প্রিয় নবনীতাদি,

ভাল আছেন আশা করি? অবশ্য আপনাকে এ প্রশ্ন করা অবান্তর! আপনি আর ভাল থাকা এই দুটো ব্যাপার যে প্রায় সমার্থক, তা আপনার পাঠক-পাঠিকা থেকে শুরু করে আপনার ধারেকাছে এক লহমাও যে কাটিয়েছে, সকলেরই সুবিদিত। আপনার নিশ্চয়ই মনে আছে প্রথম প্রথম আমাদের কথাবার্তা শুরু হয়েছিল এইভাবেই, আপনার ভাষায়, আকাশে-বাতাসে। সেইসব প্রাকপৌরাণিক উড়ো চিঠির কাছে, না জানি কী ধনরত্ন গচ্ছিত আছে এই মনে করে ফিরে গিয়ে আমার তো লজ্জায় প্রায় মাটিতে মিশে যাবার মত অবস্থা!

এই সব কথা লিখেছিলাম তখন আমি? আর আপনি কিনা ধৈর্য ধরে একের পর এক আমার সেই সমস্ত বিশুদ্ধ আবোল তাবলের জবাবও দিয়েছিলেন, তাও আবার এত যত্ন নিয়ে! আশ্চর্য ক্ষমতা সত্যি আপনার! তারপরেও কিনা আপনার মনে থেকে থেকেই এহেন কৌতূহলের উদয় হত যে লোকজন কেন তাদের সমস্ত কথা অবলীলায় আপনার কাছে উজাড় করে দিতে পারবে বলে মনে করে, কেন তাদের মনে হয় যে যে-কথাগুলো অন্য কাউকে বলা যায় না, বললে তারা বুঝতে পারবে না বা চাইবে না, সেই কথাগুলো অনায়াসে আপনাকে বলে ফেলা যায়! এই প্রশ্নের উত্তর কী আপনি জানতেন না? অথচ উত্তর তো হাতের কাছেই মজুত ছিল, আপনারই লেখা:

দু’একটা মুখের সামনে দাঁড়াতে পারি না
মনে হয় মুখ ধোওয়া নেই
মনে হয় মুখে বুঝি ময়লা লেগে আছে

কোনও কোনও মুগ্ধ মুখ দর্পণের মত স্বচ্ছ কিনা,
দেখা যায় স্পষ্ট নিজেকেই –
নিজের চেয়েও বেশি কাছে।

অন্য কারো কথা বলতে পারব না, কিন্তু এই যে কারণে-অকারণে মাঝেমধ্যেই আপনার কাছে দৌড়ে যেতাম, তা সে পরম আনন্দের মুহূর্তেই হোক বা চরম বিষাদের, তা কিন্তু এই অবুঝ বিশ্বাসের ওপর ভরসা করেই যে আপনার সামনে গিয়ে দাঁড়ালে নিজেকেই আরও খানিকটা স্পষ্ট করে দেখা যাবে, হয়তো ‘নিজের চেয়েও বেশি কাছে’। আর দেখা যেতও। তাই এই বিশ্বাস অবুঝ হলেও, অমূলক মোটেই ছিল না। আপনি অবশ্য অন্য মত পোষণ করতেন। বলতেন যে লেখক আপনি আসলে ভুল করে হয়ে গেছেন, হওয়া উচিত ছিল মনঃচিকিৎসক। কিন্তু তাহলে এতশত মনের ব্যারাম-সারানিয়া ডাক্তার-বদ্যি যে ভাতে মারা পড়ত, নবনীতাদি!

