গৌতম রায়

ভারতবর্ষের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল থেকে যখন মেরুদণ্ড সম্পন্ন মানুষের সংখ্যা ক্রমশ কমে যাচ্ছে, রাষ্ট্রশক্তির বদান্যতার কাছে যখন স্থান কাল পাত্র ভুলে গিয়ে সংস্কৃতি জগতের একটা বড় অংশের মানুষ কার্যত আত্মসমর্পণ করছেন, ঘুষ অথবা ঘুষির কাছে নিজেদের কে বিলিয়ে দিচ্ছেন, এমন এক দুর্যোগের ঘনঘটার ভয়াবহ আবর্তের ভিতর নবনীতা দেবসেনের চলে যাওয়া নিঃসন্দেহে এক অপূরণীয় ক্ষতি।

নবনীতা বেশ কিছুদিন ধরে কোলনের ক্যানসারের ভুগছিলেন। মাঝে তাঁর জ্যেষ্ঠ কন্যা অন্তরা দিল্লিতে নিয়ে গিয়ে কিছু বিকল্প চিকিৎসা ব্যবস্থা করেছিলেন কখনও ভাল হচ্ছিলেন। কখনও সমস্যা হচ্ছিল। তবু রোগ জর্জর দেহ নিয়েই মননশীলতার চর্চা কিন্তু থেমে থাকেনি। তাঁর কলম কিন্তু থেমে থাকেনি রসাত্মক। তীর্যক আলোচনা-সমালোচনার ভিতর দিয়ে, সময়, মানুষ, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, সংস্কৃতি-সব কিছুর প্রতি তাঁর শর নিক্ষেপ চলছিল অবলীলাক্রমে। মৃত্যুর করালগ্রাসে সেই ক্ষেপণ স্তব্ধ হয়ে গেল।

নবনীতা মানে ছিল আনন্দের আবরণে বিষণ্ণতাকে, যন্ত্রণাকে তীব্র, তীক্ষ্ণ করে মানুষের সামনে তুলে ধরবার একটি সঞ্জীবিত মন্ত্র। সেই মন্ত্রোচ্চারণ এখন স্তব্ধ। দেবালয় থেকে প্রতিমা কালের গর্ভে বিলীন। দেবালয় শূন্য।

নবনীতা যে সময়কালে পৃথিবীর আলো প্রথম দেখেছিলেন (১৩ জানুয়ারি, ১৯৩৮), সেই সময়কালটি ছিল চিরন্তন ভারতের বহুত্ববাদী চিন্তা-চেতনা বিকাশে এক স্বর্ণযুগ। আর যে কালে নবনীতার চোখ থেকে পৃথিবীর আলো নিভে গেল (৭ নভেম্বর, ২০১৯), সেই সময়কালটা আমাদের দেশের অতীতের বহুত্ববাদী চেতনাকে ধ্বংস করে, একমাত্রিক, এককেন্দ্রিক চিন্তাকে প্রতিষ্ঠিত করবার এক তমসাচ্ছন্ন সময়কালে প্রবেশ করবার জমদগ্ধ ক্ষেপণকাল।

উত্তরণ আর অবলোকনের এই যে পর্যায়টি নবনীতা যাপন করে গেলেন, সেই সময় কালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ক্ষমতা হস্তান্তর, দেশভাগ, ধর্মনিরপেক্ষতার এক কুসুমাস্তীর্ণ পথ চলার জন্য নেহরু সংগ্রাম, সেই লড়াইকে পশ্চিমবঙ্গের বুকে মানুষের লড়াইতে রূপান্তরিত করবার লক্ষ্যে বামপন্থীদের দৃপ্ত পদক্ষেপ, বামপন্থার নাম করে সংকীর্ণতাবাদি রাজনীতি দিয়ে বামপন্থাকে অবলুপ্ত করবার প্রচেষ্টা, বামপন্থীদের নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক নির্বাচনী পটভূমিকায় ভিতর দিয়ে সুদীর্ঘকালের একটি সরকার পরিচালনা, সময়ের অলিন্দের সেই সরকার বদলে গিয়ে অপর একটি সরকারের আসা, জাতীয় স্তরে– ও সমস্ত রকমের চিন্তা-চেতনার পরিবর্তনের নামে এক ভয়াবহ অনুবর্তনের ছক।

