নন্দিতা আচার্য্য

তিনি আমাকে বললেন, ‘আমরা কি একসঙ্গে লাঞ্চ করতে পারি?’ বছর খানেক আগের ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের একদিন; আমি পুরো দিনটাই ফেস্টিভ্যাল কভার করব। ছ’ফুট কত ইঞ্চি ওঁর হাইট হবে আমি আন্দাজ করতে পারলাম না। পাশে প্রায় ওরকমই লম্বা আর এক যুবক। অনেক কষ্টে আমি তাদের কাঁধের কাছে পড়ছি। এই সুপুরুষ যুবকটি ইরানের এক পরিচালক। সঙ্গে তার ইরান থেকেই আসা সহযোগী বন্ধু। আমার এডিটরের সঙ্গে তাদের কয়েকটা ফটো তুলে দিয়েছি। একটু আগেই ইয়াং এই পরিচালক আর তার সহযোগীর সঙ্গে, ইন্ট্রোডিউস করিয়ে দিয়েছিলেন আমার সম্পাদকই। বিকেলের স্লটে আছে এই যুবকের তৈরি ইরানের সেই ছবি। তিনি বারবার বলতে লাগলেন সেই ছবিটা দেখতে এবং তা নিয়ে লিখতে।

এ বছর কলকাতা ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল পঁচিশ বছরে পা দিল। উৎসব এবার আরও বর্ণময় হয়ে উঠেছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান নেতাজি ইন্ডোরে। এলেন শাহারুখ, রাখি ও মেঘনা গুলজার। অসুস্থতার জন্য অমিতাভ বচ্চন আসতে পারেননি এবার। সমাপ্তি অনুষ্ঠানে পুরস্কার বিতরণ এবার নজরুল মঞ্চে। আসবেন শাবানা আজমি। তথ্যচিত্র বিভাগে তাঁর বাবা কাইফি আজমিকে নিয়ে তোলা ‘কাইফিনামা’র বিশেষ প্রদর্শনী হবে এ উৎসবে।

এবারের ফোকাল কান্ট্রি জার্মানি। সুতরাং থাকছে স্পেশাল স্ক্রিনিং; জার্মান ক্লাসিক, ডকুমেন্টারি, কনটেম্পোরারি জার্মান সিনেমা। উদ্বোধিনী সন্ধ্যায় মাননীয় অতিথি হিসেবে রয়েছেন ‘টিনড্রাম’ খ্যাত জার্মান পরিচালক হেবালকার শোলনডরফ এবং কান-এ গোল্ডেন নাম জয়ী ‘সেক্সলাইফ এন্ড ভিডিও টেপস’ ছবির অভিনেত্রী অ্যান্ডি ম্যাকডয়েল। চেষ্টা চলছে তাদের দুটি ছবি দেখানোর। উদ্বোধনী ছবি সত্যজিৎ রায়ের ক্লাসিক ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’। এ বছর এই ছবিটির সুবর্ণ জয়ন্তী বৎসর।

এবারের উৎসবে ৭৬ টি দেশের ৩৬৭ টি সিনেমা দেখানো হবে নন্দন সহ আরও ১৭টি নির্বাচিত প্রেক্ষাগৃহে। এবার ভারতীয় ছবির প্রতিযোগিতা বিভাগে জায়গা পেয়েছে পনেরোটি ছবি। বাংলায় রয়েছে গৌতম হালদারের ‘নির্বাণ’, ইন্দ্রাশিস আচার্যর ‘পার্সেল’ ও কৃষ্ণেন্দু দত্তর ‘ডুবুরি’। বরাবরের মতো এ বছরেও হবে কিছু পুরনো ছবির প্রদর্শনী। শিশির মঞ্চ আর টালিগঞ্জের শতবার্ষিকী ভবনে। থাকবে ভানু-জহর-তুলসী চক্রবর্তীর ছবি। এরই সঙ্গে থাকছে বাসু চট্টোপাধ্যায়, হৃষীকেশ মুখোপাধ্যায়, মৃণাল সেন এবং বুদ্ধদেব দাশগুপ্তর নতুন ছবিও।

ছবি ছাড়াও উৎসবের উদ্ভাস হল দেশি বিদেশি অতিথি… অভিনেতা, পরিচালক, ছবির কলাকুশলী। তাঁরা উৎসবকে আলোক ছটায় বিচ্ছুরিত করে তুলবে। লেখার শুরুতে এমনই একজনের কথা বলেছি আমি। শুধু দেশি বিদেশি বিখ্যাত, স্বল্প বিখ্যাত মানুষগুলোই নয়; দর্শকও এ উৎসবের আর এক বর্ণচ্ছটা। কখন কখন তারা মজাদার গল্প হয়েও উঠেছে।

ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে আমার প্রবলভাবে যাতায়াত শুরু দু’হাজার আট সাল থেকে। দীর্ঘ দশ বছরে নানা অভিজ্ঞতা, রকমারি মজা আর অদ্ভুত কিছু চমকে ভরা এই চলাচল। দু’হাজার আট, সে বছরই আমার কাছে প্রথম সুযোগ এল ফিল্মফেস্ট নিয়ে কিছু লেখবার। আনন্দের বদলে আমি ভীত হয়ে পড়লাম। গতবছরেও যে মেয়ে লাইন দিয়ে টিকিট কেটে, রবীন্দ্রসদনের একদম সামনের সারিতে বসে (চোখ লাল করে) সিনেমা দেখেছিল, সে কিনা এবারে সিনেমা নিয়ে লিখবে! আমি বার বার ঘাড় নাড়তে লাগলাম, পারব না; ফিল্ম উৎসবের নিজস্ব বুলেটিনের এডিটর বিজনদা ধমক দিয়ে বললেন, পারবে!

সেই শুরু, ফিল্মবোদ্ধা না হয়েও তারপর এতগুলো বছরে বেশ অনেক কিছুই লেখালেখি করে ফেললাম। ফিল্ম দেখা এবং সঙ্গে সঙ্গে তার রিভিউ লিখে জমা দেওয়া ছিল আমাদের ডিউটি। তবে বুলেটিনে এখন, যে সিনেমা যেদিন দেখানো হবে; তার সংক্ষিপ্ত রিভিউ দিনের দিনই বার করে। আমার মনে হয় এটা বেশি ফলপ্রসূ। দর্শকের আগ্রহ বাড়িয়ে দেয়। তবে বাইরের মাধ্যমগুলোতে প্রতিদিনকার অভিজ্ঞতাই লেখা হয়। শুধু পূর্ণ দৈর্ঘের সিনেমাই নয়, থাকে ভাল ভাল ডকুমেন্টারি, শর্ট ফিল্ম। কী যত্ন করেই না সেগুলো নির্মাণ হয়।

উৎসব মানেই হরেক রকম আয়োজন। মিডিয়া সেন্টারের প্রেস মিটে দেশের এবং মূলত বিদেশের; বিখ্যাত পরিচালক, অভিনেতা অভিনেত্রী। ছোট বয়সে যাদের কথা ভেবে রোমাঞ্চিত হয়েছি, এমন কত জনকেই না সামনে থেকে দেখলাম। বেশ কয়েক বছর ধরে বিকেলের দিকে নন্দন চত্বরে বেশ অনেকখানি জায়গা নিয়ে নির্ভেজাল আড্ডার ব্যবস্থাও হচ্ছে। এখানে শুধু সাংবাদিক নয়, দর্শকরাও অংশগ্রহণ করেন। সিনেমার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা আসছেন। নায়ক-নায়িকা, ডিরেক্টর-প্রডিউসর, সুরকার, গাইয়ে, লেখক… মুখোমুখি এ আড্ডা বাস্তবিকই বড় প্রাণবন্ত। এমনিই এক আড্ডায় জনপ্রিয় এক অভিনেত্রীকে দেখে এবং শুনে; আমার এক প্রকার মোহভঙ্গ হয়েছিল। আবার এমনও হয়েছে, কারুর কারুর প্রতি আরও বেশি করে মোহাবিষ্ট হয়েছি।

প্রতি বছরই একটা জিনিস অবাক হয়ে লক্ষ্য করছি, তা হল ভিড়; বেড়েই চলেছে। হলের ভেতর এবং হলের বাইরে… দু’জায়গায়ই। কেউ হয়ত সকাল থেকে এসে তিনটে সিনেমা দেখে, বাকি সময়টা আড্ডায় বসে পড়ল। পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা, চায়ের দোকানে ফিল্ম নিয়ে আলাপ আলোচনা, যুক্তি তর্ক। আবার দৌড়ে দৌড়ে গিয়ে লাইন দিয়ে হলে ঢুকে পড়ে সিনেমা দেখা। এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু মজার ঘটনা রয়েছে। উপচে পড়া নন্দন বা রবীন্দ্রসদনে মাটিতে পা গুটিয়ে বসে সিনেমা দেখছি। গলায় প্রেস কার্ড।

