সংকল্প সরকার

শারদোৎসবের রেশ কাটতে না কাটতেই হেমন্তের হিমেল হাওয়ার হাত ধরে উত্তরের আঙিনায় শীতের প্রবেশ।দক্ষিণবঙ্গে কিন্তু শীত আসে কিছুটা বিলম্বে। উত্তরে কনকনে শীত যখন জাঁকিয়ে পড়ে দক্ষিণে হয়তো তখন পাতলা একটা ব্ল্যাংকেটেই শীতকে কাত করা যায়। উৎসব পাগল বাঙালির একটা অন্যতম বড় উদযাপন পিকনিক।তাই শীত এলেই পিকনিক ঘিরে শুরু হয় নানান পরিকল্পনা। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে গোটা জানুয়ারি মাসের প্রতিদিন পিকনিক স্পটগুলোতে কমবেশি পিকনিক পার্টির আগমন ঘটলেও রবিবার ও ছুটির দিনগুলোতে ভিড় উপচে পড়ে।

দক্ষিণবঙ্গে বেশ কিছু প্রাকৃতিক পিকনিক স্পটের পাশাপাশি অসংখ্য সরকারি-বেসরকারি পিকনিক স্পটও রয়েছে।কিন্তু উত্তরের বেশিরভাগ পিকনিক স্পটই প্রকৃতিসৃষ্ট।পাহাড় নদী জঙ্গল চা বাগানে ঘেরা উত্তরে রয়েছে অসংখ্য ছোট বড়ো পিকনিক স্পট। ডুয়ার্সে পিকনিক মানে স্রেফ নানা পদ সহকারে জম্পেশ ভুঁড়ি ভোজ নয়।খাওয়াদাওয়া এখানে একেবারেই গৌণ ব্যাপার।মুখ্য উদ্দেশ্য প্রকৃতিপাঠ,প্রকৃতির ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে নিজেকে উজাড় করে দেওয়া,তার রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শ নিবিড়ভাবে অনুভব করা। জীবনে নানা স্থানে পিকনিকে গেলেও একাদশ শ্রেণিতে পড়াকালীন স্কুল থেকে আর টিউশনি জীবনে ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে ডুয়ার্সে পিকনিক যাওয়ার স্মৃতি আমৃত্যু টাটকা থাকবে।

একাদশ শ্রেণিতে যাদের বায়োলজি ও জিওগ্রাফি ছিল তাদের স্কুল থেকে ডুয়ার্সের জয়ন্তীতে পিকনিক নিয়ে যাওয়া হল। পথে আলিপুরদুয়ার ছাড়িয়ে রাজাভাতখাওয়ায় এসে বাস দাঁড়াল। সামান্য প্রাতরাশ সেরে নেওয়া হল বাসেই। রাজাভাতখাওয়ায় এসে দেখলাম সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে খুব সুন্দর একটি মিউজিয়াম। হাতির পা,নানা প্রজাতির বড়ো বড়ো সাপ আর অসংখ্য পশু পাখির দেহাংশ ফর্মালডিহাইড দ্রবণে সংরক্ষণ করা রয়েছে।আর রয়েছে একটি শকুন প্রজনন কেন্দ্র আর নানা জাতের অর্কিড, গাছগাছালি।

এরপর এলাম জয়ন্তী। জয়ন্তী মানে গগনচুম্বী গাছপালা, জয়ন্তী নদী আর নদীর ওপারে জয়ন্তী পাহাড়। ছোট ছোট দল করে স্যর আমাদের ঘুরে আসতে বললেন।পইপই করে বলে দিলেন কেউ যেন দলছুট না হই।আমারা নদী পেরিয়ে ওপারে ছোট্ট একটি আদিবাসী গ্রাম দেখতে যাব। এই শীতকালে জয়ন্তী নদী মানে বিশালাকায় পাথুরে নদীর বুকে শীর্ণ শীর্ণ জলের ধারা। কিন্তু বর্ষাকালে এই নদীই নাকি কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে করাল মূর্তি ধারণ করে। নদী পেরচ্ছি, কিছু আদিবাসী রমণীও জঙ্গল থেকে সংগ্রহ করা জ্বালানি মাথায় চাপিয়ে ঘরে ফিরছে।নদীর মাঝখানে ব্রিটিশ আমলে নির্মিত একটি সেতুর ভগ্নাবশেষ দেখলাম।বিরানব্বুই এর প্রবল বন্যায় সেতুটি বিধ্বস্ত হয়।

নদী পেরিয়ে একটা আদিবাসী বস্তিতে এসে আদিবাসীদের খাদ্যাভ্যাস, পোশাক- পরিচ্ছদ, জীবনযাপন প্রত্যক্ষ করলাম।এরপর জয়ন্তী পাহাড়ের পাদদেশে দাঁড়িয়ে আছি। মনসুর হাবিবুল্লাহ নামে আমার এক বন্ধু হঠাৎই গোঁ ধরল ও পাহাড়ে উঠবে। আমরা শতবার বারণ করা সত্ত্বেও ও কর্ণপাত করলো না। পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা শীর্ণকায় জলধারা অনুসরণ করে ও উপরে উঠে গেল। আমরা ওর ফিরে আসার অপেক্ষায় বসে আছি। ঘণ্টাখানেক কেটে গেলেও ওর পাত্তা নেই।আমাদের মুখ শুকিয়ে যাচ্ছে। কোন অঘটন ঘটলো নাতো! দ্রুত স্যরদের কাছে ফিরে এসে সমস্ত ঘটনা খুলে বলি। এদিকে বিকেল গড়িয়ে যাচ্ছে।স্যরেরা এস.এস.বি ক্যাম্পে খবর দেয়।

