রাধা-কৃষ্ণ দোলে ফুল ঝুলনায়৷ শুধু কি তাঁরাই দুলবেন? তাহলে কেন‌ই বা ঝুলনযাত্রার শেষে রাখী বেঁধেIndira-Mukhopadhay দিয়ে মিষ্টিমুখ করায় আমার বন্ধু ? রাধাকৃষ্ণ, ঝুলন সাজানো, এসব তো মানুষের মনগড়া । আসল তো মাঝেমাঝে সম্পর্কটাকে ঝালিয়ে নেওয়া। কৃষ্ণ স্বয়ংও বোধহয় সেকথা বুঝেছিলেন। আসলে দোলা বা হিন্দোলনের অর্থই তো হল সুখ-দুঃখ, বিরহ-মিলন ময় মানুষের জীবন ঘড়ির পেন্ডুলামের মত চলমানতায় ভরা। লিখছেন  ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় 

 

হামিলনের জন্য‌ই কি এমন ঢালাও আয়োজন চলে আসছে হিন্দুধর্মে? নয়ত জ্যৈষ্ঠে স্নানযাত্রা, আষাঢ়ে রথযাত্রা, শ্রাবণে ঝুলনযাত্রা, কার্তিকে রাসযাত্রা, ফাল্গুনে দোলযাত্রার মত এত এত উৎসব মণ্ডিত যাত্রা পালনে সামিল হাজার হাজার মানুষ ।   রাধাকৃষ্ণতো প্রতীকি।  ভারতবর্ষে  বছরের বিশেষ দিনগুলোতে তিথিক্ষণ মেনে কেন আমরা এখনো জমায়েত হ‌ই মেলা প্রাঙ্গণে? কেন‌ই বা রথের রশিতে টান দি কিম্বা মুঠোমুঠো ফাগ আবীরে রাঙিয়ে দি বন্ধুর মুখ? আর কেন‌ই বা ঝুলনযাত্রার শেষে রাখী বেঁধে দিয়ে মিষ্টিমুখ করায় আমার বন্ধু ? রাধাকৃষ্ণ, ঝুলন সাজানো, এসব তো মানুষের মনগড়া । আসল তো মাঝেমাঝে সম্পর্কটাকে ঝালিয়ে নেওয়া। কৃষ্ণ স্বয়ং সেকথাও বুঝেছিলেন। হঠাত হঠাত মথুরা থেকে বৃন্দাবন, সেখান থেকে দ্বারকা …তাঁর সামাজিক, রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ব্যস্তসমস্ত  কর্মসূচির টানাপোড়েনে  শ্রীরাধার সাথে সম্পর্কটা যায় যায় হয়ে দাঁড়াতো। তাই তো এই উৎসবের মধ্যে দিয়ে আবারো মধুর সম্পর্কটা টিঁকিয়ে রাখার চেষ্ট করে যাওয়া। একান্তে দিনকয়েক কাছের করে পাওয়া। দুজনের কত শৃঙ্গার, ভৃঙ্গারে  Radha-krishna-in-jhulaগল্পমুখর দিনরাত এক হয়ে যাওয়া।   ঋতুবৈচিত্রের ওঠাপড়ায় মন ভালো করে দেওয়া আর সর্বোপরি মানভঞ্জন করে একটা জম্পেশ পার্টি অর্গানাইজ করা। দেব ভি খুশ! আর দেবী ভি!  আর গৌরীসেনেরা আছেন পার্টির খরচখরচা যোগাতে। কেষ্টার আবহমান কালের ব্র্যান্ডের দাপট এখনো অব্যাহত। অতএব জিতনা লাগেগা, উতনাই মিলেগা। চলো! হামলোগ পার্টি করে!  রাধা-কিষণ ডান্স করে!

