শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

অসাড়লিপি ১০

গঙ্গাসাগর

আয়নার সামনে যে গাঢ় ডেলা তাকে কি নিজের সঙ্গে তুলনা করা যায়? বিশেষত যখন বৃষ্টিহীন শহর কাঁপিয়ে একটা ভোরের ঝড় — ভোর তো গাছেদের উন্মাদনা টেনে বের করে — আলো শুধু ক্ষয়ের প্রতীক নয়, গাঢ় কোনও উত্তেজনা নেই শুধু ঘুম — আমিও তো তাই খুঁজছি, এক দেবদূতের ডানাওলা পোকা, দীর্ঘ, ফ্যাকাশে সাদা, আমার ক্লান্তির ওপর রাস্তা হারানো জঙ্গল-বাক্য, মাথা ঝাঁকানো কালোজামের গাছ, নিম, তাদের উচ্ছ্বাসেই ধুলো ও আলোর গুঁড়ো, শুধু আমার চোখে দেবদূত-পোকার ডানা, তাদের হুল ঘষটানো ভোরের আবছায়া, ছায়া ও স্পষ্টতা

তুমি কি বেরিয়েছো কখনও? সামান্য পয়সা দিয়েই পৌঁছে যাওয়া যেত মেলায় – তাও তুমি যাওনি সেই ভাজা মিষ্টির গন্ধে বুদ মানুষের ভিড়ে, তুমি যাওনি? আর যদি নাই দেখে থাকো মানুষের ভক্তি ও প্রবণতা তাহলে তুমি নদী চেনো না।আসলে তুমি মানুষ ও ভক্তি সম্পর্কে জানতে চাওনি তোমার ভয় ছিল অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস তোমাকে বিচলিত করবে তোমার ভয় ছিল দলবদ্ধ কীর্তন তোমার সামনে শুধু চিৎকার এর মুখোশ

আমি আপনি আর কখনো না-দেখা মানুষের কীর্তন আসলে এক গোপন ষোড়শ শতক

দলবদ্ধ গান ও না দেখা
মানুষের নদী তীর
মরু প্রতীম জেগে থাকা

কে দেখবে সেই দীর্ঘ প্রলম্বিত মানুষের
ঢেউ এর অভিঘাত ফুলে ওঠা
জলের পিঠ জোয়ার ছাড়াই

প্রিয় বন্ধু বলেছিল এই নোনতা জানুয়ারি
ভেসে থাক বাংলার আকাশ বলে যদি কিছু থাকে সেখানে
তা এই ঢেউ হয়ে যাওয়া মানুষের দীর্ঘশ্বাসপুঞ্জ

এই দীর্ঘশ্বাস ও পুঞ্জ খন্ডিত শব্দ সমূহ সমেত এই তীর্থ মিলিয়ে যাক আকাশে

শেষ অব্দি জেগে ওঠে শুধু আকাশ আর আমাদের দেবদূত’ পোকা আমাদের যাবতীয় ক্ষুদ্র ও কাজের বাক্য ভেসে থাক এক সর্বগ্রাসী আকাশে যা আসলে একটা দ্বীপ

আকাশ আসলে একটা দ্বীপ
নোনতা বাতাসে মগ্ন
এক ধরণের নতুন চলাচল শুরু হবে

এই দ্বীপ আসলে একটা আকাশ

এই আকাশ আসলে একটা দলবদ্ধ কীর্তন এর ধ্বনি
খোলের আওয়াজ মিলিয়ে আসছে
আমরা দর্শকের মতো স্থির
স্থিরতার আসল নাম বাংলা


গনিমিয়া শরিফ

কেউ যেন পালিয়ে যেতে বলেছিল আচমকা রাতের মুখে
আচমকা মুখের ঘুমে থ্যাতলানো শামুকের গন্ধে ভাষা বর্ষায়
কেউ যেন পালাতে বলেছিল যেখানে ভাষা বোঝাবার কোন দায় নেই কেউ যেন দৌড়োতে বলছিল
যেখানে পর পর দরজা খুলে রাখা বাড়িগুলো থেকে
বেরিয়ে আসছিলো স্কুল না যাওয়া বাচ্চারা
দুপুর তো বেরিয়ে পড়ার জন্যই
কারখানার পাশ দিয়ে শহর থেকে ফেরা
আনাচ বেপারি ভরা ট্রেন থেমে গেল রেল ব্রিজে,
কেউ বুঝি ডেকে গেল অজানা নাম অথচ বেরিয়ে এলো গোটা এলাকা কেউ ডেকে গেল এক নামাজ পড়ার সময় অথচ সম্পন্ন কৃষক মাথা তুললো না তাহলে ডাক কিছু দুর্বল এর সুরক্ষা চেতনা?
এইখানে মনে হয় সমস্ত ধ্বনি দূরে
তার অভিঘাতে যে কটা বাড়ি মুক্ত হলো
আমরাও তার সঙ্গে গড়িয়ে গেছি
পেছনে শুধু স্থির দুপুরের গ্রাম
বিক্রি হওয়া ধানক্ষেতে নিমগ্ন শিশু
এইখান থেকেই আমাদের মিলিয়ে যাওয়া
মাংসে বেধানো নখ উপড়ে ফেলে
অজানা ভাষার প্রার্থনায় জড়ো হচ্ছি আমরা যারা দুর্বল
শোণিত প্রবাহ থেকে কিছু দূরে
পুরনো দেয়াল ঘেরা এই দরগাহে
প্রতিটা রোমকূপ ই গাছ
রাত্রি শেষ এইবার উন্মাদনা থেমে যাবে কাজের অছিলায়