শাশ্বত কর

দিন তো দিনের ছন্দেই চলে। নদীর জল যেমন ছলাৎছল চলে চলার ছন্দে। কুঁড়ি ফুটে ফুল হয়, মৌমাছির ডানা নড়ে গুঞ্জনের সুমধুর শব্দ ফোটে, ফুলের ইচ্ছের ঘনীভভবনে ফল আসে,পরিপক্ক ফলের ভারে নুয়ে আসে বৃক্ষের ডাল! সবই যে সেই ছন্দ মেনেই। গ্রহ, তারা, নক্ষত্র কারও রেহাই নেই সেই ছন্দোবদ্ধতা থেকে। এই আদি বিশ্বের কণায় কণায় যে সাবলীল ছন্দ, দিনই বা তার ব্যতিক্রম হয় কী ভাবে? দিন তো তবু দিনও নয়! অন্তর মাত্র।যতই ছন্দ থাকুক, ট্রেনে বসে যেমন গতি মালুম হয় না, তেমনি ছন্দের ভিতরে থেকে তার নিয়মটুকুও মনে ধরা দেয় না সবসময়। কাজেই দিনেরও স্বাভাবিক চলাটুকুকে না দেখে ‘সু’ ‘কু’ এর বিশেষণে ভারি করে তোলে মানুষ। কিছুই দোষের নয়। প্রকৃতি যখন গড়েছেন আমাদের মন নামের সেই অব্যক্ত বিষয়টি দিয়ে, আর সেই মন নামক আয়নাটির কাছে যখন সবসময়ই ‘আমি’ উত্তম পুরুষ, তখন সেই আমির সাপেক্ষে দিনের গুণ-জাতি তো বিচার্য হবেই।পাহাড়ের যেমনি দুটি ঢাল, জীবনেরও প্রায় তাইই। উবড়খাবড় এড়োতে এড়োতে অথবা পেরোতে পেরোতে একসময় জীবনের চুড়োয় পৌঁছোন সবাই। সে চুড়োর খাড়াইও আবার সবার জন্যে আলাদা। যার যেমনি ওজন, তেমনিই ভোজনের বহর। ব্যত্যয় হলেই গুরুপাক। চোঁয়া ঢেক- গলা বুক জ্বালা। যাই হোক, যে ভাবেই হোক চুড়োয় পৌঁছোনোর পর তো নামতেই হবে। যেখান থেকে শুরু, আদতে যে সেই সমানেই আসতে হবে, নইলে আর ছন্দ মিলবে কেন? এই নামবার নিয়মটি যারা মেনে চলেন, তাদের নিয়ে সমস্যা হয় না, যারা মানেন না অথবা মানতে পারেন না, তাদের হয় মারকাটারি সমস্যা। নিয়মটিও আলাদা কিছুই নয়, সেও ছন্দোজাত। নদীর মতোই ফের। আসল কথাটি হল বহু কিছু সঞ্চয় করে তো চুড়োয় ওঠা হল, চুড়োতেও জমি অনুকুল, কাজেই সঞ্চয় গতরে বহরে আরো বাড়ল। এইবার এলো নামবার সময়। বোঝাটিকে তো এবার আস্তে আস্তে আলগা করতে হবে, হালকা করতে হবে। নইলেই সমূহ বিপদ! সঞ্চয় তখন বোঝা। কাঁধে, পিঠে, মগজে সে বোঝার ভার বয়ে নামতে নামতে হাঁপের টান উঠবেই। আবার ভর বাড়তি বলে ভরবেগেরও বাড় বাড়ন্ত। একে খাড়াই ঢাল। তায় বাড়তি ভরবেগ! ঝড় ঝঞ্জায় নুয়ে পড়া কাঁধ তো বেসামাল হবেই।তবে কথা হচ্ছে, অত সহজে কি ছাড়া যায়? মায়ার টান যে মাধ্যাকর্ষণের থেকেও তীব্র। ক’জন আর ছাড়াতে পারে বলো? কাজেই শেষের দিনে দুঃখ ভোগ লেগেই থাকে।গুরু ভজনানন্দ প্রেমগিরি মহারাজ সবে এতটুকু বলেছেন, বৃদ্ধ নটবর সাহা গলা খেঁকড়ে চিল্লে উঠলেন, ‘সবই তো শুনলাম মহারাজ। আপনের গলায় তবে মালা ক্যান? ফুলের সুবাস, ভক্তের স্যাবা এহনও ছাড়তে পারেন নাই বুঝি?’প্রেমানন্দ স্মিত হেসে কী একটা যেন বলছিলেন, ভালো শোনা গেল না। তার কারণও অবশ্য নটবর সাহা। নিজের কথাটা বলেই তিনি  এদিক ওদিক একটা কেমন দিলাম কেমন দিলাম মার্কা চাউনি ঝেড়ে খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসতে হাসতে কাপড় ঝেড়ে উঠে পড়লেন। স্বাভাবিক তাকে নিয়ে একটা গুঞ্জন শুরু হল। সেই গুঞ্জনের মধ্য দিয়ে ডান হাতটা সামনের দিকে এগিয়ে দিয়ে খানিক ঝুঁকে তড়বড় তড়বড় করে প্রবচন সভা ত্যাগ করলেন নটবর।প্রেমানন্দ বলে উঠলেন, ‘অর্বাচীন’!

………………………………………….
চিনে দ্রব্যাদি সম্পর্কে চিরকালই একটু নাক সিঁটকোনো মনোভাব আমাদের নটবর সাহার। এই যে আজকাল খাবার দাবার থেকে নাটবোল্টু পর্যন্ত চিনেদ্রব্যের ছড়াছড়ি,তবু এ বাজারেও যতটা পারেন চিনে দ্রব্য চিনে নিয়ে আলগোছে বর্জন করেন। একসময় তো চিনেপটকাও ফাটাতেন না, চিনে বাদাম পর্যন্ত দাঁতে কাটতেন না। অবশ্য চিনেবাদাম চিবুনোর উপায়ও বড় একটা ছিলো না নটবরবাবুর। তার একটা কারণ অবশ্যই নটবরের দাঁতের ফাঁসা আর অপর কারণটি হলো নটবরের ব্যস্ততা। এক কথায় কর্মবীর মানুষ নটবর সাহা। কথায় বলে ঠাঁইনড়া গাছে নাকি ফল হয় না। তা আমাদের নটবর সাহা তো সে প্রবাদ মিথ্যে করে বহাল তবিয়তে ফুল ফল ফুটিয়েছেন। সে তো আজকের কথা নয়। সেই যে দেশভাগের সময় জোয়ারের জলের মত মানুষ উজিয়ে এল যশোর রোড ধরে, সেই তখন শ্রীপুর থেকে নদী পার করে এসেছিল। কত আর বয়স তখন দশ-বারো। সম্বল বলতে মা আর কোলের বোন। বাবা দেশ ভাগের উৎকন্ঠা আর নিতেই পারেননি। দেশের বাড়িতে টিনের ঘর ছিল। টিনের ঘর, টিনের বেড়া, টিনের চারচালা। ঘর ছিল উঠানের থেকেও প্রায় আধমানুষ উঁচুতে। জল জমতো যে বর্ষায়! যাতে জল ঘরে না ঢোকে, তাই অবস্থাপন্ন গৃহস্থের ঘরদোর উঁচুই হত। সেই ঘরের বারান্দায় সে সময় রোজই প্রায় মানুষ আসে। নিচুগলায় কথা হয়। প্রাইমারি ইশকুলের মাস্টার আহমদ চাচাওনিজে থেকেই মাঝে মধ্যে আসে। কয়, তুমরা যাইবার কথা ভাবো ক্যান? আমরা কি কুনোদিন তুমাদের উচা নিচা কইছি? এত বচ্ছর একসাথে রইছি, একদিনে পর ভাব ক্যামনে? সবাই চলে যাবার পর বাবা ভিতরে এসে মোড়ায় বসেন। চালের শালকাঠের খোঁটা থেকে ঝুলানো কাপড়ের দোলনায় অল্প অল্প দোলা দেন আর দোলনায় শোয়া মেয়ের দিকে হাঁ করে চেয়ে থাকেন। মাঝে মাঝে কাপড়ের খোঁটে চোখ মোছেন। মা জিজ্ঞাসা করলেই বলেন, বড্ড কঠিন দিন আইতাছে গো নটোর মা! ধর্মের লাইগ্যা গুটা দ্যাশডা ভাঙতাছে! আমাগো যে কী হইব, এই দ্যাশ কাদের হইব কিছুই বুঝা যায় না! যদ্দুর হুনি, বুধয় পাকিস্তানে যাইব আমাগোএই গাঁউ। ভিটা ছাইড়া অন্যখানে বাঁচতে পারবা তো? মা বলেন, পারুম না ক্যান? তুমি থাকবা তো!দিন যায়। নানান খবর ভেসে আসে হাওয়ায়। নানান মন্তব্য উড়ে আসে। বাসা ফেলে একে একে উড়ে যায় পাখি। বাবাও ক্রমশঃ চুপ হতে থাকেন। মা বলেন, অত চিন্তা কইরো না। আরও কত লোকেই তো যাইতাছে। তাগো যা অইব, আমাগোও তাই।এরই মধ্যে একদিন শোনা গেল হাইস্কুলের হেডমাস্টার যতীনবাবুকে ভিন গাঁয়ের কারা যেন দু’কথা শুনিয়েছে। যতীনবাবু মানী লোক। কথা শুনে তাদের নাকি বলেছেন, হ্যাঁ বাবা! এদেশ তো তোমাদেরই হল। আমার তো আর নয়। তার দু’দিনের মধ্যে ভরা ভিটে ফেলে ইন্ডিয়ায় চলে গেলেন যতীনবাবু। খোলা ঘর থেকে যে যেমন পারল জিনিস নিয়ে গেল। ম্যাঘা কলু দেখেশুনে নিয়ে গেল যতীনবাবুর বইয়ের আলমারিগুলো। দিনদুয়েক বাদে বাবা বাইরে থেকে ফিরে বাবা কেঁদে ফেললেন। মা বলে, কী হইল? শরীর খারাপ লাগে না কি? বাবা কিছু বলেন না, খালি ফোঁপান! মা বুক পিঠ ডলে দেন। টান কমলে বাবা বলেন, নটোর মা! দ্যাশ ছাইড়া গেলে আামাগো ভিটায়ও এমনি ঘুঘু চইড়ব গো! বাপদাদার ভিটা! তাগো আত্মা জড়াইয়া এইহানে! সেই জিনিসগুলান বারো জনে লইয়া বারো রকম কাম করবে গো! ও হো হো! ক্যান ভাগ হয় দ্যাশ! হায় রে! মা আরো জোরে জোরে পিঠ ডলে দেন। বলেন, কী দ্যাখছো? কওনা ক্যান? তুমারেও কেউ কিছু কইছে? অ্যাঁ!বাবা বলেন, যতীনবাবুর বইয়ের আলমারিগুলা আছিল না?হ। আছিল তো। কত দিনের পন্ডিত তারা! কত না পুঁথি তাদের আলমারি ভরা!ম্যাঘা হেই আলমারিগুলা লইয়া বইগুলান নি ফালাইয়া হেয়াতে ত্যালের জালা রাখছে! পুরানা পুরানা পুঁথিগুলার কাঠ ফাইড়া আখা জ্বালাইতাছে! এহনও কত বই অর খড়ির ঘরের বামপালে ঢিবি দিয়া রাখা!হায় রে!ব্যস। ওই দিন থেকেই বাবার টানের শুরু। ডাক্তার নাই। সাতখানা গাঁয়ের একমাত্র এম.বি.বি.এস. গণেশডাক্তার পরিবার নিয়ে সপ্তাহ দুয়েক আগেই চলে গেছেন। একমাত্র ভরসা নিবারণ ডাক্তার। এল.এম.এফ। তার মিক্সচার শেষ হয়। টান কমে না। এক্কেবারে কমল যে দিন, সে দিন পিছনের ঝাড় থেকে চারখানা বাঁশ কাটা হল।বাবাকে দাহ করে ফিরে এসেই নটবর দেখে মা ট্রাঙ্ক খুলে তাতে জিনিস ভরছে! বাবার বিনা এই দ্যাশে আর নাকি থাকা চলে না!বাবার কাজ আর পূর্ব পাকিস্থানে করা হয়নি নটবরের। গুরুদশাতেই দেশ ছাড়তে হয়েছে মা বোনের হাত ধরে। তারপর এই মাঠ, ওই খেত রাত্তিরবেলা করে পার করে করে শেষমেশ ইছামতী ডিঙিয়ে ইন্ডিয়ায়। কেউ চেনা নেই। কেউ জানা নেই। সম্বল যেটুকু আছে, তাও লুঠ হবার ভয়। হয়নি যে সে কেবল মায়ের জন্যে। নটবরের মা তো তখন আর মানবী নন। বাঘিনী। কোলের মেয়েরে সামলান। নটবরের মুখে খাবার তুলে দেন। রাস্তায় কত লোক! কত তাদের অস্তিত্বের লড়াই! সম্ভ্রমের লড়াই! তার যেন আর শেষ নেই! উদ্বাস্তু ভরা রাস্তারও যেন শেষ নাই!নটবররা দিনভর চলে আর চলে। বোন দুধ খায়, নটবরের জোটে আঁজলা আঁজলা জল আর শুকনো রুটি বা পাঁউরুটি । মায়ের যে কী জোটে সে মাই জানে! রাতে কোনো মন্দিরের চাতাল, নয়তো বাড়ির রোয়াক নয়তো খোলা আকাশের নিচে যেখানে জায়গা জোটে থাকে। এমনি চলতে চলতে বারাসাতে এসে এক বাড়িতে মায়ের কাজ জুটল। নটবররা সেখানেই থাকে। ঢিরি বাসন মাজতে হয়। ফুঁ পেরে, জ্বাল দিয়ে মাটির উনোন জ্বালাতে হয়। নটবর মাকে কাঠ কুড়িয়ে দেয়। মায়ের মুখে আখার ছাই উড়ে এলে হাত দিয়ে মুছে দেয়। দু বেলা খাওয়াটা জোটে। মাস তিনেক বাদে বাদে খবর এলো বেলতোড়ের কাছে নাকি জায়গা দখল হবে। মায়ের সাথে সেখানেই এল নটবররা। তারপর যা হলো, যেভাবে এই জায়গাখানার দখল পেলো নটবর আর তার মা সে কেবল এই অঞ্চলের আর যারা তার বয়সী মানুষ আছেন তারাই জানে।কোনোরকমে ছাপড়ার ঘর তুলে থাকতে শুরু। সংগ্রামেরও শুরু। হাজামজা জংলা জায়গা। সাপ খোপ কেঁচো কেন্নো পোকামাকড়ের আঁতুড়। তাতে কী! নটবরের শিকড় এই মাটির গভিরে প্রবেশ করাতে কী লড়াইটাই না লড়েছেন। নটবরও কম নয়। দুধে ঘিয়ে মানুষ নটবর এখানে এসেই কাজ নিয়েছে কাপড় কলে। আসতে আসতে মায়ে পোয়ে সাজিয়ে নিয়েছে সংসার। ছাপরার ঘর থেকে দর্মা বেড়া,দর্মা বেড়া থেকে ইঁটের গাঁথনি টালির চাল হতে হতেই বোন হয়েছে দশম শ্রেণি। তাকে উপযুক্ত পাত্রস্থ করতে করতে আরো বছর পাঁচেক ঝরে গেছে। পাত্রটিও হয়েছে মনের মতন। বোনের বিয়ের পর মা পো যখন একটু খানি শ্বাস নেবে বলে থেমেছে অমনি ভাদ্রমাসের বজ্রের মত নেমে এসেছে কারখানার সাসপেনসান অফ ওয়ার্কের নোটিস! মা মাথা সাপটাতে সাপটাতে সাহস দিয়েছে, ডরস ক্যা? তুই কি আমার  হেই পোলা যে ডরাইয়া মাথা নুয়াইব! তুই এহন জুয়ান। গায়ে খাট। চাকরি ছাড়ান দে। ব্যবসা করতো রে বাপ।মায়ের কথায় ব্যবসায় নেমেছেন নটবর। কিন্তু তুমি যাও বঙ্গে তো কপাল যাবে সঙ্গে! ফাটা বরাতে কোনো ব্যবসাই জমে না। তিলের খাজা বেচা থেকে আয়ুর্বেদিক ওষুধ কোনটায় চেষ্টা করেননি! কোনোটাই ঠিক চলে না। দু দিন চলেই লসে যায়। এরই মধ্যে অবশ্য হাসিপুরের শিবাণীর সাথে নটবরের বে থা হয়েছে, এক মেয়ের পর দুই ছেলে হয়েছে। এমনি করে তালে বেতালে দিন কাটিয়ে নটবরের যখন বছর পঞ্চাশেক, তখন শেষমেশ লক্ষ্মী থিতু হলেন। মজার ব্যাপার হল, যে ব্যবসায় মা লক্ষ্মী বসলেন, তাতে চিনের যোগ রয়েছে। অবশ্য নামটুকুতেই। নটবর শুরু করলেন চিনেমাটির কাপ প্লেট ছাপানোর কাজ। বাড়িতেই। বাড়ির সামনের দিকে তিনটে ভাটি হল। ইঁটের গাঁথনি দিয়ে টালির ছাওনি হল। পেটি পেটি কাপ, প্লেট আর ডিজাইন দিয়ে যায় মহাজন। নটবর ব্লক সাজান, ছাপেন, ভাটিতে শুকিয়ে পাকা হয় রঙ।তার আগেই যদিও পাকা হয়েছে ঘর, দুয়োর, পাতকো তলা, তুলসি মঞ্চ। পাকা রুইও পড়েছে হপ্তায় দুই দিনের পাতে। দোষে গুণে দিন বেশ কেটে গেছে।
………………………………………….
