কস্তুরী সেন

১৯৮৪ সালে বেরুচ্ছে নবনীতা দেবসেনের প্রথম রম্যরচনার বই, নটী নবনীতা। নবনীতা দেবসেন, যাঁকে অনায়াসেই বলা চলে বাংলা আধুনিক সাহিত্যের ক্ষেত্রে একটি আলাদা অধ্যায়; কৃত্তিবাস, শতভিষা ও তৎপরবর্তী বাংলা কবিতা, সত্তর ও পরবর্তীর বাংলা উপন্যাস, একটি ব্যাপ্ত পরিসরে অনুবাদ সাহিত্য, দেশ জুড়ে প্রচলিত প্রান্তিক ও লোকায়ত রামকথার, মূলত সীতাপাঁচালির একটি ভিন্ন কোণ এবং সেই সূত্রে ও সেই সূত্রের বাইরেও মেয়েদের লেখালিখি, সন্নিহিত রাজনীতির নানা ধাপ, এই প্রতিটি অঞ্চল আলো পাচ্ছে যাঁর কলম থেকে, তাঁর ক্ষেত্রে অন্যান্য সকল বই ছেড়ে প্রথমেই এল এই বইয়ের নাম কেন?

রম্যগদ্য এবং অনাবিল কৌতুকের যে উপচার নবনীতা সাজিয়েছেন লেখকজীবন জুড়ে, ত্রৈলোক্যনাথ, রাজশেখর বসু বা পরবর্তীতে লীলা মজুমদার, শিবরাম চক্রবর্তীর পর সেই ধারার কৌতূক রচনার চর্চা বাংলা সাহিত্যে পুরুষ নারী নির্বিশেষে আর কেউই যে করে উঠতে পারেননি তেমন, বা চাননি, এবং সে দিগরে নবনীতা অবিসংবাদী, একথা তর্কাতীত সত্য হলেও এ-ই তো ছিল না তাঁর লিখনচর্চার একমাত্র ক্ষেত্র যে এজন্য শুরুতেই তুলে আনতে হবে প্রথম রম্যরচনার বইটিরই নাম।

অথচ আমরা আনছি। আনছি, কেননা এই যে নামটি, আদতে এই বিশেষণ, এই ‘নটী শব্দটিই খানিক অনুমোদন, খানিক অননুমোদন, খানিক কারুণ্য, খানিক দার্ঢ্য, খানিক গোপনতা, খানিক উন্মোচনের মধ্য দিয়ে পাঠককে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে সেই সত্যের সামনে, যে সত্যের অনুশীলন হয়ত সমগ্র লেখকজীবন জুড়েই করে গিয়েছেন নবনীতা দেবসেন। যে সত্য বলে, এ জীবন যেন মঞ্চই এক, এবং শিল্পী, তাঁর সকল রংরূপ প্রসাধিত অভিনয়ের মধ্য দিয়ে সেই মঞ্চকে সফল করে তুলতে দায়বদ্ধই প্রায়।

নবনীতার ছাত্রজীবন কাটছে পঞ্চাশের দশকে। গোখেল, প্রেসিডেন্সির পর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তুলনামূলক সাহিত্যে স্নাতকোত্তর করছেন যে বছর, তার পরের বছরই বেরুচ্ছে তাঁর প্রথম কবিতার বই– প্রথম প্রত্যয়। মলাটশিল্পী খোদ কবি। কৃত্তিবাস ও আরও কয়েকটি পত্রিকার হাত ধরে বাংলা কবিতা ইতোমধ্যে পালটে ফেলছে তার খোলনলচে এবং তার শরিক নবনীতাও সে সময়। ১৯৬১তে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি লাভের পর নবনীতা পিএইচডি সমাধা করছেন ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটি থেকে ১৯৬৩ সালে এবং এরপর বার্কলে ইউনিভার্সিটি থেকে তাঁর পোস্ট ডক্টরাল রিসার্চ ফেলোশিপের বিষয় হল ‘A structural analysis of the Valmiki Ramayana’.

