পুজোসংখ্যার পাতাতেই প্রফেসর শঙ্কুর সব আশ্চর্য আবিষ্কার৷ পুজোসংখ্যাতেই ‘যত কাণ্ড কাঠমান্ডুতে’৷Arindam-Rayএখানেই সমাধান হয়েছে নীলু হাজরা হত্যা রহস্যের৷  শরতের আকাশকে সাক্ষী রেখেই অভিযানে বেরোত কাকাবাবু ও সন্তু৷আজ আর তারা বেরোয় না৷ পুজোসংখ্যাগুলোও আর পুজোয় বরোয় না৷কেমন যেন কিলিয়ে কাঁঠাল পাকানো প্রক্রিয়া৷ লিখছেন  অরিন্দম রায়

 

আমরা যারা ১৯৮০ র জাতক তাদের কাছে পুজোর মানে একটু অন্যরকম ছিল।তখনও কেবল টিভি বলে কিছু আসে নি আমাদের জীবনে।আমাদের ছিল বাক্সবন্দী সাদা কালো টেলেরামা কোম্পানির টিভি।মনে পড়ে ছোটবেলায় আমি আমার কয়েকজন বন্ধুরা মিলে ফুল পাড়তে যেতাম বিলুদের বাড়ি।বিলুর বাবা শ্যামা জেঠু ছিলেন আমাদের পাড়ার জমিদার।জমিদারি অবশ্য থাকার কথা নয় তখন,সেই ১৯৮০ সালে!কিন্তু বাজারের দোকানগুলো থেকে শ্যামাজেঠুকে খাজনা আদায় করতে আমি নিজের চোখে দেখেছি।এক টাকা,দু টাকা করে খাজনা আদায় করত জেঠু আর দোকানদাররা খুব গালাগালি দিত জেঠুর পিছনে।বিলুদের বাড়িটা ছিল মস্ত,বাড়ির পিছন দিকে বাগান আর বাগানের মাঝখান জুড়ে একখানা পুকুর।আমরা শরতের সকালবেলা চলে যেতাম ওদের বাড়ি।আমার হাতে থাকত পিতলের ছোট একটা বালতি,আমার দিদার।দোপাটি,অপরাজিতা,দেশি টগর আর সদ্য ফোটা শিউলিতে ভরে যেত সেই বালতি।তবে ফুল কুড়ান ততটা সহজ ছিল না।শিউলি গাছের গোড়ায় প্রচুর শুঁয়োপোকা থাকত,রেলগাড়ির মতো,সার বেঁধে। আমাদের সেই শুঁয়োপোকাদের রোঁয়া বাঁচিয়ে ফুল তুলতে হত।একটু অসাবধান হয়েছ কি চোখ মুখ ফুলে এক্কেবারে ঢোল!তখন সেখানে চুন লাগিয়ে বসে থাকো যতক্ষণ না ফোলা কমে।শিউলি ফুলের  বোঁটার হলুদ  লেগে আমাদের হাতেও হলুদে কমলা মেশানো রং তখন!

                   pujosonkhya-2  পুজোয় তখন দুই জোড়া জামা প্যান্ট হত আমার।হাফ প্যান্ট ছেড়ে ফুল প্যান্টে পৌঁছতে ক্লাস সেভেন হয়ে গিয়েছিল।বড়কাকা কিনে দিত ক্যাপ ফাটাবার বন্দুক আর ক্যাপ।ব্যস!আমাকে আর পায় কে?ছিল মেজকার হাত ধরে ঠাকুর দেখতে বেড়ানো।হুম,এগরোল ছিল পুজোর স্পেশাল মেনু।এভাবেই আনন্দ আর উৎসবে হাত ধরাধরি করে ঘুরতে বেরতো।

