পল্লব দাস

ঠিক যে সময়ে বসে লিখছি, সেটা স্বাধীনতার সত্তর বছর পর। ১৯৪৭-এর স্বাধীনতা সঙ্গে নিয়ে এসেছিল দেশভাগের যন্ত্রণা, লক্ষ লক্ষ মানুষের এক কলমের আঁচড়ে বাস্তুহারা হয়ে যাওয়ার অভিশাপ। কিন্তু আজও আমি যখন লিখছি আমার রাষ্ট্রের লক্ষ লক্ষ মানুষ দুঃস্বপ্ন দেখছে নতুন করে বাস্তুহারা হওয়ার। ১৯৪৭, ১৯৭১ থেকে ২০১৯– উদ্বাস্তু বা রিফিউজি শব্দ দুটি যেন আমাদের পিছু ছাড়ছে না। এবং এই তিন ক্ষেত্রেই উদ্বাস্তু কথাটির প্রাসঙ্গিকতার মধ্যে মিল রয়েছে। ধর্মের দোহাই দিয়ে উদ্বাস্তু তৈরির পরিকল্পনা আসলে রাষ্ট্র শক্তির ক্ষমতা দখলের একটি ষড়যন্ত্র মাত্র।

উদ্বাস্তু নিয়ে তথ্য পরিসংখ্যান অনেক আর্কাইভেই পাওয়া যায়। কিন্তু আমার এ প্রবন্ধের উদ্দেশ্য তথ্য দেওয়া নয়, বরং নব্য উদ্বাস্তু তৈরির সময়ে অতীতের অভিজ্ঞতার ভয়াবহতা মনে করিয়ে দেওয়া এবং এই সময়ের গতি প্রকৃতি অনুধাবন করার চেষ্টা করা। কিন্তু অতীত মনে করানোর প্রয়োজন কেন? এই প্রসঙ্গে একটা অভিজ্ঞতার কথা বলতে চাই। কয়েকদিন আগে আমার কলেজের বাংলা বিভাগ আয়োজিত একটি আলোচনা সভা শেষ করে ফিরছিলাম কলকাতায় সন্ধ্যের ট্রেন ধরে। সৌভাগ্যবশত আমার সেদিনের সফরসঙ্গী ছিলেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আব্দুল কাফি।

কথায় কথায় কাফি-দা’কে বললাম যে দেশভাগ নিয়ে গবেষণামূলক কাজ করছি। কাফি’দা উত্তর দিয়েছিলেন – এই নব্য উদ্বাস্তু তৈরির যুগে দেশভাগ ও উদ্বাস্তু স্মৃতি নিয়ে কাজ করা খুবই দরকার। স্বাধীনতার সাত দশক পেড়িয়ে যাওয়ার পর আমাদের যুব সমাজ ৪৭ এর উদ্বাস্তু তৈরির ভয়াবহতাকে অনেকাংশে ভুলতে বসেছে। বাঙালির ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে এই উদ্বাস্তু ভাবনাটা জড়িয়ে আছে। কিন্তু আজ আমাদের যুব সমাজ এই উদ্বাস্তু ইতিহাসটাই ভুলতে বসেছে। তাদের এটা মনে করানো একান্ত দরকার যাতে এই নব্য উদ্বাস্তু তৈরির সময়ে তারা ভুল পক্ষ না নেয়, বিভ্রান্ত না হয়। কাফি’দার কথাটা এখনও কানে বাজে।