এই একটা দীর্ঘ, দীপ্ত আবার তমসিত সময় ধরে নবনীতা দেবসেন নামক একটি ব্যক্তিত্ব কেবল লড়াই করে গেলেন। কখনও তাঁকে লড়তে হয়েছে নিজের সঙ্গে। নিজের জীবনকে, জীবনের নানা ওলট-পালট থেকে বের করে এনে আত্মজাদের প্রতিষ্ঠিত করবার এক ভয়ঙ্কর লড়াই। তার পাশাপাশি সমস্ত ধরনের সংকীর্ণতা, সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদের বিরুদ্ধে লড়াই।

আজ যে ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদের বিরুদ্ধে গোটা ভারতবর্ষে লড়াইয়ের পরিবেশ তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে, সেই লড়াইয়ের আরেকটি ভিন্ন পর্যায় নবনীতাকে গোটা জীবন ধরে লড়তে হয়েছে। তাঁর সূচনাকালের লড়াই ছিল, লিঙ্গ ভিত্তিক সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই। লিঙ্গ ভিত্তিক মৌলবাদের বিরুদ্ধে লড়াই। আন্তর্জাতিক স্তরে লিঙ্গ সাম্যের পক্ষে আন্দোলন যখন তীব্র হয়েছে, ভারতবর্ষের সেই আন্দোলনের ঢেউ এসে পড়েছে, স্বাভাবিকভাবে বাংলাতেও পড়েছে। কিন্তু সেই আন্দোলনকে সমাজের বুকে প্রতিষ্ঠিত করবার লক্ষ্যে নানা ধরনের বিভ্রান্তি, সংকীর্ণতা, ব্যক্তিস্বার্থ, ছদ্ম প্রগতিশীলতা, মূল্যবোধের অবক্ষয় গোটা লড়াইয়ের প্রেক্ষাপটকে বারবার বিচ্ছিন্ন করে দিতে চেয়েছে।

এখানে যেন একটা একক লড়াই লড়তে হয়েছে নবনীতাকে।নিজের যাপন চিত্রের ভিতর দিয়ে, পেশাজীবনের ভিতর দিয়ে, সাহিত্যচর্চার ভিতর দিয়ে নবনীতা দেবসেনকে একাই লড়ে যেতে হয়েছে। প্রাচীন ভারতে নারীর মহৎ যাপনের চিত্র আঁকতে গিয়ে একাংশের মানুষ লিঙ্গ সাম্যের বিরুদ্ধে এক ধরনের অন্ধ আবেগ সমাজের বুকে এঁকে দিতে দীর্ঘদিন ধরে সচেষ্ট থেকেছে।

আবেগকে সমাজের বুকে দেগে দেওয়ার জন্য তারা রাম কাহিনির চরিত্র সীতা বা মহাভারতের চরিত্র গান্ধারী, দ্রৌপদীকে প্রমুখ কে এমন ভাবে উপস্থাপিত করেছে যে, পুরুষ শাসিত সমাজের বৈষম্য অবিচার নিপীড়ন-নির্যাতনগুলি ঢেকে দিয়ে, এইসব সাহিত্যের চরিত্রগুলিকে সামাজিক সাম্যের একটা ছদ্ম আবরণে আবৃত করা যায়। এই পর্যায়ে লিঙ্গবৈষম্যকে আরও বিস্তৃত করবার লক্ষ্যেই নারীর মহত্ব প্রমাণের নাম করে, প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যের কোনও কোনও চরিত্রকে দেবত্ব অর্পণ পর্যন্ত করা হয়েছে।