সেই ভোর থেকে উঠে পিকলু ঝুলন সাজাতে ব্যস্ত। আর একটু করে সাজায় আর মা’কে হাঁকে, ওমা! দেখোনা, কেমন হল? মা শশব্যস্তে রান্নাঘর থেকে আসে আর বলে খাসা হয়েছে। ভরে ওঠে পিকলুর ঝুলনবাগান। ভাদ্রের মেঘমুক্ত নীল আকাশে ছেঁড়া ছেঁড়া সাদা মেঘ…পেঁজাতুলোর মত ভেসে বেড়ায়। পিকলুদের স্কুল ছুটি আজ। সে বন্ধুদের কাছ থেকে জড়ো করেছে কত পুতুল । এক চিলতে নীল নদী। কলকল করে নীলগোলা জল বয়ে চলেছে সেখান দিয়ে । ওপর দিয়ে নদী পেরোনোর ছোট্ট বাঁশের সাঁকো। নদীর ধারে ছোট বড় মাঝারি গাছ…একটা শুকনো ডালে ছোট্ট খঞ্জনা পাখিও দোলা খাচ্ছে মনের সুখে। সবুজ পাতা ভর্তি গাছে বসেছে ল্যাজঝোলা পাখীটা। আর মনের সুখে গান গেয়ে চলেছে সে। সাঁকো পেরিয়ে চলেছে সারেসারে মাk1._1নুষ। কৃষ্ণনগরের মাটির পুতুল সব। কারো মাথায় খড়ের আঁটি, কারোর পিঠে ঝোলাভর্তি আনাজপাতি। সাঁকোর গায়ে হেলান দিয়ে একটা ভিখারি ভিক্ষে চাইছে। বয়সের ভারে সে কুব্জ ও কিছুটা ন্যুব্জ। একটা ঠ্যালাগাড়ি চলেছে সাঁকোর ওপর দিয়ে। তাতে রয়েছে মেলায় বিক্রির জন্য মাটির পুতুল, মাটির ফল, তালপাতার হাতপাখা, বাঁশের বাঁশী, কাঠের খেলনা আরো কতকিছু!  নদীর ওপরে ডিঙিনৌকায় জাল ফেলে মাছ ধরছে দু-চারজন জেলে। নদী পেরিয়ে দূরে গ্রামের মেঠোরাস্তা। মোরাম ফেলে লাল করেছে পিকলু। ওখানেই সকলে যাবে। একটা কদমগাছের নীচে সকলে জড়ো হবে আজ। ঝুলনযাত্রা তাই । কদমতলায় মেলাও বসেছে ঝুলনের। সেখানে একটা নাগরদোলাও রেখেছে পিকলু । ছোটছোট ছেলেমেয়েরাও জড়ো হতে শুরু করেছে। জিরো ওয়াটের নীল-হলুদ বাল্বও লাগিয়ে দিয়েছে পিকলুর বন্ধুরা। মেলায় একটু আলো না দিলে কেমন ন্যাড়ান্যাড়া লাগে যে!

 হারিয়ে যায় পিকলু। রাধাকৃষ্ণ দোলনায় ঝুলবে ক’দিন। মা কিনে দিয়েছে মেলা থেকে। নিখুঁত চোখমুখ তাদের। হাসিহাসি মুখ। পিকলু মনে মনে ভাবে এভাবেই যেন ঠাকুর হাসিমুখে সবসময় থাকে ওদের দুজনের সঙ্গে। আর পাড়ার সব বন্ধুরা…..পিকু, টুসু, বিল্টু, হাবুল সকলেই যেন ওর পাশে থাকে, রোজ রোজ আর সারাটা জীবন। সারাবছর অনেক দুঃখ পিকলুদের। কিন্তু এই ঝুলনের কটাদিন অনেক অনেক সুখের অবগাহন ।

 “আমি প্রতিবছরে ঝুলন সাজাবো, আমার মা’কে সুখী করো ঠাকুর!”