মানুষের স্বাভাবিক সহজাত দেশের ধারণাটিকেই দেশভাগ এক বড় প্রশ্নচিহ্নের সামনে এনে দেয়। রাষ্ট্র চেতনা ও দেশের ধারণা এক নয়। রাষ্ট্রের ধারণাটি নিতান্তই প্রাতিষ্ঠানিক। এবং রাষ্ট্রের ধারণার সঙ্গে বল প্রয়োগের ধারণাটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। রাষ্ট্র-চেতনার মধ্যে মানুষের রাজনৈতিক পরিচয় কাজ করে। আর দেশ-চেতনা একটি নিতান্ত ব্যক্তিগত বিষয়। রাজনৈতিক ভাবে মানুষ যে রাষ্ট্রীয় সীমানার অন্তর্গত তাই তার নাগরিক পরিচয় বহন করে-– অর্থাৎ রাষ্ট্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত অবস্থান। রাষ্ট্রীয় পরিচয় মানুষকে গর্বিত করতে পারে, কিন্তু তার ব্যক্তিগত অস্তিত্বের ধারণার সঙ্গে এক হতে পারে না। অপর দিকে মানুষের দেশের ধারণা তার অস্তিত্বের ধারণার সাথেই তৈরি হয়।

দেশের ধারণাটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার পরিসরে গড়ে ওঠা একটি ভৌগলিক ধারণা। এই ‘দেশের’ পরিসর রাষ্ট্রের মতো প্রাতিষ্ঠানিক নয়। এর পরিধি মানুষের অনুভূতির সঙ্গে জড়িত এবং সীমিত পরিসরে সীমাবদ্ধ। ‘দেশ’ বলতে মানুষ তার জন্মভিটে, তার বেড়ে ওঠার সঙ্গী মাঠ, ঘাট, রাস্তা, বাড়ি, ঘর, নদী, জঙ্গল এবং মানুষদেরকেই বোঝায়। এই দেশ-চেতনাই নিজস্বতার ধারণার সঙ্গে তার পরিচয় ঘটায়। তাই দেশ হারানো মানুষদের কাছে দেশ বলতে খুলনা, বরিশাল, যশোর, ঢাকা বা কৃষ্ণনগর, বনগাঁ, বসিরহাটকেই বোঝায়। তারা কেউই অবিভক্ত ভারত এমনকি অবিভক্ত বাংলাকেও নিজের দেশ বলেন না। ছোট ছোট পরিসর তার নিজস্বতা নিয়ে তাদের কাছে দেশ হয়ে ওঠে।

দেশের ধারণাটি মূলত ভৌগলিক। অর্থাৎ দেশ ভাগের ফলে একটি ভূখণ্ড ভাগ হয়ে দুটি সার্বভৌম প্রতিষ্ঠান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত দুটি পৃথক ভূখণ্ডের– দুটি রাষ্ট্রের– জন্ম দেয়। প্রশ্ন জাগে, দুই নতুন রাষ্ট্রের মানুষের রাষ্ট্রীয় পরিচয় বদলে গেলেই কি তাদের দেশ ত্যাগ প্রয়োজনীয় ছিল? মূলত ক্ষমতার লোভ এবং স্বার্থসিদ্ধির ফলাফল হলেও দেশভাগকে জোর করে এক ধর্মীয় চেহারা দেওয়া হয়েছিল। ফলে হঠাৎই পূর্ব পাকিস্তান এ চলে যাওয়া অংশের হিন্দুদের রাষ্ট্র হারাতে হয়। আবার একই ঘটনা ঘটে পশ্চিম বাংলায় থাকা মুসলিম জনসংখ্যার সঙ্গে।

হঠাৎ করে ধর্মীয় আনুগত্যের কারণে জনসংখ্যার এক বড় অংশকে রাষ্ট্রহারা হতে হয়। তাদের জানিয়ে দেওয়া হয়, এই নতুন রাষ্ট্র তাদের ধর্মের মানুষের জন্য সুরক্ষিত নয়। দাঙ্গার সময়ে সংখ্যালঘু হয়ে বেঁচে থাকার ভয়াবহতার কথা চিন্তা করে অনেকেই রাষ্ট্র ত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন। তবে পূর্ব সীমান্তে এই জনসংখ্যার অভিপ্রয়াণ এক দিন বা এক বছরে ঘটেনি। অনেকেই রাষ্ট্র লাভের প্রয়োজনে দেশ ছাড়ার কথা ভেবেছেন অনেক পরে।

