পারিজাত ব্যানার্জী

কবিতা বিষয় যে কোনও আলোচনাই আমি মনে করি শুরু হওয়া উচিৎ কবিতা দিয়ে। না-হলে পাতার পর পাতা গদ্য লিখে গেলেও পদ্যের আবেগ তার রক্তে মিশে যায় না।

“হাজার বছর আগের তোমার মুখে বলা ছত্রেরা—
হাজার বছর পরও অভিমানে দেওয়াল ভরায় অব্যক্তরা।” (লেখায় – আমি)

কবিতা আসলে কিছু সুর তাল ছন্দ আর অন্ত্যমিলের যোগফল নয়— কবিতা এক অনুভূতি; কবিতা আসলে হৃদয়ের অজানা যত সুরঙ্গে বাস আমাদের অবচেতনের, তারই প্রতিফলিত অনন্য এক আবেগ। হাজার হাজার বছর ধরে যে ফকির বা কবিয়াল বা বাউল মুখে মুখে কাব্য রচনা করে এসেছেন, তাঁদেরও মূলত ছিল একটাই উদ্দেশ্য— অন্যের মনে সামান্য ঠাঁই খুঁজে নেওয়া।

নিজেকে প্রকাশ করতে পারার মধ্যে যে আনন্দ, তারই ভাষাগত রূপেই তো আমরা বলে থাকি কবিতা।

সত্যি কথা বলতে ফেসবুকের বা টুইটারের কবিতা বলে আদৌ কি কিছু হয়? মুখে মুখে কাব্য করব না প্যাপিরাসে লিখে রাখব— এ তো যেন সেরকমই এক অযৌক্তিক প্রাচীন দ্বন্দ্ব। সকলেই চায় অন্তত তার রচিত সৃষ্টিরা অমরত্বের দাবিদার হোক। মুখে বলা কবিতারা হাওয়ায় মিলিয়ে যাওয়ার আগেই তাই ধরে ফেলা হয় কাগজে, সেই কাগজদেরই আবার একত্রিত করে প্রকাশিত হয় নতুন বইয়ের মোড়ক। কেন? যাতে জনসমক্ষে স্বীকৃতি মেলে খানিক, অন্তত কয়েকজন হলেও পাঠকের হৃদয়ে ছুঁতে পারে তার শৈল্পিক মননের বাণী। তাই তো? কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বেশ খরচসাপেক্ষ এই পদ্ধতি। সবাই তাই মননে একের পর এক কবিতা রচনা করে গেলেও তা ভাগ করে নেওয়া থেকে বিরতই থেকে এসেছে এতকাল।

এখন সময় পালটেছে। সোশ্যাল মিডিয়ার কেরামতিতে সারা দুনিয়া আজ মুঠোফোনে বন্ধ অবশেষে। কিপ্যাডে বোতাম টিপে নিজের মনে উজাড় হতে থাকা কবিতারা ঠাঁই করে নিচ্ছে ফেসবুকের ভার্চুয়াল দেওয়ালে। মুহূর্তে তাই পৌঁছে যাচ্ছে বিশ্বের দরবারে। সর্বোপরি, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে এই ছড়িয়ে থাকা হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ লোকের মনে হানা দেওয়া আজ সম্ভব হচ্ছে প্রায় বিনামূল্যে (সম্পূর্ণই বলা যেত যতদিন না নিজের পেজের বিজ্ঞাপন দেওয়ার সুযোগ মিলত না)। এর চেয়ে সৎ প্রয়াস আর কোনোমতেই করা সম্ভব কি? এতদিন কোনও ছাপার হরফও যা করতে পারেনি, যেভাবে বিপুল সাড়া ফেলতে পারেনি বিশ্ব সংসারে, ফেসবুকের এক সাধারণ অ্যাকাউন্ট সেই পথ করে তুলছে সুগম, মসৃণ।

