অ্যালবার্ট অশোক

রবিঠাকুরের একক সাহিত্য শিল্প দিয়ে বাঙ্গালির বা ভারতীয়দের শিল্প সাহিত্য যদি কেউ ভাবে, উন্নত মানের তো তিনি মূর্খের স্বর্গে বাস করছেন। নোবেল পুরস্কার যদি মেধার নির্ণায়ক হয় তাহলে দেখবেন, গত ১০০ বছরে ১১৬টা সাহিত্যের নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে সুইডিশ অ্যাকাডেমি থেকে। বাংলা সাহিত্যে ১টা আর সেটা রবি ঠাকুর পেয়েছেন। যেখানে ইংলিশ ভাষায় ২৯টা, ফরাসি ভাষায় ১৪টা জার্মান ভাষায় ১৩, স্প্যানিশ ভাষায় ১১, সুইডিশ ৭টা পুরস্কার গেছে।

এগুলি শুধু সাহিত্যের হিসাব। অন্যান্য বিষয়ে যদি ধরা যায় নোবেল পুরস্কার, তাহলে দেখবেন ভারত ১২টা নোবেল (অর্থনীতি ও শান্তির নোবেল নিয়ে) সব মিলিয়ে পেয়েছে, আর তার উলটো দিকে আমেরিকা ৩৮৫টা, ব্রিটিশরা ১৩৩ টা, জার্মানি ১০৮টা, ফ্রান্স ৬৯টা, সুইডেন ৩২। (সূত্র: নোবেল অর্গানাইজেশন) বুঝতেই পারছেন, ভারতের ২৮টা স্টেট নিয়ে ১২টা পুরস্কার কোনও গৌরবের কথা নয়।

এগুলি গত ১০০ বছরের অধিক সময়ের কথা বলছি। বাংলা, প্রকৃত পক্ষে কিছু রাজনৈতিক শাসকের অপদার্থতায় মেধার দিকে পিছিয়ে আছে।ইউনিভারসিটিগুলিতে পড়া হয় না, রাজনৈতিক কুস্তির আখড়া মাত্র। নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভাল, এই নিরিখে, কিছু খবরের কাগজের দালালিতে বাংলাতে কিছু সাহিত্যিকের নাম আছে, যারা রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে নানা পুরষ্কারের ভূষিত, ও বিখ্যাত। কিন্তু যতই আস্ফালন এনারা করুন আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নয়। এমনকি, বাঙ্গালিরা এত বেশী ঈর্ষায় ভোগে, যোগ্য না হয়েই, তা দেখা যায় রবিঠাকুরের বেলায়।

১৯১৩ সালে রবিঠাকুরের নোবেল পুরস্কারের সুপারিশ বা নির্বাচন করেন Thomas Sturge Moore। মুর একজন ব্রিটিশ কবি, নাট্যকার, ও শিল্পী, ১৯৭০ সালে জন্মান, রবিঠাকুরের চেয়ে ৯ বছরের ছোট। ১৯১১ সালে দ্য গ্রেট ব্রিটেন রয়্যাল সোসাইটি অব লিটারেচারের একটা গুরুত্বপূর্ণ পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন।

৫২ বছরে, ১৯১৩ সালে, রবিঠাকুর নোবেল পুরস্কার (the Nobel Prize for literature by the Swedish Academy of Stockholm)পান, গীতাঞ্জলীর ভূমিকায় W.B. Yeats লিখলেন, “Rabindranath Tagore, like Chaucer’s forerunners, writes music for his words, and one understands at every moment that he is so abundant, so spontaneous, so daring in his passion, so full of surprise, because he is doing something which has never seemed strange, unnatural, or in need of defense.”

ফলে নোবেল পাওয়ার পর পশ্চিম রবিঠাকুরকে a mystical Eastern sage বলে ভাবত শুরু করল। নোবেলের পর রবি ঠাকুরের লেখা অনেক বিশ্ববিখ্যাত লেখক কবি Pablo Neruda, Andre Gide, Yasanuri Kawabata, Robert Frost and Octavio Paz এবং কবি Hart Crane এর মন ছুঁয়ে গেল। নোবেল পাওয়ার পর দেখলেন, যে বাঙ্গালিরা তাকে পছন্দ করতনা, নিন্দে করত, সমালোচনা করত তারা তাকে অভিনন্দন জানাতে এসেছে। তিনি খুব ব্যথিত হয়েছিলেন।

সবাই তাকে অসহযোগিতা করত শত্রুর মত বিশেষ করে বাঙালিরা। আর তিনি সমাজে একজন প্রতিষ্ঠান নির্মাতা হিসাবে নিজেকে খুবই একা ভাবতেন। নোবেল পাওয়ার পর এরকম একটা গুজব উঠেছিল Yeats নাকি গীতাঞ্জলী নিজেই নতুন করে লিখে দিয়েছিলেন।

Sir Valentine Chirol বলে একজন সাংবাদিক , যিনি কলকাতার হয়ে দ্য টাইমস পত্রিকার কাজ করতেন, তিনি দ্য টাইমস পত্রিকায় লিখলেন, ‘অনেক অভিযোগ উঠছে, রবি ঠাকুর, অন্যের শ্রমের পুরস্কার পেয়েছেন। (–led public accusations thatTagore was essentially taking credit for someone else’s labour.)’