রাষ্ট্রের নাম পালটে যাওয়াটা এই সমস্ত মানুষদের কাছে কোনও বড় ব্যাপার ছিল না। যে স্থানে সে বাস করছে তার রাজনৈতিক নাম পালটালেও মানুষের সাধারণ ও একান্ত আপন ব্যক্তিগত অস্তিত্বের উপর তার বড় একটা প্রভাব পড়ে না। কারণ রাষ্ট্রীয় পরিচয় মানুষের সমষ্টিগত পরিচয় বহন করে। অপর দিকে তার ব্যক্তিগত বেড়ে ওঠার পরিসরটা তার ব্যক্তিগত অস্তিত্বকে প্রকাশিত করে। যাদের ধর্মীয় কারণে ও জীবন রক্ষার তাগিদে দেশান্তরী হতে হয় তাদের মূল আক্ষেপটা পূর্ব পাকিস্তান হতে পশ্চিমবঙ্গে আসার মধ্যে বা উল্টোটায় লুকিয়ে ছিল না। তাদের মূল আক্ষেপ ছিল শিকড় ছিঁড়ে আসার কষ্ট। ‘দেশ’ হারনোর ব্যথাটা ছিল তাদের পরবর্তী বেঁচে থাকার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।

এপারে থাকা মুসলমানদের বড় অংশ যেমন মনে করতে থাকে তারা দেশহারা, তাদের নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তান, তেমনই ওপারে থাকা হিন্দুদের বড় অংশ বুঝতে পারে হঠাৎই তাদের রাষ্ট্রীয় পরিচয় পরিবর্তিত হয়েছে। ব্যক্তিগত, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক আনুগত্যের চাপে এ পরিচয় মানতে না পারলে তাদেরও গ্রাস করে রাষ্ট্র হারানোর বিহ্বলতা। তবুও এই বিহ্বলতার অভিঘাত তারা কাটিয়ে ওঠে কারণ রাজনৈতিক রাষ্ট্রের অস্তিত্ব থাকে কেবল পরিচয়পত্রে। কিন্তু আর্থ-সামাজিক এবং ধর্মীয় চাপে জীবন রক্ষার তাগিদে যখন হাজার হাজার মানুষকে জন্মভূমি জন্মভিটে ছাড়তে হয়, সেই হারানোর ক্ষতিপূরণ যে আর সম্ভব নয় তা এই সমস্ত স্মৃতিচারণা থেকেই স্পষ্ট হয়।

নতুন রাষ্ট্রে বা পুরানো রাষ্ট্রে নতুন করে এসে এই সমস্ত মানুষেরা যখন আবার শিকড় গাঁথার চেষ্টা করেছেন, বারম্বার এ রাষ্ট্রের সমাজ তাদের মনে করিয়ে দিয়েছে তাদের ছিন্নমূল অস্তিত্বের কথা। আশ্রয় তারা পেয়েছেন। পেয়েছেন জমিও। কিন্তু স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পরও ‘উদ্বাস্তু’, ‘রিফিউজি’, ‘বাঙাল’ ইত্যাদি সামাজিক সম্বোধনে বেঁধে রেখে তাদের আশ্রিত হওয়ার কথা মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে। জীবনরক্ষার তাগিদে আসা এই ‘নতুন’ রাষ্ট্রে সমাজ, যেখানে তাদের নিজের কৌমের নাগরিকই বেশি, তাদেরকে নিজের বলে গ্রহণ করেনি। আবার বহিষ্কারও করেনি। রাষ্ট্র তাদেরকে নাগরিকত্ব দিয়েছে সময়ের সাথে।

