বর্ণালি মিত্র

শিশির মঞ্চ থেকে গান ও আবৃত্তির এক মনোজ্ঞ অনুষ্ঠান শুনে ফিরছি। রাত তখন সাড়ে ন’টা পার হয়ে গিয়েছে। আমার বাড়ির পথের কোনও বাস, মিনিবাসের দেখা নেই। ট্যাক্সিচালকরাও যথারীতি তাঁদের মজ্জাগত, অভ্যস্ত আচরণ শুরু করেছেন। ‘ওদিকে যাবনা’, ‘২০০ টাকার কন্ট্রাক্টে যাবেন ?’ ইত্যাদি। ‘No refusal’ লেখা গায়ে ঝুলিয়ে, বুক ফুলিয়ে, মুখ খিঁচিয়ে প্রত্যাখ্যান করাটাই তো ওদের পরিচিত দস্তুর।

মিনিট পঁচিশেক পর ভিড়ে ঠাসা এক ঘুরপথের মিনিবাস এল, উঠে পড়লাম ঠেলেঠুলে। সৌভাগ্যক্রমে খানিক বাদে চালকের ঠিক পিছনের প্রথম সিটে বসার জায়গায়ও মিলে গেল। দেখে নিলাম সেটি প্রবীণ অথবা প্রতিবন্ধী নাগরিকের জন্য সংরক্ষিত নয়।
আধঘন্টা যাবৎ বাসের প্রতীক্ষা, ট্যাক্সি-তন্ত্রের বেয়াদপি আর অসাধুতায় মন ভীষণ রকম তেতো হয়ে আছে। ‘বাংলার ৫’ গোছের মুখ করে জানলার দিকে চেয়ে রইলাম। বাসের সকলেরই গরমে ক্লান্ত, বিধ্বস্ত চেহারা। আমার পাশের আসনে এক মাঝবয়সী ভদ্রলোক আগে থাকতেই বসা ছিলেন। এক মহিলা ভিড়ের ঠেলায় সামনে এসে দাঁড়ানো মাত্র ভদ্রলোক উঠে তাঁকে বসতে দিলেন। মহিলা কিছুদূরে নেমে গেলে পর আরও একজনকে তিনি আসন ছেড়ে দিলেন, নিজে দাঁড়িয়ে রইলেন ভিড়ের চাপে হেলে। ভদ্রলোক পুনরায় বসার পর দেখলাম, আশেপাশে যে বয়েসী যাত্রী-ই এসে দাঁড়াচ্ছেন, তাঁদের কাঁধের ঝোলা, হাতের ব্যাগ সেধে নিয়ে নিজের কোলে রাখতে থাকলেন। একসময় দেখা গেল কোলের স্তূপাকৃতি ব্যাগে তাঁর গলা পর্যন্ত ঢেকে গিয়েছে। ওপর দিয়ে কেবল জেগে রয়েছে মুখটুকু। আর জেগে থাকা সেই ঘর্মাক্ত মুখে লেশমাত্র অ-স্বাচ্ছন্দ্যের ছায়া নেই লেগে। সবটাই লক্ষ্য করে চললাম অবাক চোখে।
হঠাৎ খেয়াল হোল, মনের তিক্ত ভাবটা একেবারে উধাও। নিজের মনকে প্রশ্ন করলাম, কীভাবে ? যে কোনও মহৎ বা ভালো মনের মানুষদের চারিদিকে বোধহয় একটা শুভ বলয় থাকে, যা আশেপাশের মানুষদেরকেও ছুঁয়ে যায়। আর কিছু নয়, কেবল পাশে বসা মানুষটির ওই সদিচ্ছুক ও পরোপকারী মনোবৃত্তি মন ভাল করে দিয়েছে। কৃত্রিম ভালোমানুষি আর স্বতোৎসারিত প্রবৃত্তির পার্থক্যও বুঝে নেওয়া যায় !
মানুষে মানুষে কতই না প্রভেদ ! বাসে ট্রামে একেক’জন মানুষ সামান্য অসুবিধায় কি রুক্ষ রূপ ধারণ করেন। আর এই মানুষটি অসহ্য গরমে, নিজে ঘেমে-নেয়ে একশা হয়ে, সারা পথটুকু হাসিমুখে সহযাত্রীদের যতরকম সম্ভব সহায়তা করে গেলেন। যেন নারী-পুরুষ-যুবক-প্রৌঢ় নির্বিশেষে সকলকে সাহায্য করেই তাঁর সুখ।
অথচ তিনি কোনও তকমা আঁটা সমাজসেবী নন। এমন একজন মানুষকে কাছ থেকে দেখলে মন ভাল না হয়ে পারে ?

ফুলের সুগন্ধ থাকে, যা আকৃষ্ট করে।

কিন্তু মানুষ তাঁদের স্বভাব ও আচরণের নির্যাস দ্বারা অনায়াসেই ছুঁয়ে যান চারিপাশের মানুষদের হৃদয়। জয় করে নেন মন, বিলিয়ে দিতে পারেন আপন সৌরভ।

মানুষের হৃদয় হ’তে উৎপন্ন যে অমূল্য সম্পদ, তার কি কোনও তুলনা আছে এ জগতে ?