পিসির হাত ধরে প্রথম গল্পের বই পড়তে শেখা।আজও মনে আছে আমার আনন্দমেলার সেই রঙিন কভার।লাফাতে লাফাতে পাশের বাড়ির বন্ধুকে বলতে গিয়েছিলাম ‘জানিস! আমার পিসি আমাকে বই এনে দিয়েছে!’ সে আমার কাছে জানতে চেয়েছিল ‘কি বই?কার বই?’অনেক পরে বুঝেছি বই বলতে সে হতভাগা সিনেমার কথা ভেবেছিল!সেই ছিল আমার প্রথম পূজাবার্ষিকী।আমি তখন থ্রি তে পড়ি।কমিক্স এর মাধ্যমে আমার বাংলা পড়ার শুরু। পরে সেই নেশা আরো জড়িয়ে ধরেছে আমায়।আজো ছেড়ে যাওয়ার কোন লক্ষন দেখি না।আনন্দমেলা ছাড়াও তখন পড়েছি দেব সাহিত্য কুটীর থেকে প্রকাশিত হার্ডকভারের পূজাবার্ষিকীগুলো।কি সুন্দর ছবি থাকত তার পাতায় পাতায়।আলোর ফুলকি আরো কিসব যেন নাম ছিল তাদের!আর পড়তাম ‘সন্দেশ’।ধাপে ধাপে যত ক্লাস বেড়েছে পুজোসংখ্যা লিস্টে যোগ হয়েছে নতুন নতুন নাম।একবার তো রামপুরহাট থেকে ফেরার পথে অজয় মামার কাছে বায়না করে প্ল্যাটফর্মের হুইলারের কাছ থেকে আস্ত একটা পূজাবার্ষিকী ‘শুকতারা’ই চেয়ে নিলাম!আস্তে আস্তে এমন দাঁড়াল যে পুজোসংখ্যা আর দুর্গাপুজো আমার কাছে এক হয়ে যেতে লাগল।‘আনন্দমেলা’র একটা পুজোসংখ্যার কভারের কথা আমার আজো মনে আছে।টিনটিন,ক্যাপ্টেন হ্যাডক,প্রফেসর ক্যালকুলাস,অরণ্যদেব,গাবলু আরো কারা কারা যেন ছিল সেই রঙিন কার্টুন দিয়ে তৈরি কভারে। ‘শুকতারা’ বললেই মনে পড়ে যায় হাঁদা ভোঁদা,নন্টে ফন্টে,কেল্টুদা,সুপারিটেন্ডেন্ট স্যর এর কথা।কি করে ভুলি গোলাপি স্যান্ডো গায়ে বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বাঁটুল দি গ্রেট কে! আর ছিল বাহাদুর বিড়াল।নারায়ণ দেবনাথ যদি বিদেশে জন্মাতেন তাহলে তিনি যে সম্মান পেতেন আমরা তার সিকিভাগ সম্মানও তাঁকে দিয়েছি কি?


আগে পুজোসংখ্যাগুলি পুজোর সময়েই প্রকাশিত হত।ইদানিং এভাবে কিলিয়ে কাঁঠাল পাকানোর মতো জোর জবরদস্তি বর্ষাকালেই পুজোসংখ্যা বের করার হিড়িক পড়ে যায় কেন?


                এভাবেই কখন যে কাকাবাবু ও সন্তু,জোজো,অর্জুন,অর্জুনের গুরু অমল সোম,কলাবতী,পান্ডব গোয়েন্দার বাচ্চু,বিচ্ছু তাদের পোষা দেশি কুকুর পঞ্চু আমার ঘরের লোক হয়ে উঠেছিল বুঝতেই পারি নি।‘শুকতারা’ তে আবার পেয়ে যাচ্ছিলাম নীল রঙের18478192 মানুষ রণজয়-কে।যে কিনা আমাদের মতোই সাধারণ মানুষ।ভিনগ্রহের লোকেরা তাকে ধরে নিয়ে গেছিল।কিন্তু রণজয় সেখান থেকে পালিয়ে আসে।শুধু তার গায়ের রং হয়ে যায় নীল আর উচ্চতা বেড়ে যায় অনেকখানি।প্রথম প্রথম পৃথিবীর বাসিন্দারা রণজয়কে ভয় পেলেও পরে তাদের ভুল ভেঙে যায়।পরে বুঝেছি যে ব্যক্তি কাকাবাবু লেখেন তিনিই আবার লেখেন নীল রঙের মানুষের গল্প।মতি নন্দীর লেখা এক বক্সারের সংগ্রামের গল্প ছিল ‘শিবা’।হারতে হারতে হার না মানা মানুষের সেইসব গল্প এখন আর কোথায়?

 ‘শুকতারা’রই এক পুজাবার্ষিকীতে পড়েছিলাম পিন্ডিদার আশ্চর্য কান্ড কারখানা,লেখক আশুতোষ মুখোপাধ্যায়।কোন এক নাম ভুলে যাওয়া পত্রিকার পুজোসংখ্যাতেই পড়েছিলাম পূর্নেন্দু পত্রীর লেখা ব্যোমকেশ ও সত্যবতীর পুত্র জাম্বো-র গোয়েন্দাগিরির কাহিনি।সেই সংখ্যাতেই ছাপা হয়েছিল শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের জাদুকলমে লেখা সাধু কাঁলাচাদ নামক এক অদ্ভুত কিশোরের আরো অদ্ভুত জীবন বৃত্তান্ত।(যতদূর মনে পড়ছে পত্রিকাটির নাম ছিল ‘সহজ’)। আর এইসব পুজোসংখ্যা জুড়ে ছিল শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ভূতেরা,তেনাদের বাদ দিয়ে লেখা এগিয়ে নিয়ে যাব এমন বুকের পাটা আমার নেই।