দূর থেকে রেডিও ভেসে আসে …কুসুমদোলায় দোলে শ্যামরায়, তমাল শাখে দোলা ঝোলে দুজনে…. ছোট্টবেলায় গানটা গেয়ে মা ঘুম পাড়াতো পিকলুকে…….

বরানগরে আমাদের স্কুল থেকে ফেরার পথে প্রতিবছর দেখতাম এই পিকলুর মত ছোটছোট ছেলেমেয়েদের নিষ্ঠাভরে ঝুলন সাজাতে। আটপৌরে, সাবেকী সব বাড়ির দালানের দ্বার সকলের জন্য অবারিত। সটান স্কুলের জুতো খুলে হাত ধুয়ে  দেখতে যেতাম ঝুলন। অপার বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকতাম তাদের যোগাড় দেখে।  আর কি নিখুঁত সেই সজ্জা! কি নেই সেখানে! সারাবছর ধরে পিকলুরা বুঝি সঞ্চয় করে শুকনোগাছের ডাল, প্লাসটিকের ফুল, শুকনো ফলের বীজ, নানা ধরণের নুড়িপাথর, কাঁকর, মোরাম, সাদাবালি, হলদে বালি, পুতুল   আরো কত কি! শুধু অপেক্ষা এই বিশেষদিনটির জন্য। সাতদিন আগে থেকেই শুরু হয়ে যেত মহড়া। কি অপূর্ব সৃষ্টিশীলতা ছিল ছোট বড়ো সকলের মধ্যে!  ছোটখাটি ইন্ডোর গেম খেলতে ব্যস্ত পাড়ার সক্কলে। কেউ দিচ্ছে আইডিয়া। কেউ দিচ্ছে অর্থ, বাড়ির বড়োরা দিচ্ছে সাপোর্ট আর কেউ শুধুই বিশ্বাসে মিলায়ে বস্তু।  মায়ের হাত ধরে প্রতিবছর যেতাম বরানগর পাঠবাড়ির ঝুলন-উত্সব দেখতে। দেখবার মত ঝুলন হয় এখানে। আর মেলা বসে বিশাল করে। গায়ে নীল রং মাখিয়ে,   মাথায় মুকুট পরিয়ে, পরচুলা লাগিয়ে ছোটছেলেকে কৃষ্ণ আর একটি ফুটফুটে মেয়েকে রাধা সাজিয়ে “লাইভ ঝুলন” মিছিলো বেরত আমাদের  মফস্বলী শহরে। আর পাঠবাড়ির মন্দিরের মধ্যে ছোটছোট আলাদ আলাদা ঘরের মধ্যে কৃষ্ণের শৈশবজীবনের উল্লেখযোগ্য ঘটনা যেমন তাঁর জন্ম, পুতনাবধ, কালীয়দমন, অকাসুর বধ, দধিমন্থনকে পুতুলের মাধ্যমে কৃত্রিম প্রকৃতির মাঝখানে প্রদর্শন করা হত। কি পারিপাট্য সেই ঝুলনযাত্রার! ফেরার পথে মেলা থেকে কাঁচের চুড়ি, মাটির পুতুল আর গরম জিলিপি হত উপরি পাওনা।


আসল তো মাঝেমাঝে সম্পর্কটাকে ঝালিয়ে নেওয়া। কৃষ্ণ স্বয়ং সেকথাও বুঝেছিলেন। হঠাত হঠাত মথুরা থেকে বৃন্দাবন, সেখান থেকে দ্বারকা …তাঁর সামাজিক, রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ব্যস্তসমস্ত  কর্মসূচির টানাপোড়েনে  শ্রীরাধার সাথে সম্পর্কটা যায় যায় হয়ে দাঁড়াতো। তাই তো এই উৎসবের মধ্যে দিয়ে আবারো মধুর সম্পর্কটা টিঁকিয়ে রাখার চেষ্ট করে যাওয়া। একান্তে দিনকয়েক কাছের করে পাওয়া। দুজনের কত শৃঙ্গার, ভৃঙ্গারে  গল্পমুখর দিনরাত এক হয়ে যাওয়া।