সমাজ তাদের আপন করেনি, আশ্রিত করে রেখেছে। ফলে এরা এ রাষ্ট্রে দেশ খোঁজার চেষ্টা করলেও আদতে পরিণত হয়েছে এক বিশেষ গোষ্ঠীতে – এরা হয়েছে ‘দেশভিখারি’। নিতান্তই বাঁচার তাগিদে এখানে থাকতে হয়েছে ঠিকই, কিন্তু স্মৃতি জুড়ে থাকা তাদের ‘দেশ’ এবং নতুন রাষ্ট্রে তাদের ক্রমবর্ধমান জীবনধারণের লড়াই এক নতুন নস্টালজিয়ার জন্ম দিয়েছে। ‘ভানু গোয়েন্দা জহর অ্যাসিস্ট্যান্ট’ চলচ্চিত্রের বাড়ীওয়ালার মতন তাদের এই নস্টালজিয়াও যেন বার বার বলে যায় – “আমারও একদিন আছিলো রে মশয়, আমারও একদিন আছিলো”।

এই কারণেই এখনকার সামাজিক রাজনৈতিক ধর্মীয় প্রেক্ষাপটে উদ্বাস্তু কথাটা আবার প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। CAA এবং NRC বর্তমানে ভারতবর্ষের জনসংখ্যার এক বড় অংশের মানুষের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। দেশভাগ এবং ৭১-এর দোহাই দিয়ে আবার নাগরিকত্ব প্রমাণ করার ফরমান জারি হতে চলেছে। একটি বিশেষ ধর্মীয় গোষ্ঠীকে কোণঠাসা করার লক্ষ্য নিয়ে ভারত সরকার যে আইন আনছে তা মূলত কাগজের সাথে মানুষের লড়াই। কাগজ না মিললে আবার হতে হবে বাস্তুহারা। এবং তাতে কেবল একটি ধর্মীয় গোষ্ঠী কোণঠাসা হবে না, আসাম প্রমাণ দিয়েছে – ঠগ বাছতে গা উজাড় হবার।

রিফিউজি ক্যাম্প কেমন ছিল আমরা জানি। এবার কিন্তু সরাসরি হিটলারি ডিটেনসন ক্যাম্প। অসামে এ রকম ক্যাম্পে মানুষ মরছে-– সে খবর হাওয়ায় ভাসছে। ভারত একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। কিন্তু এই আইন গুলি ভারতীয় সংবিধানের মূল চরিত্রগুলিকেই পালটে দিচ্ছে। আবার ভালো করে খেয়াল করলে দেখা যাবে, যখন আধার বা ভোটার কার্ড নয় পূর্বপুরুষের সম্পত্তির দলিল, পরিচয়পত্র এখানে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে, তখন তা খুঁজে না পাওয়ার সম্ভাবনা মূলত গরীবদের বেশি। এরা জাতি ধর্ম নির্বিশেষে এই আইনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বাস্তুহারা হবে।

এই নব্য উদ্বাস্তু তৈরির যুগে ধর্মান্ধ এক বড় জনসংখ্যা এই আইনগুলিকে সমর্থন করে ভারতীয় ধর্মনিরপেক্ষতার চরিত্রকে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছে রোজ। ৪৭ ও ৭১ এর ইতিহাস আবার জানার দরকার এদের। যে ধর্মেরই হোক মানুষ, উদ্বাস্তু হওয়ার যন্ত্রণা কারও আলাদা নয়। ইতিহাসের থেকে আমাদের শেখা উচিৎ। তবে কতটাই বা শিখব? যে রাষ্ট্রে গান্ধীর জীবনীকার ঐতিহাসিক রামচন্দ্র গুহ রাষ্ট্রীয় শোষণের ও মেরুকরণের বিরোধিতা করে গ্রেপ্তার হন রাষ্ট্রের পাঠানো পুলিশ বাহিনীর কাছে, সে রাষ্ট্রে ইতিহাসের মূল্য কতোটা সে বিষয়ে সন্দেহ জাগে। আশার আলো একটাই – ছাত্র সমাজ।
“ওরে নবীন, ওরে আমার কাঁচা/ আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা”।

*সহকারি অধ্যাপক, ইংরাজি বিভাগ, মানকর কলেজ।