আমাদের ছিল ছিটে বেড়ার ঘর।বড়কাকুর একচিলতে ঘরের কাঠের তাকে ক্লাস সেভেনে পড়া আমি খুঁজে পেয়েছিলাম এক এল ডোরাডো!অজস্র  ম্যাগাজিনের মধ্যে থেকে একের পর এক পেয়ে যাচ্ছিলাম ‘আনন্দমেলা’ পূজাবার্ষিকীর পুরনো সব সংখ্যা।তেমন-ই এক পূজাবার্ষিকীতে প্রথমবার shankuপড়ি ‘শিমূল গড়ের ভূত’।ভূত যে এত ভাল হতে পারে শীর্ষেন্দু আমাদের না জানালে জানাই হত না! মানুষের বুকের ভিতরে যে একখানা সাহসের থলি থাকে,সে কথাও তিনিই আমাদের জানালেন।শিমূলগড়ের ভূত উপন্যাসের মূল চরিত্রের নাকের ফুটো দিয়ে ঢুকে তার সেই চুপসে যাওয়া সাহসের থলি ফুলিয়ে গিঁট মেরে দিয়েছিল।অংক পরীক্ষা এগিয়ে এলে আমিও ভাবতাম যদি সেই ভূত এসে একবার আমার চুপসে যাওয়া সাহসের থলিটায় ফুঁ দিয়ে যেত! ‘পটাশপুরের জঙ্গলে’র জয়পতাকা বাবুর কথাই বা ভুলি কিভাবে?

এইরকম এক পূজাবার্ষিকীতে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি উপন্যাসে পেয়েছিলাম বিশু ঠাকুর নামের এক অসমসাহসী ব্রাহ্মণের কাহিনি,যিনি জলদস্যুদের সঙ্গে লড়াই করে তাদের হারিয়ে দিয়েছিলেন।আজ বুঝতে পারি এই চরিত্রটি সুনীল গড়েছিলেন তাঁর পিতামহের আদলে।যদিও এই উপন্যাস বা বিশু ঠাকুর কে নিয়ে খুব বেশি আলোচনা আমার চোখে পড়েনি।

আর হ্যাঁ ,প্রফেসর শঙ্কু তার অত্যাশ্চর্য সব আবিষ্কার আর অভিযানের বিবরণ সমেত তার ডায়েরিটি নিয়ে হাজির হয়েছিলেন পুজোসংখ্যার পাতায় পাতায়।সর্বোপরি ‘দেশ’ এর পুজোসংখ্যায় ফেলুদার কথা না বললে চলবে কি করে।অকালপক্ক আমি ওই বয়সেই ( মানে সেভেন এইটে পড়ার সময়)পড়ে ফেলছি শারদীয়া ‘দেশ’ আর ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’।ঐ শারদীয়া দেশের পাতাতেই আমি পড়ে ফেলি ‘যত কান্ড কাঠমান্ডুতে’।তারপর বেশ কয়েকদিন লেগেছিল ঘোর কাটতে। কারণ মনে মনে জপে যাচ্ছিলাম একটাই মন্ত্র — ওঁ মণিপদ্মে হুম!

 এভাবে পুজোসংখ্যা পড়তেই পড়তেই আমার বয়ঃসন্ধিতে পা দেওয়া এবং ঐ পুজোসংখ্যাতেই পড়ে ফেলা ‘নীলু হাজরার হত্যা রহস্য’ কিংবা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘জল জঙ্গলের কাব্য’।পড়ে ফেলা সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় এর লেখা ‘শাখা প্রশাখা’ নামের চরম স্যাটায়ারধর্মী উপন্যাস ,যাতে পৃথুলা বউকে কোলে তুলে আদর করার সময় শায়া ফেঁসে যাওয়ার মতো মারাত্মক বর্ণনা ছিল!

 গত কয়েক বছর হল কাকাবাবু সন্তুকে এমন জায়গায় অভিযানে গেছেন যেখান থেকে কেউ ফিরে এসেছে বলে জানা নেই।এই বছর হঠাৎ চলে গেলেন সুচিত্রা ভট্টাচার্য তাঁর মিতিন মাসিকে নিয়ে। এই শূন্যতা সহজে ভরাট হওয়ার নয়।তবু প্রকৃতি শূন্যস্থান পছন্দ করে না বলে শুনেছি।এখন শুধু অপেক্ষায় থাকা।

  একটা কথা না লিখে পারছি না।আগে পুজোসংখ্যাগুলি পুজোর সময়েই প্রকাশিত হত।ইদানিং এভাবে কিলিয়ে কাঁঠাল পাকানোর মতো জোর জবরদস্তি বর্ষাকালেই পুজোসংখ্যা বের করার হিড়িক পড়ে যায় কেন?