সত্যি বলতে, আপনাকে ঘিরে এত কথা, এত আনন্দময় মুহূর্তের স্মৃতি মাথার ভেতরে ভিড় করে আছে যে কিছুতেই স্থির করতে পারছি না কোনটা ছেড়ে কোনটা লিখব। চোখ বন্ধ করলেই স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি আপনার প্রশ্রয়-মেশানো, সদাপ্রসন্ন মুখচ্ছবি। মনে পড়ছে কখনও কখনও কোনও আগাম বার্তা না দিয়ে আচমকাই আমরা গিয়ে হাজির হতাম ভাল-বাসা বাড়িতে। হয়তো আপনি সেদিন প্রবল অসুস্থ, সারাদিন বিছানা ছেড়ে উঠতে পারেননি, কিন্তু আমরা যেতেই, ‘আজ কেমন আছেন?’ এই প্রশ্নের উত্তরে একগাল হাসি হেসে জবাব দিতেন, ‘এই তোরা এলি, এখন ভাল লাগছে।‘ দেখতাম আপনার মুখে তখন আর কোনও যন্ত্রণার লেশমাত্র নেই, যেন এই মাত্র ঘুম থেকে উঠেছেন, সমস্ত ক্লান্তি মুছে গিয়ে তখন আপনি ঝরঝরে, সতেজ, আনন্দ-ভরপুর। সেই আনন্দের ছোঁয়াচ এসে লাগত আমাদের মনেও। ভাল-বাসা বাড়িতে এলেই যে হাস্যমুখর, উষ্ণ অভ্যর্থনা পেতাম ঝর্ণাদি কিংবা কানাইদার কাছে, বুঝতে অসুবিধে হত না আনন্দের সেই অবিরল ঝর্ণাধারার উৎস আসলে কোথায়!

আনন্দ, ফুর্তি, উৎসাহ, অফুরান প্রশ্রয়– আপনার কথা ভাবতে বসলে এই কথাগুলোই বারবার মনের মধ্যে ভেসে ওঠে। মনে হয় জেনারেশন গ্যাপ কথাটা আদপেই জোলো, দরকার শুধুই ওই হাতটুকু বাড়িয়ে রাখার, সব দূরত্ব ওতেই ঘোচে। এই যেমন মনে পড়ছে সেইবারের সই-মেলার কথা। ইসমত চুঘতাইয়ের গল্পের ওপর ভিত্তি করে আমাদের নাটক ‘দিল কি দুনিয়া’ প্রথমবারের জন্য মঞ্চস্থ হচ্ছে। আমরা যথারীতি উদ্বিগ্ন। একে অল্প কয়েকদিনের প্রস্তুতিতে তৈরি করা নাটক, ডিরেক্টর মহাশয়া স্টেজ রিহার্সালের সময়েও জানিয়ে রেখেছেন ‘কিস্‌সু হচ্ছে না!’, উপরন্তু নাটকের ভাষা হল উর্দু, হিন্দিরও এক কাঠি ওপরে।

‘লাহৌল বিলা ক্যুও্‌য়ৎ’ বলতেই শয়নে-স্বপনে ‘আ মরি বাংলা ভাষা’- আওরানো অভিনেতারা নাজেহাল। তার ওপর এই চিন্তা যে এত জনপ্রিয় হিন্দিগানের ব্যবহার বাঙালি দর্শক আদৌ কীভাবে নেবে। নাটক যেমন দুম করে শুরু হয়েছিল, তেমনি দুম করে শেষও হয়ে গেল। আমাদের বক্ষ দুরুদুরু। কতখানি ঝুলল নাটক? দেখা গেল প্রথম সারিতে একজন উঠে দাঁড়ালেন। তারপর তাঁর দেখাদেখি বাকি সকলে। আমরা আশ্বস্ত হলাম। কেউ লক্ষ্য করল না হয়তো, কিন্তু এইভাবে নীরবে আপনি সকলের সঙ্গে আমাদের আন্তরিক যোগাযোগের একটা সেতু তৈরি করে দিলেন। এই-ই তো অন্যের দিকে বাড়িয়ে রাখা আপনার সেই অনির্বচনীয় হাত, যা একবার শক্ত করে ধরতে পারলে দূরত্ব শব্দটা নিমেষের মধ্যে অর্থহীন হয়ে যায়।

আরেকটা দিনের কথা মনে পড়ছে। শুভাদির, আমাদের তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক শুভা চক্রবর্তী দাশগুপ্তর ফেয়ারওয়েল। শুভাদি আপনার ছাত্রী, আবার দীর্ঘদিনের সহকর্মীও (আর আমরা হলাম গিয়ে সেই সুবাদে আপনার ‘নাতি-ছাত্র’)। গান, গল্প, স্মৃতিরোমন্থন মিলিয়ে বিদায়ী-অনুষ্ঠান যখন প্রায় শেষের দিকে, এমন সময়ে ধূমকেতুসম সভামাঝে আপনার আবির্ভাব। যাদবপুরে অন্য একটা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এসেছিলেন, এসেই শুনেছেন আজ শুভাদির ফেয়ারওয়েল, ফলে ছুট্টে এসে হাজির হয়েছেন। শুভাদির অবসরগ্রহণের পর একবছর জাপানে পড়াতে যাবার কথা।