মনের দুঃখে রবিঠাকুর আবার থমাস স্টার্জ মুরকে লিখলেন, ‘ভ্যালাইন্টাইন কিরল (Valentine Chirol) অভিযোগ করছে, ইংলিশ গীতাঞ্জলী নাকি ইয়েটের (Yeats) লেখা…।’ (সূত্র: ইন্টার ন্যাশনাল জার্নাল অব দ্য হিউম্যানিটিজ)

রবিঠাকুর কে? এরকম প্রশ্ন, ঘৃণার সাথে জেগে উঠেছিল ইংলিশ দেশগুলিতে। দ্য লস-অ্যাঞ্জেল টাইমস লিখল, “রেকর্ড হল, সাদা চামড়ার কাউকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়নি….” একজন পত্রিকার কলম লিখিয়ে (Gordon Ray Young) বললেন, জঘন্য সিদ্ধান্ত; ওযোগ্য হিন্দু কবিকে নোবেল দেওয়া হল (The Ignoble Decision: Hindu Poet Unworthy of Nobel Prize, “The Nobel Prize for Literature has been awarded to a Hindu poet whose name few people can pronounce, with whose work fewer in America are familiar, and whose claim for that high distinction still fewer will recognise…”) ব্রিটিশ প্রেস, গর্বের সাথে লিখল, ব্রিটিশ এম্পায়ারের (‘subject of the British Empire!) এক প্রজা পুরস্কার পেয়েছেন।

রবীন্দ্রনাথ তার গীতাঞ্জলীর ইংরেজি অনুবাদ লেখা শুরু করেন শান্তিনিকেতনের (তখন মহর্ষি দেবেন্দ্র নাথ ঠাকুরের আশ্রম) গেস্ট হাউসের সেকেন্ড ফ্লোরে থাকাকালীন।তার মনে অনেক দ্বন্দ্ব ছিল ইংরেজি তিনি ঠিক লিখতে পারবেন কিনা। তার মনে হয়েছিল, লোকে বলবে, অনুবাদ বুঝি অ্যান্দ্রু্জ (Charles Freer Andrews)করে দিয়েছে। রবিঠাকুরের সঙ্গে অ্যান্ড্রুজ সাক্ষাৎ ইংল্যান্ডে হয় ২০১২ সালে, ২০১৪ সালে অ্যান্ড্রুজ, তার চাকরি ইস্তফা দিয়ে ভারতে, শান্তিনিকেতনে চলে আসেন। অ্যান্ড্রুজ একজন মিশনারি ছিলেন, ভারতে এসে মহাত্মা গান্ধীর সাথে যোগ দেন ও ভারতের স্বাধীনতার সাথে জড়িয়ে পড়েন।

রবিঠাকুর লন্ডনে গেলে কিছু সাহিত্যিক ও কবির সঙ্গে পরিচিত হন। তাদের মধ্যে Ezra Pound এবং Thomas Sturge Moore উল্লেখযোগ্য লন্ডনে, ইয়েটসের (W.B. Yeats) সঙ্গে এক বন্ধুর (William Rothenstein) মারফত পরিচয় ঘটে। ১৯১২ সালের ৭ ই জুলাই। উইলিয়াম রদেনস্টাইন ছিলেন এক পেইন্টার, শিল্পী। রবিঠাকুর তাঁকে তাঁর লেখা প্রথমে দেখান, রদেনস্টাইন একেবারে ঠিক জায়গায়, (ইয়েটস এর কাছে) রবি ঠাকুরের লেখা পাঠিয়ে দেন। ইয়েটস, একজন আইরিশ কবি,সেই সময় লন্ডনে বিখ্যাত প্রভাবশালী, রবিঠাকুরের লেখা পড়ে প্রশংসায় পঞ্চমুখ। তিনি বলেন এই লেখা ইম্প্রুভ করা যাবেনা।যদি কেউ বলে এডিট করতে তাহলে সে সাহিত্য বুঝে না।

ইয়েটস শুধু বললেন তিনি একটা ভূমিকা শুধু লিখে দেবেন। আর গীতাঞ্জলী ২০১২তে লন্ডনে India Society প্রথম প্রকাশ করে, এবং একবছরের মধ্যে এক ডজন রিপ্রিন্ট হয়। ইয়েটস যেখানে তার প্রভাব আছে, সুযোগ পেয়েছেন, সেখানেই রবিঠাকুরকে প্রচার করেছেন।

গীতাঞ্জলি ১৫৭টা কবিতার সংকলন। বন্ধুর মারফত Yeats এর সঙ্গে রবিঠাকুরের পরিচয়। অনুবাদ করতে Yeats রাজি ও তার মধ্য দিয়ে এজরা পাউন্ডের সঙ্গেও পরিচয়। এজরা পাউন্ডও কিছু অনুবাদ করেন। বলা হয়, এটা প্রকাশ হলে সবাই ভাববে একটা ধার্মিকদের বই। বোধগম্যতার বাইরে অতীন্দ্রিয়র কথাবার্তা। এমন ধোঁয়াশা বা দুর্বোধ করে লেখা। তার অন্যান্য লেখার চেয়ে গীতাঞ্জলী অনেক বেশি অতীন্দ্রীয়বাদী লেখা। অনেক কবিতাই আধ্যাত্মিক ভাবনার আনন্দময় সুরে প্রকৃতিকে নিয়ে লেখা।

সব শেষে তিনটে নাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির সঙ্গে জড়িয়ে আছে। প্রথমত উইলিয়াম রদেনস্টাইন, যিনি লন্ডনে বিভিন্ন বিখ্যাত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ ও পরিচয় করে দেন। দ্বিতীয়ত ইয়েটসের (W.B. Yeats) এগিয়ে আসা ও তার সুনাম দিয়ে রবিঠাকুরকে ইংল্যান্ডে মহান বানানো, তৃতীয়ত স্টার্জ মুর, Thomas Sturge Moore যিনি রবিঠাকুরের নোবেল কমিটির কাছে সুপারিশ করেন।