তুলনামূলক সাহিত্যের কিংবদন্তী অধ্যাপিকা হিসেবে লিঙ্গ ভিত্তিক এই সাম্প্রদায়িকতাকে অবলম্বন করে প্রাচীন ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থার যে বিকৃত চিত্র ধর্মান্ধ মৌলবাদী শক্তি দীর্ঘদিন ধরে ভারতবর্ষের বুকে এঁকে দেওয়ার চেষ্টা করেছে, তার বিরুদ্ধে প্রতিটি পদক্ষেপে নবনীতাকে তাঁর জীবন ভোর লড়াই করতে হয়েছে। সংগ্রাম করতে হয়েছে। সংঘর্ষ করতে হয়েছে। চেতনার জগতের এই সংঘর্ষ হয়তো তাঁকে তাঁর ব্যক্তি জীবনে বহু সংঘর্ষের কালে লড়াইয়ের সাহস যুগিয়েছে।

শক্তি যুগিয়েছে। আর সেই শক্তির পুরানে হয়তো ইতিহাস দর্শনের অনবদ্য কথাকারই এইচ কার বর্ণিত, অতীত ও বর্তমানের চিরায়িত কথোপকথনের ভঙ্গিমায়, দেবত্ব আরোপের ধর্মান্ধ ভঙ্গিমা থেকে, চিন্তার জগতকে বিযুক্ত করে, সাতের দশকে বাংলা তথা ভারতবর্ষের বুকে যে সংকীর্ণতাবাদী আন্দোলন হয়েছিল, সেই তথাকথিত আন্দোলনকে ঘিরে নবনীতার উপন্যাস, ‘আমি, অনুপম’ কালের প্রাচীরে এক অব্যর্থ টিপছাপ খোদাই করে দিয়েছে।

ক্ষমতা হস্তান্তর, দেশভাগের ভেতর দিয়ে যে স্বাধীনতা ‘৪৭ সালে ভারতবর্ষ অর্জন করে, তারপর থেকে সাধারণ মানুষের অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান-চাকরি-স্বাস্থ্য-নারীর অধিকার-সংখ্যালঘুর অধিকার-আদিবাসী-দলিত-তপশিলি জাতি ও উপজাতির অধিকার ইত্যাদি প্রশ্নে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ, হতাশা, আন্দোলন ক্রমশ শাসকের আরশ কাঁপিয়ে দিতে শুরু করে।

এইরকম একটি পরিস্থিতিতে ছয়ের দশকের শেষ প্রান্ত থেকে সংকীর্ণতাবাদী আন্দোলন যেভাবে ধীরে ধীরে পশ্চিমবঙ্গকে কেন্দ্র করে, তারপরে গোটা ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে দানা বাঁধতে শুরু করে এবং সাতের দশকের শুরুর দিকে ক্রমশ বল্গাহীন হয়ে পড়ে, তাতে সাধারণ মানুষের মধ্যে এই প্রশ্নটা খুব গভীর হয়ে ওঠে যে; স্বাধীনতার পর থেকে মানুষের চাওয়া না পাওয়ার জনিত যে হতাশা, যন্ত্রণা, ক্ষোভ, প্রতিবাদ-বিক্ষোভ– এই আন্দোলন কি তারই অভীশ্রুতি?

নাকি, সাধারণ মানুষের দুঃখ, যন্ত্রণা, দুর্দশা– এই সব কিছু থেকে মানুষের দৃষ্টিকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিয়ে, শাসকের শাসনের নামে শোষণকে আরও সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে আসার জন্য এটি শাসক এবং সংকীর্ণতাবাদীদের এক যৌথ কর্মসূচি?