বছরের তিনটে বিশেষ পূর্ণিমাতে হয় রাধাকৃষ্ণের তিন লীলা-উত্সব বা যাত্রা  । ফাল্গুণী পূর্ণিমায় দোলযাত্রা, শ্রাবণী পূর্ণিমায় ঝুলনযাত্রা আর কার্তিক পূর্ণিমায়  রাসযাত্রা। ঝুলন হল বর্ষার লীলা যার অপর নাম হিন্দোলনলীলা। ব্রজবাসীরা কদমগাছে ঝুলা বেঁধে রাধাকৃষ্ণকে দোল খাওয়ায়। কাজরী গান হয়। মেঘমল্লারে বৃন্দাবনের আকাশবাতাস সঙ্গীতমুখর হয়ে ওঠে। একাদশী থেকে শুরু হয় ঝুলন আর শেষ  হয় পঞ্চমদিনের পূর্ণিমাতে। রাখী বাঁধা হয় সেদিন।

craftter-0940-840171-1-zoomতবে অন্য্যন্য যাত্রাগুলির থেকে ঝুলনযাত্রা একটু ভিন্ন। এটি রূপকধর্মী। দোলা বা হিন্দোলনের অর্থ হল সুখ-দুঃখ, বিরহ-মিলন ময় মানুষের  জীবনের প্রকৃত অর্থ‌ই হল ঘড়ির পেন্ডুলামের মত চলমানতায় ভরা। একবার আসবে দুঃখ। তারপরেই সুখ। কখনো বিরহ, কখনো মিলন। কখনো আনন্দ, কখনো বিষাদ। স্থির হয়ে থাকাটা জীবন নয়। এই দোলনার আসা ও যাওয়াটি হল রূপকমাত্র। তাই জন্যেই তো বলে “চক্রবত পরিবর্ততে সুখানি চ দুখানি চ। “

উপনিষদে বলে ” আনন্দ ব্রহ্মেতি ব্যজনাত” অর্থাত ব্রহ্ম আনন্দস্বরূপ। কিন্তু তিনি একা সেই কাজ করবেন কি করে? তাইতো তিনি সৃষ্টি করেন বন্ধু-বান্ধব, পিতামাতা, দাসদাসী, ভাইবোন, স্বামী-স্ত্রীর মত সম্পর্কের জালে আবদ্ধ মানুষদের। তাই প্রেমের আবাহনে পুরুষ আর প্রকৃতির যৌথ উদ্যোগে গড়ে ওঠে হিন্দোলন বা ঝুলনের মত উত্সব। সম্পর্ক টিঁকিয়ে রাখার জন্য সৃষ্টিকর্তা প্রজাপিতা ব্রহ্মের এরূপ দায়বদ্ধতা। মানুষ যাতে মানুষকে নিয়ে অহোরাত্র বেঁঁচে থাকে…… আর সেখানেই ঝুলন নামক মিলনোত্সবের সার্থকতা !

শ্রীমদ্ভাগবতে বলে, বর্ষণমুখর বৃন্দাবন তখন বানভাসি। বর্ষণসিক্ত ধরিত্রী সবুজ। নদীনালা বর্ষার আনন্দে থৈ থৈ। প্রাণীকুল খলখল কলধ্বনিতে মুখর। পক্ষীকুল মনের আনন্দে সরব তাদের কূজনে। আসন্ন পূর্ণিমার রূপোলী জ্যোত্স্নায় ব্যাপ্ত আদিগন্ত চরাচর। এমন প্রাকৃতিক আবাহনে মেতে উঠলেন শ্রীরাধিকা তাঁর দয়িতের সাথে।  এতো মানুষের জীবনের মত‌ই মিলনের আর্তি। বহুদিনের অদর্শণের অপ্রত্যাশিত প্রাপ্তি। এতো আমাদের জীবনে চেনা ঘটনা…তাই নয় কি ?