শিবানির সাথে নটবরের বিয়ের সম্বন্ধটা দেখে দিয়েছিলেন মজুমদার কাকা। মজুমদারকাকাও নটবরদের উদ্বাস্তু কলোনি- নেহেরু পল্লীর বাসিন্দা। শুধু তাই নয় নটবরদের দেশের লোক। পাশের গ্রাম হামরার মানুষ।। বাবাকেও চেনেন। মাও তাঁকে দেখেছেন। মা বলেন হামরার মজুমদারদের মেলা নাম ছিল। তা অবশ্য মজুমদার কাকার রাশভারি চেহারা দেখলেও মালুম হয়। নেহেরু পল্লীর সবাই মান্যি করে। কাজেই মজুমদারকাকা এখানে তাদের অভিভাবক সমান।বোনের বিয়ে দেবার পর যখন কারখানায় কাজ বন্ধ হলো, মায়ের কথায় নটবর ব্যবসা শুরু করল, তখন থেকে প্রায় বছর দুয়েক পরের কথা। এর মধ্যে খান তিনেক ব্যবসা বদল হয়েছে নটবরের। পল্লীর তিন নম্বরের পুকুর পাড়ের নিশীথবাবু হাত দেখে বলেছেন নটোর খাটুয়ে হাত।ব্যবসায় থিতু হতে বহুদিন লেগে যাবে আর চাকরি তো একেবারেই হাতে নেই। যাই হোক নটবর উদ্যমী পুরুষ, কাজেই দু’দিন মুষড়ে থেকে ফের নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করলেন। এবার নটবর শুরু করলেন মাটির ভাঁড়ের ব্যবসা। কুমোরপাড়া থেকে কিনে দোকানে দোকানে সাপ্লাই করা। বাড়িতেই স্টক। অন্যান্যবারের মত এবারেও ব্যবসা প্রাথমিক ল্যাপে ভালোই দৌড়োলো। আগের বারের দেনাদায়ও প্রায় শোধ হয়ে এল। ওদিকে বোনের বাড়ি থেকেও খুশির খবর এলো। নটবর মামা হতে চলেছে।শ্বশুরবাড়ির নিয়ম মেনে পাঁচমাসে বোন এসে উঠল বাড়িতে। এক বছর থাকবে বাপের বাড়ি। বড় দায় এসে পড়ল নটবরের কাঁধে। বোনটার শরীরের যত্ন নিতে হবে, ভালো ভালো খাওয়াতে হবে যতদূর পারে। মা আবডালে এসে বলে, ওই নটো! বড় মাছ আনিস ক্যান রুজ? ট্যাঁহা লাহে না? চারাপুনা আনবি, আয় দিবে।কী যে বলে মা! নটবর কি জানে না বোনটা কাঁটামাছ খেতে পারে না! সেই ছোট্ট থেকে কোলে পিঠে মানুষ করেছে, আদর করে অতসি নাম দিয়েছে, কোনোদিন জুতো কেনার সময় বোনকে নিয়েও যেতে হয়নি, যে জুতো এনেছে তাই ফিট করেছে আর সে কি না জানে না বোনের কখন কি চাই! বোনের রুগ্ন চোখদুটোর দিকে চাইলেই নটবর বোঝে বোনটার একটু ফল খাওয়া দরকার। একটু বেদানা, একটু আপেল। কাজ থেকে ফেরার সময় তা হাতে করে আনেও।এমনি করেই দিন এগোতে এগোতে একদিন নটবর মামাও হলো। ভাগ্নিকে কোলে নিয়ে আদর করতে করতে এই প্রথম নটবরের মনে হলো, তারও একটা সংসার দরকার। মনে হলো, এইবার মায়ের কথায় হ্যাঁকরাই ভালো।কিন্তু খামখেয়ালি বলে বদনামের ভাগি ওই যে প্রকৃতি, তার ছন্দ তো কোনোভাবে বিঘ্ন হবার নয়। যেহেতু গরম এ বছর চাঁদি চড়বড়ালো কাজেই বর্ষাও এলো আকাশ ভেঙে। হায়রে বৃষ্টি! হয়েই চলে, হয়েই চলে! পুকুর ছাপিয়ে জল উঠলো রাস্তায়। ঘরের চাল থেকে টপটপ করে জল ঝরে। যেখান থেকে জল ঝরে, নটবর সেখানে সেখানে টালির বাতার সাথে কৌটো বেঁধে দেয়। কৌটো উপচিয়ে জল ঝরে। বিছানা ভিজে যায়। গ্যাঁদা ভাগ্নিটার তখন চার মাস। ওদিকে জল বাড়তে বাড়তে উঠোনে উঠেছে। নটবরের ব্যবসার লক্ষ্মী মাটির ভাঁড় আরেকটা ঘরে ডাঁই করে রাখা, সে ঘরটা অবশ্য উঁচু। তবু এই ড্যাম্পের মধ্যে ভাগ্নিকে আর রাখা সমীচীন মনে করলো না নটবর। জামাইকে খবর দিয়ে বোন ভাগ্নিকে দিয়েই এল শ্বশুর বাড়ি। মেয়ে হয়েছে কি না, জামাইয়ের বাড়িতে তাই তেমন কোনো আপ্যায়নই হলো না নটবরের। বোনটাকে ভালো মন্দ উপদেশ দিয়ে দুপুর বেলা বেরিয়ে পড়ল নটবর। কেউ তাকে একটুজল খেতেও বললো না। কেবল বোন দরজার কোণে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদল। সাতদিনের টানা বৃষ্টিতে যত না ভিজেছে নটবর, ফেরার সময় বোনটার চোখের জলযেন তার থেকে শতগুণে ভিজিয়ে দিল তাকে!সেদিন রাতেই জ্বরে পড়ল নটবর। ধুম জ্বর! চোখ লাল। জ্বরের ঘোর বাড়লে ভুল বকে। মজুমদারকাকা জল ভেঙে ওষুধ এনে দেন। খায়, জ্বর কমে, ফের আসে। রাত হলেই ঘ্যাস ঘ্যাস করে কাশতে থাকে নটবর। মা আমপাতায় তেলচুন গরম করে কন্ঠায় মালিশ করেন। কাশতে কাশতে ঘুমিয়ে পড়ে ক্লান্ত নটবর।জল ওদিকে বাড়তেই থাকে, বাড়তেই থাকে। দাওয়া পেরিয়ে ঘর, ঘরের দেয়াল বেয়ে বাড়তে বাড়তে চৌকি ছুঁই ছুঁই। উঠোন দিয়ে বীজ পোনার ঝাঁক সাঁতরে যায়, জলঢোরা সাঁতরে যায়! বাইরের রাস্তায় কেউ হেঁটে গেলে ঢেউ এসে পড়ে ভিতরে। নটবরের মা একা বারান্দায় এক হাঁটু জলে দাঁড়িয়ে চৌকিতে রাখা জনতায় খিচুড়ি রাঁধেন। নটবরকে খাওয়ান। কেবল পাশের ঘরটার দিকে চোখ পড়লে বুক থেকে কান্না উপচে আসে। ও ঘরটায় ছেলেটার ব্যবসার সব কিছু। পোড়া মাটি জলে গলে ঘোলা। লালচে ঘোলাটে জলগুলো ও ঘরে দেখলেই মনটা হু হু করে। ওই রঙ ছেলেডার রক্ত বলে বোধ হয়! হায় রে!টানা সাত দিন পর জল নামতে শুরু করল। নটবরের জ্বরও ততদিনে নেমে গেছে। খকখকিয়ে কাশতে কাশতেএকবার এসে ব্যবসার ঘরটায় উঁকি দিয়ে ফের ঢুকে গেল শোয়ার ঘরে। মা এসে বলল, ভাইবো না নটো! দিন একরহম থাহে না! দ্যাখছো না, এই কয়দিন ক্যামন বাদল, আর আইজ দ্যাহ ক্যামন রোদ উঠছে!নটবরের রোদ তো এত সহজে উঠবার নয়। হ্যাঁ, তবে লড়তে জানে নটবর। ধাক্কা সামলেই ফের ব্যবসায় মন দিলে। এবার আর মাটিতে গলে যাওয়ার জিনিস নয়। এইবার কাপড়ের ব্যবসায় মন দিলে। কাপড়ের কলে কাজ করত বলে বেশ কিছুটা জানাও আছে। সেই বোধে ভর করেই নেমে পড়লে কাজে। তাঁতিদের বাড়ি থেকে কাপড় এনে এলাকায় কিস্তিতে বেচা। ঠিকঠাক শোধ পেলে কামাই খারাপ হয় না।যা হোক, ব্যবসা মোটামুটি জমতে জমতেই অশান্তির মেঘ ঘনিয়ে এল। এও স্বতঃস্ফূর্ত! তবে প্রাকৃতিক নয়, রাজনৈতিক। যে রাজনৈতিক অস্থিরতায় গোটা বাংলা উত্তাল হয়েছিল, হাজারো হাজারো তরুণ সমাজ বদলে দেবার আশায় আগুন জ্বেলেছিলেন, বলা বাহুল্য তার আঁচ সমস্ত উদ্বাস্তু পল্লীগুলোয় ছড়িয়ে পড়েছিল। কেউ বলেন এর কারণ দীর্ঘ বঞ্চনা, কেউ বলেন দেশ ছেড়ে আসা এই মানুষগুলোর লড়াকু মনোভাব এর জন্য দায়ী। সে যাই হোক, নেহেরুপল্লীর চারটে ব্লকের প্রতিটি গলিঘুঁজিতে গোপন সংগঠন গড়ে উঠেছিল। শহর কোলকাতার উপকন্ঠে বলে কলেজের তাজা ছেলেগুলোও আন্ডারগ্রাউন্ড হওয়ার জন্যে এই এলাকাগুলোয় লুকোতো। পুলিসও জানতো। অন্য রাজনৈতিক দলগুলোও জানতো। কাজেই পুলিসি হানা আর বিপ্লবীদের গেরিলা হানা এই অঞ্চলে নৈমিত্তিক হয়ে উঠল।এই পল্লীতে চারটে ব্লক। প্রত্যেক ব্লক থেকে একটি করে চওড়া রাস্তা মূল রাস্তায় মিশেছে। এই রাস্তাগুলোই ব্লকের সীমানা। অসংখ্য গলি, উপগলি এসে মিশেছে রাস্তাগুলোয়। গলিগুলোর দুইধারে বাড়ি, গাছপালায় ঢাকা। তাড়া খেলে পালিয়ে থাকার আদর্শ জায়গা। তার উপরে রয়েছে অধিকাংশ বাসিন্দার প্রচ্ছন্ন সমর্থন। কাজেই রাজনৈতিক গুহায় পরিণত হতে নেহেরুপল্লীর বেশি একটা সময় লাগেনি। ফলত যা হবার হল। একদিকে পুলিস আর অন্যদিকে বিপ্লবী- যৌথ সক্রিয়তায় নটবরের মত সামান্য ব্যবসায়ীর কাজ প্রায় লাটে উঠল। কারণ কোথাও কাজে গেলে যদি রাত হয়ে যায় তবে ঘরে ফিরতে গেলে ফেরা আর হবে কি না তার ঠিক থাকে না। গোটা পল্লী অন্ধকার। কোন ঘুপচি থেকে যে সিসা ছুটে এসে চড়াইকে খাঁচা থেকে উড়িয়ে দেবে সে কথা বলা যায় না। তবু সাহসে ভর করে নটবর আসে মাঝেমাঝে। একদিন তো নেত্যদার বন্ধ চায়ের দোকানটা ক্রস করবার সময় কোত্থেকে ছেঁকে ধরল গোটা চারেক ছেলে। সবার পকেটে হাত! কিছু একটা শক্ত করে ধরে! নটবরকে ধরে নানান প্রশ্ন চলল। নটবর বুঝল, আসলে এরা শিওর হতে চাইছে যে ও পুলিসের খোচর কি না! আস্তে করে বুবলাদার নামটা এদের বলে পরিচয় দিতেই ছেলেগুলো ছেড়ে দিল। শুধু ছেড়ে দিল বললে ভুল হয়। লিডার গোছের ছেলেটি দু’জনকে বলল নটবরকে বাড়ি অবধি এগিয়ে দিতে। আজ নাকি দিন ভালো নয়। নটবর বাড়িতে ঢুকতে না ঢুকতেই খেলার মাঠের দিক থেকে ধমাদ্ধম বোমার আওয়াজ! সঙ্গে ফটাশ ফটাশ ফট ফট বন্দুকের শব্দ! বারুদের গন্ধ বলে গেল, সত্যিই দিনটা ভালো নয়। পরদিন চললো পুলিসের জেরা ধমকানি। পুলিসও কী ভাবে জেনে গেছে কাল নটবর রাত করে ফিরেছে। বারবার জেরা চলল, কাউকে দেখেছে কি না! সন্তোষজনক জবাব না পেয়ে যে ভাষায় ধমকাল তাতে নটবরের মায়ের বুকেও ঠান্ডা বাতাস বইল! কী সব্বোনেশে কথা!মজুমদারকাকা আগাগোড়া দাঁড়িয়ে ছিল। পুলিস চলে যাবার পর ঘরে এসে বলল, নটটার এইবার বে দ্যান বউঠান। ইয়ং ছেলে। সত্যিই কোলে পুলিস যা ইচ্ছা দায় দেবার পারে। ফ্যামিলি ম্যান হইলে অত ঝঞ্ঝাট করব না।মা বললেন, আমার যে হাত পাউ সব ঠান্ডা হইয়া যায় ঠাকুরপো। কামে না বাইর’লে নটর চলবে ক্যামনে? আর কামে যদি বাইরয়, যদি রাত হইয়া যায়…!কইলাম তো বউঠান, বে দ্যান। ক’ন তো মাইয়ার সাথে কথা কই।আমি কওনের কেডা ঠাকুরপো? এত্ত বড় হইল, আগে কইতো বুনের বিয়া হোক! তারপর বের কথা কইলে খালি হাসে। আপনিই জিগান হেয়ার মত আছে কি না!মজুমদারকাকা জিজ্ঞাসা করলে আর অমত করেনি নটবর। কাজেই মজুমদারকাকার বন্ধুর ভাগ্নি শিবানির সাথে নির্বিঘ্নে বে থা সম্পন্ন হয়ে গেল। দেনা পাওনা নিয়ে অবশ্য মায়ের সাথে একটা খটামটি লেগেছিল তবে দেবার লোক না থাকায় আর ছেলেরও মত থাকায় সে খটামটি উত্থানেই মিলিয়ে গেছে।শিবানিও উদ্বাস্তু। নটবরের মতো নয়। নটবর উদ্বাস্তু হলেও তার সঙ্গে তার মা বোন ছিল। শিবানি উদ্বাস্তু হয়েছে একা। তার বাবা মা আর সবাই রয়ে গেছে ওপারে। কেবল ন’ বছুরে মেয়েটাকেই পাঠিয়ে দিয়েছে মামার বাড়ি। সেখানে মামিদের ঝামটানি খেতে খেতে কেটে গেছে বছর দশেক। এর মধ্যে বাবা একবার আসলেও শিবানি তার সাথে কথা কয়নি। অন্য ঘরে গিয়ে দোর দিয়েছে। মামিরা যখন মেয়ের রাগ দেমাক নিয়ে বাবাকে দুকথা শোনাচ্ছে সেই দেমাকি মেয়ের চোখের জলে তখন ছিটের ফ্রকের গলা  ভিজে যাচ্ছে! কেন যাবে সে বাবার কাছে? কেন পাঠিয়ে দিল তাইলে এখানে? ভাইরা তো ওখানেই বেশ আছে! তবে?যাই হোক, বয়সে অনেকটা বড় নটবরের সাথে যখন তার সম্বন্ধ হলো, সত্যি বলতে কি শিবানি এক কথায় রাজি হয়ে গেছিল। মামাবাড়ির নিত্যদিনের খোঁটা আর তার সইছিল না। তাছাড়া এক মাথা টাকওলা নটবরের মুখটা আড়চোখে দেখেও কেন যেন খানিক ভরসা পেয়েছিল।যাই হোক খোঁটা শোনা যার জীবন-ছন্দের সাথে আষ্টেপৃষ্টে, তার কি অত সহজে মুক্তি জোটে? শ্বশুর বাড়িতেও খোঁটার বহর অব্যহত রইল। নটবর মাকে নতুন এই ভূমিকায় দেখে অবাক হল! মমতাময়ী মায়ের একী রূপ! কথায় কথায় দেনা পাওনার খোঁটা শোনায় শিবানিকে! অকথা কুকথার বন্যা বইয়ে দেয়! শোনা যায় না এমনি সব ভাষা! শিবানির প্রতিটা কাজে হাজার হাজার দোষ! রান্নায় খুঁত! আমিষ নিরামিষ আঁইঠা শগড়ি সবেতে খুঁত! মা বাবা ছাড়া মেয়েটার জন্যে নটবরের কষ্ট হয়! কিন্তু মাকে কিছু বলে উঠতে পারে না! ক্রমে ক্রমে অত্যাচারের মাত্রা বাড়তেই থাকে। কাঁহাতক সইতে পারে মানুষ! তাই প্রতিকারের আশায় শিবানি নটবরকে অনুযোগ করে। বারবার বলে মামার বাড়ি রেখে আসতে। নটবর তাকে বোঝায়। কিন্তু মাকে কিছুই বলতে পারে না।এরই মধ্যে রোজই ব্যবসার কাজে বেরোতে হয় নটবরকে। একদিন শেষ দুপুরে বাড়ি ফিরছে, পাড়ার মোড়ের কাছে দেখে কাঁধে নীল সাদা ব্যাগ নিয়ে চোখ মুছতে মুছতে এগিয়ে চলেছে শিবানি! কী ব্যাপার? হনহন করে এগোতে যাওয়ার আগেই নটবর দেখলো পিছন থেকে মা এসে খামচে ধরেছেন শিবানির লম্বা চুল। আকর্ষণ করছেন পিছনের দিকে আর অশ্রাব্য ভঙ্গীতে বলে চলেছেন, ‘অই মাগি! ঘর চল! ঘর চল!’বাড়ি ঢুকেই সেদিন তীব্র চিৎকার করে নটবর। যে নটবরের গলার আওয়াজ পাওয়া যায় না, মায়ের এই অদ্ভুত আচরণে সেই তারস্বরে চেঁচিয়ে ওঠে। আশপাশের বাড়ি থেকে লোকজন ছুটে আসে। নটবরকে সান্ত করার চেষ্টা করে কেউ কেউ! কেউ কেউ আবার গালে হাত দিয়ে ‘ও মা! এ মা! বলে নটবরের বউ এর সাহসের কাঁটাছেঁড়ায় মাতেন। ইন্ধন পেয়ে মা ইনিয়ে বিনিয়ে সুর তোলেন। শাপ শাপান্ত করেন শিবানিকে। ডাইনি বলে গাল পারেন। ডাইনির এত ক্ষমতা যে কুলের ছেলেডারেও পর করছে!অশান্তির বহর এমনিই বাড়ে কমে। ক্রমে অভ্যাস হয়ে যায়। অশান্তির মধ্যেই বড় মেয়ে হয়। অশান্তি আরো একটু বাড়ে। পাশের দত্তবাড়ির বৌ আর মা দুজনেই নটবরের মাকে ইন্ধন দেয়। বলে কোত্থেকে জুটাইলেন গো দিদি? না আছে রূপ! না আছে বাপের ধন! দত্ত বৌ বলে, বাপের ধন তো দূর, বাপ তো নেয়ই না, এমন অভাগী! শাশুড়ি বলে, ঠইক্যা গেলেন গো দিদি! নইলে আপনেগো মা পোয়ের সংসার! কুনো অ্যালাই নাই। কত ভালো সম্বন্ধ পাইতেন! পণ এমন দিত, ঘর ভইরা যাইতো আপনের! তা তো হইলোই না! উল্টাইয়া যেয়ানি আইল দ্যাহেন ঘরে কেমন আরেক বুঝা আইনা দিল! মজুন্দার ঠাকুরপো এতবড় ভুলহান কইরল তাও কি না দিদি আপনেরই লগে! নটবরের মা এইসব শোনেন আর ঘরে গিয়ে শিবানিকে ঝামটা দেন। শিবানিও চোপা করে এখন। বিশেষ করে কোলের মেয়েটাকে বোঝা বললেই জ্বলে উঠে তীক্ষ্ণস্বরে ঝগড়া করে। বাড়িতে থাকলে নটবর কখনও মধ্যস্থতা করে, দু পক্ষকেই থামাতে চায়। কখনও বা রেগেমেগে না খেয়ে গিয়ে বসে থাকে নেত্যদার চায়ের দোকানে। বাড়ির চিৎকার স্তিমিত হলে ফেরে।এমনি করেই দিনগুলো পার করে বছর দুই আর বছর পাঁচ ছাড়া ছাড়া শিবানি ফের সন্তান সম্ভবা হল। দু বারেই দুই ছেলে। দত্তবাড়িতে মিষ্টি দিয়ে নটবরের মা বলে এলেন, বৌমা আমাগো লক্ষ্মীগো দিদি! আদর করে এবার বড় মেয়েটাকেও কাছে টেনে নিলেন। কথায় কথায় বলা হয়নি, নটবরের বড় মেয়ের নাম সুমিতা, বড় ছেলের নাম অমিত, আর ছোটটার নাম সুমিত। ঠাম্মার আদরের নাম সুমি, খুকন, আর ছুটো।
………………………………………….
এর পরের কাহিনি আর পাঁচটা বাঙালির থেকে খুব একটা ভিন্ন কিছু নয়। একটু ভিন্নতা যেখানে, সেখানেও রাজনৈতিক পালা বদলের একটা ছাপ রয়েছে। রাজনৈতিক অবস্থার বদলে বাংলার বদল কোন কোন ক্ষেত্রে হলো বা হলো না সে জানতে কেউ এ কাহিনি পড়বেন না। তবে পালা বদলে এই উদ্বাস্তু পল্লীর মানুষ জন যে সবিশেষ উপকৃত হলো, সে বলার আর অপেক্ষা রাখে না। উদ্বাস্তু পল্লীর অধিকাংশ মানুষই তাদের এই দুঃখ দুর্দশার জন্যে কংগ্রেসকেই দায়ী করতেন। তার কারণ খানিকটা দেশ ভাগ আর খানিকটা এই সব ছেড়ে আসা মানুষগুলোর দুঃখ যন্ত্রণা। বঞ্চনা বোধ। তারা আসার পর থেকে দীর্ঘকাল যাবৎ পশ্চিমবাংলায়ও আসীন ছিলেন কংগ্রেস সরকার। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ভারতে আসা উদ্বাস্তু পুনর্বাসনে কেন্দ্রের যথেষ্ট তৎপরতা থাকলেও পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা এই বিপুল ঢেউ এর মত উদ্বাস্তুদের প্রতি বৈমাত্রেয় মনোভাব কলোনির সব মানুষই জানতেন। বিরোধীরা স্বাভাবিক ভাবেই তাই তাদের কাছের লোক হয়ে দাঁড়ান। পাশে দাঁড়ানোর সুবাদে ধীরে ধীরে উদ্বাস্তু পুনর্বাসন সংক্রান্ত বিভিন্ন গণ সংগঠনগুলিরও কর্তা ব্যক্তি হয়ে ওঠেন বিরোধীরা। ১৯৬৭ তে পশ্চিমবাংলায় তখন যুক্তফ্রন্ট সরকার, প্রথম কেন্দ্রের কাছে এ রাজ্যের উদ্বাস্তু পুনর্বাসনের জন্যে ২৫০কোটি টাকার অর্থ সাহায্যের দাবি পেশ হয়। আশা জাগে মানুষগুলোর মনে। ক্রমে বিরোধীদের ঘাঁটি হয়ে ওঠে এই সব কলোনিগুলি। আসলে এই উদ্বাস্তু কলোনিগুলোর পরতে পরতে লড়াইয়ের ইতিহাস। একেবারে স্থাপনের সময় থেকেই। ভিটেহারা মানুষগুলোর চাহিদা একটাই। শিকড়ের স্থায়ী মাটি। সেই স্থায়ী মাটির স্বাদ পেতে তাঁদের লেগে যায় প্রায় তিরিশ বছর। বামফ্রন্ট সরকার তখন ক্ষমতায়। ১৯৮৬ এর পর থেকে প্রায় ১৮৪৪ট উদ্বাস্তু কলোনির যে ২,৪৬,৫২৮টি দলিল বিলি হয়। নটবরদের নেহেরু পল্লী সেই ভাগ্যবানদের মধ্যে পড়ে। নেহেরু পল্লীর মোট চব্বিশ শো সাঁইত্রিশটি পরিবার তাদের বসত জমির সরকারি দলিল পায়।উদ্বাস্তু পুনর্বাসন মন্ত্রী তখন রাধিকা রঞ্জন ব্যানার্জী সাহেব। এ পাওয়া যে কত বড় পাওয়া, ভিটে শূন্য হয়ে এসে লড়ে পাওয়া ষোল আনার স্বীকৃতি যে কতখানি আনন্দের, সে দিন নেহেরু পল্লীর মানুষগুলোকে দেখলেই বোঝা যেত। রামচন্দ্র অকাল বোধন করেছিলেন জানা যায়। সেই থেকেই শারদোৎসব বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব। সেদিনও নেহেরু পল্লীতে যেন শারদোৎসবের সেই উচ্ছলতা আছড়ে পড়েছিল। একে অন্যের সাথে যেচে পড়ে কথা কইছিল। এ বাড়ি থেকে ও বাড়িতে শুঁটকির ঝাল, লইট্যার চচ্চড়ি, চিতলের মুইঠ্যা বাটিতে বাটিতে চালাচালি হচ্ছিল। বাড়িতে বাড়িতে হারমোনিয়ামের রব উঠছিল। পাড়ার মাঠে বড়দের সাথে যুবকদের প্রীতি ফুটবল ম্যাচ হচ্ছিল। আড্ডায় আড্ডায় বহুদিন বাদে পল্লী হয়ে উঠছিল যার যার নিজের দেশের বাড়ি। বাংলাদেশের, সুন্দরবনের, বাসন্তীর সব উদ্বাস্তুদের মিলনক্ষেত্র এই নেহেরুপল্লীর সে ছিল বাস্তু পাওয়ার দিন। যুবকের দল তো খোলা মাঠে ম্যারাপ বাঁশ আর নারকেল তক্তা দিয়ে বেঁধে ফেলল এক অস্থায়ী মঞ্চ। মন্ত্রীর নামে সে মঞ্চের নাম দিল রাধিকা মঞ্চ। নটবরের বাড়িতে সুমি পাতকোতলায় বাসন ধুতে ধুতে গান ধরেছিল। শিবানি কালো কড়াইয়ে শুকনো লঙ্কার ফোড়ন দিতে দিতে খ্যানখেনে গলায় সে গানে গলা মেলাচ্ছিল। খোকন দুই হাতে দুই জিলিপি নিয়ে এল পাড়ার জমায়েত থেকে। ভাইকে দিল একটা। রোজ যাদের ঝগড়ায় মোড়ের কুকুর জড়াজড়ি হার মেনে যায়, তারাও কিনা আজ গলা জড়িয়ে জিলিপি খাচ্ছে! গোটা পাড়ার মনে আনন্দ না আসলে কি আর এমনধারা চমৎকার হয়?