দেশভাগের পর থেকে হিন্দু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী শক্তি ধীরে ধীরে ভারতবর্ষে তাদের কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক হিন্দুরাষ্ট্র স্থাপনের লক্ষ্যে যে ধরনের কর্মকান্ড বিভিন্ন প্রান্তে শুরু করে দিয়েছিল, সংকীর্ণতাবাদী আন্দোলন প্রকারান্তরে সাম্প্রদায়িক শক্তির সেইসব অপকর্মকে আরও সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার একটি কৌশল কিনা– এই প্রশ্ন সাধারণ মানুষের একটা বড় অংশের ভিতরে ক্রমশ তীব্র হয়ে উঠতে শুরু করে।

শ্রেণি সমস্যাকে কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপনের নাম করে সংকীর্ণতাবাদী আন্দোলন ভারতবর্ষের সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নিম্নবর্গীয়, অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া, ধর্মীয় সংখ্যালঘু মানুষদের ভিতরে কোন বিভাজনের সাম্রাজ্যকে বিস্তৃত ক’রে, হিন্দু মুসলমান উভয় সাম্প্রদায়িকতাকে শক্তিশালী করছে কিনা– এই প্রশ্ন ক্রমশ তীব্রতর হয়ে উঠতে শুরু করে। প্রগতিশীলতার ছদ্মবেশে একাংশের বুদ্ধিজীবী প্রকাশ্যেই এই সঙ্কীর্ণতাবাদী আন্দোলনের প্রতি তাদের সহানুভূতি প্রকাশ করতে থাকেন।

বাংলা সাহিত্যের একটা বড় অংশ সংকীর্ণতাবাদী আন্দোলনকে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত করে নানা কথা গাঁথা মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা করে। এইরকম একটি সময়ে, সংকীর্ণতাবাদী আন্দোলনকে ঘিরে বাংলার প্রেক্ষাপট, সামাজিক আঙ্গিক, মধ্যবিত্তের সংকট, উচ্চবিত্তের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদ, নিম্নবিত্তের যন্ত্রণা, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল– এই সমস্ত প্রেক্ষাপটকে এক অসাধারণ মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে নবনীতা উপস্থাপিত করেন তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘আমি, অনুপমে’র ভিতর দিয়ে।

ছাত্রজীবনে বা পরবর্তী পেশাজীবনে নবনীতা কখনও প্রত্যক্ষ রাজনীতির সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করেননি। তবে প্রগতিশীল রাজনৈতিক চিন্তা চেতনার সঙ্গে তাঁর সখ্যতা অবিদিত ছিল না। অশোক মিত্রের মতো অর্থনীতিবিদের পরিমণ্ডল তাঁকে আরও চিন্তাচেতনার দিগন্তকে উন্মোচিত করতে পারিবারিক পরিমণ্ডলের বাইরে সাহায্য করেছিল।

প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার না থেকেও শ্রেণীচ্যুত (ডি ক্লাসড) হওয়ার তথাকথিত শৌখিন মজদুরি, নিজের যাপনচিত্রের মধ্যে না এনেও, সাতের দশকের শুরুর সময়কাল ধরে, বাংলার মধ্যবিত্ত সমাজের ভিতরেই সংকীর্ণতাবাদে আন্দোলনকে ঘিরে আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক যে উথাল পাতাল, তাঁকে অসাধারণ মুন্সিয়ানার ভিতর দিয়ে উপস্থাপিত করলেন নবনীতা।

প্রত্যাখ্যানের মর্যাদাকে গ্রহণের বিষণ্ণতার ভিতর দিয়ে জীবন সংগ্রামের আর্ট হিসেবে তুলে ধরতে গিয়ে, অন্ধ আবেগকে দূরে সরিয়ে রেখে, আশ্চর্যজনক নিরপেক্ষতার অনুষঙ্গে সমাজ চিত্রের যে অনুপুঙ্খ বর্ণনা নবনীতা এই উপন্যাসের মধ্যে দিয়ে করলেন, তাকে এক কথায় একটি ‘ঐতিহাসিক উপন্যাস’ হিসেবে বর্ণনা করা যেতে পারে।