তাই বুঝি আধুনিক গীতিকারের ভাষাতেও দেখি ঝুলনের উল্লেখ…মধুর মধুর বংশী বাজে, কোথা কোন কদমতলীতে …অথবা বাঁধো ঝুলনা, তমাল বনে, এসো দুলি দুজনে

কাজী নজরুলের গানে মূর্ত হয় আজো ঝুলনের কথা…সখী বাঁধলো বাঁধলো ঝুলনিয়া, নামিল মেখলা মোর বাদরিয়া…অতুলপ্রসাদ সেনের ভাষায় শ্রাবণঝুলাতে, বাদল বাতে সখী আয়গো কে ঝুলিবি আয় …

রবিঠাকুর বলে ওঠেন

দে দোল্‌ দোল্‌ ।

দে দোল্‌ দোল্‌ ।

এ মহাসাগরে তুফান তোল্‌ ।

বধূরে আমার পেয়েছি আবার —

ভরেছে কোল ।

প্রিয়ারে আমার তুলেছে জাগায়ে

প্রলয়রোল ।

বক্ষ-শোণিতে উঠেছে আবার

কী হিল্লোল!

ভিতরে বাহিরে জেগেছে আমার

কী কল্লোল!

সত্যি এ যেন পরাণের সাথে পরাণ বাঁধার উৎসব!  চির বন্ধুতার আবেগে মাখোমাখো উত্সব  ।

ঝুলন নামের সেই মিটিং গ্রাউন্ডের বাস্তব বাগানটি এখন ফেসবুকের আঙিনায় আর অগণিত বন্ধুতার হাতছনিতে আমরা প্রতিনিয়ত‌ই গড়ে চলেছি ডিজিটাল ঝুলন। কেউ দেয় ছবি। কেউ বলে বাহ্! কেউ লেখে কবিতা, আমরা বলি অপূর্ব! কেউ আবার লেখে গল্প। আমরা বলি অনবদ্য! এ ও তো সেই সাঁঝ সকালে ঝুলন সাজিয়ে বসে থাকা..কিছুটা সামাজিক হওয়ার আকাঙ্খায়, কিছুটা বন্ধুত্বের আস্বাদ পাওয়ার লোভে। পিকলু ঝুলন সাজায় আর বসে বসে ভাবে কখন রাস্তা দিয়ে লোক যাবে আর আমার সাজানো ঝুলন দেখে বলবে “বাহ্‌ পিকলু, দারুণ সাজিয়েছো” কেউ বলবে, পিকলু এবার বুঝি কাঠের গুঁড়োতে সবুজ রংটা কম মাখানো হয়েছে? কিম্বা কেউ বলবে, কি পিকলু? পড়াশোনা শিকেয় তুলে শুধু ঝুলন করলেই চলবে?


অন্য্যন্য যাত্রাগুলির থেকে ঝুলনযাত্রা একটু ভিন্ন। এটি রূপকধর্মী। দোলা বা হিন্দোলনের অর্থ হল সুখ-দুঃখ, বিরহ-মিলন ময় মানুষের  জীবনের প্রকৃত অর্থ‌ই হল ঘড়ির পেন্ডুলামের মত চলমানতায় ভরা। একবার আসবে দুঃখ। তারপরেই সুখ। কখনো বিরহ, কখনো মিলন। কখনো আনন্দ, কখনো বিষাদ। স্থির হয়ে থাকাটা জীবন নয়। এই দোলনার আসা ও যাওয়াটি হল রূপকমাত্র।