তবে আনন্দ কি চিরস্থায়ী হয়? কীভাবেই বা হবে? কুমোরের চাকে ঘুরছে সুখ দুঃখ, বর্ষা শরৎ। কাজেই স্বত্বের মেজাজ মিইয়ে এলেই শুরু হয়ে গেল নৈমিত্তিক ঠোকাঠুকি। অন্তরে, অন্দরে, বাহিরে, বাহারে সর্বত্র ঠোকাঠুকি। এ এক অদ্ভুত সমাজ। কেউ কারও ভালো সহ্য করতে পারে না। কারো বাড়ির ছেলে চাকরি পেলে তার কেউ সুখ্যাতি করে না, বরং বাপ দাদা পিসতুতো মেসোর সাথে পার্টির সম্বন্ধ খোঁজে। কারো বাড়ি টি.ভি. এলে কর্তার চাকরিতে ঘুষ নয়তো ছেলের বিয়ের বর পণের প্রসঙ্গ ওঠে, কারো বাড়ির বৌ সুন্দরি হলে বিকেলের মেয়েলি আড্ডায় তাকে নিয়ে আসর বসে, তার চাল চলন চরিত্রের ছিদ্র খোঁজা হয়। বট অশথ কদমের তলায় বস্তা পেতে বসে তাসের আড্ডা। কখনও বা তিন তাসও চলে। ছেলে ছোকরারা পড়াশুনোর বদলে খিস্তি খেউর নেশাভাঙে অধিক আগ্রহী হয়। আদিরসের ফোয়ারা ছোটে আড্ডায়। অনায়াসে একে অন্যের মা, বোন নিয়ে মশকরা করে। মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে কখনও কখনও হাতাহাতি, লাঠালাঠি হয়। বলা বাহুল্য রাজনীতি এই বিশৃঙ্খলাকে কোথাও কোথাও প্রশ্রয় দেয়। পড়লেই যে জিজ্ঞেস করবে, ভালো মন্দ সাদা কালো চিনবে। তার থেকে পিছিয়ে থাকুক, বুঁদ হয়ে থাকুক সেই ভালো। কে যে ঠিক, কে যে মিত্র আর কে যে মিত্রবেশী শত্রু- হাজারো বিভ্রান্তির সে এক অদ্ভুত সময়!কোনো উদ্দেশ্য নেই যেন কারো! কোথাও যেন যাবার নেই। এই নেহেরু পল্লীই যেন পৃথিবীর সীমানা। তাই এই পল্লীর অধিকাংশ ছেলেরা এখানেই খেয়োখেয়ি করে। এখানেই তাদের প্রেম, এখানেই বিবাহ, এখানেই আন্ডা বাচ্চা পরিসমাপ্তি। বাইরের নবগঠিত ‘ভদ্র’ সমাজে নেহেরু পল্লীর নামে ভয়ানক সব কথা রটে। দাঙ্গাবাজ জায়গা। কোনো কিছু হলেই মারধোর ফাটাফাটি! এমন কি মেয়েরাও নাকি বটি কাটারি নিয়ে বেরিয়ে আসে! কাজেই পারত পক্ষে তারা এড়িয়েই চলে।আমাদের নটবর সাহার ছেলেরাও নেহেরু পল্লীর সেই ক্রাইসিস পিরিয়ডের ফসল। কাজেই যা হবার তাই হল। খোকন ডিঙোলো ক্লাস এইট আর তার পাঁচ বছরের ছোট ভাই ছোটো ডিঙোলো মাধ্যমিক। সুমি অবশ্য সেভেনের পর আর স্কুলে যেতে পারেনি। ঠাকুমার আশ্য পেয়েছিল, কাজেই একটু ডেভেলপড ফিগার! সেভেনে পড়তেই যাকে বলে ডাগর ডোগর হয়ে উঠেছিল। ফল স্বরূপ ভ্রমর গুঞ্জন শুরু হয়ে গেছিল। বাড়ির চারপাশে ঘুরঘুর করত সব ছেলেরা। নটবরের মা আর শিবানি চিল চিৎকার জুড়ত। কেউ ওতেই ভাগত, কেউ কেউ আবার সাইকেলের সিটে বসে এক ঠ্যাঙ নামিয়ে দু আঙুলে বিড়ি ধরে কেতা মেরে পোজ দিত। এদের জালায় নটবরের বাড়ির লোক আর পাতকো তলায় চান করতে পারত না! অন্য বাড়ির চাল থেকে, উঁচু গাছ থেকে জোড়া জোড়া শ্যেনচোখ হামলে পড়ত। এমনকী চানঘরেরর ইঁটের ফাঁকগুলোও তক্তা মেরে বুজিয়ে দিতে হল!একদিন নটবর গেছিল উম্মিদপুরে কাপড়ের কালেকশান নিতে। ফিরতে সন্ধ্যা রাত। সাইকেল চালিয়ে ফিরছিল মেইন রোড ধরেই। কী মনে হতে কেঁকড়াতলার পাশ থেকে শর্টকাট নিল। কেঁকড়াতলা নটবরের বাড়ি থেকে প্রায় দু কিলোমিটার তো হবেই। রাস্তাটা কাঁচা না হলেও এবড়োখেবড়ো। স্ট্রিট লাইটও মধ্যে মধ্যে নেই। কাজেই এলাকার ব্যস্ততম প্রেমগলি হিসেবে জোয়ান মহলে বেশ প্রসিদ্ধ।সে রাস্তায় নেমে নটবর একটা বিড়ি ধরাল। তারপর আপন মনে গুনগুন করে গাইতে গাইতে আস্তে আস্তে প্যাডেল ঘোরাল। রাস্তার বাঁকে বাঁকে কপোত কপোতির দল। বাচ্চা কাচ্চা থেকে বুড়োবুড়ি সবাই আছে। নটবর বেশ একটু মজাই পেল। ডানদিকে একটা গাছ থেকে তেলাকুচোর ঝাড় হামলে পড়েছে রাস্তায়। সেই ঝাড়টার নিচে দু’জন কী অসভ্যতাই না করছে! সাইকেল নিয়ে ওদের পাশ কাটিয়ে যাবার সময় কী মনে করে একবার তাকিয়েই চমকে উঠল নটবর! হাত থেকে খসে পড়ল বিড়ির জ্বলন্ত পোঁদা! নটবর চেঁচিয়ে উঠল, অই সুমি! প্রচণ্ড বিকর্ষণে দেহ দুটো পৃথক হতে চেষ্টা করলেও চুড়িদারের গলায় আটকে পড়ল ছোঁড়াটার হাত। ছোঁড়াটাকে বিলক্ষণ চেনে নটবর। ভালো বাড়ির ছেলে। কিন্তু কুসঙ্গে পড়ে উচ্ছন্নে গেছে। রাত দিন খেলার মাঠের পাশে বসে পাতা খায়। শেষে আর থাকতে পারলো না নটবর। সাইকেল ছিটকে ফেলে দৌড়ে এসে ছেলেটার গালে মারল গায়ের জোরে এক চড়। সে ছেলেও ফুঁসে উঠে এক ধাক্কায় নটবরকে ফেলে দিল মাটিতে, তারপর মুহূর্তে দৌড়ে অন্ধকারে দাঁড় করানো সাইকেলে উঠে পালালো। নটবর মাটি থেকে উঠে মেয়েকে পিছনে বসিয়ে যখন বাড়িতে নিয়ে এলো মেয়েটা তখনও থরথর করে কাঁপছে।ব্যস! যেহেতু পড়তে যাওয়ার নাম করে মেয়ের এই কাজ, কাজেই মেয়ের পড়াশুনোই গেল বন্ধ হয়ে। তাতে কী হয়? উঠতে বসতে ধমকি শুরু। বাচ্চা ছেলেদুটো খেলতে বেরোলেও তাদের ধরে ধমকি দেয়। রাত বিরেতে টালির চালে ধমাস ধমাস করে আধলা পড়ে! বুড়ি মা কেঁপে কেঁপে ওঠেন! পাড়ার ছেলেরা অভয় দেয়। মাঝে মাঝেই একে ওকে ধরে মার লাগায়। শনাক্তকরণের জন্যে ধরে বাড়িতে নিয়ে আসে। সে নিয়ে আবার ঝঞ্ঝাট হয়! সব মিলিয়ে যাকে বলে একেবারে যাচ্ছেতাই অবস্থা। কাজেই নটবরকে আবার সিদ্ধান্ত নিতে হল। উড়োচিঠি আর ঢিলের অত্যাচার থেকে বাড়ির লোককে সাহস দিতে নটবরের ফের ব্যবসা বদল হলো। কাপড়ের কাজ ছেড়ে নটবর শুরু করলো ছাপার কাজ। সেরামিকের জিনিসপত্র ছাপার কাজ। বাড়িতেই।এতে অবশ্য দুটো উপকার হলো। এক, সারাদিন বাড়িতে থাকায় অত্যাচারের বহর কমে এলো; দুই, সময় মত খাওয়াদাওয়ায় নটবরের স্বাস্থ্যও বেশ ভাল হলো। স্বাস্থ্য ভালো হলে মনও ভালো থাকে, কাজেও মন আসে। ফলে কাজ বেশ জব্বরই হতে থাকল নটবরের। মহাজন গাড়িতে করে, ভ্যানে করে মাল দিয়ে যায়। নটবর ছাপায়, ভাটিতে জ্বাল দেয়ার কাজে শিবানি, কখনও কখনও বড় ছেলে খোকন সাহায্য করে। বলা যায় এত দিনে বুঝি সুখের দিন আসে!নটবরেরর মাও বৃদ্ধা হয়েছেন। দাঁত পড়ে গেছে। কথা বলতে গাল খবল খবল করে। নাতিরা হাতের ঝুলে পড়া চামড়ায় দোল দেয়। ছোটটা বেশি বদ। ঝুলে পড়া থুতনি ধরে নেড়ে দিয়ে বলে, উফ! বুড়ি পুরো সুচিত্রা সেন!বুড়ি খাওয়ার পর ছেঁচা পান গালে দেয়, টুকুন দোক্তাপাতা খায়। আস্তে আস্তে নটবরের কাছে গিয়ে ভাটিঘরের দাওয়ায় বসে। ছেলেকে ডাকে। বলে, ও নটো! কী করস?কী করুম মা? জানো তো কী করি এহানে।বলি কি, সুমিটার বে দিয়া দে। দেহিস না, কত্ত বড়ডি হইছে। বাবারে, ভাঙা ঘরে চাঁদ উঠলি তো জোছনা বাইরে যাবই। মাইনষে তো জানবই। বলি কি, কথাহান শুন। ছেমড়িডার বিয়া দে।রোজ রোজ এই এক প্যানা শুনে শুনে শেষমেশ বিরক্ত হয়েই সুমির সম্বন্ধের খোঁজ শুরু করে নটবর। খোকনটা তখন সবে এইটে পড়ে আর ছোটো পড়ে থ্রিতে।খুঁজলে ভগবান মেলে আর পাত্র মিলবে না? সুপাত্র মিলে যায়। পাত্রের বাড়ি একটু হয় তো দূর, তবে বেশি দূরও নয়, ট্রেনে বড় জোর ঘন্টা দুয়েক। পাত্রের বাবা সম্পন্ন চাষি। বিঘে পঁচিশ জমির মালিক। পাঁচ বোনের একমাত্র ভাই। স্টেশান রোডে ইমিটেশানের বড় দোকান। চার দিদির বিয়ে হয়ে গেছে। বাকি একজনের নাকি দাঁত উঁচু আর রুগ্ন বলে বিয়ে হয়নি। ভারি অমায়িক লোক পাত্রের বাবা। নটবরের বন্ধু কেষ্টর মামাশ্বশুরের কীরকম আত্মীয়। এই কেষ্টর কথা যদি ফুরসত হয় বলা যাবে। অবশ্য না বললেই বা কী! এই কেষ্ট, নটবররা তো আর আহামরি কেউ নয়। না বিখ্যাত, না কুখ্যাত। না আছে এদের পুঁজিবাদ, না আছে সাম্যবাদ। এরা সমাজের মাথার চুল। জন্মায়, বড় হয়, কাটা পড়ে, ফের বড় হয়, পাকে আর একসময় ঝরে যায়। দিনে কটা চুল গজালো আর কটা ঝরলো সমাজ তার খুব একটা খবর কোনোদিনই রাখে না।যাই হোক, সুমিকে যেদিন পাত্রপক্ষ দেখতে এল, সাজিয়ে দিল পাশের বাড়ির মন্টার বউ। শিবানির বেনারসিতে সেজে উঠল সুমিরাণি। বুড়ি ঠাকুমা কাঁপা কাঁপা হাতে ট্রাঙ্ক খুলে একখানা সীতাহার পড়িয়ে দিল সুমির গলায়। বলল, দ্যাশ ছাইড়া আওনের কালে কীভাবে যে আনছিলাম গয়না কয়ডা সে আমিই জানি।কওনা ঠাম্মা! ও ঠাম্মা! কওনা কীভাবে আনলা?বুড়ি সুমির চাঁদমুখের চিবুক ধরে আদর করে বলেন, যা পাইতেছিল তাই  কাইড়া নিতাছিল। হায়রে হায়! বাচ্চার দুধ খাওনের বাটি অবদি ছাড়ে না!তবে তুমি কেমন করে আনলা?এই প্রশ্নের উত্তরে বুড়ি ইশারায় যে স্থান দেখাল আর যে কথা বলল তা আর লেখা যায় না। কেবল মন্টার বউ আর সুমি মুখ টিপে হাসতে হাসতে একে অন্যের গায়ে ঢলে পড়ল।
………………………………………….

সুমির পাত্রের নাম সুকুমার। বয়সটা সুমির তুলনায় একটু বেশিই। তবে রোজগার পাতি শোনা যায় বেশ ভালোই। কাজেই দাবি দাওয়াও বেশ ভালোই ছিল। নটবর সেই মত জোগাড়ও করেছিলেন সবকিছু কষ্টেসৃষ্টে। কিন্তু যতই নাটুকে শোনাক, এ বঙ্গে তখনও বৌমা বলতে মা লক্ষ্মী আগমনের উপায় বই আর কিছু অনেক পরিবারেই ছিল না। সুকুমারের পরিবারও তেমনই। নিজের তিন মেয়ে বিয়ে দিতে যে পরিমাণ খরচ হয়েছে তার সমতুল, পারলে তার চে’ খানিক বেশিই আদায় করতে চেয়েছিলেন সুকুমারের বাবা। নটবর তা বুঝতেও পারেনি। বুঝল যখন মেয়ে জামাই এল দ্বিরাগমনে। জামাইয়ের আড়ালে মেয়ের কাছে শ্বশুরবাড়ির কথা শুনে শিবানির চোখ ভরে এল। বিস্তারে আর অত্যাচারের প্রসঙ্গে গিয়ে কী হবে? সে তো আজও প্রায়দিনের খবরের কাগজে চার নইলে পাঁচপাতায় ছোট করে হলেও বেরোয়।
শ্বশুরবাড়ির দাবি এবারেও মেটাল বটে নটবর, তবে তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। সুমি তার বড় আদরের। সুমির মায়ের কাছে জামাইয়ের বর্বরতার যে বিবরণ নটবর পেয়েছে, তাতে আর মেয়েকে পাঠানোরই ইচ্ছে ছিল না। কেবল শিবানির কথায় মজুমদারকাকার কাছ থেকে পঞ্চান্ন হাজার টাকা ধার নিয়ে জামাইয়ের হাতে তুলে দিয়ে বলেছে, বাবা! মেয়ে কিন্তু আমার বড় আদরের। দেখে রেখ।
এখন যেমন হাতে হাতে মোবাইল, চাইলেই মুহূর্তে সানফ্রান্সিসকো আর সন্ন্যাসীপাড়া মুখোমুখি, আজ থেকে বছর কুড়ি আগেও তেমন ছিল না। অন্তত নেহেরু পল্লীতে তো নয়ই। নটবরদের পাড়ায় একটি মাত্র টেলিফোন। সমরেশদের বাড়ি। এই উদ্বাস্তু কলোনীর অধিকাংশ ছেলে পড়াশুনো বেশিদূর না করলেও কেউ কেউ অনেকদূরই গেছে। যারা গেছে তারা সমাজের বিভিন্ন জায়গায় সুপ্রতিষ্ঠিত এরই মধ্যে। সমরেশের ছেলেটা যেমন। অবশ্য সমরেশদের অবস্থা আগাগোড়াই ভালো। তাছাড়া ছেলেটারও লেখাপড়ায় দারুণ মাথা। এইটুকু ছেলে, এরই মধ্যে প্রসারভারতীর ইঞ্জিনিয়ার! সমরেশ নটবরের বন্ধু না হলেও বয়স্য বটে। তাই মাঝে মধ্যে ফোন টোন এলে ডেকেডুকে দেয়। আর ফোন তো আসে কালেভদ্রে। কেই বা করবে? শিবানির মামারা  বছরে এক আধবার করেন আর করে নটবরের মহাজন। তাও খুব প্রয়োজন না হলে করেন না।
সেদিন যখন ফোনটা এল, তখন সন্ধ্যে সন্ধ্যে। আকাশের কোণে শ্লেটের রঙের মেঘ জমেছে। সমরেশের বাড়ির মেয়েটা এসে ডাক দিল, ও নটজেঠু! তোমাগো ফোন!
বাড়িতে জামাই এলে যেমন হুড়োহুড়ি পড়ে, ফোন এলেও নটবরের তেমনি হত। ভাটিঘরের দরজাটা খোলা রেখেই দৌড়োলো। শিবানি পিছন পিছন চ্যাঁচাল, কী গো! গায়ে জামাটা দাও!
টেবিলে কাত করে রাখা রিসিভারটা কানে নিয়ে সেই যে জোরে হ্যালো বলল নটবর, তারপর মিনিটখানেক ফোন ধরে থাকলেও আর রব করলো না! কেবল চোখ থেকে টস টস করে দুফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল লাল রঙের মেঝেয়।
সমরেশের বউ আঁচলটা মুখে টেনে ধরাগলায় জিজ্ঞেস করল, ও ঠাকুরপো! কী হয়েছে! কী হয়েছে!
বুক ফাটা চিৎকার করে ধপ করে বসে পড়ল নটবর, সুমিরেএএএ!
সমরেশের ছেলে আর তার বন্ধু যখন ধরাধরি করে বাড়ি নিয়ে এল নটবরকে, ততক্ষণে শিবানি মূর্ছা গেছেন। বৃদ্ধা মা ইনিয়ে বিনিয়ে বিলাপ করে চলেছেন। আর খোকন রাগে এঘর ওঘর ছুটোছুটি করছে। বাবাকে দেখেই বলল, বাবা! দিদিরে কোথায় রাখছে?
হাসপাতালে।
কুন হাসপাতাল?
বনমালিপুর।
আর কথা শোনেনি খোকন। হতে পারে ক্লাস এইট ফেল, তবে সে কেবল ইশকুলের পড়ায়। বাইরে তার ব্যবহারের সুবাদে বন্ধু তার অসংখ্য। আর তাছাড়া জায়গাটা নেহেরু পল্লী। এক ডাকে তার জনা বিশেক খাড়া হয়ে গেল।
পাড়ার আর পাঁচজন গণ্যমান্যের সাথে নটবর যখন দু ঘন্টা ট্রেন ঠেঙিয়ে রাত দশটায় বনমালিপুর হাসপাতালে পৌঁছোলো, ততক্ষণে তার অর্ধদগ্ধ কন্যার পাশের ওয়ার্ডেই হাত পা ভাঙা জামাইও ভর্তি! পরদিন সকালে বাড়ি ফিরে খোকনকে জড়িয়ে ধরে হাঁউমাউ করে কেঁদেছিল নটবর! বিলাপের মত চিৎকার করে বলেছিল, খোকনরে! মারলিই যদি, ছ্যাড়াডারে মাইরা ফ্যলাইলি না ক্যান?
সুমি মরে নি! শাশুড়ির দেয়া আগুনের চিহ্ন বুকে পিঠে আর বাম হাতে বহন করে বাড়ি ফিরে এসেছে। তিনমাস সে হাসপাতালে ছিল। একদিনও তার শ্বশুরবাড়ির কেউ আসেনি। অবশ্য আসার কথাও নয়! নটবরের অভিযোগে জামাই আর শাশুড়ির বছরখানেক কেস চলার বাদে সাড়ে তিন বছরের জেল হয়েছে। যাই হোক, মেয়ে নটবরের কাছেই থাকে। শিবানির সাথে সাহায্য করে। বিকেল হলে উদাস হয়ে বসে থাকে। শিবানি কত বলে, তবু ঘরের বাইরে বেরোয় না।
খোকন এখন বাবার সাথেই কাম কাজ করে। বড়ও হয়েছে। তাগড়া জোয়ান। হাতে পায়ে জব্বর জোর। শোনা যায় পার্টিও নাকি করে। নটবর একদিন দেখেওছে মিছিলে। কিছু বলেনি। বলবেই বা কেন? ছেলে বড় হয়েছে। তার জীবন সে যেমনি চালাতে চায় চালাক। বাবা যে পার্টিরে সাপোর্ট করেছে তাকেই ছেলেরও করতে হবে এমন ভাবনা নটবরের না। তাছাড়া নটবর আর এই নেহেরুপল্লীর আর সবাই যখন সেই দলটাকে সাপোর্ট করেছিল তখন তার দরকার ছিল। সেই দল তখন নটবরদের কথা বলছিল। জমির পাট্টা দেয়ার কথা বলছিল। সেদিনের নটবর আর এদিনের নটবরের যেমন বিস্তর ফারাক, তেমনই ফারাক আর সবার জীবনেও। উদ্বাস্তু পল্লীর প্রত্যেকটা বাড়িই এখন প্রায় স্বচ্ছল। প্রায় প্রতি ঘরেই দুজন তিনজন রোজগেরে। কারও কারও বাড়িতে দোতলা উঠেছে। আর তাছাড়া সে দলটারও যারা নেতা, তাদেরও আচার আচরণের ঔদ্ধত্য উর্দ্বমুখী। আর নিতে পারছিল না অনেকেই! কাজেই সব মিলিয়েই ফের বিরোধী একটা হাওয়া চলছিল গোটা রাজ্যে। উঠতি বয়সের খোকন যে সে হাওয়ায় মিলে যাচ্ছে সে দেখেও নটবর কিছুই বলেনি। মনে হয়েছিল, সেও যেমন বাপদাদার ভিটায় থাকতে পারেনি, শিকড় তুলে উঠে আসতে হয়েছে, তেমনি তার ছেলেও বাপের মত আঁকড়ে থাকছে না, শিকড় তুলে অন্যত্র বাসা বাঁধছে। তবে তফাত তো আছেই। নটবর ভিটা ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল, আর খোকন নিজের ইচ্ছায়। যাই হোক, ছেলে বড় হলে তারে সব কাজে বাধা দিতে নেই। কাজেই নটবর খোকনকে সরাসরি কিছুই বলেনি। কেবল একসাথে টালিতে আলকাতরা ভেজা পিচ্চট জড়াতে জড়াতে বলেছিল, দেখিস খুকন! রাজনীতিটিতিতে বেশি কইলে জড়াইয়া পড়িস না। আমরা কইলে ছাপোষা মানুষ!ছাপোষা মানুষেরও একটা দিন বড় গুরুত্ব থাকে। সে হলো ভোটের দিন। ভোটের আগে থেকে বাড়িতে বাড়িতে নেতাদের আনাগোনা বাড়ে। যেহেতু খোকন এখন অন্য শিবিরের বেশ সক্রিয় কর্মী, কাজেই সব পক্ষের আনাগোনাই বাড়ে। প্রার্থী নিজে ঘরে ঢুকে চা খান, জল খান। এক দল এসে বলে, নটদা! এবারেও বাড়ির চারটে ভোটই যেন পাই। নটবর কাঁধের গামছায় হাত মুছতে মুছতে বলে, নিশ্চয়ই। উঠতি দলের মানুষেরা এসে বলে, নটদা, খোকন তো আমাদের লগেই আছে। ভোটগুলা বুইঝা দিয়ো! নটবর মুখে হাসি টেনে বলে, নিশ্চয়ই! রাতের অন্ধকার গাঢ় হলে কাঁধে ঝোলা নিয়ে দু জন আসে। নটবরকে ডেকে বলে, এবারও আমরা প্রার্থী দিয়েছি কমরেড। নটবর বলে, প্রার্থী দিলা তো দিলাই। ভোট তো পাউও না, পাইবার চ্যাষ্টাও করো না। সারা বছর তো দেখতিই পাই না তোমাগো! যাই হউক, খাড়াও! চান্দা দেই, লইয়া যাউ গা।ভোটের দিন এবার দুটো অটো পাড়ায় ঘুরছে। যত বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের বুথে নিয়ে যাওয়ার জন্য। নটবর মারে কোনো অটোতেই তুলল না। সাইকেলের পিছনে বসিয়ে নিয়ে গেল বুথে। বুথের বাইরে খোকনদের দলটা ঘুরঘুর করে। পুলিসে টহল দেয়। মাঝে মধ্যে ধেয়ে যায়। পোলাগুলা দৌড় মারে যে যেদিকে পারে! সেই দেখে বাড়ি এসেই নটবরের মা কেমন হাঁসফাঁস করে! বলে, ও নটো! বুকটা এত ধড়ফড় করে ক্যানরে বাপ? নটবর বলে, ফ্যানের তলায় বহো। জল খাও।কথায় বলে, অভিজ্ঞতা হল সবচেয়ে দামি! হলোও তাই! বেলা গড়ানোর সাথে সাথে গলি দিয়ে ছুটোছুটি বাড়ল। তারপর শুরু হল দমাদ্দম বোমাবাজি! একটা করে বোম পড়ে আর নটবরের মা চমকে চমকে ওঠে! শিবানি আর সুমি বাইরের গ্রিল ধরে ঠায় রাস্তার দিকে তাকিয়ে। বেলা দুটো নাগাদ চার পঁচটা ছেলে মিলে নটবরের বাড়িতে যাকে দিয়ে গেল, কেবল হাতের বালাটা দেখে তাকে খোকন বলে চেনা যায়। গায়ের সাদা জামা ধুলো রক্ত মাখা। প্যান্টও তাই। মাথায় বড় ব্যন্ডেজ উপচে রক্ত এসে লাল! আর মুখের জায়গায় জায়গায় কালসিটে!তবে ক্ষতি হওয়ার আরো কিছু বাকি ছিল। নাতির ওই অবস্থা দেখে বৃদ্ধা ঠাকুমা সেই যে নটো বলে ডাক দিয়ে শক্ত হলেন, হাজার মালিশেও আর নরম হলেন না! দেবনাথ ডাক্তাররে কল দিল ছোট। তিনি বাড়ি এসে দেখলেন। সব শেষ! বাড়িময় বিলাপের মাঝে খোকন গোঙাতে গোঙাতে বলে উঠল, শালারগুলো! তোদের যদি রাজ্যছাড়া না করতে পারি তো আমি বাপের ব্যাটা না! আর বাপ? বাপ নটবর তখন মায়ের ট্রাঙ্ক খুলে উথালি পাথালি করে বার করছে একখানা আফগান স্নোয়ের কৌটা! সেই কৌটায় আছে সাত রাজার ধন মানিক- দ্যশের বাড়ির মাটি! মাটিটুকুন নিয়ে মায়ের আঁচলে বাঁধতে বাঁধতে চিৎকার করে নটবর আছড়ে পড়ল মায়ে বুকে! মাগো! মা! ও মা!
