সুবীর সরকার

জোতদারের ধানের গোলায় আগুন। অথচ উদ্বেগহীন জোতদারের মুখে তখন তেভাগার গল্প। লাল পতাকা, কৃষকজনতা ও বারুদ বন্দুকের গাথাগল্প। গল্পপথে রক্তের দানা ফন্দিফিকির ও সমূহ চক্রান্তকথা। আগুন প্রায় নিভে আসে অথচ গল্প শেষ হতে চায় না। আদতে এক গল্প কিছুদূর গিয়েই নানা প্রশাখায় বিভক্ত। তাই এমন ধারাবাহিকতার মজাদার ফানুষ। এইসব গল্প খুঁটে খাই আমি। আমোদিত হই। আর বাড়ি ফিরবার পথে সন্ধে ও রাত্রির মধ্যপর্বে প্রায়শই বাঁশবাগান পড়ে। বাঁশবনের ভিতর অগণন জোনাকি।

সুবীর সরকার

মন্দ আলোর নদী। সামন্তরক্তের মতো। লোককথার ঝোলা কাঁধে অপরূপ সব কথোয়াল হেঁটে যান। তাঁরা হেঁটে যেতেই থাকেন। আর ভালোবাসার পাশে সন্ত্রাস-রক্ত-লালসার আগুন। জন্ম ও মরণ লেখে বাজপাখি। শীত আসে। উত্তর বাংলার মাঠে মাঠে কুয়াশা। সাদা বকের দল আসর বসায়। কুয়াশার ভিতর তারা উড়েও যায়। কুয়াশা পাতলা হতে থাকে। রোদ ভাসিয়ে নিয়ে যায় শীতসকাল। রোদ, মানে শীতের রোদ সর্বদাই সংক্রামক। কিঞ্চিত উদাসও করে হয়তো বা। মিনিটে মিনিটে আবার পাল্টে যায় রোদের রঙ ও রেখা।

রোদ প্রায়শ টেনে নিয়ে যায় আমাকে নদীর কাছে। নদী কখনো প্রবীণ হয় না জানি। এও জানি নদী থাকলেই নদীচর থাকবে। আর নদীচর মানেই বালির নকশাকাটা সুবিশাল সামিয়ানা। নদীর সাথে মাঝি মাল্লা ডিঙি নৌকো আর সারিগান এসবের আশ্চর্য যোগাযোগ। আবার শীতের নদী অন্যরকম। সে হাওয়া বাতাসের। সরষেখেতের আর তরমুজবাগানের। নদী আমাকে টানে। উসকে দেয়। ঝাউগাছের পৃথিবীতে একা থাকবার কোন কষ্ট থাকে না। চাঁদওভীষণমাত্রায় ডাকে আমাকে। নদীপথে কাহিনী তৈরী হয় কতশত। আর কাহিনী সমূহে মিশে যেতে থাকে লোকগান। লোকবাজনা। নদীকে উপাস্য ভেবে আমাদের উত্তরবাংলায় গান বাঁধা হয়।

পুজোর ফুলে ভরে ওঠে নদীগর্ভ। উত্তরবাংলার রাজবংশী মহিলারা দলবদ্ধ হয়ে নাচে। তিস্তা বুড়ির পুজো হয়। বাজে ঢাক আর ঢোল। এই ভাবে অন্ধকার ও আলোয় পূর্ণ হয়ে উঠতে থাকি আমি। আবেগ টেনে আনে চোখের জল। আবার চোখের জল দিয়ে মাঝে মাঝে অন্যমনস্ক এঁকে রাখি বিকেল। বিকেল প্রসঙ্গে খুব, খুব চলে আসে পুকুরঘাট। নৈঃশব্দ খানিকটা। পুকুরঘাটে কেউ কেউ হারিয়ে ফেলে নাকছাবি। রুপোর বিছে। লণ্ঠনের মৃদুআলোয় শুরু হয় অনুসন্ধান পরব। আবার কুয়াশা নামে। কুয়াশা জড়ানো হাসপাতালের বারান্দায় এলোমেলো আর একা আমি হাঁটি কিঞ্চিত আলগোছে।