তবুও তো পিকলু সাজিয়েছে ঝুলন। মনে রেখেছে সেই উত্সবের কথা। আজো তার ঝুলন দেখতে গেলে সে দেয় দুটি নকুলদানা অথবা একটুকরো বাতাসা। কিন্তু সেখানে অনেক আন্তরিকতা ঠিক যেমন ফেসবুকেতে কেউ অন্যের ছবি দেখে বলে, তোমার ছবি দেখলেই মন ভালো হয়ে যায় অথবা ইউ মেড মাই ডে! ঠিক তেমনি।

ঝুলনযাত্রা বহুযুগ আগে থেকে ব্রজভূমি বৃন্দাবনে মহাসমারোহে অনুষ্ঠিত হত। শ্রীকৃষ্ণ এবং শ্রীরাধিকা তাঁদের অষ্টসখী ইন্দুরেখা, চিত্রা, চম্পকলতা, ললিতা, বিশাখা, তুঙ্গবিদ্যা, সুদেবী এবং রঙ্গদেবীর সাথে লীলা করেছিলেন ঐ দিনে। শ্রীচৈতন্যদেবের লীলাক্ষেত্র নবদ্বীপধামেও এখন ঝুলন পালিত হয় মহাসমারোহে। রাধাগোবিন্দের প্রচলিত ঝুলনযাত্রার হাত ধরে এসে পড়ে রাখীবন্ধন যা এখন গ্লোবাল মার্কেটে আরো জনপ্রিয়। ই-কর্মাসের  রমরমায় দেশ হতে দেশান্তরে একটি মাত্র মাউসের ক্লিকে রাখী ও সেই সাথে উপহার পৌঁছে যায় বন্ধুর হাতে। এই রাখীবাঁধার চল নিয়ে নানাজনের নানা মত।

পুরাণের কাহিনী অনুযায়ী দেবতারা যখন অসুরদের দৌরাত্ম্যে স্বর্গ থেকে ক্ষমতাচ্যুত তখন দেবরাজ ইন্দ্র দেবগুরু বৃহস্পতির শরণাপন্ন হলেন। ইন্দ্রের স্ত্রী পৌলমী তখন বৃহস্পতির নির্দেশে ইন্দ্রের হাতে বেঁধে দিলেন একগুচ্ছ রাখী। এই রাখী হল রক্ষাকবচ যা দেবরাজকে রক্ষা করবে অসুরদের সকলপ্রকার অত্যাচারের হাত থেকে। শ্রাবণী পূর্ণিমার দিনে রাখী পরার পরেই নাকি দেবরাজ ইন্দ্র সমর্থ হয়েছিলেন অসুরদের পরাস্ত করে স্বর্গরাজ্য উদ্ধ্বার করতে।

ইতিহাস বলে অনেক কাহিনী।

তার মধ্যে বাঙালীদের কাছে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গ ও রাখীবন্ধনে রবিঠাকুরের অগ্রণী ভূমিকা। ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জন বাংলাকে দুভাগ করে বসলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই বঙ্গভঙ্গের তীব্র বিরোধিতা করে দেশপ্রেমের মন্ত্রে জাতীয়তাবাদকে আরো সোচ্চার করার চেষ্টায় জাতিধর্ম নির্বিশেষে, আপামর জনসাধারণের হাতে রাখী বাঁধলেন। বীজমন্ত্র একটাই। ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে দেশবাসীকে একসূত্রে আবদ্ধ করা। লিখলেন সেই অনবদ্য গান

“বাংলার মাটী বাংলার জল, বাংলার বায়ু বাংলার ফল, পুণ্য হোক, পুণ্য হোক হে ভগবান! তাই সেইথেকে রাখীপূর্ণিমার দিনটি বাঙালীর মননে, স্মরণে আরো গুরুত্ব পেয়ে আসছে।