……………………………………………….
চিরদিন কাহারও সমান নাহি যায়! মাকে দাহ করে আসতে আসতে সেই লড়াই করে জমি দখলের দিনগুলো মনে পড়ছিল নটবরের। কখনও বাঘিনীর মতন, কখনও সন্তানের মতন জমি আগলে ছিলেন মা। কতজন এসেছে, কত লোভ, কত ভয়- মা পিছু হাঁটেননি। ছেলে মেয়েকে নিয়ে তেরপল টানিয়ে থেকেছেন। তারপর কোনোমতে ছাপরা, তারপর কত চড়াই উৎরাই! সবখানে মা এসে পাশটায় দাঁড়িয়েছেন। আজ মা নাই! ছাই হয়ে ভেসে গেছেন গঙ্গায়! যে মা মুখে নিজে না খেয়ে খাবার তুলে দিয়েছেন মুখে , তারই মুখে আজ আগুন দিতে হয়েছে নটবরকে! ও হো হো! ভাবতেই হু হু করে জল চলে আসে নটবরের চোখে!
শিবানি এসে পাশে দাঁড়ায়। কী হইছে? এমনডাই তো হওয়ার কথা। তাও তো তুমার মা ভালো মানুষ ছিলেন বইলা ভুগেন নাই। ভাবো তো যদি বুচুনির মাডার মত ভুইগতো! এই তুমিই হয়তো একদিন অকথা শুনাইয়া দিতা! তার চে এই তো ভালো গ্যালেন! এমন হাতে রথে ক’জনায় যাইতে পারে গো?
কথাটা তো সত্যিই।
এমন আরো বহু ‘সত্যি’ কথা ক্রমশঃ মলমের মত এসে এসে নটবরকে ফের স্বাভাবিক করে তুলল। দিন দশেক পরেই দেখা গেল নটবর বেশ স্বাভাবিক ভাবেই কাক খাইয়ে মালসায় রান্না করে খেয়ে ভাটিঘরে কাজ করছে। এই তো ছন্দ। এই ছন্দেরই নাম তো জীবন।
সুমির কথা অনেক্ষণ বলা হয়নি। সেই যে স্বামীর ঘর থেকে হাসপাতাল ঘুরে বাপের বাড়ি এলো, তারও তো প্রায় বছর দশেক পার হয়ে গেছে। এর মাঝে একবার বছর পাঁচেক আগে তার নামে রেজিস্ট্রি চিঠি এসেছে। সুকুমারের। ডিভোর্স চেয়েছে সুকুমার জেল থেকে ছাড়া পেয়েই। বাড়িতে আলোচনা করে রাজিও হয়ে গেছে সুমি। ফলস্বরূপ লাখ দুয়েক টাকা আর বিবাহ বন্ধন মুক্ত হওয়ার কাগজ এসে পৌঁছেছে তার কাছে। পাড়ার দু একজন কাকিমা মায়ের কাছে দু একবার ফের বিয়ে দেয়ার কথা বলেছে বটে তবে মা বাবা সে নিয়ে বিশেষ আগ্রহ দেখান নি। সুমির টাকা থেকে কিছুটা বাবার ব্যবসায় লেগেছে। বাকিটা ওর নামেই ব্যাঙ্কে।
যে ছেলের সাথে বাবা তাকে দেখেছিলেন, সে ছেলেটার কথা এখনও মাঝে মাঝে মনে পড়ে সুমির। সুমির বিয়ে হয়ে যাওয়ার পরে সেই ছেলেও নাকি বদলে যায়! ডিপ্রেশানের লক্ষণ সুস্পষ্ট হয়। একবার তো বিষও খায়। তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ায় মরেনি বটে, তবে খুঁতো হয়ে রয়েছে। সেদ্ধ ছাড়া আর কিছু খেতে পারে না। এ সব কিছুই সুমি জেনেছে ছোটর কাছ থেকে। ওই ছেলেটার ভাই আবার ছোটর সহপাঠী। অবশ্য সেই ছেলে এখন নাকি অনেক শুধরেছে। নেশা ভাঙও করে না! কলেজস্ট্রিটে একটা ছোট বইয়ের দোকান করে। তবে বিয়ে আর করেনি। সুমি শুনেছে, তার জন্যেই আজও বিয়ে করেনি প্রশান্ত।
ছোট এখন সকালে পেপার দেয়। বিকেলে বাজারে মুদি দোকানে কাজ করে। দুপুরটায় বাবার কাজে সাহায্য করে। ছোটটা খোকনের তুলনায় চৌখস। অন্তত নটবরের তো তাই লাগে। দাদার মত রাজনীতি করে না বটে, তবে রাজনীতিকে কেমন কাজে লাগায়! মানে এই ধর পার্টির ব্যানারটা দিয়ে কেমন সুন্দর ভাটিঘরের টালির উপর এক্সট্রা কভার বানায়! অথবা হোর্ডিং এর কাঠ কুঠ দিয়ে কেমন পাখির খোপ তৈরি করে ফেলে! কেমন করিৎকর্মা! যাই হোক, এই ছোটই সুমির কাছে প্রশান্তর খবরাখবর এনে দেয়। প্রশান্তও মাঝে মধ্যেই এ জন্যে ছোটকে রোল টোল খাওয়ায়।
মা গত হওয়ার সাত আট মাস বাদে প্রশান্ত আর তার বাবা এক সন্ধ্যায় নটবরদের বাড়িতে এসে প্রস্তাবটা দেয়। নটবরও কি আর সে নটবর আছে! কাজেই মুহূর্তেই আগের অবস্থান থেকে একশো আশি ডিগ্রি সরে এসে এক কথায় রাজি হয়ে যায়! ঠিকই তো, কী হবে পুরোনো ভাবনা চিন্তা মাথায় পুষে রেখে! জোয়ান বয়সে অমন দু একটা খারাপ কাজ বেমক্কা অনেকেই করে ফেলে! প্রশান্তর হাতের ঠেলায় ধুলো চাটার অপমানটাও বেমালুম হজম করে ফেলে নটবর। যখন মেয়ে রাজি, এতদিন অপেক্ষা করে সেই ছেলে রাজি, তো নটবর বা কোন হরিদাস যে অরাজি হবে! কাজেই বাধা বলতে রইল কেবল কাল অশুচ। ফলত মায়ের বার্ষিকী সারার দু মাসের মধ্যে সুমির রেজিস্ট্রি ম্যারেজ কম্পলিট! বিসমিল্লার ক্যাসেট আর বাজেনা বটে এবার, তবু  বাপের বুকটা ফের খালি হয়ে যায়। ঘর খালি করে ফের সুমি চলে শ্বশুর বাড়ি। শিবানি জোড় হাত কপালে তুলে অস্ফুটে উচ্চারণ করে, মা, মাগো! রক্ষে কোরো!
আর পাঁচটা সংসারে যা হয়, নটবরের সংসারেও তার ব্যত্যয় কিছু হল না। অমন রাম ঠ্যাঙান খাওয়ার পর থেকে নটবরের বড় ছেলে অনেকটাই ঘরমুখী হলো। মিটিং মিছিল তেমন হয়ও না। হলেও যায় না। কাম কাজ করে সারা দিন। দুইজনায় খাটায় ব্যবসাও বাড়ে। একসাথে কাজ করায় নটবর বেশ বুঝতে পারে, খোকন তার একটু স্বাধীনচেতা। কাজেই একসময় খোকনেরও আলাদা একটা ব্যবসা হয়। বাড়িতেই। ছোটটাও ভালোই কাজ কাম করে। কাজেই এইবার বাড়িতে একটু ‘বিলাসিতা’ আসে। টি.ভি. আসে, ট্যাপের জল আসে। গ্যাসের সিলিন্ডার আসে। ঘর সংস্কার করতে মিস্ত্রী আসে। তারপর স্বাভাবিক নিয়মে আসেন গৃহ লক্ষ্মী বড় বউ। বউভাতে নটবর পাড়ার ক্লাবে ম্যারাপ বেঁধে পল্লীর সব্বাইকে পেট ভরে খাওয়ায়।
বৌমা দেখতে শুনতে সুন্দর। বেশি রাও নাই। তবু এতদিন ধরে বহমান ছন্দের তো অন্যথা হবার জো নেই। কাজেই শাশুড়ি মায়ের সাথে খোটাখুটি লাগে। তিন দশক পর শিবানির ক্যানকেনি আওয়াজে আর ভাষায় আশপাশের বাড়ির দরজায় জানলায় ভিড় জমে। নটবর ফের অবাক হয়। মায়ের আচরণগুলো মনে পড়ে যায়! এ এক অদ্ভুত পুনরাবৃত্তি! অতীতের পীড়িতা বর্তমানকে পীড়িত করে যেন তার অতীতের পীড়নে মলম লাগান!
বৌমা তেমন রা কাড়েনা বলে রক্ষা। নইলে নিত্যিদিনের ঝগড়া ফের এ বাড়ির দোসর হত! বেশ ভালো রকমই হতো কারণ খোকন নটবরের মত নয়। গোলমাল দেখলে জব করে প্রথম থেকেই। বউ কিছু না বললেও বউ এর পক্ষে সেই দু চারটে কথা বলে। নটবরের মা যেমন করে তারস্বরে বিলাপ করতেন ছেলে বউ এর আঁচলে চলে যাচ্ছে বলে, শিবানি তেমন করেই চেঁচান। খোকনও সমানে চেঁচায়। মুখ খারাপ করে। মা পোর ঝগড়া অসহ্য হয়ে উঠলে ভাটিঘর থেকে নটবর চেঁচিয়ে উঠে দু পক্ষকে ধমকায়। তাতে কখনও কাজ হয়। কখনও শিবানির চিৎকার বেড়ে ওঠে।
পরিবর্তনই যখন প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম কাজেই পরিবর্তনের দিনকাল এগোতেই থাকে। ফলভারে ন্যুব্জগাছের দিন এগিয়ে আসে নটবরের। বয়ঃবৃদ্ধির স্বাভাবিক ছন্দে নটবর মিষ্টি হয়ে ওঠেন। রক্তে শর্করার মাত্রা প্রয়োজনের তুলনায় অনেকটাই বাড়তি আর কী! এ সবেরই মাঝে নিম্নচাপের বাদলাবেলায় হঠাৎ রোদ্দুরের মত আনন্দের ঝলক আসে! খোকনের খোকা আসে। নাতির টলমল টলমল চলনে নটবর সাহার মুখের হাসি চওড়া হয়। শিবানিরও কাজ বাড়ে।
ক্রমে ছেলে মানুষের পদ্ধতি নিয়ে শাউড়ি বউয়ের গলা চড়ে। অশান্তির তীব্রতায় নাতির পিঠে ভাদ্রমাসের তাল পড়লে নটবরও তারস্বরে ধমকায়। এরই মধ্যে আবার ছোটোর বউ আসে বাড়িতে। আসে মানে আপনিই আসে। একদিক থেকে অবশ্য ভালোই, বৌভাত তো বৌভাত, নটবর-শিবানিকে পাত্রী খোঁজার দায়টুকুও নিতে হয় না! মৌরিগাছার মেয়ে নমিতার সাথে ছোটোর প্রেমের পরিণতিতে এক সন্ধ্যায় নমিতা ঘোমটা দিয়ে এসে ওঠে। সিঁথিজোড়া তার কালী মন্দিরের আশীর্বাদী সিঁদুর।
প্রেমের পরিণতি বিবাহে এসে ঠেকলে স্বাভাবিক পারিবারিক ঝাঁকুনিতে বহু ক্ষেত্রেই  দেয়ালে চিড় ধরে। আর নেহেরু পল্লীর নটবরের পরিবারের সে ঝাঁকুনি তো রিখটার স্কেলের সাত দশমিক তিন মাত্রার! কাজেই প্রায় সব দেয়ালগুলোয় ফাটল ধরে যায়। ভাইয়ে ভাইয়ে, বউয়ে বউয়ে, শাউড়ি বউয়ে কলকলানি তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। চূড়ান্ত ঝাঁকুনিতে একদিন ভাত ভিন্ন হয়। খোকন আলাদা হয়। আলাদা মানে সবেতেই আলাদা। ব্যবসায় আলাদা, কাজে আলাদা, হাঁড়িতেও আলাদা! ছোট অন্য কাজ ছেড়ে বাবার ব্যবসায় ঢোকে। তবে এ শান্তিচুক্তি সাময়িক! লাইন অফ কন্ট্রোল, বর্ডার অফ পার্টিশান নিয়ে দু পক্ষের, বলা বাহুল্য শিবানিকে নিয়ে তিন পক্ষের ক্রমাগত অগ্নিবর্ষণে নটবর একেবারে জেরবার হয়ে যায়!
এদিকে রাজ্যেও পরিবর্তন ঘনিয়ে আসে। সে কেবল রাজনৈতিক যে তা কিন্তু নয়, চাহিদার পরিবর্তনও খুব জলদি ঘটে যায়। বলা হয়নি, অবশ্য বলাটা খুব জরুরিও ছিল কিনা কে জানে, নেহেরু পল্লীর প্রায় সব ঘরেই টি.ভি. নামক বাক্সটির আমদানি হয়ে গেছিল প্রায় বছর কুড়ি বাইশ আগেই। নটবরের মা তখন বেঁচে। রোববার করে মহাভারত দেখতেন। তারপর অবশ্য কেবল চ্যানেলের রবদবা আর ডেইলি সোপের উত্থান পিরিয়ড। আগে সন্ধ্যেবেলায় যেখানে নেহেরু পল্লীর বাড়িতে বাড়িতে হারমোনিয়াম পাড়া হত, গলি দিয়ে হেঁটে গেলে প্রায় দু বাড়ি ছাড়া ছাড়া রবীন্দ্র সঙ্গীত নয়তো নজরুলের সুর, নতুবা নিদেন পক্ষে আধুনিক গানের কলি ভেসে আসতো, কেবল আসার বছর ঘুরতে না ঘুরতেই সেখানে ডেইলি সোপের সুর ভাসে! এইসব সোপওয়ালাদেরও চরম এলেম! রীতিমত মার্কেট সার্ভে করে জনগণের খাওয়ার মত বিষয়ই উপস্থাপন করেন। কাজেই জনগণেশ একাত্ম হয়ে হাঁ করে গেলেন। ক্রমে তাদের মধ্যে চারিত হতে থাকে পর্দার ওপারের তিন রঙা দেয়াল, রান্নাঘরে ‘পিলাস্টিক পেইন্ট’, হাতের বালা, লিকুইড সিন্দুর, জামার কেতা, একপাটের আঁচল, দুমদুমানি মোটর বাইক! অলক্ষ্যেই বদলাতে থাকে মন।
এই নেহেরু পল্লী জ্বলন্ত বিপ্লবের সময় দেখেছে। সে বিপ্লবের অর্থ বুঝেছে খানিক হলেও। কিন্তু মোবাইল নামের যে বিপ্লব ঘনিয়ে এসেছিল এর পর, নটবরের মত ছানা পোষা মানুষগুলোর সামর্থ্য কোথায় সে বিপ্লব বোঝবার! হস্তে হস্তে মোবাইল! বুকপকেট থেকে মোবাইল মালা গলে দুলছে! এই মোবাইলের উপর আবার মা ষষ্ঠীর স্পেশাল কৃপা! জেনারেশান  চেঞ্জ হতে বছরও লাগে না! এই থেকে ওই, ওই থেকে সেই। ফিচারে ফিচারে ছয়লাপ! ছ্যাড়া বুড়া হক্কলেরই গলে দোলে গুঞ্জামালা! হেয়াতেই কত গান, হেয়াতেই নিবেদিত প্রাণ! মহাজনের টাকা ভাঙিয়ে যেদিন ছোট ইয়া চওড়া এক মোবাইল নিল, নটবরের সাথে তার এই লাগে তো সেই লাগে। সেই স্ফুলিঙ্গ স্বভাবতই ছড়িয়ে পড়ল জতুগৃহের ভাঁড়ার ঘরে। বাপের ব্যবসা মানে তাতে তো খোকনেরও বলার অধিকার! কাজে কাজেই গোলা বর্ষণ! সাইক্লোন! টর্নেডো, টাইফুন! টাইফুনের ধ্বংস বেগে সেই দিনই মাস্তুল ভাঙল নটবরের নৌকার। ছেলে বউ এর হাত ধরে অন্যত্র চলে গেল বড় ছেলে খোকন।
দিনের শেষে ভাটি ঘরের ইঁট বিছানো পৈঠায় পা ছড়িয়ে উদোম গায়ে বসে রইলেন বৃদ্ধ নটবর সাহা। পিছনে তিনটে ইলেকট্রিকের ভাটিতে সাড়ে তিন হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াসে শুকোচ্ছে সেরামিকের রঙ। আর নটবর চেয়ে দেখছে, তার মন থেকে রঙগুলো কেমন উবে যাচ্ছে এক এক করে। রঙ উবাতে কতটা তাপ লাগে? কতটা তপ্ত হতে পারে নটবরের মন, সুজন পাঠক?
………………………………………………….
