বর্ণালি মিত্র

বহুচর্চায় ক্লিশে হয়ে যাওয়া বিষয়টিই উত্থাপন করছি আরও একবার। আগেও শুনতে হয়েছে, “এত বই কেনো, সিডি কেনো বর রাগ করে না?” এবং প্রশ্ন করেছে একটি মেয়েই, যে তথাকথিত উচ্চশিক্ষিত, লম্বা চওড়া ডিগ্রির অধিকারী এবং যথেষ্ট অহংবোধ তা নিয়ে।
সেদিন আরও এক বেশভূষায়, চলনে বলনে অত্যাধুনিকা বললেন, ‘তুমি তো দেখছি আবার ইদানিং ফেসবুকে লেখো, তোমার বর তো আরওই বিরক্ত হবেন!’ প্রত্ত্যুত্তরে আমি বললাম, ‘দ্যাখো আমার কাঁচা হাতের ও সব লেখা কোনও পাতেই দেবার যোগ্য নয় সে আমি জানি, আগে ডায়েরি লিখতাম, এখন ফেসবুক-এর কল্যাণে আমার অপটু শব্দে একটু আধটু লেখার অক্ষম চেষ্টা করি, দুঃসাহস দেখাই। তবে সন্ধ্যা হলে টিভির ওই অর্থহীন, স্থূলমানের ধারাবাহিকগুলি দেখার শখ বা নেশা আমার নেই। আর পাড়া বেড়ানোর অভ্যেসটাও করে উঠতে পারিনি কোনওকালেই। ফেসবুক-এর নেশাটা প্রধানত বিদগ্ধ প্রিয় কবি ও আরও যাঁদের লেখা ভালোবাসি তাঁদের লেখা নিয়মিত পড়তে পারার কারণে। স্কুল ক’রে, বাড়িতে তিনদিন ছাত্র পড়িয়ে নিজের মনমতো সময় কাটাই বইপড়ে, ভালো গান শুনে।
আর ফেসবুকে একটু আধটু লেখার চেষ্টা করি, এ কারণে বর বিরক্ত হ’লে সে তো খুবই হতাশাজনক ব্যাপার ! সে জন্য এক মিনিটের নীরবতা পালন করা যেতে পারে বরং !
অধিকাংশ নারীর চোখে এ যুগেও আদর্শ নারীর সংজ্ঞা এক শতাব্দী পূর্ব রকমেরই।
একশো বছর আগে রবীন্দ্রনাথ ‘যোগাযোগ’ উপন্যাসে লিখেছেন “মেয়েরা নিজেদের আলো নিজেরাই নিভিয়ে বসে আছে” ! তাঁরা আজও ভাবতে ও দেখতে ভালোবাসেন, মেয়েরা কেবল রাঁধবে, ঘরদোর তকতকে রাখবে, পতিধর্ম, পতিস্বর্গ আওড়াবে (পতি চরম অশিষ্ট, অভব্য হলেও)
সংসারের খুঁটিনাটি কর্তব্য করেও যে নিজের ভাল লাগার কোনও জগৎ নিয়ে মনের মত ক’রে বেঁচে থাকা যায় তা তাঁরা ভাবতে পারেনও না, ভাবতে চানও না।
জ্বরের সময় বর বছরে দু’দিন খাবার তৈরী করলে বা পা মচকালে হাতের কাছে বরফ এগিয়ে দিয়েছে শুনলে কিছু মহিলা চক্ষু কপালে তুলে বলেন, ‘উফ কি ভাগ্য গো তোমার, এত করলো বর’। অথচ তাঁরাই আবার নারীদিবসে সকাল থেকে সাম্যবাদের বার্তা চালাচালি করেন রাশি রাশি !!(রেডিমেড যদিও)।
এ অভিজ্ঞতা বিস্তর হয়েছে, কারুর বাড়িতে পুরুষ কোনও সাংসারিক কাজে হাত লাগিয়েছেন শুনে মহিলার দল চক্ষু বিস্ফারিত করেন, সে বাড়ির রমণীকে সৌভাগ্যবতী আখ্যা দিয়ে দেন। অর্থাৎ একজন নারীর ভাগ্যের অনেকখানি দায় তাঁর সাথী পুরুষটির ওপর ন্যস্ত করেন। যেন একজন পুরুষই পারেন তাঁর ঘরণীটিকে সৌভাগ্যের স্বর্গদ্বারে পৌঁছে দিতে।
আমি অনেক সময় বাধ্য হয়েই প্রশ্ন রেখেছি, ‘কেন বরের জ্বর হলে তোমরা কি সেবা করো না? বরেরা কিছু করলেই অত বিস্ময়ে মূর্ছা যাবার কী যুক্তি ?’ এ জাতীয় কথা তাঁদের মনে ধরবে এমনটা আশা করাই বাতুলতা যদিও।
মনে আছে সাহিত্যিক সুচিত্রা ভট্টাচার্য একটি উপন্যাসে এক চরিত্রের মুখে সংলাপ রেখেছিলেন, “বাঁদী দেখে দেখে চোখ সয়ে গেছে, গোলাম দেখলে অবাক লাগে !”

আমি নারীবাদী নই। বরং যুক্তিবাদী হওয়াটাই কাঙ্ক্ষিত বোধ করি। কোনও নারী যদি স্বভাবগত ভাবে উশৃঙ্খল হন বা চরম স্বেচ্ছাচারিতার পথে চলেন যা পরিবারের সকলের দুঃখিত বা অপদস্থ হবার কারণ হ’য়ে দাঁড়ায় তা কখনোই সমর্থন করিনা।
বহু সংসারে পুরুষরাও রীতিমতো নিগৃহীত হন, স্ত্রী দ্বারা চরম লাঞ্ছিত হ’তে দেখেছি প্রত্যক্ষ ভাবে।
তবে খুব হতাশ লাগে যখন দেখতে হয় একটি মেয়েই অপর নারীর জীবনের সার্থকতার মানদণ্ড নির্ধারণ করেন এত লঘু চিন্তনে।

এককথায় বলতে গেলে, এই শতকেও বৃহৎ সংখ্যক মেয়েদের অভিধানে পুরুষই নারীর ভাগ্যনিয়ন্তা, কারুর বোধে ভাগ্যবিধাতাই বটে!!