কিছুক্ষণ আগেই যাদবপুরের আরেকজন বরিষ্ঠ অধ্যাপিকা জানিয়েছেন শুভাদির অবসর-পরবর্তী জীবনের কথা ভেবে তাঁর এখন থেকেই হিংসে হচ্ছে। আপনাকেও জানানো হল সেই কথা। ‘হিংসে?’, বলেই যারপরনাই বিস্মিত এবং আহ্লাদে গদগদ হয়ে আপনি শুভাদিকে জড়িয়ে ধরে সশব্দে একগাল চুমু খেলেন। গোটা হলজোড়া নীরব গাম্ভীর্যের আবহাওয়া মুহূর্তের মধ্যে খানখান হয়ে গিয়ে অদ্ভুত এক ফুর্তির আমেজ তৈরি হল। সবার মুখে হাসি। শুভাদিরও। শুধু আপনার উপস্থিতিমাত্র একটা পরিবেশকে কীভাবে হালকা, আন্তরিক আর আনন্দময় করে তুলতে পারে, এ তার অন্যতম স্মরণীয় একটা নজির।

কিন্তু ঈপ্সিতাদির (অধ্যাপক ঈপ্সিতা চন্দ) ফেয়ারওয়েলের বেলায় ব্যাপারটা শুধু এইটুকুতেই থেমে থাকল না। এবার বেশ পূর্বপ্রস্তুতি নিয়ে স্বমহিমায় আপনি সভা আলো করে অবতীর্ণ হলেন। আপনার এই স্টার প্রেজেন্স-টা ছিল ঈপ্সিতাদির জন্য সারপ্রাইজ। যেই না শুনেছেন ঈপ্সিতাদির ফেয়ারওয়েলে আমরা নাটক করছি, অমনি দেবলীনা-র কাছে আপনার আবদার, ‘আমারও পার্ট চাই’। ব্যস, আমরাও আহ্লাদে-আনন্দে আটখানা! নবনীতাদি আসছেন আমাদের নাটকের সূত্রধার হয়ে, আর আমাদের কী চাই! নাটক তো আগে থাকতেই হিট! হয়েওছিল তাই। রীতিমত আনন্দে ভেসে যাওয়া বলতে যা বোঝায় বুদ্ধদেব বসু সভাঘর সেদিন তা-ই প্রত্যক্ষ করেছিল। সেদিনকার কলরবমুখরিত হইহই রইরই আমাদের কারো পক্ষেই অন্তত এই জীবনে ভুলতে পারা অসম্ভব।

শুরুর দিকে অবাক হতাম, এই ভেবে যে, এত লোকজন, হই-হট্টগোল, এমনকি যে-কাউকে অনায়াসে কাবু করে ফেলতে পারে এমন অসুস্থতার মাঝেও কী করে আপনি লিখে যান এত সব রৌদ্রকরোজ্জ্বল লেখা, যা পড়লে মনেই হয় না যে এ কোনও শয্যাবন্দি কিংবা কর্মভারে আনখশির ডুবে থাকা মানুষের লেখনীনিঃসৃত। তার পরে বুঝেছি, আপনি মানুষটা আসলে বড়ই আস্তিক, ‘আছে আছে’-র জায়গায় ‘নেই নেই’ বলাটা আপনার স্বভাবেই নেই। তাই যে আছে, বা যা আছে, বিশ্বাসের সেই অমোঘ আশ্রয়কে উদ্দেশ্য করে আপনি বলতে পারেন:

কেউ বলুক, না বলুক, তুমি সব জানো।
তবু কোথাও পাহাড় আছে
ছোটো কথা, বড়ো কথা, ছোটো দুঃখ, বড় বেদনা
সব ছাড়িয়ে
মস্ত এক হাসির পাহাড়।
একদিন
সেই পাহাড়ে ঘরে বাঁধব তোমার সঙ্গেই।
লোকে বলুক, না বলুক, তুমি জানো।