খোকন খোকন করে মায়।খোকন থাকে কোন পাড়ায়?কী বান রান্ধে, কী বান খায়!খোকনরে তুই ঘরে আয়!ঘরে আবার আসবে কী! খোকন তো ঘরেই! রাজনীতি করা ছেলে বস! অত কাঁচা না! পুরো হঠে গেলে বাড়ির বখরাটা কোথায় যাবে? তাছাড়া নতুন জায়গায় থাকায় খানিক হলেও লাভ! কিন্তু নতুন জায়গায় ব্যবসা পাতার একটা এস্ট্যাব্লিশমেন্ট কস্ট আছে না! কাজেই খোকন আমাদের কেবল রেসিডেন্সিয়াল অ্যাড্রেসের টেম্পোরারি লোকেশান বদলায়। কাজকামের জায়গা সেই বাড়িতেই থাকে। নটবরের শরীরও ক্রমশঃ নড়বড়। এই চোখে চালশে তো এই দাঁতের গোড়া নড়বড়! গায়েও আগের মত তাকত নাই। মিষ্টতা ছাড়াও আরও নানান অসুখ আত্মীয় স্বজনের মত বাসা বেঁধেছে শরীরে। কাজ মূলত তাই ছোটই করে। নটবর এট্টু আধটু দেখাশোনা করে।দিন কেটে যায়। যায় আর কোথায়? আদতে পুরোনো দিন কালচক্র মেনে ফিরে ফিরে আসে। ফিরে আসলেও যখন আসে তখন পারিপার্শ্বিক পোশাক বদলে যায়। এই যেমন নেহেরু পল্লী ক্রমশঃ তার পোশাক বদলাচ্ছে। এই বদলের শুরু অবশ্য এ অঞ্চলে ঠিক ভাবে বললে আজ থেকে প্রায় বছর বারো আগে। মিত্তিরদের বাড়ি ভেঙে প্রথম এই ক্ষয়ের শুরু হয়। অবশ্য মিত্তিররা কেউ বাড়িতে থাকত না। সবাই বাইরে বাইরে চাকরি করে। তাছাড়া কোলকাতায়ও পাকা ঠিকানা আছে। কাজেই অদরকারি বিষয় আশয় বেচে দিয়ে বুদ্ধিমানের কাজই ওরা করেছে। এমনটাই বলছিল তখন পল্লীর লোকজন।তারপর অবশ্য অনেক জল বয়ে গেছে। জমি নিয়ে জোরালো আন্দোলনের জেরে টালমাটাল হতে শুরু করেছে রাজ্য। শুধু জমিই বা কেন, পাহাড়ে জঙ্গলে সর্বত্র অশান্তি! ছোটো চাদরে গাত্র ঢাকার ব্যর্থ প্রয়াস! মুড়ি দিলে পা আলগা, আর পা ঢাকলে বুক উদলা! ক্ষমতার অলিন্দে কখন চরিত্র বদলে গেছে ক্ষমতাশালী দল বোধ হয় তা খেয়ালও করেনি। দলের ভিতরে, বাইরে, রাজ্যের সর্বত্রকেমন যেন এক সুসংহত বিশৃঙ্খলা! অবশ্য স্বতঃস্ফূর্ততার খুব স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য বিশৃঙ্খলা। যেখানেই ক্যাওসনেস বেশি, সে কাজটি চোখ কান বুজে স্বতঃস্ফূর্ত। স্বতঃস্ফূর্ততা আর মতানৈক্যের জেরে জেরবার এক অবস্থা তখন রাজ্যের। চায়ের দোকানে, বাড়িতে বাড়িতে, টিভিতে টিভিতে কেবল তারই আলোচনা। মাথা টালমাটাল হলে অবশ্য অনেক কিছুই টলে যায়। আর চাহিদার লগফেজে নেহেরুপল্লীর দিকে চোখ পড়ে অনেক পুরু ট্যাঁকওয়ালা মানুষের। এ যেন মায়ান সভ্যতার লুকোনো রত্নাগার। লোকের চোখের সামনে অথচ আড়ালে লুকিয়ে থাকা সম্পদ!এতক্ষণ বলা হয়নি, এ বার বলি- উদ্বাস্তু পল্লী হলেও নেহেরু পল্লীর কানেক্টিভিটি কিন্তু মারাত্মক। রেলস্টেশান হাঁটাপথে খুব বেশি হলে পাঁচ মিনিট। উঁচু জায়গা।‘কইলকাত্তা’ কানের পাশে। ‘ম্যাট্রো র্যারল’ নাকের ডগায়! এতবছর বসত থাকায় স্বাভাবিক স্কুল, বাজার, ডাক্তার সব কিছু হাতের নাগালেই। ব্যস! বলো পাব্লিক, শান্তির নীড় বসাতে হলে আর কী চাই!কাজেই নেহেরু পল্লীতে এখন প্রায়ই ‘তেনা’দের আনাগোনা। পূজোয় ‘তেনারা’ মোটা চাঁদা দেন। বর্ষার দিনে বাছাই করা মাথার ঘরে জোড়া হিলসা নজরানা দ্যান। মাঝে মধ্যেই আবগারি ওয়েদার তৈরি করে নবীন প্রজন্মের লেগে তরলের ফোয়ারা ছোটান। গাম্বাট বক্সে তালে বেতালে বিট বাজেঃ চাক দুম দুম! চাক দুম দুম!ধুম ধুম ধুম ধুম নাদব্রহ্ম ছড়িয়ে সাধারণত ‘তেনারা’ আসেন। ধুমধুমানি তাদের বাহন। আগমনের মাহেন্দ্রক্ষণ জেনারেলি রাত বিরেত। সঙ্গে উঠতি কোনো মাচোম্যান। সুজন পাঠক নিশ্চই জানেন ‘তেনাদের’ কথা। ধুম ধুমিয়ে বাড়িতে এলেন মানেই বাস্তুসাপের বিদেয় হলো। কেউ লোভে, কেউ ভয়ে একে একে বেচে দিলেন পাট্টা। সার সার নারকেল গাছ আর কদম ডালে কোকিলের কুহু যে নেহেরু পল্লীর অন্যতম পরিচয়, সেখানে এখন কান পাতলেই পেল্লাই হাতুড়ির ধমাদ্ধম ধমাদ্ধম আওয়াজ!একে একে মানুষ চাট্টি বাট্টি গুটিয়ে নিয়ে চলে যায়। বৃদ্ধ নটবর সাহা গ্রিলের হাতল ধরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখেন। চোখে ভাসে শৈশবের গ্রামঃ ভিটে ছেড়ে একে একে বিদায় হচ্ছে সত্যেনকাকা, রবিকাকা, হারুকাকারা! যাবার আগে বাবার কাছে এসে জড়িয়ে ধরে কানছে! দাদাগো কুথায় যামু,হেয়ার তো ঠিক নাই, আবার যেন দেখা হয়! ঠিক অমনি করেই আজ যেন কেঁদে গেল পরিতোষদা! নটবর তারে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিল। প্রায় নিত্যদিন নটবর এই সব দেখে আর তার অতীত বর্তমান সব কেমন মিলে মিশে যায়!খোকন ইদানিং ফের রাজনীতিতে যোগ দিয়েছে। হামেশাই মিটিং মিছিলে যায়। বাইরে মিটিং থাকলে ছেলে বউরে রেখে যায়। আজও তারা এসেছে। খোকনের ছেলেও তো কত বড় হয়েছে! এইবারে নাইন। দু- দুটো বিজ্ঞান বই! পাঁচ পাঁচটা মাস্টার! প্রায় গোধূলি বেলায় নটবর বাইরের গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শোনে দাওয়ায় বসে নাতি চিৎকার করে পড়ছেঃগলিরমোড়েএকটাগাছদাঁড়িয়েগাছনাগাছেরপ্রেতচ্ছায়া-আঁকাবাঁকাশুকনোকতকগুলিকাঠিরকঙ্কালশুন্যেরদিকেএলোমেলোতুলেদেওয়া,রুক্ষরুষ্টরিক্তজীর্ণলতানেইপাতানেইছায়ানেইছাল-বাকলনেইনেইকোথাওএকআঁচড়সবুজেরপ্রতিশ্রুতিএকবিন্দুসরসেরসম্ভাবনা।নটবর নাতির পড়া শোনে আর বাইরের দিকে চেয়ে রুগ্ন বটগাছটার পানে চায়। সত্যি! কবিরা কত জানেন! তাদেরও গলির মোড়ে গাছটা দাঁড়িয়ে আছে। বালির ট্রাক যেতে অসুবিধে বলে গেল মাসে গাছটার বড় বড় ডাল কেটে দিয়েছে। সন্ধ্যে ঘনিয়ে এলে প্রেতের মতই তো দাঁড়িয়ে থাকে গাছটা!আরেকবার পড়ো না ভাই ওইটা! নটবর নাতিকে ডেকে বলে।নাতি ফের দাদুকে কবিতা পড়ে শোনায়। পড়া শেষ হলে দেখে দাদুর গাল বেয়ে জলের ধারা!তুমি কবিতা শুনতে ভালোবাসো দাদু?নটবর মাথা নাড়ে। তারপর গলা খাঁকড়ে বলে, কবিরা খুব জ্ঞানী হয়রে দাদা! কবিরা সব জানে!ধ্যাৎ! কবিরা সব জানবে কেন? বিজ্ঞানীরা সব জানে।বিজ্ঞানীরা তো জানবই। কবিরাও সব দ্যাখতে পায়। আগেভাগে দ্যাখতে পায়।ধ্যাৎ! এটুকু বলেই বই হাতে ঘরে ঢুকে যায় নাতি। দাদুর কথা তার বিশ্বাস হয় না। তবে বুঝতে পারে দাদু কবিতা ভালোবাসে। হঠাৎ একটা কথা মনে হতেই দৌড়ে বাইরে আসে।দাদু! দাদু!কও!তোমরা উদ্বাস্তু ছিলে না?ছিলাম তো দাদু। এহন যারে বাংলাদ্যাশ কও, হেয়াই আমার জন্মভূমি। আমরা থাকতাম…নটবর দাওয়ায় বসে নাতিকে পুরোনো দিনের কথা বলতেই থাকে। নাতিরও এ গল্প বহুদিনের শোনা। দাদুর কাছে, ঠাম্মার কাছে, এমন কী বাবার কাছেও শোনা! তবুও শুনতে তার বেশ লাগে।শিবানি সন্ধ্যে প্রদীপ জ্বেলে শাঁখ বাজান। দাদু নাতির গল্প তখনও চলছে। বড় বউমা সিরিয়াল সেরে রান্নাঘর থেকে ছেলেকে খাওয়ার জন্যে ডাকেন। ছেলে তখনও দাদুর কাছে গল্প শুনছে। রাতে ঘুমোতে যাবার আগে নাতি দাদুকে বলে যায়, দাদু! আমাদের ইশকুলের ফাংসানে না রাজদীপ একটা কবিতা বলেছিল। তোমায় এনে শোনাব।দাদু বলে, বেশ। শুনিয়ো।
………………………………………………..
এরই মাঝে ফের পালাবদল আসে রাজ্যে। পালা যে বদলাবেই সে নেহেরু পল্লী দেখলেই বেশ বোঝা যেত। যে নেহেরুপল্লী লাল পল্লী নামেও প্রচলিত ছিল, তারই অধিকাংশ বাড়িতে তখন তেরঙ্গার পতাকা ওড়ে। লাল বাড়ির লোকজনেরাও ক্রমশঃ পল্লীতে অনিয়মিত হন। আসলেও চাল চলনে আর সেই প্রত্যয় চোখে পড়ে না। বদলে বিরোধীদের চলনে বলনে আত্মবিশ্বাসের ছাপ সুস্পষ্ট হয়। ক্রমাগত তীব্র বিরোধী বাতাসের ঢেউয়ে নেহেরু পল্লীর বেশির ভাগ বাড়ির চাওয়া পাওয়ার ধরণ বদলে যায়। নটবরের বাড়িও তার ব্যত্যয় নয়। স্বতঃস্ফূর্ত পালা বদলে ফের উৎসবে মেতে ওঠে নেহেরুপল্লী। আলোর রোশনাইয়ে পথ ভেসে যায়।  কাতারে কাতারে মানুষ বের হয়ে আসে রাস্তায়। তবে এ উৎসব আর নটবরের দেখা আগের পালা বদলের উৎসব বা দলিল পাওয়ার উৎসব যেন অনেক আলাদা। সে উৎসবে ছিল সবাই শরিক, সবাই আন্তরিক। আর এখানে তো কয় দিন বাদেই দেখা গেল, ক্রমে এ পল্লীর সমস্ত উৎসবের হোস্ট হলেন মুহূর্তে ভোল বদলে ফেলা সেই ‘তেনারা’ আর গেস্ট হলেন নেহেরু পল্লীর মানুষ জন।ধুমধুমানিও ক্রমশঃ বাড়ল। একে একে ভাঙা পড়ল নটবরের গলির সাত সাতটা বাড়ি। এমন কী কেষ্টর বাড়িটাও বাদ গেল না! নেহেরু পল্লীর গোড়ার দিন থেকেই নটবর আর কেষ্ট অন্তরঙ্গ বন্ধু। সুদিনে দুর্দিনে সব সময় পাশে থাকা বন্ধু কেষ্ট! সেই বন্ধুও বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ায় মনে মনে মুষড়ে পড়ে নটবর।একেবারেসামনের ঘরটা ভাঙা পড়ছে এবার! ও বাড়িটা ধলা মায়ের। ধলামা নটবরের মায়ের সই। দুই জনের সখ্যতা বলতে গেলে আপন বোনের থেকেও বেশি। ধলামা বলতে মাই তো শিখিয়েছিল নটবরকে।  মা যেদিন চলে গেল, সেদিনও ধলামা এসে প্রৌঢ় নটবরের মাথাটা বুকে চেপে ধরে বলেছিলেন, অই! কান্দস ক্যা? আমি আছি না!ধলামা চলে গেছেন বছর তিনেক। মেয়েদেরও বিয়ে হয়ে গেছে! দুই ছেলেই চাকরি করে। তারা আরো ভালো জায়গায় চলে যেতে চায়। কাজেই বাড়িটা বেচে দেওয়াই তাদের পক্ষে লাভজনক!ধলামায়ের নিজের ঘরটা যখন ভাঙা হচ্ছে নটবর আর দেখতে পারেনি। কেন যে মানতে পারে না!তাই তো সমস্যা হয়। বাড়ি যেন নটবরের প্রাণ! কিছুতে ছাড়বে না! ছাড়বে না বললাম এই কারণে যে দুবার নটবরের কাছে সেই প্রস্তাব এসেছিল। বলাবাহুল্য দু পুত্রের তরফ থেকেই। অবশ আজ নয়। বছর দুয়েক আগে। খোকন চেয়েছিল বাবা তাকে তার অংশটা লিখে দিক। তা হলে সে ব্যাঙ্ক থেকে একটা ঋণ নিতে পারবে। সাময়িক মন্দা কাটিয়ে ব্যবসাটাকে একটু বড়ও করতে পারবে। ন্যায্য দাবী! খোকনের আছে যখন, স্বাভাবিক ছোটরও তো ন্যায্যদাবী থাকবেই। কাজেই ছোটও এসে সনদ পেশ করে। তারও লোন নেওয়া নাকি বড়ই দরকার। পক্ষপাতশূন্য নটবর বলটা নিজের কোর্টে ড্রিবল করে দুজনকেই পষ্ট জানিয়ে দেয়, তার বা শিবানির জীবদ্দশায় বাড়ির কোনো ভাগাভাগি হবে না।মাত্র সাতটা দিন। তার মধ্যেই ধলা মায়ের বাড়িটা মাঠ! নটবর দেখে। এরকম ফাঁকা অবস্থা তো সে আগেও দেখেছে। দেখেছে কী, সেই তো বাঁশ ধরেছে মেসোর সাথে ঘর বাঁধার সময়। কই তখন তো এমন ছিল না! এখন কেমন যেন কদাকার! কোনো সবুজ নেই! জায়গায় জায়গায় দাঁতের মত ভাঙা ইঁট বের হয়ে আছে! গাঁইতিআলারা একটা দেয়ালের খানিক অংশ কেবল ভাঙেনি। সেই অংশটায় ইলেকট্রিকের মিটারের পাশে একটা গণেশ ঠাকুরের ছবিআলা ক্যালেন্ডার ঝোলে। হাওয়া পেলেই ঘষঘষ করে দোলে।‘তেনাদের’ লোকগুলো নির্ঘাত জাদু জানে! নইলে মাসছয়েকের মধ্যে নটবরের চোখের সামনে চারতলা বিল্ডিং দাঁড় করিয়ে দেয়! অ্যাঁ! একেবারে রঙ ঝং করে পুরো কম্পলিট!নটবর গ্রিল ধরে বাইরে দাঁড়িয়ে এইসব দেখে আর অবাক হয়! একে একে নতুন পরিবারেরা গুহায় এসে কেমন গৃহপ্রবেশ করে! প্রসাদের থালা দিয়ে যায়! একেবারে আগের মতই তো! নতুন ছাপরা ঘরে ঢোকার সময় ধলামারাও তো পূজো করে প্রসাদ দিয়ে গেছিল! সবই এক! কেবল লোকগুলোই আলাদা!সন্ধ্যের দিকে চায়ের কাপ হাতে নটবর আর শিবানি রাস্তার সামনে দাঁড়িয়ে গল্প করে। নটবর ইদানিং আর ব্যবসা একেবারেই দেখে না। কাজেই ফুরসত অঢেল মেলে শিবানির সাথে কথা কওয়ার। আর তাছাড়া শিবানি বই আর কেউ তো তার সাথে বসে বেশিক্ষণ কথা কয়ও না!  তাদের সময় কই?শিবানি সামনের ফ্ল্যাটের লোকজনের কথা বলে নটবরের কাছে। কে ভালো, কাদের ঘরের বউটা সারাক্ষণ তাদের ঘরের দিকে চেয়ে থাকে, কার গলায় মোটা চেন, কার পোশাক আশাকের রুচি ভালো না- এই সব আর কী! নটবর শোনে। হ্যাঁ না বলে। সন্ধ্যে নামলে ঘরে গিয়ে টিভি দেখে।এক যাত্রায় কারো তো আর পৃথক ফল হয় না! কাজেই নটবরের ঘরেও এক রাতে বাইকবাহন এক‘তেনার’ আবির্ভাব ঘটে। খোকনই নিয়ে আসে। ছোটও ঘরে এসে দাঁড়ায়। ছোটর বউ ট্রেতে সাজিয়ে চায়ের প্লেট দিয়ে যায়। নটবরকে কত কী বোঝায় সেই চিমড়ে পানা লোক! বলে, কাকা! প্রোমোটার মানেই খারাপ লোক নয়। আপনি আমার বাবার মত। আমি বলছি, বাড়িটা আমায় দেন। অনেকগুলো টাকা পাবেন, চাই কী একটা এক কামরা ফ্ল্যাটও পাবেন। ছেলে মেয়েদের দিয়ে থুয়েও আপনার অংশ ব্যাঙ্কে রেখে বিন্দাস চলে যাবে দুজনের। কোনো ছেলের উপরে নির্ভর করতে হবে না! নটবর শোনে, বোঝে, চুপ থাকে, শেষমেশ দু বছর আগের বয়ানেই অনড় থাকে। প্রোমোটার লোভ দেখায়। অনেক টাকার লোভ। পাথরে মোড়া ঘরের লোভ! নটবর শুনেও শোনে না।প্রোমোটার অবশ্য হতোদ্যম হয় না। তারপর থেকে প্রায়ই আসে। মিষ্টি টিষ্টি, মুসুম্বি বেদানা হাতে ঝুলিয়ে আসে। দুপুরে ভাত খাবার পর নটবরে আর শিবানি সেগুলো খায়। খোকন, ছোট পালা করে নটবরকে বোঝায়, শিবানিকে বোঝায়। শেষমেশ চেঁচামেচি করে। ভবি তবু ভোলে না। নটবর অনড়। বেঁচে থাকতে বাড়ি বেচবে না। প্রোমোটার ভদ্রলোক চিমড়ে হলেও বেশ ভদ্র। একটু অতি মাত্রায়ই ভদ্র। আর নটবরের খুব অপরিচিতও তো নয়! এর আগে পাড়ার রক্তদান শিবির নইলে বস্ত্র বিতড়নে স্পনসর করতো।  মিছিলেও নিজে হাঁটতো অথবা চেলা চামুণ্ডা পাঠাতো। অযাচিত ভাবে দান খয়রাত করা এই লোকটাকে কেষ্টই চিনিয়েছিল। বলেছিল, পার্টির কয়েকজন লোকাল নেতাদের সাথে এর নাকি খুব দহরম মহরম। তখন অবশ্য তার জামার রঙ লাল! তো তাতে কী এসে যায়! কত লোকেই তো জামা বদলালো এই পল্লীতে; বছর বছর ধরে তম্বি করা কত  লোকাল নেতাই তো রঙ বদলে নতুন রঙের নেতা হয়ে ফের তম্বি করলো, সেখানে এ তো পল্লীর মানুষও নয়! আর তাছাড়া জামার রঙ আর খয়রাত তো এই প্রোমোটারদের ইনভেস্টমেন্টের অঙ্গ! কাজেই এতে আর দোষের কী!রাস্তায় নটবরকে দেখলেই ইদানিং মেসোমশাই বলে ডেকে খোঁজখবর নেয়। শরীরের কথা জিজ্ঞেস করে। ডাক্তারের কাছে যেতে হলে চ্যালাকে দিয়ে বাইকে চাপিয়ে নিইয়ে যায়। প্রেমগিরি মহারাজের সান্নিধ্যে আসার পরামর্শও তো ওরই। মহারাজের এখানে এসে নটবর জেনেছে প্রেমানন্দ মোহগ্রস্থ মানুষকে মোক্ষের পথ চেনান। এলাকার প্রায় সমস্ত প্রোমোটার তার ভক্ত। যে সকল বৃদ্ধবৃদ্ধা বাড়ির মায়া ত্যাগ করতে পারছেন না, তাদের মোহ ত্যাগে মুক্তির পথদর্শানোয় বাবাজী একেবারে সিদ্ধপুরুষ!বাবাজী দূরের মানুষ। কথায় একটা দোখনো টান আছে। অঞ্চলে আগমন আন্দাজ বছর খানি! তবে উঠন্ত মূলা পত্তনেই চেনা যায়। বাবাজী যে বেশ উঁচু দরের সে প্রথম থেকেই তার ভক্ত বহর দেখেই বোঝা গেছিল। যার বাড়িতে প্রথম ওঠেন, তিনিও এক প্রোমোটার। তিনিই নেহেরুপল্লীর এক ফ্ল্যাটের এন্টায়ার গ্রাউন্ড ফ্লোরে বাবার মন্দির বসান। প্রবচন কক্ষ আপাতত নন এসি থাকলেও বাকি সবটাই চব্বিশ ডিগ্রি মেইন্টেইন্ড। বাবা টপ টু বটম গোছানো। টপ পুরো মাখন কামান কামানো। বটমে ইস্তিরি করা গেরুয়া অথবা রক্তাম্বর নতুবা শ্বেতাম্বর। যে লগ্নে যা যায়, বাবা তাই পরিধান করেন। প্রবচন কক্ষে গরমের কারণে বোধহয় ঊর্ধ্বাঙ্গ অনাবৃত থাকে। ভিতরে যখন থাকেন ম্যাচিং ফতুয়া আর মানানসই রুদ্রাক্ষ থাকে গায়ে গলায়। বৃদ্ধবৃদ্ধাদের জন্যে স্পেসাল সেশানে বাবা বিকেল পাঁচটা থেকে ছ’টা অন হন। পোলাপানদের জন্যে অবশ্য অনলাইনে অন্য ব্যবস্থা।প্রবচন কক্ষে মহারাজকে ঘিরে ত্রিস্তরীয় বেষ্টনী। প্রথম বেষ্টনী শিষ্যাদের। তারপর ভক্তপ্রাণ প্রোমোটারদের পরিবারবর্গের। আর শেষ বেষ্টনী মোহগ্রস্থ বৃদ্ধ বৃদ্ধার।