jayanta-Debabrata-Choudhuryজয়ন্ত দেবব্রত চৌধুরী

আজ থেকে পাঁচ বছর পরে..

সূর্য তখন সন্ধ্যাবেলায় সাবেকী এক পার্টিতে একা; পরিমিত মদ্যপান, বস্ সামনে এসে দাঁড়াবে একসময়, ‘আরে মিত্র, আজ এতোটা?’ ও চমকে উঠে দেখবে সামনে ট্রেতে রাখা খালি ছ’টা গ্লাস, চারটে গেলাসের হিসেব মেলাতে পারবে না কিছুতেই। বউ বাপের বাড়ি, সেদিন রাতে ঘরে ফিরে বাতি জ্বালিয়ে ঘুমোবে। পথিক বেচারা মফস্বলে প্রাচীন মন্দির দর্শনে গিয়ে উত্তেজিত হয়ে হয়তো বলেই বসবে, ‘জয়ন্ত, ঠিক এইরকম গড়নটা কিন্তু আগে দেখিনি ভাই!’ হঠাৎই আত্মসম্বিত ফিরে পাবে, মনমরা হয়েই কাটাবে বাকী যাত্রাপথ, মাঝপথ থেকেই তড়িঘড়ি স্টেশনে ফিরবে। তুমি তখন নিশ্চিত সাউথ সিটিতে বন্ধুদের সাথে নিশ্চিন্তে গল্পরত; ভিড়ের মধ্যে থেকে তোমার নাকে ভেসে আসবে চেনা মানুষের সুবাস, তোমার কানে ভেসে আসবে অর্ধস্ফুটে তোমার ডাকনাম, সচকিত হয়ে চারিদিকে তাকাবে, চেনা কোনো মুখ- নাহ্ কেউ নেই। অন্য একটা মেয়ে অন্য কোনোখানে অবান্তর প্রতীক্ষা করবে আগামী দশ বছর কোনো জটাজুটধারী তরুণ সন্ন্যাসীর আকস্মিক আবির্ভাবের। আরো একজন বাড়ির চিরাচরিত ঠাকুরঘরকে গুদাম বানাবার কঠিন সংকল্প নেবে নিষ্ফল রোষে। আমার প্রথমা প্রথম প্রথম একটা বিষাদের চারা ওর দক্ষিণের জানালায় রোপণ করেছিলো তা জানা আছে, জানা নেই তৎকালীন নবোদ্ভিন্ন আজ মহীরুহের রূপ নিয়েছে নাকি অঙ্কুরেই বিনষ্ট? আমার দ্বিতীয়া একরাতে ওর স্বামীকে ফিসফিস করে বলবে বিগত দুই বছরের মতোই, ‘আজ জানো তো ওর, তোমায় বলেছিলাম না, পাঁচ বছর আগে আজকের দিনেই…’। ‘ছাড়ো তো ওসব পুরনো কথা’। স্বামী খোলা বুকে মুখ ঘসায় ও ছেড়ে দেবে অতীত, আহ্ বর্তমান কী ইন্দ্রিয়মুখর! সেই দিনই বিকেলবেলায় তুমুল বৃষ্টিতে ছাতামাথায় বিপ্লবদা খোলা মাঠে বক্তৃতা শেষে বলেছে, ‘এবার আমাদের প্রিয় (অকালমৃত) কমরেডের মৃত্যু বার্ষিকীতে দুই মিনিটের নিরবতা..’