‘পরে কখনও যত্ন করে লিখব’– আপনি বলতেন এর চাইতে নেতিবাচক কথা আর কিছু হয় না। একজন লিখিয়ের পক্ষে উপযুক্ত বিষয় বা শৈলীর অভাবের চেয়েও ক্ষতিকর যদি কিছু থেকে থাকে, তবে তা হল তাঁর মাত্রাতিরিক্ত খুঁতখুঁতেপনা, যা একটা সময় পরে আলসেমিতে পর্যবসিত হতে বাধ্য। আর তাই, আপনি লিখে যেতেন, ধৈর্য ধরে, নিয়ম করে। আপনি জানতেন যে লেখাটা লেখকের শুধু স্বভাব মাত্র নয়, তাঁর স্বধর্মও বটে, এবং এও জানতেন যে ধর্মরক্ষা বড় দায়। না লেখার হাজারো একটা অজুহাত থাকতে পারে, লেখার জন্য এক লেখা বাদ দিয়ে দ্বিতীয় কোনও অজুহাত নেই। তার জন্য প্রয়োজন হয় অভ্যাসের, অনুশীলনের, আত্মানুশাসনের। স্বভাবের প্রণোদনাতেই আপনি লিখতেন, এটা স্বীকার না করলে অন্যায় হবে, কিন্তু এও জানতেন যে স্বভাব দীর্ঘদিনের অনভ্যাস বরদাস্ত করে না, ছেড়ে চলে যায়, যদি না তাকে যত্ন করে আগলে রাখা হয়।

মনে পড়ে, তখন চন্দ্রাবতীর রামায়ণের (এখনও অবধি অপ্রকাশিত) ইংরেজি অনুবাদের পরিমার্জন এবং টীকাটিপ্পনী তৈরির কাজ চলছে। কাজ যত না হচ্ছে, তার চেয়ে বেশি হচ্ছে খাওয়াদাওয়া, হাসিঠাট্টা, রঙ্গরসিকতা আর রকমারি গল্পগুজব। কেলটুস মাঝেমধ্যেই এসে হাজির হচ্ছে, এই গালগল্পবাজ মানুষগুলো আদৌ কোনও কাজ করছে কিনা দেখে যেতে। সেইসব গালগল্পের বিষয় কখনও আটপৌরে, কখনও অ্যাকাডেমিক, কখনও বা অবিশ্বাস্যরকমের রোমাঞ্চকর কোনওকিছু।

এত জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছেন আপনি, এত অজস্র স্যুটকেস হারিয়েছেন, এত বিচিত্র মানুষের ভিড় আপনার জীবনে, সারাদুনিয়াজোড়া অমৃতকুম্ভের সন্ধান (হাঁপানি নটউইথস্ট্যাণ্ডিং) – তাই আপনার ঝুলিতে গল্পের অভাব ঘটবে, এ অসম্ভব! ‘এগুলো লিখে রাখ, বুঝলি, নইলে পরে সব ভুলে যাবি’ – গল্প বলা মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে একদিন বলেছিলেন। স্মৃতির কী আজগুবি খামখেয়াল দেখুন, এত জরুরী সব কথা ভুলে গেছি, কিন্তু এইটে মাথায় থেকে গেছে!

মনে থেকে গেছে সেই দিনের কথাও, কাজেরই ফাঁকে যেদিন আপনাকে জানিয়েছিলাম যে ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ হিস্টরিকাল (নাকি হিস্টিরিকাল?) রিসার্চের সদ্য-ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জানিয়েছেন যে এখন থেকে তাঁর উদ্দেশ্য হবে রামায়ণ মহাভারত ইত্যাদি আখ্যানগুলি যে কিংবদন্তী অথবা পুরকথা নয়, ঠোস ঐতিহাসিক সত্য, এটা প্রমাণ করা। আপনি কয়েক লহমা চুপ করে বসেছিলেন। তারপর সেই নীরব অসহায়তার রেশ মিলিয়ে না যেতে দিয়েই মন্তব্য করেছিলেন, ‘আমি দেখতে পেলাম আমার চোখের সামনে ভারতবর্ষটা কেমন বেলুনের মত উবে গেল!’