জওয়ানের তড়িঘড়ি একটা জিপ নিয়ে খুঁজতে বেরিয়ে পড়ে।সবার মুখে অন্ধকার নেমে আসে। কারও মুখে রা নেই। মাথা কাজ করছে না আমার। আনন্দ করতে এসে বন্ধুকে হারাতে বসেছি! এদিকে সন্ধে নেমে গেছে। আচমকা দুটো আলোকবিন্দু নদী পেরিয়ে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। জওয়ানদের জিপটি কাছে এসে স্টার্ট বন্ধ করল। দেখি মনসুর পিছনের সিটে বসে আছে। চোখদুটো ওর ভয়ার্ত বিস্ফারিত। আমাদের সবার ধড়ে প্রাণ ফিরে এল। পরে মনসুর জানিয়েছিল ও নাকি পাহাড়ে উঠে ফিরে আসার পথ খুঁজে পাচ্ছিল না। হিংস্র বুনো জানোয়ারের মুখোমুখি হয়ে বেঘোরে প্রাণ হারাতে বসেছিল। এস.এস.বি জওয়ানরাই ওকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে। জওয়ানদের অশেষ ধন্যবাদ জানিয়ে আমরা ফিরে আসি।

কর্ম উপলক্ষে কোলকাতা চলে আসার আগে আমি চুটিয়ে টিউশনি করতাম। একবার হল কি, শীতের মরসুম আসতে না আসতেই ছাত্রছাত্রীরা আবদার করে বসল ওদের নিয়ে ডুয়ার্স পিকনিক যেতে হবে।বেশিরভাগই একাদশ-দ্বাদশ। স্কুলজীবনের সেই মারাত্মক দুঃস্মৃতি ফিরে আসে, আমায় ভয়ার্ত করে তোলে। পত্রপাঠ সেই প্রস্তাব আমি নাকচ করে দিই। সদ্য দাড়িগোঁফ ওঠা উঠতি বয়সের ছেলেপুলেদের নিয়ে আমার বড্ড ভয় হয়। এদের নিয়ন্ত্রণে রাখা ভীষণ কঠিন। মেয়েদের তাও বলেকয়ে বুঝিয়ে সুঝিয়ে নজরের আওতায় রাখা যায়। পড়তে এসেই একরোখা বায়না করা বাচ্চাদের মতোই ঘ্যানঘ্যান করতে থাকে ছেলেমেয়েগুলো। অগত্যা, রাজি হতেই হল। শর্ত একটাই, বিনা গার্জিয়ানে কাউকে নেওয়া হবে না।

পিকনিক হবে ডুয়ার্সের লালিগুরাসে। একফাঁকে কাছেপিঠের রকি আইল্যান্ড ঘুরে আসব। বাস ছাড়বে টিউশন সেন্টারের সামনে থেকে। প্রচণ্ড কুয়াশা পড়েছে। দেখি ভোর ভোর সেই কুয়াশা ভেদ করে কনকনে ঠাণ্ডায় ঠকঠক করতে করতে ছাত্রছাত্রীরা তাদের অভিভাবকদের নিয়ে চলে আসছে। বেলুন সাজিয়ে, মাইক বাজিয়ে, রান্নার উপকরণ নিয়ে বাস রওনা হল।

ছায়াময় বনবীথিকা। দু’পাশে মখমলের মতো সবুজ চা-বাগিচা দেখতে দেখতে চালসা পেরিয়ে মেটেলি ছাড়িয়ে চলে আসি লালিগুরাস। পাহাড় ঘেরা উপত্যকায় মূর্তি নদীর পাড়ে এই পিকনিক স্পটটি। পাহাড়ের উতরাই পথ বেয়ে স্পটে নেমে আসি। টিফিন সেরে রান্নার বন্দোবস্ত করে দিয়ে সবাইকে নিয়ে ছোট ছোট জিপে রকি আইল্যান্ডের উদ্দেশে রওনা হই। উতরাই পথে নাম-না-জানা অসংখ্য রঙবেরঙের পাহাড়ি ফুল, আকাশছোঁয়া বনস্পতি, আদিবাসী মানুষজন চোখে পড়ে। রকি আইল্যান্ডে বড় বড় পাথরের চাই হেলান দিয়ে, ঝর্ণার মতো মূর্তি নদীর বরফ-ঠাণ্ডা জলে পা ভেজিয়ে, সেলফি তুলে কিছু সময় কাটিয়ে ফিরে আসি পিকনিক স্পটে। ততক্ষণে খাবার প্রস্তুত হয়ে গেছে। কব্জি ডুবিয়ে খেয়েদেয়ে সবাই ফেরার উদ্যোগ করি।

ইতোমধ্যে বেলা পড়ে এসেছে। পড়ন্ত সূর্যের আলোর লুকোচুরি খেলা হতে লাগল মূর্তি নদীর নুড়ি পাথরের বুকে। অদ্ভুত সেই খেলা। সবুজে নীল জলে সোনালী পাথরের মায়াবী প্রতিচ্ছবি। আর দূরের পাহাড়ও গায়ে জড়িয়ে নিল সাদা কুয়াশার চাদর। চারদিক স্তব্ধ হয়ে গেছে। শুধু মূর্তির ছলাৎ ছলাৎ শব্দ। সন্ধের অন্ধকার ঘন হতে থাকে। আর দেরি করা ঠিক হবে না। ভালোলাগার লালিগুরাস বুকের ফটোফ্রেমে বাঁধিয়ে নিয়ে দ্রুত বাসে উঠে পড়ি।