সতীনাথ ভাদুড়ী তাঁর ‘জাগরী’ উপন্যাসের ভিতর দিয়ে যেভাবে জাতীয় আন্দোলনের মধ্যবর্তী সময়কালের নানা আর্থ-সামাজিক সংকটকে মূর্ত করে তুলেছিলেন এক অনবদ্য ছন্দবদ্ধতায়, সাম্প্রদায়িকতার সমস্যা, জাতপাতের সমস্যা, অর্থনীতির টানাপোড়েন কে কিভাবে প্রভাবিত করে, প্রতিবিম্বিত করে তার বর্ণনা দিয়েছিলেন। শাসক তার শাসনের ক্রিয়া প্রতিক্রিয়াকে তীব্র থেকে তীব্রতর করে তুলতে পারে এই কৌশলে, সতীনাথ তা অনবদ্যভাবে দেখিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন।

অনেকটা যেন সেই আঙ্গিকটাই বজায় রেখে, অথচ সাতের দশকের পটভূমিকায়, সামাজিক বিজ্ঞানের ক্রমবিকাশের ভিতর দিয়ে বিভাগোত্তর বাংলাতে, বামপন্থী আন্দোলনকে ঘিরে বাংলার মানুষের পরিমণ্ডলে একটা অত্যন্ত ইতিবাচক ধ্যানধারণার প্রকাশ, প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, সেখানকার বাংলা ভাষাভাষী মানুষদের উপর ধর্মের নাম করে বিভাজনের চেষ্টার মধ্যে দিয়ে তদানীন্তন পশ্চিম পাকিস্তান গোটা ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম জাতীয়তার নাম করে কি ধরনের ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী হানাহানির প্রচেষ্টা চালাচ্ছে ,যার প্রভাব পশ্চিমবঙ্গ সহ ভারতবর্ষের গোটা উত্তর-পূর্বাঞ্চলকেই আক্রান্ত করছে।

এই সমস্ত প্রেক্ষিতকে কখনও প্রত্যক্ষভাবে, সরাসরি ইঙ্গিতের ভিতর দিয়ে, আবার কখনও ইন্দ্রজিতের মেঘের আড়াল রেখে লড়াইয়ের ময়দানে অবতীর্ণ হওয়ার মতো করে এই উপন্যাসের চরিত্র, তার বিচার বিশ্লেষণ, সময়ক্ষেপণের মধ্যে দিয়ে নবনীতা তুলে ধরেছিলেন। এভাবে একটা দশকের বর্ণনা, একটা সময়ের বর্ণনা, একটা কালের বর্ণনা, যেখানে মাটি-মানুষ-আগুন-পৃথিবী, প্রতিটি অস্তিত্বের লড়াই ধ্বংসের হাত থেকে নিজেকে বাঁচানোর তাগিদে ব্যস্ত।

এক অন্তহীন সংগ্রামের ধ্বনি হিসেবে কাল থেকে কালত্তরে বিদীর্ণ হয়ে গিয়েছিল নবনীতার ‘আমি, অনুপম’ নামক মহাকাব্যিক মহাভারতের ভিতরে। এমনটা সতীনাথ ভাদুড়ীর ‘জাগরী’ উপন্যাসের ভিতর দিয়ে করেছিলেন বা অন্নদাশঙ্কর রায় ‘ক্রান্তদর্শী’ উপন্যাসের ভিতর দিয়ে করেছিলেন। আরও যদি পিছিয়ে যাই আমরা, আন্তর্জাতিক সাহিত্যের অঙ্গনে, তাহলে দেখব সেই পরিমণ্ডলে ঐতিহাসিক ফরাসি বিপ্লবকে কেন্দ্র করে রিচার্ড কব ‘দি ইনহেরিটস’ নামক উপন্যাসের ভিতর দিয়েও তাইই করেছিলেন। নবনীতা দেবসেনও তাইই করলেন সাতের দশকের নবমহাভারত ‘আমি, অনুপমে’র ভিতর দিয়ে।