অথচ ‘…মস্ত বড় দালানকোঠার/কড়িবরগা ভাঙবার মতন/প্রচণ্ড আওয়াজ করে’ যে ‘তৈজসপত্তর’ ভাঙছে, এক ভারতবর্ষের সমাধির ওপর যে জেগে উঠছে আরেক নতুন ভারতবর্ষ – একরোখা, উচ্চাকাঙ্ক্ষী, অন্ধ – তা তো আপনার অবিদিত ছিল না। ‘উত্তরকাণ্ডের’ মত রামায়ণী পুনর্কথন, বা বলা ভাল সম্প্রসারণ, গোটাদেশজোড়া আত্মীয়হননের যে মহাপুরাণ আমাদের চোখের সামনে তুলে ধরে, তারই সূত্র ধরে কি আমরা পৌঁছে যাই না আপনারই এরকম সব উচ্চারণের কাছে:

গোপন গর্জন শুনেছো? মাটির গভীরে শব্দ ওঠে–
দুঃখ বাস্তুসাপ
এইবারে ধ্বংসবিষ ঢেলে দেবে বত্রিশনাড়ীতে
মায়ের মাতাল গর্ভে
উঠে আসছে
পাতাল-আগুন –
তৃণে তৃণে কৃতান্তমুষল।

যে মৌষলপর্বের উদ্ঘাটন আমাদের চোখের সামনে এখন প্রাত্যহিক ঘটে চলেছে, তার কত না চিহ্নসংকেত আপনি ছড়িয়ে রেখে গেছেন আপনার লেখায়। ‘লক্ষ্মণের হাসি’-র মত গল্পের কথা মনে পড়ে, মনে পড়ে সীতার চোখে ধরা পড়ে যাওয়া শ্রীরামচন্দ্রের ছদ্ম-অপরাধবোধ। ‘এই ভারতবর্ষে কী করে বাঁচবি তোরা!’ – কতবার এই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আপনি, কতবার চুপ করে থেকেছি আমরা এর প্রতিক্রিয়ায়!

আপনি চেয়েছিলেন আমরা সুস্থ থাকি, শুধু শরীরে নয়। এবার দেশে ফিরে প্রথম যেদিন আপনার সঙ্গে দেখা করতে গেলাম, সেদিনও আপনার তুমুল শরীরখারাপ। তবু উঠে বসলেন– ‘তোরা এসেছিস তো, এখন ভাল লাগছে’! বললেন, মানুষের জীবনে কখনও কখনও এমন সময় আসে যখন সে নিজের ভারেই ন্যুব্জ হয়ে পড়ে, তখন দরকার হয় অন্য কারোর একটা তাকে তুলে ধরে দাঁড় করিয়ে দেবার। মনে করিয়ে দিলেন, কালকের আমি-র সঙ্গে আজকের আমি-র কোনওই যোগাযোগ যদি আমার স্মৃতিতে না থাকে, তাহলে সেটা আত্মপ্রতারণা!

তারপরেই মোক্ষম কথাটা বললেন– কেউ কারো পরিপূরক নয়! ‘ছিল’, ‘নেই’ আর ‘মাত্র এই’-এর মাঝের যে হাইফেনঠাসা শূন্যস্থান, তা শুধু এইটুকু কথা দিয়েই ভরাট হয়ে গেল। কেননা মাত্র এইটুকুই তো শুধু নয়। আমরা যারা পেছনে রইলাম, যারা এত আদর, এত স্নেহ, এত অবারণ প্রশ্রয় আর জীবনীশক্তি পেলাম আপনার কাছে, আমাদের জন্য ওই শূন্যস্থানটা জুড়ে বসে আছেন আপনি। আশীর্বাদ করুন যাতে চারপাশে ক্রমাগত ছোট হয়ে আসতে থাকা এই পৃথিবীর রুদ্ধশ্বাস প্রদূষিত আবহাওয়ার মধ্যে বাস করেও, এই কথাগুলো নিজেদের স্মরণ করিয়ে দিতে আমাদের গলা কেঁপে না যায়:

বিশ্ব ছোট হয়ে যাক হস্তধৃত আমলকের মতো,
এ আমার প্রার্থনীয় নয়। আমি চাই পৃথিবী ছড়াক
আমার পৃথিবী আমি পরিশ্রম করে খুঁজে নেবো।
পৃথিবী, বিস্তীর্ণা হও, ব্যাপ্ত হও ব্রহ্মচরাচর
আকীর্ণ ছড়িয়ে পড়, আরও, আরও নিঃসীম সময়
আমার পৃথিবী হোক অফুরান, অনন্ত বিস্তার
পৃথিবী, বর্ধিষ্ণু হও, আমি ছোট, আরও ছোট হই।

অনেক ভালবাসা।
ইতি,
আপনার নাতি-ছাত্র
যুধাজিৎ
১৭.১১.২০১৯
হাইডেলবার্গ