নটবরকে বলে বলে কাজ না হওয়ায় চিমড়ে প্রোমোটার নিজেই একদিন বিকেল বিকেল ধুমধুমি চাপিয়ে মন্দিরে নিয়ে আসে। আম বাঙালির বয়স বাড়ার সাথে ভক্তির সম্পর্ক জেনারেলি বর্গের সমানুপাতিক। বয়স বাড়ে, অসুখ নামের একটি করে গয়না গায়ে ওঠে আর বর্গের ল্যাপে ভক্তি বৃদ্ধি হয়। ‘দম মারো দমে’ দোলানো কোমর ক্রমশঃ ‘হরে কৃষ্ণ হরে রামে’ ফোকাসড হয়। এটাই স্বাভাবিক ছন্দ। সন্দেহবাতিক কুমন ব্যতিরেকে মোটামুটি এই রুলই উইথ সাম এক্সেপশান ফলোড হয়। রয়াল এনফিল্ডের গতি রুখে নটবরকে নিয়ে চিমড়ে যখন মহারাজের ডেনে এন্ট্রি নিল তখন প্রবচন স্টার্ট হয়ে গেছে। চিমড়ে উঁচুদরের ভক্ত। কাজেই সটান নটবরকে নিয়ে গেল সেকেন্ড লেয়ারে। মহারাজ বচন থামিয়ে স্মিত হেসে দেখে শিষ্যাদের বললেন, ‘ওরা এসেছে যে! আসবার স্থান করে দাও’!কেবল বলবার অপেক্ষা! শ্বেত শুভ্র শিষ্যারা মুহূর্তে বিভঙ্গিত হয়ে সাড়ে চৌদ্দ ইঞ্চি চলবার পথ করে দিলেন। চিমড়ের পিছন পিছন নটবর এগিয়ে গেল গিরি মজারাজের ফুলহারে সুসজ্জিত আসনের কাছে। চিমড়ে ঝুঁকে পড়ে প্রণাম জানিয়েই ধপাস করে বসে পড়ল! এত পয়সা চিমড়ের, তবু কী করে যে অমন খটখটে পাছা হয় কে জানে! বসল যখন যেন খট করে আওয়াজ ফুটল!নটবর দেখাদেখি ঝুঁকে প্রণাম করতে গিয়েই অঁক করে কঁকিয়ে উঠল! স্থান মাহাত্ম্যে মাজার ব্যথার কথা বেমালুম ভুলে গেছে! আর হতভাগা শরীর! মনের দেখাদেখি একবার তো ভক্তিরসে স্নান কর! তা না, কেবল নীরস হাড্ডির ধাঁচা! তায় আবার মাজার হাড্ডির স্পেস কমে যাওয়ায় ঝুঁকতেও দেয় না! ফলতঃ আমাদের নটবর মাজা আর মনের যুগপৎ ব্যথায় ব্যথাতুর বদনে নিরীহ নয়নে চেয়ে থাকে। প্রেমগিরি মহারাজ স্মিত হেসে বলেন, আহারে! স্লিপড ডিস্ক! থাক থাক, ঝুঁকো না! তারপর শিষ্যাবৃত্তে চোখ রেখে বলেন, কই হে সই! একবার নরেশকে ডাকো!বলামাত্র ডানদিকের শিষ্যা উঠে বাবাকে প্রণাম করে বাবাজীর বামপাশের কাঁচের দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকে যান। খানিক্ষণেই সরেস বপু নরেশের আগমন হয়। নরেশকে ডেকে চক্ষুযোগে নটবরকেদেখিয়ে বাবাজী বলেন, নরেশ! আমার এই ছেলের জন্যে একটা কোমর বন্ধ আনো তো!নরেশ নটবরের কোমরের দিকে তাকিয়ে মাথাটা একবার ক্লকওয়াইজ ঘুরিয়েই অ্যাবাউট টার্ন নিয়ে ভিতরে চলে যায়। বাবাজী নটবরের দিকে চেয়ে বলেন, এই যে নরেশকে দেখলে ও হল সুশ্রুতের অধস্তন সাতশো সাতচল্লিশতম পুরুষ। সুশ্রুত কে জানো তো?নটবর মাথা নাড়েন।বাবাজী স্মিত হেসে শিষ্যা সঙ্গে খুনসুটিরত চিমড়েকে ডেকে বলেন, কি শোয়াম্ভু! তোমার মনে আছে?চিমড়ে শম্ভু অ্যাজ এক্সপেক্টেড পানছোপ হাসি হাসে।বাবাজী গলা চড়িয়ে বলেন, তোমরা জানো?ভিড় থেকে হাত তোলেন হরিরাম হোমিওপ্যাথ। বাবাজী সেই দেখে হেসে বলেন, জানি জানি, জানো না! ভেবেছিলাম হরিরাম অন্তত জানবে, হোমিওপ্যাথ হোক, তবু ডাক্তার তো! কিন্তু নাঃ! ব্যাজার হরিরাম ফের হাত তুলে কী যেন বলতে জান। বাবাজী তার কন্ঠস্বর দমিয়ে বলেন, বলছি রে বাবা বলছি! এত উদগ্রীব হলে চলে! শোনো শুশ্রুত হলেন আমাদের আদি চিকিৎসক। কী দক্ষতাটাই না ছিল আয়ুর্বেদে! গোটা শরীরের কোথায় কোন পেশি আর কোথায় কোন হাড় সব একেবারে নখস্থ! গ্রন্থও তো আছে! সুশ্রুত সংহিতা! পড়োনি! পড়বে পড়বে, বুঝলে? পড়তে হয়, নইলে পিছিয়ে পড়তে হয়! দেখো নি!সমবেত ঘাড় নড়ার মধ্যেই সেই সুশ্রুত বংশোদ্ভুত নরেশ ঘাড় গুঁজে বেল্ট নিয়ে ঢুকে পড়ে। বাবাজীর নিরন্তর হাসিমুখ। বেল্টখানা হাতে নিয়ে বলেন, দাঁড়াও! একটু শোধন করে দি! বলেই চোখের মণি ঊর্ধ্বে তুলে মন্ত্রোচ্চারণ করতে শুরু করেন। কন্ঠ বটে বাবার। ঘর গমগম করতে থাকে। শিষ্যারা উর্ধ্ববাহু হয়ে নিঃশব্দে এ পাশ ও পাশ ছন্দভরে দোল খেতে থাকে। খানিক বাদে বাবাজী গ্রাউন্ডস্টেটে ফিরে এসে নটবরকে ডাকেন, কই হে নটবর! এসো!নটবর এগিয়ে যায়। বাবাজী বেল্টখানা ধরিয়ে দেন ডানদিকে বসে থেকা শিষ্যার হাতে। শিষ্যা নটবরের টেরিলিনের শার্ট উঠিয়ে ঘামে ভেজা ভুঁড়িতে বেল্ট বাঁধে। নটবরের বেশ আরাম বোধ হয়।বাবাজী বলেন, কী! এবার আর কষ্ট আছে? ব্যাথা আছে?শিষ্যার আঙুল তখনও নটবরের ভুঁড়ি ছুঁয়ে। স্বাভাবিক ভাবেই, প্রশ্নের বুড়ি ছোঁয়া উত্তর দেয় নটবর, না!আলতো আঙুলের ঠেলা পড়ে নটবরের পেটে। অনেকটা সেলুনে চুল কাটার পর ঘাড়ের কাছে যেমন ঠেলা পড়ে তেমন। তবে তেমনতরো রুক্ষ নয়।  আয়েশ আছে।নটবরের স্থান হয় প্রথম সারিতেই শিষ্যাদের মাঝে। চিমড়ে শম্ভুর পাশে। নটবর এদিক ওদিক দেখে। বেশ ভালোই জমিয়েছে বাবাজী। সাজিয়েছেও বেশ। ঝকঝকে পুট্টি করা দেয়ালে দেয়ালে শ্রী কৃষ্ণের মানবোদ্ধারের ছবি। সপ্ত ভূবনের ছবি। নরকের ডেসক্রিপশান। কর্নার স্ট্যান্ডের মাথায় মাথায় রজনীগন্ধা। চন্দনের গন্ধে ঘর সুবাসিত। শিষ্যাদের গা থেকেও মোলায়েম সুবাস ভাসে। কাজেই এ ঘরে ঢুকলে ভক্তিরস প্রেমরস ওথলাতে বাধ্য।বাবাজী বলেন, এসো নটবর রোজ। দেখো, ভালো লাগবে। সারা জীবন বহু তো বন্ধন জড়ালে গায়ে। এখানে এসো বন্ধন মুক্তির পথ পাবে। মোক্ষের লক্ষ্যে এগোতে পারবে। মোক্ষই তো সব। ত্যাগ, নটবর ত্যাগ। ত্যাগই মোক্ষের কাছটিতে তোমায় নিয়ে যাবে। এখানেই দেখ, আমাকে না হয় বাদ দাও। এই যে ভক্তবৃন্দ, এরা কেমন সর্বস্ব ত্যাগ করে ঈশ্বর সেবায় নিয়োজিত প্রাণ! এরা তাই মোক্ষের পথিক। কী আনন্দ এদের চোখে মুখে দেখ!কথাটা সত্যি বটে। নরেশের পেঁচোমুখ বাদ দিলে এখানের সব শ্বেতবসনাদেরই বদন আনন্দশোভিত।গুরুজী বলে চলেন, কী আছে নটবর এই দেহে! পোশাক বই তো কিছু নয়। যে দেহকে তুমি আমার আমার ভাবো, সে তো তুমি নও, যে ঘরকে তুমি তোমার ভাবো সেও তো তোমার নয়। তোমার দেহ তুমি নও, তোমার মন তুমি নও! দেহ মন থেকে তুমি সম্পূর্ণ ভিন্ন শুদ্ধ বুদ্ধ মুক্ত আত্মা! বলেই ফের চোখের মণি ওপরে তুলে জলদগম্ভির কন্ঠে বলে উঠলেন,“বাসাংসি জীর্ণানি যথা বিহায় নবানি গৃহ্ণাতি নরোহপরাণিতথা শরীরাণি বিহায় জ়ির্ণান্যন্যানি সংযাতি নবানি দেহী”।।আর সবার দেখাদেখি নটবরও মাথা ঝুঁকিয়ে প্রণাম করল। শ্লোকের অর্থ কী ঠিক না বুঝলেও তা যে বেশ গম্ভীর কিছু সে বেশ মালুম হল তার।গুরুজী বলে চললেন, যা আদতে তোমার একেবারেই নয়, তাকে আঁকড়ে যদ্দিন থাকবে তদ্দিনই দুঃখ! ছেড়ে দাও, আর দুঃখ নাই। টিউমার হলে ডাক্তার কী করে নটবর? থাক বাছা, শরীরেরই তো অংশ বলে রেখে দেয়, না কি অপারেশন করে? রেখে যদি দিত, তবে তো দুঃখ বাড়তো বই কমত না বাবা! তেমনই, যদ্দিন আমার আমার করে স্থাবর অস্থাবর জড়িয়ে রাখবে, দুঃখ তোমার পিছু ছাড়বে না। তুমি তো নদী নটবর। উচ্চ মধ্য নিম্নগতির শেষে এখন প্রায় সাগরের মুখে। এখন যদি পলি তুমি নাই ছাড়তে পারো তবে সাগরে মিলবে কেমন করে? নির্মল সাগর তো তোমার পলি নেবে না! যেখান থেকে নিয়েছো সেখানেই ফেলে আসতে হবে সব।নটবরের কেন যেন মনে হয় চিমড়ে বেটা মগজ ধোলাইয়ের জন্যে এখানে নিয়ে এসেছে তাকে।হয় তো তার মুখে সে ভাব ফুটে উঠে থাকবে। বাবাজী সেই দেখে বললেন, জানি নটো! এখন তোমার পক্ষে সব বন্ধন ছিন্ন করা বেশ শক্ত। একদিনে তা হবেও না। তুমি এসো রোজ। তোমার মধ্যে একটা শুদ্ধচিত্ত আছে। দেখলে ভালো লাগে। তারপর শম্ভুর দিকে ফিরে বললেন, বাবা শম্ভু, আজ তো নামগানের সময় হয়ে এল। তুমি আবার নটবরকে নিয়ে এসো। আর যাবার আগে একবার নরেশের সাথে কথা বোলো, কেমন?চিমড়ের সাথে কাচের দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকলো নটবর। আঃ! যেন গঙ্গার পাড়ের ঝিরঝিরে বাতাস! গোটা চার পাঁচেক ঘর পেরিয়ে অফিসে নরেশের সাথে দেখা হলো ওদের। নরেশ নটবরের নাম ঠিকানা জেনে নিয়ে একটা রেজিস্ট্রেশান করিয়ে নিল। চিমড়ের কথামত প্রিমিয়ার ভক্তই হল নটবর। মানে ফেসিলিটি একটু বেশি আর কী! সামনের দিকে বাঁধা স্থান, তিথিতে তিথিতে পূজোয় ছাড়, স্পেশাল ভোগ, বাড়ির অনুষ্ঠান প্রয়োজনে আশ্রমে করানোর সুবিধা, যে কোনো অসুবিধায় আর্জেন্ট কল পাওয়ার সুবিধা, নাতি নাতকোরের ফ্রিতে গুরুজীর দ্বারা আশীর্বাদী নামকরণ, সাবসিডাইজড রেটে জন্মছক, কুষ্ঠীবিচার এইসব আর কী! রেজিস্ট্রেশানের ফিজ হয় তো তাতে একটু বেশিই পড়ল, পাঁচ অঙ্কে গড়াল, তাতে কী?রেজিস্ট্রেশান পর্ব সেরে বেরিয়ে আসার সময় নরেশ আবার চিমড়ের হাতে আর একটা বিল ধরাল। নটবরা টেরিয়ে দেখল এ হল তার কোমরবন্ধের বিল। বেল্টের কাঁচামাল-মজুরি-আশীর্বাদ-সার্ভিসচার্জএর পৃথক মূল্য ধরে একত্রে সাত হাজার একশো নিরানব্বই।শার্টের উপর দিয়েই বেল্টে হাত বুলোতে বুলোতে নটবর যখন চিমড়ের সাথে আশ্রম ছাড়ল, তখন সান্ধ্যভজনা শুরু হয়ে গেছে। গুরুজী আসনে চোখ বুজে ধ্যানমগ্ন আর শিষ্যা ভক্তরা সমবেত ভাবে সুর তুলেছে্নভবসাগর তারণ কারণ হেরবি নন্দন বন্ধন খন্ডন হেশরণাগত কিঙ্কর ভীত মনেগুরুদেব দয়া কর দীনজনে!পাশের পাশের বাড়ির কালীপদরা রামকৃষ্ণ মিশনে দীক্ষিত। ওদের বাড়িতে সন্ধ্যেবেলা নিত্য এ গান হতো। কালীপদ সাত্তিক মানুষ। ঘিয়ের মত গায়ের রঙ। পৈতের রঙ আর গায়ের রঙ প্রায় মীশে যেত। যখন গাইত, সবাই তাকে ঘিরে থাকত, সবাই গাইত। কালীপদরাও বাড়ি ছেড়ে পাশেই ভাড়া উঠে গেছে মাস ছয়েক। প্রোমোটার এখনও বাড়ি ভাঙেনি। পোড়ো বাড়িখানায় এখনও রোজ বৃদ্ধা বউঠান সন্ধ্যেবেলা প্রদীপ দিয়ে যান তুলসি তলায়! সেও গান আর এও গান! এই প্রার্থনা এখানে কেমন যেন প্রাণছাড়া প্রাণছাড়া। যেন কেবল সুরে বসানো কথা। মন উদ্বেল করা সেই সুর যেন এখানে কোথায় কেটে গেছে। তবু চিমড়ের রয়াল ধুমধুমিতে চেপে বসার আগে একবার কপালে জোড় হাত ঠেকিয়েই নিলো নটবর।
……………………………………………..
এমনটা তো ছিল না এখানে! বসতি গড়ার পর থেকে আপদে বিপদে সব একেবারে এককাট্টা হয়ে থেকেছে ওরা। কারও বাড়ির উৎসবে পাঁচ ছ দিন সবাই পাত পেড়ে ডাল ভাত যা হোক খেয়েছে। এক বাড়ির চাল থেকে পুঁইডগা নামালে অন্য বাড়ির চাল থেকে কুমড়ো নেমেছে। ভালোবাসা থাক, ঝগড়া থাক একসাথে বেঁচেছে। কিন্তু এ কী! পুরোনো বাড়িগুলো ভেঙে নতুন ফ্ল্যাটগুলোয় যে মানুষগুলো এসে উঠেছে, তারা কেউ পাড়ায় মেশে না। অবশ্য উলটো কথাটাও যে খাটে সে কথা অস্বীকার করা যায় না। পাড়ার পুরোনো মানুষেরা, মূলত মহিলারা কিছুতেই এই ফ্ল্যাট নিবাসী মানুষদের মহল্লার করে নিচ্ছেন না। উঁচু বাড়িগুলো আর নেহেরু পল্লীর মধ্যে ফারাক তাই থেকেই যাচ্ছে।এতে অবশ্য সব চেয়ে ক্ষতি হচ্ছে পাড়া সংস্কৃতির। বাঙাল অধ্যুষিত এই পল্লীর পাড়ায় পাড়ায় একসময় উৎসব অনুষ্ঠান লেগেই থাকত। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান- মানে রবীন্দ্র জয়ন্তী, রবীন্দ্র নজরুল সন্ধ্যা, বিজয়া সম্মিলনী এই সব। বিচিত্রানুষ্ঠান- মানে ছেলে ছোকড়াদের মনের মত চলতি গানের অনুষ্ঠান। কত সব মতন শিল্পী! কুমার অমুক কুমার তমুক, আশা কন্ঠী, লতা কন্ঠী, সন্ধ্যা কন্ঠী! একেবারে রমরমা ব্যাপার! আর কী কেতা! মঞ্চে ব্যান্ডের ঝাকানাকা গৌরচন্দ্রিকা শেষ। হিট গানের প্রিলিউড বাদন কম্পলিট। মাইকে মাইকে শোনা যাচ্ছে রফি সাহেবের গানঃ চান্দ মেরা দিল, চান্দনি হো তুম! অথচ শিল্পীকে দেখা যাচ্ছে না। দর্শক উদ্গ্রীব! কোথায় সেই চন্দ্রবচনী গায়ক, কোথায় গায়ক! গান প্রায় আদ্ধেক শেষ করে কর্ডলেস হাতে দর্শকের পিছন থেকে প্রবেশ করছেন শিল্পী! ওরে হাততালি! আর শিল্পীরও তো তথৈবচ অবস্থা। রফি সাহেবের কন্ঠ বের করার স্ট্রেনে মাজা মচকানো,চেপা দাঁতের ঠেলায় চোয়াল শক্ত, গরমেও ঝকমক পোশাকের ভাপে সর্বাঙ্গ ঘর্মাক্ত! হাঁটতে গেলে পাছে সুর বেঁকে যায় তাই তেভাঙা মুরারী রূপে শিল্পী কাঠবৎ! তবু কী আনন্দ! কত অনুরোধ উপরোধের কাগুজে চিরকুট!এছাড়া সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয়, ক্লাবীয় অনুষ্ঠান তো আছেই। দরিদ্রদের বস্ত্রদান, রক্তদান শিবির, বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, বিরাট কলব্রিজ প্রতিযোগিতা, ফুটবল টুর্নামেন্ট, মেলা কত কী! তারপর শীতলা পূজো, মনসা পূজো, দুর্গা পূজো, কালীপূজো কত কী! এইসব আঞ্চলিক উৎসব অনুষ্ঠানের যে কী মেজাজটাই ছিল! নাচের মহড়া, নাটকের মহড়া আর বিজয়া সম্মিলনীতে স্পেশাল অ্যামেচার যাত্রার মহড়া। কী যে অনাবিল আনন্দের সেই মহড়ার দিনগুলোয়! আর কত দর্শক! খেলার মাঠ উপচে পড়ত। কত পালা! হাইস্কুলের হেডমাস্টারমশাই অমরবাবু  ছিলেন ডিরেক্টার। কী পালা না অভিনয় হয়েছে! সিরাজের বেগম থেকে নটী বিনোদিনী, ভক্ত প্রহ্লাদ থেকে নেতাজী সুভাষ কত পালা! ক্ষমতাও ছিল কিছু অমরদার! যা সাজত, মানিয়ে যেত। আর কী অভিনয়! যেমন গলা, তেমন আবেগ! পালার অভিনয়ের পর প্রণামের ধুম পড়ে যেত! নটবরের মত স্বল্পবাক মানুষকে দিয়েও কি না অভিনয় করিয়েছেন! সেই অমরবাবুও নাই, সেই দর্শকও নাই, কাজেই পালাও নাই! অবশ্য এ জন্যে বিল্ডিং প্রোমোটারদের থেকে সিরিয়াল প্রোমোটারদের দায় অনেক বেশি। যত সিরিয়াল জমল, ততই তো গোলমাল শুরু হল। মহড়ায় ঠিক সময় কেউ আসে না। আসলেও সিরিয়ালের সময় এলে পালায়। তারপর অভিনয়ের সময়েও লোক হয় না! বাড়িতে টিভি আগলে বসে থাকে! শেষবার পালার পর ড্রেসিং রুমে যখন আর কেউ এল না, অমরবাবু বললেন আর নয় রে! এই শেষ! শেষ বলে একেবারে শেষ। আজ প্রায় পনেরো বছর হলো, এ পাড়ায় আর যাত্রা হয় না। অমরদাদের সে বাড়িও তো আবাসন হয়ে গেছে। তিনভায়ের মিলিয়ে প্রায় বারো চোদ্দো কাঠা জায়গা ছিল অমরদাদের। সবটা একজনই নিয়ে মস্ত আবাসন গড়েছে।শিবানির সাথে চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে পুরোনো দিনের সেই সব প্যাচালই পাড়ছিল নটবর। এইসব সংস্কৃতি আসলে মানুষগুলোকে একসাথে রাখতো। যবে থেকে এ সব বন্ধ হলো, গণ্ডগোলের সূত্রপাত। ছেলে ছোকরাগুলোর খারাপ আড্ডা শুরু হলো। আর এখন তো আড্ডা ব্যাপারটাই উঠে গেছে। কানে কানে ইয়ারফোন গোঁজা ছেলেপুলের ইয়ারদোস্তও ওই মোবাইলে! কী দেখে আর কী না দেখে! ছিঃ!আসলে পাড়ায় আজ একটা ঘটনা ঘটে গেছে। শিবানি বিস্তারে শুনে এসেছে বিকেলের আড্ডা থেকে। ফ্ল্যাট অনেক উঠলেও অবশিষ্ট বাড়ির গুটিকয় মহিলারা এই কালচারটি টিকিয়ে রেখেছেন।  রোদ একটু পড়লেই মন্টাদের বাড়ির সামনেটায় তারা জড় হয়ে গল্প করেন। স্বাভাবিক ভাবেই সেখানে এ বাড়ি সে বাড়ির নাড়ি নক্ষত্র বিশ্লেষিত হয়। সেখান থেকেই শুনে এসে শিবানি নটবরের সাথে চা খাওয়ার সময় ‘আই আই ছি ছি’ করে। এ তার বহুদিনের অভ্যেস। যাই হোক সেই অভ্যেসের গুণকীর্তন থুয়ে আসুন আমরা শুনি কী এমন ঘটেছে আজ এই পাড়ায়!নটবরের বাড়ি থেকে গোটা বারো বাড়ি পরে অভিরামের বাড়ি। অভিরাম আর বলরাম দু ভাই। অভিরাম নটবরের সমবয়সী। বলরাম ছোট। ওরা বরিশালের ছেলে। এখানে এসে কাপড়ের ব্যবসায় ভালো পয়সা করে। তারপর যা হয়, দু ভাই বে থা করে ভেন্ন হয়। তিন কাঠার প্লট ভাগ হয়ে দু ভাইয়ের দেড় কাঠা করে ভাগে পড়ে। অভিরামেরও দুই ছেলে। রমেশ আর সুরেশ। দুটোই একেবারে সোনায় ধোওয়া। নটবরের মাঝে মাঝে মনে হয়, জন্মের পর এদের মধুরস দেওয়ার পরিবর্তে আদিরস দিয়েছিল কেউ। এত ইন্দ্রিয়পরায়ণ মানুষ হয়! বড়টার জন্যে তো অভিরাম মাঝে মধ্যে এসে কাঁদতো। হেন বাড়ি নেই যেখান থেকে রমেশ খুচখুচ করতে গিয়ে খ্যাদানি না খেয়েছে! একেবারে গ্যাজেট বিহীন জেমস বন্ড! পাড়ার ছোকরারা মজা করে ডাকতো র্যা মস বন্ড! যাই হোক শেষমেশ এই রমেশ উর্ফ র্যা মস বন্ড এক ‘এল স্কোয়ার টি টি’ কন্যের কাছে জব্দ হয়ে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেন। এল স্কোয়ার টি টি এই অঞ্চলে খুব প্রচলিত কোড। ফুল ফর্ম হল, লুক লন্ডন টক টোকিও। মানে টোকিওর সাথে কথা কইলে লন্ডনের দিকে চেয়ে থাকে, এই আর কী! যাই হোক, র্যা মস বন্ডের বন্ধনে বাপ কাকা তো বটেই বলা বাহুল্য পাড়া পড়শিরাও বেশ সোয়াস্তি পেলেন। সেই আনন্দেই অভিরাম চোখ বুজলো মাস ছয়েকের মধ্যে। ওদিকে ধীরে ধীরে ছোট ভাইয়ের গুণকীর্তন প্রকাশ পেতে শুরু করল। কথায় আছে না, প্রতিভা আর চুলকুনি কখনো চাপা থাকে না, ঠিক প্রকাশ পাবে, লোকে ঠিক জানবে!