শুধু তাই নয়, ফেসবুক সুযোগ করে দেয় অনেক গুণী মানুষের সংস্পর্শে আসার। সমভাবাপন্ন অনেক মানুষের সঙ্গেই আলাপ করা যায় বিভিন্ন গ্রুপের সদস্য হয়ে। একে অপরের সঙ্গে মেতে থাকা যায় নানারকম আলোচনায়, তর্কে, বিতর্কে, শিল্পে এবং নিঃসন্দেহে, কবিতায়।

মানুষদের প্রয়োজন যেমন ভিন্ন, তেমনই বিচিত্র তাদের ভাবাবেগ। বিশেষ করে শিল্পীসত্ত্বাদের মধ্যে বেশি করে লক্ষণীয়, তারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মুখচোরা। সামনাসামনি নিজেকে তুলে ধরার পথে যার পক্ষে হাঁটা বেশ কঠিন— তাদেরও একমাত্র আশ্রয়স্থল তাই এই মুখপুস্তিকা। আবার যাঁরা ধরুন, সমাজের বিভিন্ন স্তরে কর্মসূত্রে ব্যস্ত,সময় বা সুযোগ পান না কোনও সাহিত্য আলোচনা সভা বা সমিতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হওয়ার, তাঁদের মনে বাষ্প হয়ে জমে থাকা কবিতারা এর আগে কখনও এত বড় নির্ভেজাল নিরন্তর প্ল্যাটফর্ম পেয়েছেন কি? মনে তো হয় না।

কবিতা আগেও অনেকে লিখতেন। বাবা কাকার মুখেই শোনা, বাঙালিরা কলেজে উঠে এক আধটা কবিতা লেখেনি, এমন ঘটনা বিরল। তবে পরে কেন হারিয়ে গেল এই মানুষগুলোর আবেগ? কেন তারা আর জন্ম দিল না নতুন কোনও কবিতার?

আসলে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, পাশের মানুষটিকে দেখে তবেই আমরা উদ্বুদ্ধ হই। মনে হয়, সে যখন পারে, আমিও চেষ্টা করে দেখিই না, পারি কিনা? তখনই আবার চলতে শুরু করে কলম— খালি পাতায় ঝরে পড়ে আত্মবিশ্বাস। হ্যাঁ, ফেসবুক সেই খালি পাতাও যার উৎসাহে ঝরঝর করে এগোতে থাকে লেখা, অন্যদের লাইক কমেন্টের উদ্দীপনায় মনের খুচরো কথাগুলোও খুঁজে পায় ভাষা। জন্ম নেয় একের পর এক সাজানো ছত্র আদর করে যাদের আমরা বলি কবিতা।

তবে সব ভালোরই যেমন এক মন্দ দিক থাকে, এই ফেসবুকের কবিতাও তার ব্যতিক্রম নয়। অনেকদিন আগে বাবার মুখে শোনা এক অভিজ্ঞতা এক্ষেত্রে যেন বড় বেশি মানানসই। বাবাদের স্কুলের এক মাস্টারমশাই আধুনিক কবিতা নিয়ে ব্যঙ্গ করে শুনিয়েছিলেন তাঁর নিজের একটি রচনা—

“এখান থেকে মারলাম তীর, লাগল কলাগাছে—
হুলুৎ করে রক্ত বেরোলো—
চোখ গেল রে বাবা!”

এমন আধুনিকীকরণ চোখে পড়লে আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগেও যেমন সবাই হাসত, আজও তার ব্যতিক্রম হয় না। সব ‘প্রোডাক্ট’ এরই ‘কোয়ালিটি কন্ট্রোল’ বলে একটা ব্যাপার থাকে যা নিয়ন্ত্রণ করে সেই বিশেষ বস্তু বা কার্যের গুণগত মান। কবিতা সেই অর্থে কোনও বস্তু না হলেও তা এক একটা সমাজের চলমান নির্ধারক তো বটেই। রবীন্দ্রনাথের কবিতা যেভাবে ঠাকুর বংশের ধারাভাষ্য, সুকান্ত ভট্টচার্য যেভাবে বিপ্লবের মন্ত্রে দীক্ষিত, জীবনানন্দ দাশ তেমনই আধুনিক নব্যধারার এক অনন্য পরিচায়ক।