‘বৃষ্টিতে ওড়াল পর্দা/ পর্দা ওড়ে শ্রাবণ সকাল/ সব দরজা খুলে যায় পিছনের পথে/ শুকনো পাতা ভিজে/ পদচিহ্ন ঢেকেছে শৈবাল…’– প্রথম বইয়ের এই সুরেলা কবিতা ভাষা থেকে কিছুটা সরে যাবেন নবনীতা দ্বিতীয় বই স্বাগত দেবদূত (১৯৭১)-এ বা ৭২-৭৮ কালপর্বে লেখা তৃতীয় বই রক্তে আমি রাজপুত্র’র কবিতাগুলিতে। ৭৬ সালে রমাপদ চৌধুরীর কাছ থেকে আসছে দেশ পত্রিকায় উপন্যাস লিখবার ডাক।

প্রবাসপর্বের ব্যক্তিগত ক্ষয়, সমসময়ের উতরোল রাজনীতি যতটা না ঠাঁই পেতে সক্ষম হয়েছিল এসময়ের কবিতার বইগুলিতে, তার চেয়ে অনেকটা বেশিই পেল প্রথম উপন্যাস আমি অনুপম-এ। পেল দেশে ফিরে ১৯৭৫ এ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্যের অধ্যাপক পদে যোগ দেবার পর, মরণপণ তত্ত্বজ্ঞানে নিজেদের নকশালপন্থী ছাত্রদের উদ্বুদ্ধ করে তাঁর নিকটজন-বন্ধুদের কলকাতা ছেড়ে অন্যত্র চলে যাবার লজ্জাজনক বাস্তব–‘…প্রাণ নিতে আর প্রাণ দিতে শিখিয়ে দিয়ে নিজেরা পিছু হটে পালিয়ে যাচ্ছেন আমাদের বন্ধুগণ। নিজেদের মুখনিঃসৃত বাণীর দায়িত্ব তাঁরা নেননি। আমার ধরনের কবিতায় আমি এই সব অনেক কিছুই বলতে পারি না, তার জন্য গদ্য চাই।’

আমরা পাঠকরা দেখছিও তাই, নবনীতা, অত্যন্ত সচেতনভাবেই তৈরি করেছেন তাঁর গদ্যের ভাষা। ১৯৭৭ সালে দ্বিতীয় উপন্যাস প্রবাসে দৈবের বশে-তে তিনি যখন লিখছেন আন্দোলন উত্তর প্রবাসী বাঙালিনী প্রধান চরিত্রের শিকড়হীনতার কথা, স্ববিরোধ ও আত্মদহনের কথা, ‘খেসারৎ’ গল্পে পাঠককে কেঁপে উঠবার জন্য দাঁড় করিয়ে দিচ্ছেন সব খোয়ানো সাব অল্টার্নের ক্ষমাহীন হাহাকারের সামনে, ১৯৮৯তে বৃদ্ধাবাসজীবনের খণ্ডচিত্রের আখ্যান শীত সাহসিক হেমন্তলোক পার হয়ে নয়ের দশকের শেষে প্রকাশিত বামাবোধিনী উপন্যাসে যখন প্রায় ছারখারই করে দিচ্ছেন এ যাবৎ চলে আসা রামকাহিনির পিতৃতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক ছাঁচ, মেয়েদের বয়ান, মেয়েদের লড়াই, লোকায়ত দেশজ সংস্কারের মধ্যে লুকিয়ে থাকা নারী রাজনীতির ভাল মন্দকে তুলে আনছেন একটুও চিৎকার না করে, জাহির না করে, প্রায় খিড়কির রোয়াকে বসে বৈকালিক মেয়েলি আড্ডার অনুত্তেজিত ঢংয়ে,

প্রায় পাঁচালি পড়ার মতো গেরস্ত ভঙ্গিটিতে, ভেঙে দিচ্ছেন যাবতীয় প্রথাগত একপেশে ধারণাকে, পূর্ববঙ্গের চন্দ্রাবতীর গাথা থেকে শুরু করে দাক্ষিণাত্যের সীতা আম্মার পাঁচালি পর্যন্ত ঢুঁড়ে, যা কিনা একরকম চ্যালেঞ্জই করছে ‘প্রভু’ রামচন্দ্রের অস্তিত্বকে এবং সীতাকে, ছায়াসঙ্গিনীর বদলে কোথাও কোথাও প্রায় বিপরীতেই দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে তাঁর, ভারী সুন্দর একটি বিকল্প হিসেবে, তখনও কিন্তু কবিতায় নবনীতা গহন, নিবিড়, বেদনা আকাঙ্ক্ষা ও সংরাগে আশ্চর্য রক্তিম কেমন!…’মনে মনে সারাদিন দেখা/ মনে মনে নিত্য সহবাস/ সারাক্ষণ কাছে কাছে থাকি/ সারাদিন কথা বলি/ বইখানা কোথায় ফেললে?/ বেরুচ্ছ কি?/ ফিরবে কখন?/ মনে মনে লাগিয়ে দি’ জামার বোতাম/ ভুরু থেকে সরিয়ে দি’ ঝুঁকে পড়া কেশ/ মনে মনে এগিয়ে দি’ কলম, রুমাল/ মনে মনে অহর্নিশি, মনে মনে সারা দিনরাত/ খুব ঝগড়া, খুব যত্ন, মনে মনে আদরটাদর/ সারাদিন সারারাত, আজীবন নিখিল বিস্তার/ মনে মনে, মনের মানুষ’। (নবনীতার নোটবই)

