ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

রবিঠাকুরের লেখায় একাধিকবার এসে পড়েছে এই পিকনিক প্রসঙ্গটি। যদিও সেসময় চড়ুইভাতি বা বনভোজন‌ই ছিল পিকনিকের সদর্থক সমার্থক। তবে বনভোজনের কথা এসেছে তাঁর জাপানযাত্রীতে বেশ কয়েকবার। এছাড়া তাঁর যোগাযোগ উপন্যাসে আছে পিকনিক প্রসঙ্গ। সবচেয়ে ভালোভাবে এই পিকনিকের পুরো ছবিটি উঠে এসেছে ইউরোপ প্রবাসীর চিঠিপত্রে।

পিকনিক নামের বিদেশি শব্দটি তিনি ব্যাবহার করেছেন ইউরোপের প্রবাস থেকে লেখা চিঠির মধ্যে। বিদেশের প্রবাসে তিনি লক্ষ্য করেছিলেন সেখানকার ঘন ঘন সংঘটিত মিলনোৎসবের ক্ষণ। ফুর্তি, আমোদপ্রমোদ অন্তপ্রাণ মেম সাহেবদের চূড়ান্ত বিলাসিতা এই পিকনিকেও দেখা যায়।

স্থান কাল পাত্র ভেদে ভেদে সান্ধ্য পার্টি, গেটটুগেদার ছাড়াও মেদুরতায় ভরা থাকে আমাদের সপ্তাহান্তের এই শীত পিকনিক। আমাদেরও ব্যস্ততার ইঁদুর দৌড়ে এই পিকনিক এক রঙ মিলান্তি মনের খোরাক।

রবিঠাকুর ইউরোপের চিঠিতে লিখলেন–

“এখানে মিলনের উপলক্ষ কতপ্রকার আছে, তার সংখ্যা নেই। ডিনার, বল, conversazione, চা-সভা, লন পার্টি, এক্সকার্শন, পিকনিক ইত্যাদি। আমি একবার এখানকার একটি বোট-যাত্রা ও পিকনিক পার্টিতে ছিলুম। এখানকার একটি রবিবারিক সভার সভ্যেরা এই বোট-যাত্রার উদ্যোগী। এই সভার সভ্য এবং সভ্যরা রবিবার পালনের বিরোধী। তাই তাঁরা রবিবার একত্র হয়ে নির্দোষ আমোদপ্রমোদ করেন। এই রবিবারিক সভার সভ্য আমাদের এক বাঙালি মিত্র ম—মহাশয় আমাদের অনুগ্রহ করে টিকিট দেন।

লন্ডন থেকে রেলওয়ে করে টেমসের ধারে এক গাঁয়ে গিয়ে পৌঁছলুম। গিয়ে দেখলুম টেমসে একটা প্রকাণ্ড নৌকো বাঁধা, আর প্রায় পঞ্চাশ-ষাট জন রবিবার-বিদ্রোহী মেয়েপুরুষে একত্র হয়েছেন। দিনটা অন্ধকার, আকাশ মেঘাচ্ছন্ন, আর যাঁদের আসবার কথা ছিল, তাঁরা সকলে আসেননি। আমার নিজের এ পার্টিতে যোগ দিবার ইচ্ছা ছিল না, কিন্তু ম—মহাশয় নাছোড়বান্দা। আমরা অনেক ভারতবর্ষীয় একত্র হয়েছিলুম, বোধ হয় ম—মহাশয় সকলকেই সুন্দরীর লোভ দেখিয়েছিলেন, কেন না সকলেই প্রায় বাহারে সাজগোজ করে গিয়েছিলেন।

অনেকেই গলায় লাল ফাঁসি বেঁধেছিলেন। ম—মহাশয় স্বয়ং তাঁর নেকটাইয়ে একটি তলবারের আকারে পিন গুঁজে এসেছিলেন। আমাদের মধ্যে একজন তাঁকে ঠাট্টা করে জিজ্ঞাসা করলেন “দেশের সমস্ত টাইয়ে যে তলবারের আঘাত করা হয়েছে, ওটা কি তার বাহ্য লক্ষণ?” তিনি হেসে বললেন, “তা নয় গো, বুকের কাছে একটা কটাক্ষের ছুরি বিঁধেছে, ওটা তারই চিহ্ন।” দেশে থাকতে বিঁধেছিল, কি এখানে, তা কিছু বললেন না। ম—মহাশয়ের হাসিতামাশার বিরাম নেই; সেদিন তিনি স্টিমারে সমস্ত লোকের সঙ্গে সমস্ত দিন ঠাট্টা ও গল্প করে কাটিয়েছিলেন।

একবার তিনি মহিলাদের হাত দেখে গুনতে আরম্ভ করলেন। তখন তিনি বোটসুদ্ধ মেয়েদের এত প্রচুর পরিমাণে হাসিয়েছিলেন যে, সত্যি কথা বলতে কি, তাঁর উপর আমার মনে মনে একুটখানি ঈর্ষার উদ্রেক হয়েছিল। যথাসময়ে বোট ছেড়ে দিল। নদী এত ছোটো যে, আমাদের দেশের খালের কাছাকাছি পৌঁছয়। স্টিমারের মধ্যে আমাদের আলাপ-পরিচয় গল্পসল্প চলতে লাগল। একজন ইংরেজের সঙ্গে আমাদের এক জন দিশি লোকের ধর্মসম্বন্ধীয় তর্ক উঠল।

আমাদের সঙ্গে এক জনের আলাপ হল, তিনি তাঁদের ইংরেজি সাহিত্যের কথা তুললেন, তাঁর শেলির কবিতা অত্যন্ত ভালো লাগে; সে-বিষয়ে আমার সঙ্গে তাঁর মতের মিল হল দেখে তিনি ভারি খুশি হলেন; তিনি আমাকে বিশেষ করে তাঁর বাড়ি যেতে অনুরোধ করলেন। ইনি ইংরেজি সাহিত্য ও তাঁর নিজের দেশের রাজনীতি ভালোরকম করে চর্চা করেছেন, কিন্তু যেই ভারতবর্ষের কথা উঠল, অমনি তাঁর অজ্ঞতা বেরিয়ে পড়ল। তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “কোন্‌ রাজার অধীনে।”

আমি অবাক হয়ে বললুম, “ব্রিটিশ গবর্মেন্টের।”