কাজেই সুরেসের রসবোধ ক্রমে প্রকাশিত হতে শুরু করল। দাদার থেকে শ’ গুণা জাদা মিষ্টি এই ভাই। তার লীলাক্ষেত্র জেনারেলি বাড়ি থেকে বহু বহু দূরে। কর্মক্ষেত্রের যে কোনও নারীকে তিনি অনায়াসে মদন শর নিক্ষেপ করেন। কেউ কেউ বিদ্ধ হন। শুশ্রূষার জন্যে তাকে নিয়ে প্রায়শই কোথায় যেন ভেগে যান সুরেশ।তো এ গুণের কদর তো আর সকলে বোঝে না। স্বাভাবিক তাই গুণীও কদর পান না। উলটে ঠ্যাঙানি খান। বেশ কয়েক জায়গায় কম্বল ধোলাই খাবার পরে স্বাভাবিক ভাবেই চাকরিটি গত হয়। সুরেশবাবু তখন নেশার ব্যবসা শুরু করেন। না, না, পাঠক ভুল ভববেন না। একটিমাত্র বিষয় ছাড়া আর কোনোক্ষেত্রেই সুরেশ কুমার আইন ভাঙেন না। আইনানুগ নেশাদ্রব্য মানে তামাকজাত দ্রব্যের সাবডিলারশিপ নেন। মানে ডিলারের ঘর থেকে মাল তুলে দোকানে দোকানে সাপ্লাই দেন। অচীরেই দু পয়সা আসতে থাকে। স্বাভাবিক ভাবে অন্তরে ছুপে থাকা বাঘ রক্ত চায়।ফলতঃ প্রায়শই রমেশ সুরেশের খন্ডযুদ্ধ লাগে। রমেশের অফিসে বেশ জোরদার দায়। সেই সকালে বের হয়, রাত করে ফেরে। বাড়ি ফিরলেই বউ দেবরের নামে অভিযোগের বন্যা বইয়ে দেয়। কাঁহাতক ঘরে বাইরে অশান্তি আর সহ্য হয়? কাজেই ছেলে বঊ নিয়ে এই যন্ত্রণার সাথে এক বাড়িতে থাকা রমেশের পক্ষে অসম্ভব হতে শুরু করে। আবার বাড়ি অতি বিষম বস্তু! কাজেই শেয়ারও ছাড়া যায় না। শেষ অবধি মায়ের মধ্যস্থতায় দোতলায় ঘর তুলে রমেশ থাকে। নিচে থাকে মা আর সুরেশ।এভাবেই চলছিল। কানাঘুঁষোয় অনেক কিছুই গুণধর সুরেশের নামে কানে আসলেও কোনোপক্ষই না ঘাঁটানোয় একপ্রকার শান্তি ছিল বলা যায়। গোল বাঁধল সেদিন, যেদিন রমেশের বউ স্নান সেরে বেরিয়েই গুণধর দেবরের কোলে আবিষ্কার করল ছেলের আয়াকে। যে জতুগৃহে একবিন্দু ফুলকিই আগুন ধরানোর জন্যে যথেষ্ট, সেখানে এরকম পারমাণবিক বিস্ফোরণে কোন কোন টেক্টোনিক প্লেট যে সরে যাবে সে কথা কেই বা বলতে পারে! দেবর গুণধর দুদ্দাড় করে নিচে নেমেই বেরিয়ে গেল আর আয়া আবাগি লাজ লজ্জা দূরে থাক, কোল থেকে নেমেই অ্যাজ ইউজুয়াল নিজের কাজে লেগে গেল। কেবল দু খানি ক্যানক্যানানি গলা চড়ল বাতাসে। তার একটি রমেশের বউ আর অপরটি রমেশের মায়ের।সে রাতে দু ভায়ের ধুন্ধুমারে কার যে কী ফেটেছিল সে আলোচনায় না যাওয়াই ভালো। তবে কথা কী ঘটনার ফলশ্রুতি যতটা আশা করা গেছিল ততটা হোলো না! কারণ, এ বাজারে সব গেলে সব পাওয়া যায় কিন্তু মায়াদির মতো কম পয়সার আয়া গেলে আর ফিরে পাওয়া যায় না! এ কথাটা রমেশের বউ এর মাথায় এসেছিল পরে। যদি আর কয়েক ঘন্টা আগে আসতো, তবে শুম্ভ নিশুম্ভের লড়াইখানা আটকানো যেত। সে যাই হোক, আয়াও বদলালো না, বলা বাহুল্য সুরেশও বদলালো না। কেবল মিলন স্থল বদলালো। কখনো মায়াদির বাড়ি তো কখনও মিলেনিয়াম পার্ক থেকে গঙ্গাবক্ষে ভেসে পড়লো সুরেশ আর মায়াদির জ্বলন্ত নৌকো। এ সব বাড়ির অনেকেরই জানা, কিন্তু ওই যে বললাম, নিত্যকর্ম ‘অতি বিষম বস্তু’, কাজেই চোখ থাকতে অন্ধ হলেম কান থাকতে কালা!তবে কী পাঠক, লোভের ইলাস্টিসিটি মারাত্মক! যেদিকে টানো, যতই টানো, হুড়হুড়িয়ে লম্বা হবে!আর তার সাথে যদি কামের ফোড়ন মেলে তবে তো পাগলা ঝাঁজে মরবেই। সে ঝাঁজ সামলাবে সুরেশের সাধ্য কী! কাজেই ঝাঁজে অসুস্থ সুরেশ অচীরেই মায়াদিকে ছেড়ে আকৃষ্ট হলো বাড়ির ঠিকে ঝি রূপালীর প্রতি। রূপালীর বয়স অল্প। কাজেই কারণে অকারণে সুরেশ কলতলায় কাজের সময় ঘুরপাক খেতে শুরু করল। ওদিকে বিপদ আঁচ করে মায়াদি রূপালীকে ডেকে সব বেত্তান্ত খোলসা করে বলল। তারপর থেকে রূপালী তক্কে তক্কে। আজ যেই না সাহস করে ঘাড়ের কাছে শ্বাস ফেলেছে সুরেশ, রূপালী ঝেঁটিয়ে তার বিষ ঝেড়ে দিয়েছে।সুরেশের মা বিপদ বুঝে রূপালীকে ডেকে যত বোঝায় -অই তুই চুপ কর! তুই মাইয়া না! তর নামেই বদনাম রটবো! সোয়ামী লইবো না!- তত রূপালী তারস্বরে চেঁচায়। মাইয়া তো কী হইছে গো! আমার কুনো তো দুষ নাই! দুষ তো তুমার পুলার! ইডা তো তুমাগো পাড়া। যাও না, তুমিই ডাক দাও পাঁচজনরে। দেহি মাইনষে কার পাশে দাঁড়ায়। আর আমার সোয়ামীর কথা বইলো না! আমি তো শুধু চেঁচাইতাছি! আমার সোয়ামী যদি জানে, তাইলে তুমার পোলার খবর আছে!এই কথাই শিবানি শুনে এসেছে পাড়া থেকে। সেই শোনা ইস্তক নটবরের মনে হচ্ছে এই অবক্ষয়ের দায় কেবল সময়ের। সময়ই এত জলদি এত কিছু লোভ ছড়িয়েছে যে অতি সাধারণ এই মানুষগুলো আর নিতেপারেনি। আরেকটু ভালো, আরেকটু টিভির মত জীবন পাওয়ার লোভে ভালো মন্দ মান সম্মান বোধগুলোই কেমন পাল্টে ফেলেছে আজকের ছেলেমেয়েগুলো। না না ভুল হলো, শুধু ছেলেমেয়েরা নয়, সব মানুষগুলো। কেবল দৌড়চ্ছে! আরো চাই, আরো চাই! চাইতে চাইতে কোথা দিয়ে বয়ে যাচ্ছে জীবন, সে আর নজর করতে পারে না। কী এমন খারাপ ছিল নটবরের জীবন! ছেলেমেয়েদের সে মানুষ করতে পারে নি? তাদের মাছ মাংস খাওয়াতেপারেনি? পূজোয় জামা কাপড় দিতে পারেনি? সব পেরেছে! এসবের বেশিই দিতে পেরেছে। খেলার মাঠ দিতে পেরেছে। স্কাউটের, লোকনৃত্যের আসর দিতে পেরেছে। রবীন্দ্র জয়ন্তীতে নাটকের রিহার্সাল দিতে পেরেছে! আর এখন তার বড় ছেলে নাতিটাকে কী দিচ্ছে? না খেলা ভুলিয়ে গেম দিচ্ছে, বন্ধুর সাথে খেলাধুলো আটকে চোখের ডগায় কার্টুন দিচ্ছে, লেখাপড়ার মর্ম না বুঝিয়ে নম্বর বাড়ানোর জন্যে মাস্টার আর মাস্টার দিচ্ছে, মাস্টার কাঁড়ি কাঁড়ি নোট দিচ্ছে! এত সব কিছুর মধ্যে মাঠটাও কখন হাপিস হয়ে যাওয়ায় শৈশবটাও হারিয়ে যাচ্ছে! কৈশোরটাও বার্ধক্যের মত! নটবরের মনে হয় তার আর নাতির দৈহিক সামর্থ্য বোধ হয় এক। বলা যায় না, কমও হতে পারে! এই তো সেদিন, এত বড় ছেলে, শুঁয়োপোকা লেগেছে বলে কী কান্নাটাই না কানল!নটবর আর শিবানি এই সব আলোচনা করছে, এমন সময় বাইরে থেকে মিছিলের আওয়াজ আসে। যেকোনো আওয়াজে বাইরে বেরিয়ে দেখবার কৌতুহল এখনও নটবর শিবানির আছে। বাইরে বেরিয়ে দেখে, বড় মিছিল বেরিয়েছে। প্রথমে বাইকের সারি। সেখানে চিমড়েও আছে। আরসব বাইকের সওয়ারি যারা, তাদের অনেককেই এর আগে বহুবার সাইকেল নিয়ে ‘আদর্শ’ মিছিল করতে দেখেছে নটবর! বাইকের মিছিল শেষ হতেই পতাকা হাতে দলে দলে অজস্র মানুষ! সেই মিছিলের আগায় কর্মসূচী নিয়ে শ্লোগান দিচ্ছে খোকন, আর মাঝামাঝিতেবন্দেমাতরম শ্লোগান দিচ্ছে অভিরামের ছোট বেটা গুণধর সুরেশ! নাতি ঘর থেকে বেরিয়ে এসে দাদুর হাত ধরে টেনে বলল, দাদু সেই কবিতাটা এনেছি। শুনবে?ঘরের চৌকিতে বসে কবিতা পড়ে নাতি, নটবরের চোখে ভাসেমায়াদি, রূপালি, অভিরামের বেটা,‘বন্দেমাতরম’শ্লোগান! মনে ভাসে ছোট্টোবেলায় দেখা মিছিলে‘বন্দেমাতরম’ বলা হারুকাকার মুখ! এই দুই শব্দকে মেলানো বড় কঠিন! অতীতে বর্তমানে হাবুডুবু খেতে খেতে নটবরের কানে আসে নাতির পড়া কবিতার লাইন! আরে, ওইহানডা কী পড়লা দাদা! ফির একবার পড়ো! আর একবার পড়ো!নাতি পড়েঃ ত্যাগব্রতের যাবজ্জীবন উদাহরণ হয়ে থাকবে ব’লেযারা এত দিন ট্রেনের থার্ড ক্লাসে চড়েছেসাধারণ মানুষের দুঃখদৈন্যের শরিক হয়েতারাই চলেছে এখন রকমারি তকমার চোপদার সাজানোদশঘোড়ার গাড়ি হাঁকিয়েপথচারীদের হটিয়ে দিয়ে, তফাৎ ক’রে দিয়েসমস্ত সামনেওয়ালাকে পিছনে ফেলেপর-ঘর বিদেশী বানিয়ে।হ্যাঁ, ওরাও উদ্বাস্তু।কেউ উৎখাত ভিটেমাটি থেকে কেউ উৎখাত আদর্শ থেকে।নটবরের চোখে ভাসতে থাকে ছোট্টবেলার আবছা স্মৃতি- হারুকাকার হাতের তেরঙ্গা, নেহেরুপল্লীতে মায়েপোয়ের অস্তিত্বের লড়াই, যৌবনের নেহেরুপল্লীর অলিতে গলিতে মশাল মিছিল, ঠাস ঠাস বুলেটের শব্দের পাশে অস্ফুট ইনকিলাব জিন্দাবাদ,পাট্টা পাওয়ার দিনগুলোয় কদমের ডাল, চায়ের দোকানের বেড়ার খাঁজে খাঁজে লাল নিশান, সাদা ধুতি আর লাল পতাকার দিন…তারপর লাল পতাকার কাঁধের ফতুয়ার ফাঁকে ঝকঝকে মোটা সোনার চেন, এল.সি. অফিসের ধমকি, খোকনের মার খেয়ে ফুলে যাওয়া গাল! ছবি কেবল দুলতেই থাকে,দুলতেই থাকে। নটবরের মনে হয়, সে যেন এই নেহেরুপল্লীর গায়ে শ্যাওলা পড়া কচ্ছপ! তাকে ঢুকে যেতে হবে আরো গভিরে, আরো অনেক গভিরে, যেখানে মাথার উপরে চাইলে দেখা যাবে শুধু নীল নয়তো ঘোলাটে জল, আশে পাশে ঘুরঘুর করবে আরও কয়েকজন আদিম কচ্ছপ যাদের হাতে কখনও কোনো ঝান্ডা ছিল না, যাদের হাতে কখনও কোনো মোবাইল ফোন ছিল না, যাদের কোনো স্লোগান ছিল না, কোনো চাওয়া পাওয়ার হিসেব ছিল না! ছিল একটা পৃথিবী। যেখানে গাছে গাছে ফুল ছিল, ফুলে মৌমাছি ছিল, নীল রঙের আকাশ ছিল, বটগাছের ছায়ার মত মা ছিল, বউ ছিল, পাখির ডাকের মত ছিল ছেলেপুলের কলতান! নটবরের মনে হয়, নেহেরু পল্লীর আকাশে যেন কোন দেশের মেকি মেঘ ভেঙে পড়েছে! শ্বাসরোধী দূষণের কালো মেঘ! যার বৃষ্টিতে গায়ে জ্বালা ধরে! খেতের ফসল জ্বলে যায়! যেন আরও গভিরে সাঁতরে ঢুকে যেতে হবে তাকে যেখান থেকে চোখে পড়বে না আর ভাঙা বাড়ির ভাঙাচুরো কান্না, ভাঙা চরিত্রের ভাঙা মুখে বন্দেমাতরম!নাতির ঠেলায় গঙিয়ে ওঠে নটবর।ও দাদু! কবিতা বললেই তুমি এমন কাঁদো কেন?দাদুরে! কে লিখছেন কও তো কবিতাডা!অচিন্ত্য কুমার সেনগুপ্ত।দেখছো দাদু, চোখ মুছতে মুছতে নটবর বলে, কবিরা কত জানেন! তুমারে কইছিলাম না, কবিরা সব জানেন! আজ দেখলা তো!কী আবার দেখলাম!দেখলা না! নাতিকে কথাগুলো বলতে গিয়েই থমকে যান বৃদ্ধ নটবর সাহা। ফুলগাছে কি আর ভার দেওয়া সাজে?নাতি বলে, কী বলছ বলো না!কিছু না দাদু, কিছু না! তুমি পড়ো, মন দিয়া পড়ো। যা পড়বা তা বুইঝো, নিজের জীবনে মাইনো, কেমন!
……………………………………………
ভজনানন্দ প্রেমগিরির সভায় এখন মাঝে মাঝেই যান নটবর। সত্য বলতে কি খারাপ খুব একটা লাগে না। সারাদিনের ক্যাঁচর ক্যাঁচর বাদ থেকে খানিক ধম্মকথা তো কানে যায়। তাছাড়া মোহমুক্তির পথে তো তাকে যেতেই হবে, হক কথাই তো বলেন মহারাজ। যে বয়সে এসে দাঁড়িয়েছেন আর যেভাবে দুনিয়া বদলেছে তাতে যত তাড়াতাড়ি এই মোহ মুক্তি হয় ততই মঙ্গল।নটবর প্রিমিয়ার ভক্ত হওয়ায়হর দিন মিনিট পাঁচেক ডাউট ক্লিয়ারিং এর সুযোগ পান । কোনো না কোনো প্রশ্ন থাকেই নটবরের। গুরুজীও হাসি মুখে উত্তর দেওয়ার শেষে উদাত্ত কন্ঠে শ্লোক আওড়ান। বুঝুক নাই বুঝুক, নটবরের বেশ লাগে।সবই ঠিক আছে। অন্তরে অন্দরে প্রায় সব মোহই মুক্ত হয়ে গেছে। ছেলেপুলে নাতি প্রতিবেশী কোনো কিছুতেই আর তেমন বিচলিত হন না। কেবল বাড়ির প্রশ্ন এলেই অন্তরের কোত্থেকে যে ‘না’ কথাটি এসে ঠোঁটে জোটে সে নটবর ঠাহর করতে পারে না! ছেলেপুলে রেগুলার এসে খোঁচায়। সুমিও মাঝেমধ্যে শ্বশুর বাড়ি থেকে এসে বলে টলে। বাড়ি বেচলে তো সুমিরও দুপয়সা লাভ হয়। জামাইয়ের দোকানখানা আরেকটু ভালো করা যায়। একটা গোডাউন নিতে পারে ইত্যাদি ইত্যাদি। শিবানিও সময় সময় বোঝায়। ছেলেপুলের লাইগাই তো বাড়ি। অগো হক্কলেরই  যহন সুবিধা হয়, ছাইড়াই দ্যাও। আর আমাগো তো ঘর দিবে কইছেই। ট্যাহাও যা দিবে চইলা যাবে ঠিক। দিইয়াই দ্যাও।সব বোঝে নটবর। মনে মনে তৈরিও হয়। অথচ ছেলে হোক বা চিমড়ে, বাড়ির কথা জিজ্ঞেস করলেই সেই ‘না’ কোত্থেকে উজিয়ে আসে। ‘না’ এর ঠেলায় একেবারে জেরবার নটবর। মনে মনে ভাবে প্রেমগিরি মহারাজকে জিজ্ঞাসা করবে। জ্ঞানী মানুষ। ঠিক পথ দেখাবেন।মঙ্গলবার করে ছোট মার্কেট যায়। সকালে তাই নটবরই বাজারে আসে।আজ বৃহস্পতি। গেল পরশু বাজার সেরে ফেরার সময় হরিরাম হোমিয়োপ্যাথের সাথে নটবরের দেখা। ধরে নিয়ে তারকের চায়ের দোকানে বসল। একথা ওকথার পর বলল, নটোদা! বাড়ি বেচতে রাজি হচ্ছ না বুঝি?তরে কইলো ক্যাডা? খোকনায়, না ছুটো?ওরা কেউ না। ও এমনিই বোঝা যায়।এমনি ক্যামনে বুঝস?ক্যামনে আবার? রাজি হলে শম্ভু তোমাকে প্রেমগিরির কাছে নেবে কেন?মহারাজ বুঝি রাজি করনে অ্যাক্সপার্ট?যাও তো! বোঝো না?বুঝি তো! কিন্তু কই কি, কাম তো হয় না। মাথা থেইক্যা ‘না’ কথাডা তো যায়ই না!যাবেও না। তোমাদের মত মানুষ নটোদা, যাদের রক্ত দিয়ে বাড়ির ইঁট গাঁথা, তাদের মগজে না প্রেমগিরির বাক্যের কড়া অ্যান্টিডোট ঠাসা আছে। বাবাজীর কথা আসা মাত্র কাটাকাটি হয়ে যায়।তুই যাস ক্যা হেইডা ক’তো!আমারও খানিকটা তোমার মতই কেস। তবে তোমার হলো গোটা বাড়ি আর আমার হলো ডিসপেনসারি। যাই হোক, আবেগটা প্রায় একই।হ, তা তো বটেই। তা তরেও কি প্রমোটার লইয়া গ্যাছে?আর কে? আমার ছোটো জায়গা, ঝঞ্ঝাট কম বলে জেনারেল ভক্তশিপ নিয়েছে। তোমার জায়গা বেশি, কাজেই তুমি প্রিমিয়ার। তবে কি জানো, নটোদা! ভজন বাবাজীর জ্ঞান থাকলেও ভন্ড!তর তো উই অ্যাক দুষ। সন্দহবাতিক। হালার চিকিৎসা করতেও যা সব জিগাস! জ্বর লইয়া গেলে তারে জিগাস কুন জাগা তার ভালা লাগে? ঘরের ভিতর না খুলা মাঠ? বাস আইতে দেরি হইলে খাড়াইয়া থাহেন না পায়চারি করেন? ক’তো! ইয়ার কুনো যুক্তি আছে?আছে গো দাদা, যুক্তি আছে। হোমিয়োপ্যাথি অত সহজ নয়। মানুষের মন বুঝতে হয়। প্রশ্ন করে করে ক্যাটাগোরাইজ করতে হয়।তুই তাই করগা। আমি উঠি।দাঁড়াও না, কেন ভন্ড বললাম শুনে যাও।অল্পের উপর দিয়া ক। বাসায় ম্যালা কাম।আরে শোনোই না, কাম একদিন কম হলে মহাভারত অশুদ্ধ হবে না। জানো তো, একদিন কথায় কথায় মহারাজকে জিজ্ঞাসা করেছি, মহারাজ! আপনি তো দশনামী সম্প্রদায়ের। আপনার আদিগুরু কে? তো সে কী চোটপাট! শেষে কী বলল জানো, বলে কিনা, হরিরাম! আমি কোনো সম্প্রদায়ের নই। আমি একম। বললাম, মহারাজ অপরাধ নেবেন না, আপনি যে ‘গিরি’ উপাধি ব্যবহার করেন! তো বলে কি না, তাতে কী! নামে কি এসে যায়? নাম পদবী এসব তো বহিরঙ্গ, অন্তরঙ্গে সব এক। সবই ব্রহ্ম! বলেই শ্লোক!আর অমনি তুই বুইঝা গেলি বাবাজী ভন্ড লোক! বলিহারি! আরে, ঠিকই তো কইছেন উনি, নামে কী আইসা যায়! তর নাম আগে আইছে না তুই আগে আইছস ক’তো? এই বুদ্ধি লইয়া তুই ওষুধ দেস কী কইরা ক’তো! ধুস!কথা আর না বাড়িয়ে নটবর বাড়ি চলে এসেছে। কিন্তু হরিরাম হোমিয়োপ্যাথের কথাও হোমিয়োপ্যাথির ডোজের মতই কাজ করেছে। ডাইলিউটেড ডোজ, কিন্তু সিম্পটমে মিলে যাওয়ায় ম্যাজিকাল এফেক্ট দিচ্ছে! নটবরের মনেও এদিক ওদিক ছড়িয়ে থাকা টুকরো টুকরো সন্দেহর মেঘ ক্রমশঃ দানা বাঁধতে শুরু করেছে।অবশ্য নটবরের প্রশ্নের উত্তর ঠিকই মিলছে, তবুও কোথায় যেন একটা খিঁচ থেকে যাচ্ছে।