। আমি তখন শোকেসের মাথায় আমার বাবার একহাত দূরে রাখা বাঁধানো ছবির ভেতর হাসছি, আমার চোখের তলার চামড়া আর নতুন করে কোঁচকাচ্ছে না, বয়স আর বাড়ছে না পৃথিবীর আবর্তনে। আমার প্রৌঢ়া মা বারবার সেই ছবিটা হয়তো সাদা ন্যাকড়া দিয়ে মোছামুছি করবে অকারনেই, আমার সাথে চোখাচোখি হবে বারকয়েক। আমার বোনকে কোনো একদিন রান্নার মাসি মনে করিয়ে দেবে যে আলুপেঁয়াজ বাড়ন্ত,সে রাত্রে শুতে গেলেই মনে পড়ে যাবে যে ও মাসকাবারি পেঁয়াজের মতো নিজের দাদার খোসাগুলোও খুলে যেতে দেখেছে পরতে পরতে। আর অনির্বাণ ব্যর্থ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকেই ক্রুদ্ধ প্রশ্ন ছুঁড়বে, ‘তবে কী প্রয়োজন ছিলো?’; জবাব মিলবে না, জবাব ছিলো না কোনোদিনই অথবা প্রশ্নটাই। আমার স্মৃতিতে শনিবারের আড্ডায় নিয়মিত একটা বাড়তি থালায় কিছু ভাজাভুজি রাখা হবে প্রত্যাশিতভাবেই। রোববার সকালে ঠিকে ঝি যেই গজগজ করতে করতে ওই বাসি খাবারগুলো ফেলবে আস্তাকুঁড়ে, অম্নি শূন্য থেকে একটা মোটাসোটা কাক এসে কপাৎ করে গিলে ফেলবে ওগুলো যেন এতক্ষণ এর অপেক্ষাতেই ছিলো। ‘কী অশৈলী কাণ্ড রে বাবা!’ ভাবতে ভাবতে ঝি বাড়ির ভেতর ফিরবে সাততাড়াতাড়ি, আজ তার মেলা কাজ। এই সুদীর্ঘ পাঁচ বছরে তেমন কিছুই বদলায়নি কিন্তু। শুধু তোমার উদ্দেশে না-পাঠানো ঊনচল্লিশটা চিঠি চিলেকোঠাতেই রয়ে গেছে আমার অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপিগুলোর সাথে। শুধু স্থানীয় সুরসপ্তকের একটাসূক্ষ্ম তার হঠাৎ করেই ছিঁড়ে গেছে এজন্মের মতন। শুধু জরাজীর্ণ মন্দির-মসজিদগুলো আরেকটু যেন বুড়িয়ে গেছে আচমকা স্নেহের অভাবে। কী ক্ষতি হলো তাতে? এখনও কোথাও একটা ধ্বসে যাওয়া মন্দির দেখে কোনো শিশু বিস্মিত হয়ে শুনতে পাচ্ছে সন্ধ্যাকালীন ঘণ্টাধ্বনি, এখনও এক কিশোর বন্ধুদের সামনে হাত মুঠো করে বলছে, ‘আমার গোটা আকাশটাই চাই’, এখনও আপিসফেরত কোনো বাসের ভেতর ধূপকাঠি বিক্রেতাকে এক সপ্রতিভ যুবক উপহার দিচ্ছে তার দৈনন্দিন প্রাপ্য একমুখ পরিচিতির হাসি, এখনও হয়তো শ্যামবাজার পাঁচমাথার মোড়ে এক গম্ভীর পাগল যান্ত্রিকভাবে উচ্চারণ করে চলেছে চিরকালীন প্রশ্নরাজি, ‘কে কী কখন কোথায় কেন….কে কী কখন কোথায়..’। তবুও যদি ছিঁচকাঁদুনের মতো একঘেয়ে ভাবে বলো যে কোনো সামান্যতম ক্ষতি হয়েছে পৃথিবীর, তবে কিন্তু পূর্বোক্ত রত্নমন্দির, বিষাদবৃক্ষ, মোটা কাক, শ্যামবাজারের ক্ষুব্ধ উন্মাদ একযোগে তেড়ে এসে বলবে, ‘হিঁদুর মেয়ে হয়ে গীতা পড়োনি; জানো না শুধু জামাটাই বদলায়, আমিটা বদলায় না?’