রাখী হল সেই রক্ষাবন্ধনের কবচ যা পরিয়ে দিলে কোনো অমঙ্গলের আশঙ্কা থাকেনা। তাই বুঝি মা যশোদা কৃষ্ণের হাতে এই মঙ্গলসূত্র বা ডোর বেঁধে দিতেন। বালগোপাল অরণ্যে, প্রান্তরে গোচারণায় যেতেন সখাসখীদের সাথে, তার যাতে কোনো অনিষ্ট না হয় সেই জন্য 268ef5f। আবার ব্রজবালারা কিশোর কৃষ্ণের হাতে ফুলের রাখী বেঁধে দিতেন প্রেম-প্রীতির বন্ধন হিসেবে। মাতা কুন্তী নাকি অর্জুনপুত্র অভিমন্যুর হাতে যুদ্ধযাত্রার প্রাক্কালে রাখী বেঁধে দিয়েছিলেন। অতএব রাখী হল স্নেহ-ভালবাসার বন্ধন দিয়ে মোড়া এক রক্ষাকবচ যা কেবল মাত্র ভাই-বোনের সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।

মধ্যযুগের একটি ঘটনায় পাওয়া যায় অন্য বৃত্তান্ত। মোগলসম্রাট হুমায়ুনের হাতে রাখী বেঁধেছিলেন রাজপুতানার রাজকন্যা কর্ণাবতী । প্রবল পরাক্রমশালী বাহাদুর শাহর কাছে পরাজিত হয়ে রাজকন্যা খুব ভেঙে পড়লেন।  কিন্তু রক্ষাবন্ধনের দিনেও  দাদার মতন শুভাকাঙ্খী হুমায়ুনকে রাখী পাঠাতে ভুলে গেলেননা তিনি। সৌহার্দ্যপূর্ণ বন্ধনের এই রাখী পাওয়া মাত্র‌ই মোগলসম্রাট হুমায়ুন বুঝতে পারলেন ভগিনীসমা কর্ণাবতীর আবেগ। ততক্ষণাত তিনি ভগিনীর সম্মান ও তার রাজ্যের গৌরব বাঁচাতে সসৈন্যে অস্ত্রসজ্জিত হয়ে শত্রুপক্ষকে আক্রমণ করলেন । কর্ণাবতী  ততক্ষণে সতী হয়ে অগ্নিশিখায় আত্মাহুতি দিয়েছেন। হুমায়ুন সেখানে পৌঁছেই ভগিনীর জন্য অশ্রুপাত করেন।

 কিংবদন্তির কড়চা বলে, গ্রীক সম্রাট আলেকজান্ডারের  ব্যাকট্রিয়ান  ধর্মপত্নী রোকসানা পুরুর সাথে তাঁর স্বামীর সাথে ঝিলামনদীর  তীরে  যুদ্ধের প্রাক্কালে পুরুর হাতে নিজে রাখী বেঁধে দিয়েছিলেন। পুরুরাজা এই রাখীবন্ধনে তৃপ্ত হয়ে এক লহমায় যুদ্ধাস্ত্র নামিয়ে ফেলেছিলেন। সে যাত্রায় এভাবে রোকসানার স্বামী আলেকজান্ডারের প্রাণ রক্ষা পেয়েছিল  কেবলমাত্র একগুচ্ছ রাখীর জন্য।

 এখন রাখী একটি বিশেষ দিন যার কমার্সিয়াল মার্কেট বেশ গরম। কত অফারের হাতছানি, কত ডিসকাউন্ট.. শুধু রাখীর কথা মাথায় রেখে। রাখীর বিজ্ঞাপনে চাপা পড়ে যায় ভ্রাতৃত্ববোধের নরম আবেগ।   রাখীবন্ধনকে মনে রেখে ঝাঁপিয়ে পড়ে ক্রেতারা। মিষ্টির দোকান, গয়নার দোকান এমনকি উপহারের দোকানেও চলতে থাকে ভীড়। এও যেন ব্যাবসার নতুন এক স্ট্র্যাটেজি। ব্যাবসায় থাকে প্রতিনিয়ত ওঠাপড়া, অনেকটা শেয়ারবাজারের মত। এই বিশেষ দিনগুলোতে আবারো তাকে কিছুটা তুলে ধরার চেষ্টা চলে। বিক্রির গ্রাফ বাড়তে থাকে ক’টা দিন।

