যখন ভাঙল
রজতকান্তি সিংহচৌধুরী

আবার আমরা সেই অন্ধকার যুগে ফিরে যাই?
অনুমতি দাও, হে ঈশ্বর!
এই দেশে শিক্ষার বিস্তার যেন কখনো ঘটেনি
কোনোদিনই গুটি গুটি পা ফেলেনি ফিরিঙ্গি বণিক
বণিকের মানদণ্ড দেখা দেয়নি রাজদণ্ড রূপে
প্রাণ দেননি ক্ষুদিরাম কানাই সত্যেন বাঘা যতীন দীনেশ
ঘটেনি লবণ সত্যাগ্রহ,গান্ধির ‘ভারত ছাড়ো’, আজাদ হিন্দের শাহাদাত!

শক হুন পাঠান মোগল আর্য অনার্য দ্রাবিড় চিন
মিলে যে ভারততীর্থ — সে তো শুধু কবির কল্পনা
কঠোর বাস্তব হল ঘৃণা -ঘৃণা করো প্রতিবেশী মা ও বোনেদের
ঘৃণা করো পরদেশি পরভাষাভাষী
যে-কোনো কারণে যারা হুবহু তোমার মতো নয়
ঘৃণা করো, জিঘাংসায় ভরে দাও প্রত্যেক প্রত্যঙ্গ
যাতে প্রতি অঙ্গ অন্যান্য অঙ্গকে ছিন্ন
করে দিতে পারে আকণ্ঠ হিংদায়!

ভাঙো–বিভাজন করো, তবে না শাসন?
‘আমরা সবাই রাজা’! মামদোবাজি
পেয়ে গেছে যত্তসব ছোটোলোকদল,
হাঃ!হাঃ! রাজদণ্ড যত খণ্ড হয়…
ছিল না আকবর বাদশা — তাঁর ইবাদতখানা
দীন-ই-ইলাহীর সর্বধর্মসম্মিলন
এমনকী তাজমহলও, রাস্তার কুকুরও এটা জানে,
হল গিয়ে ভেঙে দেওয়া শিবের মন্দির!

এখানে তো কোনোদিনই সতীদাহ হয়নি বারণ
বিধবাবিবাহ? হোঃ! হোঃ! হোঃ! হোঃ!
তার চেয়ে ঢের ভালো নাবালিকা বিবাহের ঘটা
খাপ পঞ্চায়েত কিংবা অনার কিলিং
‘যত মত তত পথ’ বলে গেল কোথাকার পাগল ঠাকুর
সে-কথা মাথায় করে কে এক সন্ন্যাসী
ঘরে-বাইরে ডাক দিল,আমরা শুধু সহিষ্ণুই নই,
সব ধর্মকেই আমরা সত্য বলে মানি!

আমরা আড়ম্বর করি কর্তব্য করি না
যা যা করি রোজ, তাতে বিশ্বাস করি না
যা বিশ্বাস করি, সেটা পালন করি না
গোছা গোছা বক্কাবাজি করি
একফোঁটা আত্মত্যাগ? সে কখনো না!
আমাদের রাজনীতি কেবল অন্যের চোখে ধুলো
নিজ বাকচাতুর্যের মোহে আত্মমুগ্ধ নার্সিসাস
হয়ে থাকাটাই আমাদের ভবিতব্য!

যে-শিক্ষার আলো আনে, সে প্রমিথিয়ুস,
তার যে-সৌভাগ্য তবে সে তোমারও হোক
দেখুক পাহাড়তলি হেঁটমুণ্ড ঊর্ধ্বপাদে তোমাকে ঝুলিয়ে দিল শাসক জিয়ুস
গুহামানবের দেশে ফিরে যাই চল, অথবা পেছনপানে যেতে চাই আরও
হুপ হুপ শব্দ সব লাফিয়ে বেড়াব ডালে ডালে,
ফলমূল খাব শুধু শুদ্ধ শাকাহারী
মহান ভারতে ধূলিসাৎ খাদ্যের নানান রুচি নানা ভাষা ভিন্ন ভিন্ন মত
দিনান্তে ভারত-মাকে প্রণাম জানাব দীর্ঘশ্বাসে
শত কোটি সন্তানকে,মাগো, শিব গড়তে শাখামৃগ গড়েছ এখনই!

অন্ধকার যুগে ফিরে যাই
ইজাজত দেবে না, ঈশ্বর?
তুমিও তো কার্মাটারে চতুর্থ আশ্রম গড়ে স্বেচ্ছানির্বাসিত
এই ভদ্রসমাজের রাষ্ট্রতন্ত্রে তোমাকে মানায়?
এ কুটিল গৃধ্রকূটে মানুষের ঘিলুপিণ্ড ছিটকে পড়ে মানুষেরই লাশে
জেনেছ, এমন লোক অতীব বিরল,যাদের উদ্দেশ্য সৎ এমনকী মহৎ
শুভ শ্রেয়স্কর কাজে বাধা ও ব্যাঘাত
ঘটাবার লোক খালি হাজার হাজার!

অনন্য ঈশ্বরকণা নিয়ে এ বাংলায় আসো
অনেক আঘাত নিয়ে ফিরে যাও রক্তাক্ত সত্তায়
ঘোর রাতে প্রাণের প্রদীপ জ্বালো কোন্ সে আলোয়
দিনের পথিক সে কি মনে রাখে? তার পথ অবকীর্ণ মন্দিরে মসজিদে,
রক্তক্লিন্ন পিচ্ছিল সড়কে গাঢ় অন্ধকার থকথক করে
এখনো কি অনুমতি দেবে না, ঈশ্বর?
একবার অন্তত অধঃপতনের অবম নরকে ইতিহাসবিস্মৃত জাতিকে
কণ্টকশয়নে কল্পকল্পান্তর দগ্ধ হতে দাও!