর তার ব্যাটা ঠিক উল্টো। বিষ্ণুর সমর্থক, বিষ্ণু অন্ত প্রাণ।

কশ্যপমুনির স্ত্রী দিতির দুই পুত্র। দৈত্য হিরণ্যাক্ষ ও হিরণ্যকশিপু। এদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে সমগ্র দেবকুল তখন সন্ত্রস্ত । বিষ্ণু বধ করলেন হিরণ্যাক্ষকে। এবার হিরণ্যকশিপু ভ্রাতৃহন্তা বিষ্ণুর ওপর প্রতিহিংসা পরায়ণ হয়ে উঠল। মন্দার পর্বতে কঠোর তপস্যা করে ব্রহ্মার বর পেল সে। দেব, দৈত্য, দানব কেউ তাকে বধ করতে পারবেনা। এইবার খেলার শুরু।

শুরু হল একুশে আইন। হিরণ্যকশিপুর আপন দেশে বলবত্‌ হল নয়া আইন। কেউ বিষ্ণুপুজো করতে পারবেনা। এদিকে তার ছেলেই তো পরম বৈষ্ণব। তাহলে? তাহলে আর কি মার ডালো। আবার যে কেউ মারতে পারবেনা তার ছেলে প্রহ্লাদকে। রাজ্যের সব বিষ্ণুভক্তকে তিনি শূলে চড়িয়ে মৃতুদন্ড দিয়েছেন। কিন্তু ছেলের বেলায় কি করবেন? বুদ্ধি খাটালেন বাপ। সুইসাইড বম্বার চাই তাঁর। কে হবে সেই আত্মঘাতী ঘাতক যে কিনা নিমেষে শেষ করবে তার পুত্রকে? বাপের দুষ্টু পাজী এক বোন ছিল। তার নাম হোলিকা। যুগে যুগে যেমন থাকে আর কি! সংসারে ভাঙন ধরায় তারা, দুষ্টু বুদ্ধিতে ছারখার করে ভাইয়ের সংসার। হোলিকার কাছে ছিল এক মায়া-চাদর।
তৈরি হল বিশেষ ঘর। সেই ঘরে হোলিকা প্রবেশ করল প্রহ্লাদকে নিয়ে। হোলিকা ভাইপো প্রহ্লাদকে তার কোলে নিয়ে বসবে। আগুণ জ্বালানো হবে এমন করে যাতে ঐ মায়া চাদর হোলিকাকে রক্ষা করবে আর প্রহ্লাদের গায়ে আগুণ লেগে সে পুড়ে মরে যাবে। কৌশল, ছলনা সবকিছুর মুখে ছাই দিয়ে মাহেন্দ্রক্ষণ এগিয়ে এল। অগ্নি সংযোগ হল । মায়া চাদর হোলিকার গা থেকে উড়ে গিয়ে নিমেষের মধ্যে প্রহ্লাদকে জাপটে ধরল। হোলিকা পুড়ে ছাই হল আর প্রহ্লাদ তখনো অক্ষত।
রঙ নিয়ে লিখতে বসে পুরাণের জ্ঞান দিয়ে দিলাম। বে-রঙ্গীন হয়ে গেছি কি?
আসলে পুরাণের এই হোলিকা দহন বা আমাদের আজকের ন্যাড়াপোড়া বা বুড়ির ঘর জ্বালানোর কারণ হল অশুভ শক্তির বিনাশ আর পরেরদিনে দোল উত্সবে আনন্দ সকলের সাথে ভাগ করে নিয়ে শুভ শক্তিকে বরণ করা। অথবা যদি ভাবি বৈজ্ঞানিক যুক্তি দিয়ে? বছরের শেষে পুরণো স্মৃতি, জীর্ণ, দীর্ণ সবকিছুকে জ্বালিয়ে দিয়ে নতুন বছরকে সানন্দে বরণ করার আগাম তোড়জোড়? কিম্বা বসন্তে ঋতু পরিবর্তনে রোগের বাড়াবাড়িকে নির্মূল করতে এই দহনক্রিয়া? আর সামাজিক কারণ হিসেবে শীতের শুষ্ক, পাতাঝরা প্রাকৃতিক বাতাবরণকে পুড়িয়ে সাফ করে কিছুটা বাসন্তী ধৌতিকরণ। যাকে আমরা বলে থাকি spring cleaning। সে যাইহোক দোল পূর্ণিমার আগের রাতে খেজুরপাতা, সুপুরীপাতা আর শুকনোগাছের ডালপালা জ্বালিয়ে আগুণের চারপাশে ছোটছোট ছেলেমেয়েদের মহা উত্সাহে নৃত্য করে করে গান গাওয়াটাই যেন আরো সামাজিক। আমাদের চাই রঙ। নানান রঙ। ঝকঝকে রঙ। মলিনতা, বিবর্ণতা সবেতেই ফ্যাশান আউট। শুধু রঙেতেই ইন।

“আজ আমাদের ন্যাড়াপোড়া, কাল আমাদের দোল, পূর্ণিমাতে চাঁদ উঠেছে বল হরিবোল”

এবার সেই হরিবোলের সূত্র ধরে মনে পড়ে যায় মথুরা-বৃন্দাবন সহ ভারতের সর্বত্র দোলের পরদিন হোলি উত্সবের কথা। রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা আর রং খেলার আনন্দে সব কালিমা, বৈরিতা মুছিয়ে দেওয়া আর বার্ষিক এই উত্সবের আনন্দ সকলের সাথে ভাগ করে নেওয়া।

দোল এলেই এখনো মন উচাটন। কেন এমন উদ্বেলতা? রঙ নেবার ও দেবার আকুলতা কি? যার প্রেমিক নেই সেও যেন নিঃস্ব নয়। তার আছেন চির রঙ্গীন রবীন্দ্রনাথ কিম্বা কবিতার সব ব‌ই থরে থরে, বিছানার ওপরে। দোলের গান, দোলের কবিতায় তার শূন্য দোলপিঁড়িটি ভরে উঠবে আবারো নতুন রঙ এ, সেই আশায়।

ভাগ্যি সোশ্যালনেটওয়ার্ক ছিল আমাদের এই দোলের সাথে । দোলখেলার বৃত্তটা কিন্তু ছড়িয়েছে আগের থেকে । কত চোখ এড়িয়ে প্রেম বেঁচে বরতে থাকে দিনের পর দিন রাতের পর রাত । দোলে গিয়ে সেই প্রেম হয়ত পূর্ণতা পায়। মাঝে কিছুদিন দোলের ভালোবাসার বাতাস বয়েছিল অর্কুট অলিন্দে। তারপর ইদানিং ফেসবুক উজাড় করে ঘন্টার পর ঘন্টা দোলের ভালোবাসা পেরয় ডিঙিনৌকো করে । ডিজিটাল ঢেউ পেরিয়ে সীমিত শব্দের ভালবাসা ট্যুইটারের চিলেকোঠাতেও মুখ লুকোয় । কিন্তু কোথায় পব সেই রঙ এর উত্তাপ? ফাগের রঙে আবার ঠাণ্ডা লাগে চট করে। তাই সাধু সাবধান।

কোথায় পাব আসল রং? নতুন রং? আরও নির্ভেজাল রং। কিন্তু wrong রঙ নয়। যে রঙে সত্যি নেই ইগো ক্ল্যাশ, হিংসের গন্ধ, বিদ্বেষের ছোঁয়া, নেই কোনও রঙ্গীন রাজনীতি। যাবার আগে রাঙিয়ে দিয়ে যাও দোল, মানুষের বেরঙ্গীন জীবনগুলোকে।