তাই মানদণ্ডে কিছুটা তুল্যমূল্য বিচারের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার দায় থেকেই যায় কবিতারও। ফেসবুকের উন্মুক্ত ফোরামে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যা ধারণ করা আদৌ সম্ভব না। অনেক সাধারণ লেখা আন্তর্জালিক পরিচিতির দৌলতে ‘ভাইরাল’ হয়ে যায়— আবার অনেক সুন্দর লেখাও ‘লাইক কমেন্ট’ না পাওয়ায় চাপা পড়ে যায় নিত্যনতুন পোষ্টের তলায়। তার উপর চলতে থাকে নানা রকম প্রতিযোগিতার নামে প্রহসন, যেখানে লেখার মান বিচার করা হয় কটা ‘লাইক’ পড়ল সেই ভিত্তিতে। এমন চলতে থাকলে কবিতার ভবিষ্যৎ প্রকৃতি বোঝা সত্যিই কষ্টসাধ্য। ভালো কবিতা খুঁজে পাওয়াও বেশ কঠিন।

অসুবিধা আরও আছে। কবিতার উপস্থিতিই আমার মনে হয় পদ্মপাতায় জলের মতো আপেক্ষিক। তা কখন অন্য কোন পাঠকের মনের সুরে তাল মেলাবে, বোঝা দুষ্কর। তাই কারও রচনার গুণগত মান বিচার করাও অসমীচীন। কিন্তু ফেসবুক নাছোড়বান্দা। সেখানে যে কোনও মুহূর্তে বসে যেতে পারে বিচারসভা। কখনও সখনও ভোগ করতে হতে পারে আবুঝ পাঠকদের অপ্রাসঙ্গিক কারাদণ্ডও। উৎসাহ হারায় প্রকৃত শিল্পীসত্ত্বা। মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে তারা, যারা শুধুমাত্র ‘নেটওয়ার্কিং’য়ের জোরেই করতে পারে বাজিমাত।

এ প্রসঙ্গে কপিরাইট ইস্যুও কিন্তু বেশ যুক্তিযুক্ত। ফেসবুক আসার পর দেখি, অন্যের লেখা নিজের নামে চালানোর প্ররোচনায় যোগ দিয়ে চলে অনেকেই। আদৌ কতখানি নিরাপদে বাঁচছে ফেসবুকীয় কবিতারা— ভবিষ্যতে তা আদৌ কতখানি রক্ষণাবেক্ষণ করা সম্ভব— এ বিষয়গুলির উপর আগামীতেও আলোচনা বা চাপানউতোর ছাড়া গতি নেই।

ফেসবুক আসলে এক খোলা মঞ্চ। সেখানে ক্রমাগত হয়ে চলেছে সৃষ্টিশীলতার উত্থান। আবার নতুন বুদ্বুদের সঙ্গেই হারিয়েও যাচ্ছে বহু অসংগঠিত পদ্য কালের অতলে। সবার কাছে বর্তমানে পৌঁছনোর তাড়াহুড়োয় ভবিষ্যতে কিভাবে অতীত হয়ে চলেছে এক একটি রচনা, তা আমরা সকলেই অল্পবিস্তর দেখেছি, দেখছি। আশার কথা একটাই, কালজয়ী কে হবে তার হিসাব একমাত্র সময় নির্ধারণ করলেও প্রযুক্তির হাত ধরে নতুন সৃষ্টিদের এই আঁতুড়ঘর এগিয়ে চলবেই, নিঃসন্দেহে এ বিষয় আমি আশাবাদী।

“শেষমেশ আশাটুকু থেকে যায়—
বাকি সবই যে সময়সাপেক্ষ, আপেক্ষিক!” (লেখায় আমি)