এই তো কালই প্রেমগিরি মহারাজকর্মযোগ বোঝাচ্ছিলেন। কত কথা! নটবরের কেন যেন মনে হচ্ছিল, মহারাজ কেমন যেন ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একই কথায় আসছেন। কেবলই বলছেন, কর্ম করো কর্ম করো! কিন্তু এমন ভাবে করো যাতে গায়ে বাঁধন না কষে বসে। সব কর্ম শ্রীকৃষ্ণের জন্যে আদতে করছ, কাজেই সব কর্ম তাঁর চরণে উৎসর্গ করলে আর কর্মের বন্ধন থাকে না! বেশ কথা। কিন্তু তার পরেই মহারাজ চলে গেলেন অন্য পথে! বললেন, বাড়ি হলো আসলেমোহ। অজ্ঞান মায়া। শ্রীকৃষ্ণ থাকবার জন্যে আকাশের মত এত বড় ছাত দিয়েছেন, বাতাস দিয়েছেন, গাছে গাছে ফল দিয়েছেন তো কীসের মোহে এই নস্বর বাড়ি আটকে বন্ধন বাড়ানো! এ বিশ্বের সমস্ত ধুলোয় ধুলোয়, সমস্ত জীবে তো তিনিই। কাজেই নিজের মোহে বাড়ি আটকে রেখে আরও অন্তত ষোলটা পরিবারের চার ষোল চৌষট্টি জীবে বিস্তৃত তাঁকে গৃহহীন করা তো তাঁকেই অসম্মান করা! এই ভাবে পাপের বোঝা বাড়ানো কি উচিত! তাছাড়া তিনি তো ভক্তের ব্যবস্থা করেই পদক্ষেপ নেন। ভক্তের টালির চাল বদলে টি.এম.টি. বার শোভিত ছাদ, ধবল গাইয়ের মত ধপধপে মার্বেল মেঝে যদি উনি দিতে চান, ভক্তর তো উচিত তাকে সাগ্রহে সানন্দে গ্রহণ করা!নটবর সেদিন আর সামনে না বসে হরির সাথেই বসেছিল। হরি নটবরকে একবার চোখের ইশারা করল, যার মানে দাঁড়ায়, দেখলে তো!হরি প্রশ্নোত্তরের সময় মহারাজের কাছে নিবেদন করল, মহারাজ! আমারও তো অন্তরে নিশ্চয়ই শ্রীকৃষ্ণ। আমি তো যতবার তাঁর ধ্যান করি, অন্তর থেকে কথা আসে, ওহে হরিরাম! লড়ে যাও! যে ডিসপেনসারি তোমায় মান দিয়েছে, খাওয়া দিয়েছে, পাঁচ জন কেষ্টর জীবের কষ্টে বিনে পয়সায় ওষুধ দিয়েছে, তার রক্ষাকর্তা হয়ে এত সহজে তাকে নষ্ট হতে দিয়ো না। ওকে রক্ষা করাই তোমার কর্ম!সে তোমার মোহ বলেন হরি, শ্রীকৃষ্ণ নন। এত সহজে তাঁকে পাওয়া যায় নাকি!সে কি মহারাজ! সেদিনই তো বললেন তাঁকে সেবা করাই সবচেয়ে সহজ! তবে! আমি তো মহারাজ, নিষ্কাম কর্মই করি ডিস্পেনসারিতে! আজ নয়। না হোক প্রায় বছর চল্লিশ। আজ লাখ পাঁচেক টাকার বদলে সেই সেবা চুকিয়ে দেওয়া আমার কর্ম না লড়াই করে সেবা করা আমার কর্ম আপনিই বলুন!মহারাজ সরাসরি হরির কথার উত্তর দিলেন না। বদলে রহস্য করলেন! স্মিত হেসে বললেন, কী যে কর্ম আর কীযে অকর্ম সে নিয়ে জ্ঞানীরাই বিভ্রান্ত হয় হরি, সেখানে তো তুমি শিশু! সর্বজ্ঞানী কবিরাও পর্যন্ত জানেন না! কবয়ো ন বিদুঃ, বুঝলে, কবয়ো ন বিদুঃ!কবি শব্দের ব্যুৎপত্তি, অর্থের বিস্তার, বা বর্তমান পরিসর কোনোটাই নটবরের জানা নেই। নটবর জানেন, কবি সাধারণ মানুষ নন। নটবর মানেন, সাধারণ মানুষ দেখতে পান না এমন অনেককিছু কবিরা দেখেন। নটবর বাগবাজারে মায়ের বাড়িতে নিজে কানে শুনেছেন কবি হলেন সর্বজ্ঞ। কবি বর্তমান দেখেন, ভূত সম্পর্কে ধারণা করেন, ভবিষ্যতের আয়নায় কল্পনায় নিজেকে দেখতে জানেন, তিনি তো দার্শনিক। কাজেই তিনিও জানেন না! অথচ প্রেমগিরি মহারাজ জানেন! এ কথাটা তার বিশ্বাস হয় না। কাজেই নটবর দুম করে বলে ফেলে, মহারাজ! অপরাধ নিয়েন না! আমি এই কথাডায় ঠিক প্রত্যয় পাই না! কবিরা জানেন না! তাই হয়! তবে সাধারণ মাইনষে কী কইরা জানব!বাবাজী এ কথায়ও হাসেন। তারপর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গীমায় চোখের মণি ঊর্ধ্বে তোলেন। গমগম করে উচ্চারণ করেন, “কিং কর্ম কিমকর্মেতি কবয়োহপ্যত্র মোহিতাঃ তত্তে কর্ম প্রবক্ষ্যামি যজ্ জ্ঞাত্বা মোক্ষ্যসেহশুভাৎ”বলতে বলতেই বাবাজী ধ্যানস্থ হন। নিশ্ছিদ্র নীরবতা নেমে আসে প্রবচন কক্ষে। কেবলমাত্র ফ্যানের ঘসঘসানি ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। এমনিই কাটলো মিনিট পাঁচেক যতক্ষণ না শিষ্যারা সান্ধ্যপ্রার্থনা শুরু করলেন!উত্তর না মেলায় কাল থেকেই মনটা বিগড়েছে। ফেরার পথে হরিরামের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। হরিরাম বলছিল, কিচ্ছু করার নেই গো নটোদা! এ এক অদ্ভুত সময়! এক যুগ থেকে আরেক যুগের সন্ধিক্ষণ। আমরা তার মাঝে পড়ে গেছি! চাইলেও বেশিদিন আর টিকিয়ে রাখতে পারবা না। দেখছো না, প্রেমগিরির মত পন্ডিত মানুষ কেমন ওদের হয়ে কাজ করেন! কেমন সাধনার তত্ত্বগুলোকে নিজের মত করে বানিয়ে বলেন! আমি তো তোমার থেকে খানিক ছোট নটবরদা! কাজেই আর কী করে তা বললাম না। একদিন রাত্রিবেলা এসে দেখো। দেখবে কত বাইকের লাইন। আর তেনাদের প্রবচনের স্থল আমাদের মত সমক্ষে নয়, ভিতরে!নটবর চুপ করে হাঁটছিল। হরি বলেই চলেছিল। পন্ডিতরাই যখন বিকিয়ে নটদা, বাকি ক্ষমতাবান মানুষদের কথা তো বুঝতেই পারো। সব এদের হাতে। আজ হোক, কাল হোক, তোমার বাড়ি আমার ডিসপেনসারি সব যাবে!নটবর বলে উঠল, জানি। তবু এইহানে আসি ক্যান জানস?জানি। আমিও তো সে জন্যেই আসি নটদা! যতদিন এইখানে এসে ডিসপেনসারির ভাঙাটাকে ঠেকিয়ে রাখা যায়!দুই বৃদ্ধ ঠুকঠুকিয়ে হেঁটে যায়। শেষ ভাদ্রের ঝিরঝিরে বাতাসে কোত্থেকে যেন বৃষ্টির গন্ধ ভাসে।
………………………………………………
পয়লা আশ্বিন। আজ খোকনের জন্মদিন। এই তো সেদিন যেন। খোকনকে কোলে করে বাড়ি ঢুকল শিবানি। মা শাঁখ বাজালো। আঁতুড় তো নাই, তবু অন্য ঘরে ওদের থাকার ব্যবস্থা করল। মুখ দেখেই বলল, ধইরাই তর বাপের মুখ! তারপর খোকন বড় হতে শুরু করল, আধো আধো বলে, টলমলো চলে। এমন খোকন আর কারো নাই! খোকন হাত ঘুরালে মা বলে, দ্যাখছস না ক্যামন নাচে! পা নাড়ালে বলে, দ্যাখছস না! দাদুর মত বল খেলে! হাঁ করলে গান শোনে, কানলে বাড়ি মাথায় ওঠে! সেই খোকন আজ এত্ত বড়! তারও পোলা নাইনে পড়ে! ভাবা যায়!নটবর সক্কাল সক্কাল উঠে দুধ এনে দেয়। পায়েসটা তো করুক খোকনের মা। দুপুরে কাজে আসবে যখন খাওয়ানো যাবে। বড় হয়ে যাক যতই জন্মদিনে পায়েস না হলে খোকন এখনও কষ্ট পায়! সে কি আর জানে না নটবর!বেলা বাড়ে! খোকনের আসার সময় পার হয়ে যায়। খোকন আসে না। নটবর আশ্বিনা রোদ্দুরে বাইরের গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে পথ দেখে। খোকন আসে না!ভিতর থেকে শিবানি ডাক পাড়ে, কী অইল! ভিতরে আসো না ক্যান! আশ্বিনা রোদ গায়ে লাগাইতে নাই! ঘরে আস। আসবনে খুকন। কুনো কামে আটকাইয়া পড়ছে হয়তো!আরো ঘন্টাখানেক দাঁড়িয়ে ঘরে ঢুকে যায় নটবর। ভেবেছিল আজ তিন বাপ ব্যাটা একসাথে খাবে! তা কই আর সে সব হলো।চুপচাপ নিরামিষ ভাত খেয়ে উঠে যায় নটবর। শিবানি সাধলেও মাছ খায় না। আসলে এক বেলা এখন মাছ খায় নটবর। টুকড়োটা বাঁচিয়ে রাখে। যদি ছেলেদের সাথে রাতে খাওয়া যায়!রাগও হয় ছেলেদের উপর! বচ্ছরে এই একটা দিনও বাপের কাছে আসতে পারে না! বাপের সাথে বসে খেতে পারে না! অথচ এই ছেলেরাই একথালে খাবে বলে মারামারি করত! আর আজ! বাপের সাথে সম্পর্ক কেবল এই বাড়ি!বাড়ি! বাড়ি! বাড়ি! কী অসহ্য দায়! বাপের সাথে ছেলের সম্পর্ক কেবল বাড়ি! যা! দেবেই না নটবর! কাউরে দেবে না! যদ্দিন বেঁচে থাকে কাউরে দেবে না!এই সব ভাবতে ভাবতেই ফের নটবর চলে আসে বাইরের গ্রিলের ধারে। দরজাটা খুলে বাইরে তাকায় বারবার। নাঃ! কেউ নাই!গ্রিলটা বন্ধ করতে গিয়ে ফের তাকায় বাইরে! কেউ নাই!বিকাল বেলায় নটবর আজ আবার আসে প্রেমগিরির আশ্রমে। খোকনের জন্যে বসে থেকে থেকে আসতে একটু দেরিই হয়। যখন ঢোকে তখন প্রবচন শুরু হয়ে গিয়ে মাঝামাঝি। এদিক ওদিক চেয়ে হরিরামকে আজ আর খুঁজে পায় না নটবর। মনটা তারও উচাটন। না এলেই হত। উচাটন মনে বাবাজীর প্রবচন শোনে। শোনায় আর দেখায় সাযুজ্য পায় না, কথায় আর কাজে মিল পায় না! ধুস!তারপরেই নটবর ওইসব কথাটথা বলে প্রবচন কক্ষ ছাড়ে। আর তার বেরিয়ে যাওয়ার পথে চোখ রেখে ভজনানন্দ প্রেমগিরি বলেন ‘অর্বাচীন!’মনটা আজ বেজায় খিঁচড়ে আছে নটবরের। ফেরার পথে মুদি দোকান থেকে দুলাল ডাকে, ও নটোদা! ও নটোদা! নটবর হাত উঁচু করে পরে আসবে বলে ইশারা করে। দুলাল তবু ডাকে। শোনো না!দুলালের দোকানের দিকে এগোয়। দুলাল দোকান ছেড়ে বেরিয়ে এসে বাইরেটায় দাঁড়িয়ে গলা নামিয়ে বলে, শুনছো তো নটোদা!কী রে!সে কী! তুমি শুনো নাই! আমি ভাবলাম, তুমার বন্ধু মানুষ। তুমি হয়তো বেশি জানবা!নটবর উতলা হয়। কী কইতে চায় দুলাল?দুলাল নটবরের হাতটা ধরে গলাটা আরো আস্তে করে বলে, আরে হরিরামদার ব্যাপারটা তো জানোই। ওই যে ডিসপেনসারিটা! তা যাগো বাড়ি, তারা তো আগেই দিয়া দিছে। হরিরামদাই পুরানা ভাড়াইট্যা বইলা হঠাইতে পারে নাই।সে তো জানি!আইজ দুপুর বেলা ডিসপেনসারি বন্ধ করনের সময় কারা জানি ভিতরে ঢুইক্যা নাহক ভুল চিকিৎসার দুহাইনি দিয়া ভাঙচুর করছে। শুনছি ক্যারা জানি হরিরামদারে চড় পর্যন্ত মারছে!পাটা কাঁপতে থাকে নটবরের। মনে হয় এক্ষুণি একবার যায় হরিরামের বাড়ি। দুলালরে বলে, ক্যারে দুলাল! তুই না মস্তান আছিলি! চল দেহি তো কার এত বড় সাহস হরিরামরে অপমান করে! চল তো আমার লগে!কুথায় যাবা?ক্যান? হরিরামের বাড়ি।সে বাড়িতে কুথায়? সে তো হাসপাতালে! বাড়ি আইসাই কুয়া তলায় পইড়া গেছে! স্ট্রোক! পোলারা হাসপাতালে লইয়া গেছে!নটবরের মুখ থেকে কথা সরে না। দুলাল বলে, নটোদা! মস্তান আমিও আছিলাম। আজও ডরাই না কাওরে! তবু যা যা কানে আসে, তাইতে বলি, এ সময়ডা ভালো নাগো নটোদা! তুমারও তো বাড়ি লইয়া যা টানাটানি, সবই তো দেহি, সাবধানে থাইহো!নটবর যখন বাড়ি ফেরে, তখন শিবানি রান্নাঘরে। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে নটবর জানতে চায়, খোকন আইছিল?শিবানি মাথা নাড়ে।দীর্ঘশ্বাস ফেলে নটবর। কী দিন কুথায় আইল শিবানি!শিবানি আঁচলে চোখ মুছে বলে, চুপ কর! চা খাও!বাইরের গ্রিলে কে যেন নাড়া দেয়! নটবর বাইরে গিয়ে দেখে, কই কেউ তো না! গ্রিলটা বন্ধ করতে গিয়ে অভ্যেস মত বাইরের দিকটায় আরেকবার তাকায়। আরে! গলির মুখে আলো আঁধারি থেকে কে যেন উঁকি দেয় না ওদের বাড়ির দিকে! সমরের ব্যাটা না! চিমড়েডার পাছে পাছে ঘুরঘুর করে তো ওই ব্যাটা সারাক্ষণ! ও উঁকি মারে ক্যান? অই! অই পার্থ! শুইনা যা! কী হইছে?পার্থ এগিয়ে এসে বলে, তোমাদের বাড়িই আসছিলাম জ্যাঠা!ক্যান রে! কী অইছে?কোনোরকম ভণিতা না করে পার্থ বলে, খোকনদারে আটকাইয়া রাখছে!মুহূর্তে আগুন জ্বলে যায় নটবরের মাথায়। পার্থর কলার চেপে ধরে বৃদ্ধ নটবর সাহা! কার এত সাহস রে আমার খুকনরে আটকায়?পার্থ বৃদ্ধের হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করে। বলে, আমায় ধইরা লাভ নাই। অরে কেলাবে রাখছে। তুমি আইয়া লইয়া যাও।শিবানি কখন পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে। ডুকরে বলে ওঠে, কী গো তুমি যাও!খালি গা, লুঙ্গি পরা নটবর সাহা পার্থর সাথে পাড়ার ক্লাবে যায়। নামেই পাড়ার ক্লাব। সেখানে যারা আছে, সেখানে পার্থর মত দুই চারটে চ্যাঙড়া ছাড়া পাড়ার আর কেউ নাই। ষণ্ডা ষণ্ডা কয়েকটা লোক। তাদের কাছে গিয়ে পার্থ একজনকে বলে, হুলাদা, নটবরজ্যাঠা।হুলাদা নামের সেই মুষ্টান্ডা এগিয়ে আসে। নটবরের কাঁধে হাত রেখে বলে, এত কিচাং করছেন কেন দাদু? বাপ ব্যাটা মিলে শম্ভুদার ভালোই তো মেরে লিচ্চেন! কাজ তো কিছুই করছেন না!নটবর গলা চড়ায়, ভদ্রতা শেখোনাই? বাপের বয়সী মাইনষের সাথে কী কইরা কথা কইতে হয় জানো না? মস্তানি করতাছো? কোথায় মস্তনি করতাছো জানো! এইডা নেহেরু পল্লী! একবার হাঁক দিলে বাড়ি বাড়ি থেইক্যা লুক বাড়াইব!ক্লাবের ভিতরের ঘর থেকে দরজায় দুমদুম আওয়াজ পড়ছে। খোকনের গলা শোনা যায়, বাবারে যদি কিছুকরছ হুলাদা! মার্ডার কইরা ফ্যালাম!হুলা একবার সেদিকে তাকায়। তারপর শান্তভাবে নটবরের দিকে চেয়ে বলে, দাদু! বেশ জোরেই তো চ্যাঁচালেন! কোনো বাড়ি থেকে লোক বেরোলো? কেউ আসবে না! দিন বদলেছে দাদু! নেহেরুপল্লী এখন ভদ্রলোকের জায়গা!কথাটা সোজা বুকে লাগে নটবরের। কোত্থেকে যেন ছোটো দৌড়ে আসে। তেড়ে যায় হুলার দিকে! নটবর আটকায়। যাস না ছুটো! পাড়াডা এহন ভদ্রলুকের হয়া গ্যাছে! কেউ আইব না!তারপর হুলার দিকে চেয়ে বলে, শম্ভুরে কাল আইতে কোয়ো। কাগজপত্র সব লইয়া আইতে কোয়ো। এবার আমার খুকনরে ছাইড়া দ্যাও! পোলাডার আইজ…বলতে বলতে গলা বুজে যায় বৃদ্ধ নটবর সাহার!আরে দাদু! আগে বলবেন তো! ইস! খোকনের আজ জন্মদিন! কইরে! খোকনকে নিয়ে আয় তো! খোকন তো বলবে! কিচ্ছু বলে নি!নটবর চোখ মোছে। ভিতর থেকে বেরিয়ে আসে বিধ্বস্ত খোকন। তেড়ে যায় হুলার দিকে। ছোট জাপটে ধরে বাইরে নিয়ে আসে। তিন বাপ ব্যাটা যখন বাড়ি যায়, হুলা চেঁচিয়ে বলে, তা হলে কাল আসতে বলছি দাদু শম্ভুদাকে!বাড়ির উঠানে শিবানি খোকনকে জড়িয়ে ধরে কানতে থাকে। নটবর ধরা গলায় বলে, আঃ! কী করতাছো? পোলার জন্মদিনে মায়রে চক্ষের জল ফেলাইতে নাই! পোলাডা সারাদিন খায় নাই! এড্ডু পায়স দাও।উঠানে মোড়া পেতে তিন বাপ ব্যাটায় কাঁসার বাটিতে পায়েস খায়। ঘন ক্ষিরের পায়েস চোখের জলে নোনতা হয়ে ওঠে। বাঁ হাতের পিছন দিয়ে চোখ ডলে খোকন বলে ওঠে, কাউরে দিবা না বাবা! আসুক শম্ভুদা! কাল আমি কথা কমু!না বাবা! থাউক! নটবর বলেন, বাড়ি আমার প্রিয়! দ্যাশ থিক্যা উজাইয়া আইয়া মায়ে পোয়ে গড়া তো! কিন্তু বাবা, তুমরা যে আরও আপনার!নিজের রক্ত! বাড়ি রাখতে গিয়া তুমাদের কষ্ট তো আর আমি দেহনের পারুম না! তুমি বরং বাবা, শম্ভুরে কইয়ো ভাড়ায় থাকবার কইলে একখান বাড়ি নি দেহে!রাতের খাওয়া আজ একসাথেই সারে সবাই। খোকন বাড়ি চলে যায়। ছোটও চলে যায় নিজের ঘরে। বুড়ো বুড়ি ঘরে মুখোমুখি বসে থাকে চৌকির উপর!নটবর বলে, জানো খুকনের মা, আইজও আশ্বিন, আর হেইদিনও ছিল আশ্বিনের! মায় উপাস দিছিল! নারাণ পুজা নি কইর্যাু ঘরে ঢুকব! তুমিও একহান উপাস দিও! ঘর ছাড়নের…কথা আর বলতে পারে না নটবর। বাচ্চা ছেলের মত হাউ হাউ করে কাঁদে! শিবানি নটবরের মুখখানা সাপটে দ্যায়, জাপটে ধরে! কথা কইতে পারে না কোনো!নটবর কান্নার আবেগে ফোঁপায়। বলে, মহারাজ ঠিক কইছিল গো শিবানি, সব কিছু ছন্দে চলে! জীবন সব কিছু ঘুরাইয়া ঘুরাইয়া ফেরত লইয়া আসে!শিবানি নটবরের পিঠ ডলতে ডলতে বলে, চুপ কর! দুহাই তুমার, শান্ত হও! অ ছুটো, এই দ্যাখ না তর বাপে ক্যামন করে!ডাইকো না শিবানি! কাউরে ডাইকো না! কারও কিচ্ছু করনের নাই! এয়া অনিবার্য ছন্দ! কবিরাও নাকি জানেন না এই ছন্দ টপকাইতে!শিবানি শান্ত করবার চেষ্টা করে। ধীরে ধীরে কান্নার বেগ থেমে আসে। নটবর উঠে ঘরের কোণে রাখা ট্রাঙ্কগুলো হাতড়ায়। মায়ের ট্রাঙ্কটা খুলে একখান পুরোনো আফগান স্নোয়ের কৌটা বার করে। কৌটাখানা শিবানির হাতে দিয়ে বলে, এইহানে মুর দ্যাশের মাটি শিবানি! এয়ার মধ্যে এই ভিটার মাটি খানিক তুইল্যা রাইহো কাল!শিবানি আর পারে না! এই কৌটার মাটির গুরুত্ব সে জানে! কেঁদে উঠে বলে, কী কও তুমি? নটবর ফের ফোঁপায়। তারপর চোখ মুছে ধরা গলায় বলে, উঠ খুকনের মা! আজ ঘুমাইলে চলব না! গুছগাছ কর! সব গুছাইয়া লও। উদ্বাস্তু নটবরের কাইল উদ্বাস্তু হওনের দিন! গুছাইয়া লও! অঃ! আমার চশমাডা কুথায়! আশ্বিনের নিরালা রাত! রাস্তার শ্বারমেয় গুলোকে বাদ দিলে নেহেরু পল্লীর কোত্থাও আর নড়াচড়া নেই। কেবল এই ছোট্ট ঘরটায় যুদ্ধকালীন তৎপরতায় দুটো মানুষ ট্রাঙ্ক গোছায়। ট্রাঙ্ক গোছায় আর চোখ মোছে। চোখ মোছে আর ট্রাঙ্ক গোছায়।বাইরের পৃথিবীর ছন্দে তাতে কোনো ঘাত পরে না! মহাশূন্যের অনন্ত কটাহে পৃথিবী তার আপন ছন্দে ঘুরপাক খায়, তাই রাতের জ্যোৎস্নাও ধীরে ধীরে ফ্যাকাশে হতে থাকে ভোরের আলোয় মিশে যাবে বলে।