 আচ্ছা  ঝুলন কি মেনে চলে গ্যালিলিওর সূত্র?  পেন্ডুলামের সাম্যাবস্থা থেকে পর্যায়ক্রমে একবার ডাইনে ও বাঁয়ে যাওয়া…এও তো দোলনার‌ মত।  ঝুলনের দোলনায় অধিষ্ঠিত রাধাকৃষ্ণ তো ভরযুক্ত পেন্ডুলামের প্রতীক।  এই দোলনার টাইমপিরিয়ড‌ও কি পেন্ডুলামের গতির মত ? বাঁদিক থেকে তার আসা, তারপরেই পুরনো স্থানে ফিরে আসা, তারপর সাম্যাবস্থায় আসা…. হয়ত বা তাই। গ্যালিলিও তো ছিলেন একজন গণিতজ্ঞ কাম দার্শনিক।  অর্থাত ঝুলনের দৈর্ঘ্য বাড়ালে সে অনেক  সময় নেবে দুলতে। আর দৈর্ঘ্য ছোট হলে সে তাড়াতাড়ি দুলবে। এটাই তো  পেন্ডুলামের জীবনদর্শন।

দুজনের মধ্যিখানে কোথাও নিহিত পেন্ডুলাম বা গ্যালিলিওর ববের সেন্টার অফ গ্র্যাভিটি । ঝুলন্ত দোলনার ওপর থেকে ঐ সেন্টার অফ গ্র্যাভিটির দৈর্ঘ্যটি হল পেন্ডুলামের দৈর্ঘ্য বা “L” আর অ্যাক্সিলারেশান ডিউ টু গ্র্যাভিটি মানে মাধ্যাকর্ষণজনিত ধ্রুবক বা “g”সেও তো রয়েছে পৃথিবীর সর্বত্র..  বৃন্দাবন থেকে নবদ্বীপে। তাহলে নিশ্চয়‌ই ঝুলন মেনে চলে  গ্যালিলিওর সূত্র যেখানে স্থান-কাল-পাত্রভেদে টাইমপিরিয়ড “T”, দৈর্ঘ্য”L” অদ্ভূত এক সম্পর্কের সমীকরণে  জড়িয়ে আছে অনন্তকাল ধরে।

দার্শনিক উপলব্ধি যখন ক্ষুদ্র তখন মনের চাঞ্চল্য দ্রুত অর্থাত দোলনার গতি দ্রুত। আর উপলব্ধি যখন গভীরে প্রসারিত তখন চাঞ্চল্য শ্লথ অর্থাত দোলনা তখন ধীরগতি প্রাপ্ত হয়। কারণ গ্যালিলিও বলেছেন পেন্ডুলামের দৈর্ঘ্য হল টাইম পিরিয়ডের বর্গের সাথে সমানুপাতিক। এই বুঝি ঝুলনের জীবনদর্শন। কালের ঘড়িও যা মেনে আসছে অনন্তকাল ধরে।

কালের পেন্ডুলাম কি আর স্থির থাকে? পেন্ডুলাম স্থির থাকা মানে তো ঘড়ি বন্ধ হয়ে যাওয়া। তারো তো এক‌ইভাবে চলতে থাকা। চলাই জীবন।

শুভ চরৈবেতি!  পুণ্য ঝুলন ! হ্যাপি রাখি!

রবeবার এর পাতায় ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের আরও লেখা পড়ুন নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে:

সিনান যাত্রা 

গুরুপূর্ণিমা ও ব্যাসদেব 

প্লিজ, পজ এন্ড পার্ডন !!!