সহজাত ভালবাসা ও আনন্দের একটি পুঁটুলি নিয়েই জন্মেছিলেন নবনীতা। মাতৃপরম্পরার ধারক তিনি। দ্বিতীয় বিবাহে কবি নরেন্দ্র দেবের সঙ্গে আবদ্ধ হয়ে, সন্তানবতী হবার পরও মা রাধারাণী, কবি রাধারাণী দেব সম্পর্কে ও ভালবাসায় আবদ্ধ ছিলেন পূর্বতন শাশুড়ি মা’র সঙ্গে…আনন্দের এই ‘ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে’ সুরটিতে আজীবন বেজেছেন নবনীতা, এই ‘শস্ত্রে ছেঁড়ে না অগ্নি দহে না যারে’ ভালবাসার শব্দে টাপুর টাপুর বাজিয়েছেন, অন্তত চেয়েছেন বাজাতে তাঁর পাঠককে আজীবন।

তাই হয়ত তাঁকে এত অনায়াসে এবং প্রাপ্য হিসেবে নিতে অসুবিধে হয়নি বাঙালির, তাই হয়ত বাঙালি বিরোধ দেখেনি, আলাদা করতে পারেনি অধ্যাপক নবনীতা দেবসেন, বাগ্মী, প্রাবন্ধিক নবনীতা দেবসেন, সাহিত্য আকাদেমি, পদ্মশ্রী, সাহিত্য আকাদেমি জীবনকৃতি ও আরও অজস্র সম্মাননায় ভূষিত, বাংলা ভাষা উপদেষ্টা বোর্ড, ভারতীয় জ্ঞানপীঠ পুরস্কার ও ভাষা উপদেষ্টা কমিটির সদস্য পদাধিকারী অতি বিদ্বান, অতি প্রতিভাবান মানুষটির সঙ্গে হিন্দুস্থান পার্কে মধ্যরাতে স্কুটার শিখতে নেমে পড়া নবনীতার, কেদারনাথে গাড়ি বিভ্রাট থেকে শুরু করে কুম্ভে পোশাক বিভ্রাট পর্যন্ত সদাবিভ্রান্ত, অগোছালো, শ্যাম্পুর বদলে ফিনাইলে মাথা ধুয়ে প্লেন ধরতে চলে যাওয়া নবনীতার।

ফারাক করতে দেননি নবনীতা নিজেই, নিরন্তর বাঙালির হাতখরচ জুগিয়েছেন সেই অবিকল্প আনন্দের পুঁটুলিটি থেকে। ব্যক্তিজীবনের প্রবল বিপর্যয়ের মধ্যেও অসুস্থ মা’র আদেশ হুকুমের প্রতি সজাগ তটস্থ থেকে, তা নিয়ে মজা করে, হিন্দুস্থান পার্কের বাড়িটির দরজা অকৃপণ স্নেহদাক্ষিণ্যে ছাত্র, আত্মীয়, প্রার্থী, আশ্রিত সবার জন্য সবসময় খোলা রেখে, নিজের অসুস্থতার মধ্যেও অবিশ্রান্ত লেখালিখিতে ঝরে পড়া সেই আনন্দঝর্ণার স্রোতধ্বনিটি তিনি বজায় রেখেছেন অবিরল। উত্তরকালের বাঙালি যদি আজ তাঁকে দেখে বিস্মিত না হয়, তা বাঙালিরই জাতিগত অক্ষমতা।