এরকম আরও বহুজন আমার আশেপাশে; গলায় ঝোলানো প্রেস কার্ড, গেস্ট কার্ড, ডেলিগেট কার্ড। পাশে চেয়রে বসা ভাগ্যবান দর্শকমণ্ডলী। বহুক্ষণ ধরে লাইন দিয়ে ওরা আগে এসে, আগে বসেছে। আমদের মতো চা খেতে গিয়ে খিল্লি করেছে নাকি? বিখ্যাত পরিচালকের বিখ্যাত সিনেমা শুরু হল। অল্পক্ষণের মধ্যেই সিনেমাপ্রেমী দর্শকদের অনেকেই চেয়ারের মধ্যে এমন ঘুমিয়ে পড়ল, যে তাদের নাক ডাকতে শুরু করল। আনাড়িরা ভাবতে পারে সিনেমার ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক।

এরই মধ্যে কেউ তাদের ভাবনাকে ঘেঁটে দিয়ে বলে উঠতে পারে, ‘উফহ দাদা, আমার কানের ভেতর নাকটা ঢুকিয়ে আপনার নাক ডাকাটা একটু বন্ধ করুন।’ সবচেয়ে মুশকিল হল সাইডের দিকের চেয়ারে বসা কেউ যদি ঘুমিয়ে পড়ে; অচিরেই সে মাটিতে কুঁকড়ে বসে থাকা কোনও দর্শকের গায়ে ঢলে পড়তে পারে… একবার নয়, বারবার। আবার অন্যদিকে হলের ভেতর জল খেতে গিয়ে চুড়ির আওয়াজ হলেও কেউ কেউ খেপে গিয়ে বলে, বাইরে যান! এরাই বেশিরভাগ ঘুমোয়, অথবা আধ ঘণ্টার মধ্যে সিট ছেড়ে বেরিয়ে যায়। মেঝেতে বসা দর্শক যদি একটু তৎপর থাকে… কিছুক্ষণের মধ্যেই সে এইসব সিনেমা বোদ্ধা দর্শকদের আনুকূল্যে সিট পেয়ে যায়। প্রতিবছরই থাকে এমন কিছু নির্ভেজাল মজার খোরাক।

হেমন্তের সন্ধ্যা নেমে আসে তাড়াতাড়ি। নন্দন চত্বরের সেই অনামি বাঁশিওয়ালা উৎসব প্রাঙ্গণের আনাচে কানাচে সুর ছড়িয়ে দেয়। সকাল থেকে আমরা যারা সিনেমা উৎসবে সঁপেছি প্রাণমন; সারাদিন ছবি দেখার ধকলে তাদের মুখ চোখ বসে একসা! দ্রুত চায়ে চুমুক দিয়ে আবার হলে ঢোকা; শুরু হল কোন বিখ্যাত সিনেমা। সেই রসে নিমজ্জিত হতে হতে সময় ভুলে যাই… শেষ মেট্রো বেরিয়ে যায়। ইশ, ফিরবো কিসে? বেরনোর গেটের কাছে বাঁশিওয়ালা তার জিনিসপত্তর গুছিয়ে নিয়ে বাড়ি যাবার তোরজোড় করছে। আমরা তার সঙ্গে দাঁড়িয়ে আর একবার চা খাই। মাথার ভেতর ঘোরে দৃশ্য-সুর-গল্প; টেকনিক, অভিনয়। কেমন একটা ঘোর নিয়ে আমরা বাড়ি ফিরি প্রতিদিন, পরের দিনের প্ল্যান প্রোগ্রাম মাথায় রেখে।

অনুষ্ঠানের শেষ দিন, সন্ধ্যা পার করে জমে ওঠে উদাত্ত আড্ডা, নানা তর্ক বিতর্ক। বাঁশিওলার সুর কেমন বিষণ্ণতা ছড়ায়। আমরা সময়ের হিসেব করিনা। হয়ত আবার একবছর পর এই ফেস্টিভ্যালেই দেখা হবে… ফিসফ্রাই ভাগ করে খাওয়া আর প্রাণান্ত তর্কবিতর্ক করা এসব বন্ধু বান্ধবদের সঙ্গে! ডুব দিই উৎসবের সুর আর আলোয়। অপেক্ষা শুরু হয় পরের বছরের; মনে মনে ভাবি, আরও বর্ণময় হয়ে উঠুক আমাদের কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব।