joy
জয় গোস্বামী

বল করতে আসছেন খ্যাংরা।
খ্যাংরা দৌড় শুরু করেছেন। ব্যাট ধরে প্রস্তুত নেবু। ব-অল করছেন, অফ স্ট্যাম্পের বাইরে ছিল, নেবু তাড়ু চালিয়েছেন। লাগেনি। উইকেট কিপার পটকায় হাতে বল। এ বলেও কোনো রান হয়নি। রান যা ছিল তাই আছে। তিন উইকেটে এক। বাজার পাড়ার ব্যাটিং বিপর্যয়।। এই বিপর্যয়ের মুখে কি এমন তাড়ু চালানো উচিৎ? এখন ঠেকিয়ে খেলা দরকার। যাই হোক  বটগাছ প্রান্ত থেকে ওভারের শেষ বলটা করতে আসছেন খ্যাংরা। হাফ পিচে ফেলেছেন। স অ ঙ্গে স অ ঙ্গে ব্যাট চালিয়েছেন নেবু—ব-অল মাঠের মধ্যেই উঠেছে। ক্যা-আ-চ। ফাইন লেগে মোটা বাবলু-উ-উ। মোটা বাবলু  হাত পেতেছেন। এঃ হে-হে ফেলে দিয়েছেন মোটা বাবলু। এই ক্যাচ কে উ ফেলে? ইতিমধ্যে একটি রান হয়ে গেল। ওভার শেষ।  মাঠে জটলা হচ্ছে। আম্পেয়ার এগিয়ে এসেছেন। কী হচ্ছে ওখানে আমরা আপনাদের জানাচ্ছি। ওঃ। আম্পায়ার বিমল স্যর দ্বারা এইমাত্র সতর্কিত হলেন বোলার খ্যাংরা। এই হৃদয়নাথ ব্যায়ামাগার দলের অধিনায়ক, দারুণ বোলার খ্যাংরা, এইমাত্র মোটা বাবলুকে গাল দিয়েছেন। কী বলে গাল দিয়েচ্ছেন? আমি বলে দিচ্ছি। ও সাধন দা সাধন দা কী হয়েছে! আচ্ছা, আচ্ছা। বোলার খ্যাংরা ক্ষিপ্ত হয়ে ‘ফেকলু শুয়োর’ বলে গাল পেড়েছেন ফিল্ডারকে।। ফিল্ডার মোটা বাবলু তখন তৎক্ষণাৎ  আম্পায়ারের কাছে নালিশ করায়, আম্পায়ার বিমল স্যার সতর্ক করলেন বোলার তথা হৃদয়নাথ ব্যায়ামগারের অধিনায়ক খ্যাংরাকে। এই আম্পায়ারকে আপনারা সবাই চেনেন। ইনি খুবই স্ট্রিক্ট। ইস্কুলের পরীক্ষার টুকলি ধরতে অথবা মাঠে প্লেয়ারদের পানিশমেন্ট দিতে ইনি সিদ্ধহস্ত। আপনারা যারা এই ‘শিবু সরকার’ টুর্নামেন্ট দেখছেন না, কিন্তু বাজারপাড়া মাঠের চারদিকের বাড়িতে জানলায় বসে রিলে শুনছেন তাদের জানাই, ইনিই সেই আম্পায়ার যাঁকে টাউনে সবাই বেঁটে বিমল নামে একডাকে চেনে। একটি জরুরি কথা। এইমাত্র ক্যাচ তুলে অব্যাহতি পাওয়ার সুযোগে যে রানটি নিলেন ব্যাটসম্যান নেবু, সেটি-ই বাজারপাড়ার পক্ষে প্রথম রান যা কোনও ব্যাটসম্যান দ্বারা সংগৃহীত। এখন বাজারপাড়ার রান তিন উইকেটে দুই। এর আগে ছিল তিন উইকেটে এক। এই একটি রান এসেছিল নো বল থেকে। নো বলটি করেছিলেন খ্যাংরা। তিনি শূন্য রানে দু উইকেট দখল করেছেন এখন পর্যন্ত। অন্য উইকেটটি রান আউট। নতুন ওভার শুরু হচ্ছে, নর্দমাপ্রান্ত থেকে বল করতে আসছেন খাবলা। খাবলার বিরুদ্ধে ব্যাট করবেন যথারীতি নেবু। তিনি এখনও অপরাজিত এক রানে। খাবলা এখন বল ঘষছেন। তাঁর পাজামায়। হ্যাঁ, খাবলা পাজামাটা এখন উঁচু করে বেঁধে, পা দুটো হাঁটু অবদি গুটিয়ে নিয়েছেন। খেলার আগে কথা হচ্ছিল। খাবলা দুঃখের সঙ্গে জানালেন খাবলার দুটো পেন্টুলই নাকি আজ সকালে খাবলার বাড়িতে কেচে মেলে দেওয়া হয়েছে। খাবলা বেরোবার সময় প্যান্ট না পেয়ে একটা সাদা পাজামা পরে এসেছেন মাঠে। আর একটা সাদা বুশশার্ট। খাবলার বল ঘষা শেষ। এটা ক্যাম্বিস বল হলেও খাবলা বল ঘষায় বিশ্বাস করেন। তাতে নাকি বেশ মেজাজ আসে। খাবলার বিশ্বাস, লেনথ বা লাইন নয়, মেজাজই বোলারের আসল সম্পদ। এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি, নর্দমাপ্রান্তে দাঁড়িয়ে বলটা মাটিতে রেখে খাবলা পাজামার দড়িটা টাইট করে বেঁধে নিচ্ছেন, বুশ শার্টটা তুলে। ও এগুলো বলব না বলছ? আচ্ছা বাদ দিয়ে যাচ্ছি, বাদ দিয়ে যাচ্ছি।

joy-storyআমার পাশে বসে আছেন স্কোরার ভেবু। ভেবু বলছেন, পাজামার দড়ি ব্যাপারটা রিলেতে না বলাই ভালো। বেশ, তাহলে বলছি না। খাবলা তিন ধরণের বল করতে পারেন। এক তো মাঝে মাঝে বাম্পার দেন। বাউনসার। দ্বিতীয়রকম হল ব্যাটসম্যানের গা টিপ করে একরকম ফুলটস। ব্যাটে লাগলে লোপ্পা ক্যাচ। সেই বল ব্যাটে না লাগলে গায়ে মুখে খেতে হবে। নয়তো বোল্ড। এর মাঝে মাঝে হঠাৎ এক-একটা ছুঁড়ে বল। পিওর ছোঁড়া। সেটা অফ স্পিন করবে। অর্থাৎ খাবলা একজন ফাস্ট বোলার কাম স্পিনার। এখনই বল করবার জন্য খাবলা দৌড় শুরু করবেন। কিন্তু না, খেলা হঠাৎ বন্ধ। কেন? আম্পায়ার বিমল স্যার এগিয়ে আসছেন ক্লাব হাউসের দিকে। ক্লাব হাউস মানে আমরা যেখানে বসে আছি। একটা দু কামরার ক্লাবঘর। সামনে একটা বারান্দা। এই বারান্দায় বসে স্কোর লিখছেন স্কোয়ার ভেবু। আর বোর্ডে সেগুলো চক দিয়ে লিখছেন হরিহরদা। মাইক হাতে আমি, বলরাম, রিলে করছি। আম্পায়ার বিমল স্যার এদিকেই এসে দাঁড়িয়ে পড়েছেন। এ কি আঙুল নেড়ে আমাকেই ডাকছেন। আচ্ছা যাই একটু শুনে আসি। এখুনি আপনাদের জানাচ্ছি আম্পায়ার বিমল স্যার কেন খেলা সাময়িক ভাবে বন্ধ রেখে ক্লাব হাউসের সামনে এলেন। জানাচ্ছি। আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে। আপনাদের জানাই আম্পায়ার বিমল স্যার এসেছিলেন ক্লাব হাউসে সতর্ক করতে। তিনি এইমাত্র আমাকে সতর্ক করে গেলেন বেঁটে বিমল বলার জন্য। আপনাদের সকলের কাছে এবং বেঁটে বিমল স্যারের কাছে আমি ক্ষমা প্রার্থনা করছি বেঁটে বিমল বলার জন্য। আমি অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে দুঃখ প্রকাশ করছি। এর পর থেকে আমি আর রিলে করার সময় বেঁটে বিমল স্যারকে বেঁটে বিমল বলব না। বিমল স্যারই এখন বোলারের দিকের আম্পায়ার। এই তিনি হাত সরিয়ে নিলেন। আর দৌড় শুরু করলেন খাবলা। খাবলার প্রথম বল ফুলটস। বুক টিপ করে। কেনোক্রমে নেবু  ব্যাট বাগিয়ে ধরেছেন। ও-ও। কট অ্যান্ড বোল্ড। সোজা ফিরতি ক্যাচ ধরে নিয়েছেন খাবলা। আউট! নেবু আউট। না-আ। আউট নয়। আম্পায়ার বিমল স্যার ‘নো’ ডেকেছেন। সেটা যেমন আমরা শুনতে পাইনি, তেমনই বোলার খাবলাও শুনতে পাননি। কিন্তু সর্বশক্তি দিয়ে ফুলটস বা বীমার দিতে গিয়ে খাবলার পা বোলিং ক্রিজ পার হয়ে যায়। নো কল শুনতে পাইনি আমরা কেউই কারণ বিমল স্যার যতই দাপুটে লোক হোন, তাঁর কণ্ঠস্বর মিনমিনে মতো। ও আচ্ছা, মিনমিনে বলা ঠিক হয়নি। স্কোরার ভেবু আমাকে সাবধান করছেন। মানে ক্ষীণ। ক্ষীণ কণ্ঠ। বলতে চাইছি। যাই হোক  ক্ষীণ কণ্ঠে নো বলায় নো শোনা যায়নি, কিন্তু, ডান হাত দিয়ে নো বলের সাইন দেখিয়েছিলেন বিমল স্যার যেটা স্কোরার দেখেছেন। ফলে নট আউট। হাবেভাবে বোঝা যাচ্ছে খুশি নন বোলার খাবলা। পরের বল করেছেন। এটি বাউন্সার। নেবু আকাশে তলোয়ার ঘোরানোর মতো ব্যাট ঘুরিয়ে ছিলেন। ব্যাট এড়িয়ে বল উইকেটকিপারের পিছনে ড্রপ খেয়েছে, খেয়ে বাউন্ডারির দিকে যাচ্ছে, কুচো বিভূতি দৌড়ে আসছেন ধরে ফেলেছেন। কিন্তু নেবু দুটি বাই রান নিতে পেরেছেন। দলের রান তিন উইকেটে চার। মাঠে হাততালি। কারণ যত উইকেট পড়েছিল, এতক্ষণ রান চেয়ে কম ছিল। এইবার উইকেট তিন কিন্তু রান চার। তাই বাজারপাড়ায় পক্ষে এই হাততালি। খাবলাকে এগিয়ে গিয়ে কিছু বোঝাচ্ছেন অধিনায়ক খ্যাংরা। ওভারে তৃতীয় বলটি করেছেন খাবলা। পিওর থ্রো। অফ স্পিন করেছে বলটা, লেগস্টাম্পে পড়েছে। নেবু ব্যাট ছোঁয়াতে পেরেছেন, মোটা বাবলু ও কুচো বিভূতির মাঝখান দিয়ে বল সো-ও-জা বাউন্ডারি। কী, আম্পায়ার সিগন্যাল দিচ্ছেন। বল সেন বাড়িতে লেগেছে। সেন বাড়ির রোয়াকটা একটু এগোনো মতো। সেন বাড়ির রোয়াক লাগলে দুই। মাঠে হাততালি। একটি চমৎকার দুই মেরেছেন নেবু। আজকের দিনে খেলা শুরু হবার পর প্রথম দুই মারলেন কোনো ব্যাটসম্যান। এর আগে অবশ্য দৌড়ে দুটি বাই রান সংগ্রহ করেছিলেন নেবু ও নির্মল। নির্মল অন্য প্রান্তে ব্যাট করছেন। নেবু-নির্মল জুটি আসলে আপনারা জানেন, হৃদয়নাথ ব্যায়ামাগারের পুরনো ওপেনিং জুটি। কিন্তু আজ নির্মল-এর সঙ্গে নেবু ওপেন করার জন্য আসতে পারেননি। নেবুর সাইকেল নিয়ে নেবুর ভাই বেরিয়ে যান আড্ডা মারতে। এবং সাইকেলটা লিক করে নিয়ে ফেরত আনেন। চাকার লিক সারিয়ে নেবু যতক্ষনে মাঠে পৌঁছেছেন ততক্ষণে বাজারপাড়ার শূন্য রানে দুই উইকেট। তারপর একটি নো বলের দ্বারা তাদের প্রথম স্কোর হয়। পরের বলেই একটি উইকেট পড়তে তিন উইকেটে এক-এর মাথায় নেমে নেবু নির্মলের সঙ্গে খুবই দৃঢ়তার সঙ্গে ব্যাট করছেন এখন। ইতিমধ্যে আরও দুটি বল হয়ে গেল। ব্যাটে বলে হয়নি কোনোটাই। ওভারের শেষ বল ডেলিভারি করতে আসছেন খাবলা। তার আগে খাবলা তার পাজামাটা গুটিয়ে থাই পর্যন্ত তুলেছেন। আর বুশশার্টটা কোমরে পাজামার মধ্যে গুঁজে নিয়েছেন। এইবার দৌড় শুরু করেছেন। ব-অ-ল- ক রে এ ছেন— ওঃ! সোজা গিয়ে নেবুর কপালে লেগে বল লাফিয়ে থার্ডম্যানের দিকে চলে যাচ্ছে। চো-লে আ-য় বলে ডাক দিইয়েছেন নির্মল। নেবু দৌড় শুরু করেছেন একটি লেগ বাই নেওয়ার জন্য। থার্ডম্যানে বলটি কুড়িয়ে নিয়েছেন সে-ই কুচো বিভূতি। তিনি ডিপ ফাইন লেগ থেকে দৌড়ে থার্ডম্যানের বল ধরলেন। অপূর্ব। তার বয়স মাত্র বারো। কুচো বিভূতি সিক্সে উঠেছেন এবার। কিন্তু তার মতো ফিল্ডিং-এ পারদর্শী কেউ নেই। এ কি, নেবু তো তাঁর দৌড় শেষ করছেন না! অপর প্রান্তের উইকেট পার হয়েও তিনি ছুটেই চলেছেন। আর বোলার খাবলাকেও আমরা দৌড়তে দেখছি। খাবলা পাঁই পাঁই ছুটছেন আর ব্যাট দুহাতে তুলে নেবু পশ্চাদ্ধাবন করছেন খাবলার। ওঃ বুঝেছি। উনি মারবেন। নেবু মারবেন খাবলাকে। খাবলা বাউন্ডারি লাইনের ধার দিয়ে পালাচ্ছেন। ইতিমধ্যে অন্য ফিল্ডাররা গিয়ে নেবুকে ধরে ফেলেছেন। নির্মল গিয়ে বোঝাচ্ছেন। খেলা সাময়িক বন্ধ। গণ্ডগোল হচ্ছে। এখন বোঝা যাচ্ছে নেবু মোটেই একটি বাই রান নেওয়ার জন্য দৌড় শুরু করেননি। খাবলা নেবুর কপালে বল মারায় নেবু ক্ষিপ্ত হয়ে খাবলাকে ঠ্যাঙানোর জন্য দৌড় শুরু করেছিলেন। গণ্ডগোল থেমেছে। খেলা আবার শুরু হতে যাচ্ছে। দশ ওভার করে দু পক্ষ খেলবে। ইতিমধ্যে পাঁচ ওভার হয়ে গেলো। রান তিন উইকেটে পাঁচ। কিন্তু এইবার দেখা যাচ্ছে নির্মল ব্যাট হাতে চলে যাচ্ছেন। কেন? তিনি তো আউট হননি? কারণ দশ ওভার খেলায় কোনো ব্যাটসম্যানই পাঁচ ওভারের বেশি খেলতে পারবেন না। নির্মল অপরাজিত থেকে রিটায়ার করেছেন বলে মাঠে হাততালি। নির্মল-এর রান শূন্য। নির্মল কোনো রান করার সুযোগ পাননি ঠিকই, কিন্তু ওপেনার হিসেবে দৃঢ়তার সঙ্গে পাঁচ ওভার ব্যাট করেছেন। আউট না হয়ে। একি? নেবুও ফিরে যাচ্ছেন? কী ব্যাপার? আম্পায়ার বিমল স্যার নেবুকে অসদাচারনের জন্য লাল কার্ড দেখালেন। হ্যাঁ, এই শিবু সরকার ক্রিকেট টুর্নামেন্টে লাল কার্ড অ্যালাউ। ফুটবল, ক্রিকেট যে টুর্নামান্টই হোক এই বাজারপাড়ায় লাল কার্ড অ্যালাউ। নইলে বড্ড মারামারি হয়। নেবু ব্যাটটা মাঠে ছুঁড়ে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। নেবু একটু গুণ্ডা প্রকৃতির আছেন। ইস্কুলেও তিনি মারামারি করার জন্য প্রসিদ্ধ। তিনি ক্লাস নাইনে পড়েন পালচৌধুরি উচ্চ বিদ্যালয়ে। আচ্ছা। আছা। বাদ দিয়ে যাচ্ছি। বাদ দিয়ে যাচ্ছি। বাদ দিয়ে যাচ্ছি। আমাকে স্কোরার ভেবু বলছেন ইস্কুলে নেবু কী করেন, সেটা  রিলেতে বলার দরকার কী! নেবু এখন এমনিতেই ক্ষেপে আছেন। যদি শুনতে পান খুশি হবেন কি? ঠিকই। এটা রিলেতে বলা আমার উচিৎ হয়নি। তবে স্বস্তির কথা নেবু তাঁর সাইকেলে চেপে মাঠ ছেড়ে ধাঙড়পাড়ার দিকে চলে যাচ্ছেন দেখতে পাচ্ছি। বোধকরি নেবু বাড়ি চলে গেলেন। তিনি বোধহয় ফিল্ডিং দেবেন না। যা হোক, বাজারপাড়ার এখন সমূহ বিপর্যয়। কারণ পাঁচ উইকেটে পাঁচ। নির্মল অবসৃত শূন্য। নেবু বহিষ্কৃত দুই। বাজারপাড়ার পক্ষে একমাত্র বাউন্ডারি অর্থাৎ দুই মেরেছেন নেবু-ই। নেবু বাড়ি চলে গেলেন মানে সাত জনে ফিল্ডিং কাটতে হবে বাজারপাড়াকে। তাদের হাতেও আছে আর মাত্র দুটি উইকেট। কারণ দুই পক্ষেই ৮ জন ৮ জন করে খেলছেন। সাত উইকেট পড়তেই ইনিংস শেষ হবে। দেখি আমরা এই বিপর্যয়ের হাল ধরতে পারেন কিনা। নেমেছেন আফিম তপন। ইনি এইটে পড়েন। এর বাবা মুকুন্দবাবুর স্টেশন বাজারে দোকানের মাথায় সাইন বোর্ডে লেখা আছে সরকারি আফগারি বিভাগের অনুমোদিত গাঁজা বিক্রয় কেন্দ্র। যদিও দোকানটির নাম মহাদেব ভান্ডার। এবং দোকানে চাল, ডাল, সর্ষের তেল, আলু, পেঁয়াজ, সাবান, পাউডার, খেলনা সবই পাওয়া যায়। পাঁচ জন কর্মচারি আছে। কিন্তু, দোকানের একটি অংশে একটি কাউন্টার করা। ট্রেনের টিকিট বিক্রির কাউন্টারের মতো। সেখানে  গাঁজা আফিম ইত্যাদি বিক্রি হয় আইন সম্মত ভাবে। তাই, মুকুন্দবাবুর ছেলেকে সবাই আফিম তপন বলে। cricket-clip

  নতুন ওভার শুরু করতে  চলেছেন আবার সেই খ্যাংরাই। বলা হয়নি, ওদিকে নেমেছেন গোদা বিভূতি। কিন্তু তিনি স্ট্রাইক নেবেন না।। স্ট্রাইক নেবেন আফিম-তপন। অধিনায়ক খ্যাংরার এটিই শেষ ওভার। এরপরে তিনি আর বল করতে পারবেন না। আফিম-তপন-ই একমত্র যিনি সাদা কেডস সাদা ফুল প্যান্ট আর সাদা ফুল হাতা সার্ট পরে এসেছেন। মাত্র বছর চোদ্দ ব্য়সেই আফিম তপন বেশ লম্বা। তাকে ব্যাট হাতে কানহাইয়ের মতো লাগছে। কানহাই, আপনারা সকলেই জানেন কদিন আগে, গত মাসেই ইডেন গার্ডেনে ভারতের বিরুদ্ধে নব্বই রান করেছেন। যে টেস্টে গণ্ডগোল হল। আগুন লাগলো। টেস্ট খেলা একদিনের জন্যে বন্ধ হয়ে গেল। তবুও ভারত হারল ইনিংস ও ৪৫ রানে। যাক গে বাদ দিয়ে যাচ্ছি। আসলে বলতে চাইছিলাম সব জায়গাতেই গণ্ডগোল হয়। টেস্টেও। ইতিমধ্যে মাঠে একটি গরু ঢুকে পড়ায় খেলা বন্ধ। গরু তাড়িয়ে দেবার পরেও খেলা শুরু করা যাচ্ছে না। কারণ পারুল-মা যাচ্ছেন। পারুল-মা মাঠের মাঝখান দিয়ে বাড়ি ফিরছেন। তিনি চূর্ণী নদীতে চান করতে গেছিলেন। পারুল-মা বলেন তাঁর বয়স আশি। পারুল-মা কানে শোনেন না। পারুল-মা কোমর থেকে বেঁকে গেছেন। তিনি মুখ তুলে রাস্তা দেখতে পান না।। এ টাউনের সব সাইকেল, সাইকেল রিক্সা, গরুর গাড়ি, ভ্যান রিক্সা ও পথচারীরা সাবধান হয়ে যায়, যখন পারুল-মা চূর্ণীতে স্নান করতে যান। এবং ফিরে আসেন। কারণ, কোমর থেকে ঝুঁকে একটি লাঠি ধরে পারুল-মা হেঁটে যান। এবং কাউকেই দেখতে পান না। কোনো হর্ন শুনতে পান না।  সবাই শশব্যাস্ত থাকে পাছে ধাক্কা না লেগে যায়। পারুল-মা এখন এই বাজারপাড়ার মাঠ পার হচ্ছেন। বিমল স্যার খেলার বিরতি ডিক্লেয়ার করেছেন। কারনও আছে, একবার একটি ক্রিকেট ম্যাচের মঝখান দিয়ে পারুল-মা চলে যাচ্ছিলেন। বিমল স্যার তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে বলেন ঠাকুমা আপনি ওইদিক দিয়ে যান। এখানে খেলা হচ্ছে। পারুল-মা যথারীতি কিছুই শোনেন না। এবং সর সর সামনে থেকে সরে যা ব্যাটা এই কথা বলতে থাকেন। পারুল-মা আশি বছরের তুলনায় খুবই কর্মঠ। নিজে রান্না করে খান। পারুল-মার মাথায় কদমছাঁট চুল। সব সাদা । মাথার ওপর একটি ভিজে গামছা চাপিয়ে তিনি বাড়ি ফেরেন চূর্ণীর ঘাট থেকে। এইবার বিমল স্যার যখন কিছুতেই সামনে থেকে সরছেন না, তখন পারুল-মা তাঁর হাতের লাঠি দিয়ে বিমল স্যারের হাটুতে মারলেন এক বাড়ি। কারণ বিমল স্যারের তো তিনি মুখ দেখতে পাচ্ছেন না। হাঁটুটাই দেখতে পাচ্ছেন। পারুল মা তো কুঁজো হয়ে হাঁটেন। সোজা হতে তাঁকে কেউ কক্ষনো দেখেনি।  বিমল স্যার সভয়ে লাফ মেরে পিছনে সরে যান। কিন্তু লাঠির ঘা মারতে গিয়ে বুড়ির মাথা থেকে ভিজে গামছা মাঠে পড়ে যায়। বিমল স্যার যখন পিছিয়ে পিছিয়ে চলে যাচ্ছেন তখন বুড়ি ধমক দেন। যাচ্ছিস কোথায়। আমার গামছাটা তুলে দে। বাধ্য ছেলের মতো সেটাই করেন বিমল স্যার। গামছা তুলে পারুল-মার মাথায় দিয়ে দেন।

আমার সামনে এসে পথ আগলাচ্ছিস! এত সাহস! কৃতজ্ঞতা প্রকাশের বদলে খনখনে গলায় ধমক দেন পারুল মা। সেই থেকে কোনো আম্পায়ার বা প্লেয়ার পারুল মা কে আর ঘাটান না। এখন পারুল মা পিচের মঝখান দিয়ে পার হয়ে গেলেন। তিনি বটজাছ প্রান্তের দিকে যাচ্ছেন। লেগ আম্পায়ার গোপেনমামা তাকে পথ দেখাচ্ছেন। ইনি মিষ্টি গোপেন নামে পরিচিত। গোপেন মামারা আদতে ময়রা। ইনি মেজো ভাই। স্কুল টিচারি করেন। দোকানে বসেন না। এদের পৈত্রিক দোকানের নাম মনোহর মিষ্টান্ন ভান্ডার। এই জন্যেই একে মিষ্টি গোপেন বলা হয়। যাই হোক বাদ দিয়ে যাচ্ছি… বাদ দিয়ে যাচ্ছি… কারণ দুই আম্পায়ার বিমল স্যার আর গোপেন মামা আঙুল তুলে আমার দিকে কী দেখাচ্ছেন। ওঁরা মোটেই খুশি নন মনে হচ্ছে… খেলা আবার শুরু হচ্ছে খ্যাংরা প্র-থ-ম বল আফিম তপন পা বাড়িয়ে ফরোয়ার্ড খেললেন। বল যেখানে খেলেছেন সেখানেই আছে। কোনো রান হয়নি। পরের বল আ-বা-র নিখুঁত ফরোয়ার্ড খেলা কোনো রান নেই কিন্তু কি ডিফেন্স! যেন আমাদের পঙ্কজ রায়! রান পাঁচ উইকেটে পাঁচ। খ্যাংরা এই বলটি দিয়েছিলেন অফ স্ট্যম্পের বাইরে। কাট মারবেন ভেবে ব্যাট চালালেন আফিম তপন। ব্যাটে বলে হল না। উইকেট কিপার পটকা ধরে নিয়েছেন। ইস যদি ব্যাটে বলে হত তাহলে অবশ্যই একটি কাট উপহার পেতাম আমরা। আফিম তপন এর আগে নিউ রামকৃষ্ণ সঙ্ঘের বিরুদ্ধে পর পর পাঁচটি কাট মেরেছিলেন। সেদিন তিনি দশ রান পেয়েছিলেন বাউন্ডারি থেকে। সেন বাড়ির রোয়াকটি একটু এগিয়ে থাকার কারণে এ-মাঠে বাউন্ডারি দুই ওভার বাউন্ডারি চার। হ্যাঁ কী বলছো ভেবু? ওহঃ বুঝেছি স্কোরার ভেবু বলছেন পুরোনো কথা বাদ দিতে।  বাদ দিয়ে যাচ্ছি ইতিমধ্যে ওভারের চতুর্থ বল… চমৎকার  ড্রাইভ মেরেছেন আফিম তপন… কিন্তু সো-ও-জা কভারে বেচার হাতে গেছে বল… গোদা বিভুতি আফিম তপনের রানের কলে সাড়া দিতে একটু দেরি করে ফেললেন… ওহ ওহ ওহ আউট আউট। না গোদা বিভুতি নন আফিম তপনই রান আউট। কী হল ব্যাপারটা আপনাদের জানাচ্ছি। গোদা বিভুতি হয়তো ভেবেছিলেন বাউন্ডারি হবে কিন্তু বেচার হাতে বল পড়ায় গোদা বিভুতি একটু দোনামোনা করলেন। আর আফিম তপন তখন রান নিতে গিয়ে পিচের মাঝবরাবর  এসে দেখেন গোদা বিভূতি ক্রিজ ছেড়ে বেরননি তখনো। ফলে আফিম তপন   একটু থমকে যান। তখনই গোদা বিভূতি তার ভারি শরীর নিয়েও অত্যন্ত দ্রুত বেগে দৌড়ে অপরপ্রান্তে পৌঁছন। আফিম তপন পড়িমরি করে বোলারপ্রান্তের দিকে ছুটেছিলেন কিন্তু অধিনায়ক খ্যাংরা আমায় দে আমায় দে বলে চেঁচাতে থাকায় বেচা বলটি খ্যাংরাকে ছুঁড়ে দিতে দেরি করেননি। তাই আফিম তপন রান আউট। অত্যন্ত দুর্ভাগ্য বাজারপাড়ার।  গোদা বিভূতির দিকে  রাগত দৃষ্টিতে বারবার ঘুরে তাকাচ্ছেন আফিম তপন তার ফিরে যাবার পথে… মাঠে নেমে পড়েছেন  ব্যাঙা। ছয় উইকেটে পাঁচ রান এখন। ব্যাঙাই শেষ ব্যাটসম্যান। ওদিকে অধিনায়ক খ্যাংরার পঞ্চম বলটি খেলবেন গোদা বিভূতি। কারণ  শেষ মুহূর্তে  প্রাণপণ দৌড়ে তিনি ব্যাটিং প্রান্তে চলে এসেছিলেন যখন বোলিং প্রান্তের দিকে রান আউট হচ্ছেন আফিম তপন। খ্যাংরার বলটি একটু আগে পিচ পড়েছে। ওহ চমৎকার একটি দুই মারলেন গোদা বিভূতি। মিড উইকেটে সপাটে ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন। ওখানকার ফিল্ডার চোম্পে বলটিতে হাতই ছোঁয়াতে পারলেন না। চোম্পে এবার ক্লাস সেভেনে উঠেছেন। ইতিমধ্যে পরের বল ওহ হ কি মার! এগিয়ে এসে বোলারের মাথার ওপর দিয়ে তুলে সোজা বটগাছের তলায় ফেলেছেন গোদা বিভূতি। ওভার বাউন্ডারি চার। ছ উইকেটে এগার এখন বাজার পাড়ার। অধিনায়ক খ্যাংরার ওভার শেষ। খেলা জমে উঠেছে। গোদা বিভূতির পা মাথা বলের লাইনে যায় না। তিনি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মারেন। কিন্তু দারুণ মারেন।

  kobo_cricket_toon_clip_art_23175পরের ওভার শুরু করতে চলেছেন, না খাবলা নয় চোম্পে।
পরের ওভার শুরু করতে চলেছেন চোম্পে। তাঁর বিরুদ্ধে ব্যাট হাতে দাঁড়িয়েছেন ফাস্ট বোলার ব্যাঙা। চোম্পেও মোটামুটি ফাস্ট। ইনিও গায়ে মুখে মারায় প্রসিদ্ধ। স্কোরার ভেবু জিগ্যেস করছেন প্রসিদ্ধ আবার কেন? এত শক্ত শক্ত কথা? প্রসিদ্ধ এমন কি শক্ত কথা? গোপেন মামাদের দোকানেই তো লেখা আছে টাটকা ছানার জন্য প্রসিদ্ধ। গোপেন মামারাও তো সন্ধের পর ছানাও বিক্রি করেন। অবশ্য গোপেন মামা করেন না। কারণ উনি তো আর দোকানে বসে। না। আমার ভুল হয়ে গেছে। বাদ দিয়ে যাচ্ছি। চোপমের প্রথম বলটি পিচ পড়েই সোজা উইকেট কিপার পটকার হাতে চলে গেছে। কোনো রান নেই। দ্বিতীয় বলটি ব্যাঙা ফরোয়ার্ড খেলতে গেছেন বল ব্যাঙার কাঁধে লেগে লাফিয়ে উঠে পয়েন্ট অঞ্চলে ড্রপ খাচ্ছে। উইকেট কিপার নাএ বলে কোনো রান হবে না মনে হয়। একি! গোদা বিভূতি দৌড়চ্ছেন? কিন্তু ব্যাঙা বেরোতে চাইছেন না।  গোদা বিভূতি উলটো দিকে ঘুরে আবার দৌড়চ্ছেন ফেরৎ যাওয়ার জন্য। ওহ কোনো লাভ নেই এবাও সেই কুচো বিভূতি। কি ফিল্ডিং! থার্ডম্যান থেকে ছুটে এসে বল ধরেই ছুড়ে দিয়েছেছেন বোলার চোম্পের হাতে। অবশ্যম্ভাবী আউট জেনে পিচের মাঝখানে হতাশ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছেন গোদা বিভূতি। এগারো রানে বাজারপাড়ার ইনিংস শেষ। অর্থৎ সাত জন আউট গোদা বিভূতি যে কেন এমন অসম্ভব কল দিলেন! রান তো ছিল না। মনে হয় ব্যাঙা তো ব্যাট করতে জানেন না। তাঁর চেয়ে গোদা বিভূতি নিজে ভাল ব্যাট করেন। তাই হয়তো স্ট্রাইক নিতে চেয়েছিলেন। যাই হোক দশ ওভার পুরো খেলতে পারল না বাজারপাড়া। তারা এগারো রানে অল আউট হল এইবার হৃদয়নাথ ব্যায়ামাগার ব্যাট করতে নামবে। পনেরো মিনিত সময় আছে। আমরা একটু চা খেয়ে আসি। আমি বলরাম— যাকে আপনারা সবাই রিলে বলরাম বলে জানেন— আমি, স্কোরার  ভেবু এবং মাইকম্যান হরিহরদা চা খেয়েই আবার আপনাদের কাছে ফিরে আসবো।


আমরা আবার ফিরে এসেছি। চা খাওয়া হয়ে গেছে। কাঁচের গেলাসে দুটো চা খেয়েছি আমি। এতক্ষণ বকছি তো। অবশ্য শুধু চা নয়। টোস্ট খেয়েছি দুটো। মরিচ টোস্ট। মাঠের ওপারে মন্টু কাকার চায়ের দোকানের মরিচ টোস্ট। কোয়ার্টার পাউন্ড পাউরুটি আধখানা করে উনুনে সেঁকে দেয় মন্টুকাকা। তার ওপর মাখন। তার ওপর গোলমরিচ আর নুন। স্কোয়ার ভেবু অবশ্য চিনি টোস্ট খেয়েছেন। মানে ওই কোয়ার্টার পাউন্ড পাউরুটির ওপরে মাখন, তার ওপরে চিনি। গোলমরিচের বদলে চিনি। আমি অবশ্য পছন্দ করি সর-টোস্ট। ওই আধাআধি কাটা উনুনে সেঁকা পাউরুটিতে দুধের সর বিছিয়ে দিয়ে তার ওপর মোটাদানার চিনি ছড়িয়ে খাও। ফাসক্লাস। তবে  ওই টোস্টের ওপর মোটা দানার চিনির সঙ্গে মঝে মাঝে মোটা মোটা মরা পিঁপড়েও পড়ে। ডেয়োঁ সেগুলো, বাদ দিয়ে খেতে হয়। সে যাক গে আমি বাদ দিয়ে যাচ্ছি। তবে একটা কথা না বললেই নয়, ওই টোস্টের জন্য কিন্তু তাতে মাঠ পার হয়ে মন্টুকাকার দোকানে যেতে হয়। ফিরে অনেক সময় এসে দেখি অন্য কেউ মাইক নিয়ে নিয়েছে রিলে করবে বলে। তাই আজ আর যাইনি। আমাকে স্কোরার ভেবু-ই এনে দিয়েছেন কিনে। ধন্যবাদ ভেবু।

যাই হোক, বাজারপাড়া নেমে গেছে ফিল্ডিং করতে। ফিল্ডিং সাজাচ্ছেন গোদা বিভূতি। তিনিই ক্যাপ্টেন। এই ম্যাচে স্লিপে কাউকে রাখা হয় না। কিন্তু, এই হৃদয়নাথ ব্যায়ামাগারের খেলায় একটি স্লিপ থাকে শুধু। তাতে গোদা বিভূতি দাঁড়ান। কুচো বিভূতি যেমন ছোটখাটো, গোদা বিভূতি তেমনই বিরাট। সেই জন্যই তাদের কুচো এবং গোদা বলে আলাদা করা হয়। এই পনেরো মিনিটের বিরতিতে গোদা বিভূতি ক্লাবহাউসে এসেছিলেন। এসে টিফিন বাক্স খুলে তিনটি ডিম সেদ্ধ। দুটি কলা এবং খানিকটা সুজি খেলেন। সুজিটা একবাটি মতো। তাছাড়া দুটি রসগোল্লা। স্কোয়ার ভেবু তাকে বলেছিলেন, এত বেশি খেও না বিভুতিদা। আরও মোটা হয়ে যাবে। গোদা বিভূতি বলেন, আমি কম খেতে পারি না রে। তবে তুই যখন বলছিস, কাঁচাগোল্লা দুটো আর খাব না। তুই নে। ফলে দুটি গোল সন্দেশ স্কোয়ার ভেবু খেয়ে নেন।

ও আচ্ছা, বাদ দিয়ে যাচ্ছি। বাদ দিয়ে যাচ্ছি। এত ব্যক্তিগত কথা রিলেতে বলা ঠিক নয়। আচ্ছা, স্কোয়ার ভেবু জানাচ্ছেন, এর আগের খেলা যেদিন ছিল সেদিন স্কোয়ার ভেবু গোদা বিভুতিকে দুটি গজা দিয়েছিলেন নিজের টিফিন থেকে। তাহলে তো শোধ বোধ। আমরা আর পার্সোনাল কথায় যাবো না। খেলার ধারাবিবরণী দেবো। এখানে অবশ্য আরও একটা কথা না বললে নয়, গোদা বিভূতির অভ্যেস আছে অন্যের টিফিন থেকে নিজে নিজেই তুলে খাওয়ার। গোদা ক্লাস টেনে পড়েন। কিন্ত তাঁকে দেখলে মনে হয় বি এ পাস। এতই ভারিক্কি হয়ে উঠেছেন গোদা বিভূতি। গোদা বিভূতি বাড়ি থেকে ভাত খেয়ে ইস্কুলে আসেন। কিন্ত ফার্স্ট পিরিয়ডের ঘণ্টা পড়তেই দেখা যায় তিনি বেরিয়ে গেছেন। সামনে চেনুদার দোকানে কচুরি খাবেন। চারটের কমে কচুরি তিনি খান না। আবার এক্সট্রা তরকারি এতবার চাইতে থাকেন, যে, দোকানির সঙ্গে গণ্ডগোলও হয়ে যায়। মুখ মুছতে মুছতে তিনি যখন সেকেন্ড পিরিয়ডের মাঝামাঝি ফেরত এসে ক্লাসে ঢোকার পারমিশন চাইছেন শিক্ষক যদি জিগ্যেস করেন, তুমি এতক্ষণ কোথায় ছিলে? তখন গোদা বিভূতি অম্লান মুখে বলে দেন স্যার পাইখানায় গিয়েছিলাম। দুপুরে আবার গোদা বিভূতি সাইকেল করে বাড়ি যান ভাত খেতে। এবং টিফিন পিরিয়ড শেষ হবার মুখে মুখে গোদা বিভুতির মুখ চলছে। তিনি ডালমুট খাচ্ছেন কোনওদিন। কোনওদিন মশলা মুড়ি চিবোচ্ছেন। সারাক্ষণ কিছু না কিছু খেতেই হয় গোদা বিভুতিকে। খেলার শুরুতে অধিনায়ক গোদা বিভূতি কাকে দিয়ে বোলিং ওপেন করাবেন দেখা যাক। ও, আচ্ছা, বাজারপাড়ার পক্ষে প্রথম ওভার শুরু করবেন অ্যাঁও-অ্যাঁও স্বপন। অ্যাঁও-অ্যাঁও স্বপনের নাম অ্যাঁও-অ্যাঁও স্বপন হল কেন অনেকেই জানেন। আবার অনেকেই জানেন না। যাঁরা জানেন না তাঁদের জন্য বলছি।

অ্যাঁও-অ্যাঁও স্বপন সারাক্ষণ তাঁর সমস্ত কথার আগে-মধ্যে-শেষে একটি অ্যাঁও-অ্যাঁও যোগ করেন। স্বপন কোথায় গিয়েছিলি? অ্যাঁও স্যারের বাড়ি পড়তে গেছিলাম অ্যাঁও। ইস্কুলে মাস্টারমশাই বললেন নায়াগ্রা জলপ্রপাত কোথায় অবস্থিত? অ্যাঁও কানাডায় অ্যাঁও স্যার। স্বপন, তোমার বাবা বাড়ি আছেন? অ্যাঁও বাবা আজ অ্যাঁও মামার বাড়ি গেছে অ্যাঁও। সব কথায় একটি ‘অ্যাঁও’ লাগানোর কারণে তাঁর নাম অ্যাঁও অ্যাঁও স্বপন। অ্যাঁও অ্যাঁও স্বপন তাঁর প্রথম বলটি করবেন। ব্যাট করতে নেমেছেন দুই বিশু। মুক্তি বিশু আর কাশি বিশু। মুক্তি বিশুর বাবার নাম মুক্তিপদ হালদার। আর কাশিনাথ ইনস্টিটিউশন নামে যে ছেলেদের ইস্কুল আছে, তার ঠিক পাশের বাড়িটায় থাকেন বলে অন্যজনের নাম কাশি বিশু। ব্যাট করবেন মুক্তি বিশু। অ্যাঁও অ্যাঁও স্বপন দৌড় শুরু করেছেন। প্রথম ব-অ-ল ওভার পিচ। পায়ে লাগল। মাঠে বোলারের হুঙ্কার। অ্যাঁ-অ্যাঁ-ও হাউজ দ্যাট্যাঁ ওঁ-ও!

আম্পায়ার গোপেনমামা মিষ্টি হেসে নট আউট বললেন। অ্যাঁও-অ্যাঁও স্বপন দ্বিতীয় বল করলেন। কানের পাশ দিয়ে উইকেটকিপার নির্মলের হাতে। তৃতীয় বল মুক্তি বিশু কানার মতো চালালেন। মুক্তি বিশু ফরোয়ার্ড খেলতে জানেন না। কিন্তু এই ম্যাচগুলোয় হৃদয়নাথ ব্যায়ামাগারের ক্যাম্বিস বল কিনে দেন মুক্তি বিশুই। তাঁর বাবার একটি রেশন দোকান আছে। যে দোকান ‘কাকার রেশন’ নামে খ্যাত। এ টাউনে সবাই বলে ‘কাকার রেশনে’ যাচ্ছি। তাই মুক্তি বিশু ফরোয়ার্ড না খেলতে পারলেও ওপেনার হয়েছেন কেননা সেটাই তাঁর ইচ্ছা। কানা চালিয়ে বলটি মিড উইকেটের দিকে যেতে মুক্তি বিশু একটি রান পেয়েছেন। ফলে কাশি  বিশু এসেছেন। অ্যাঁ অ্যাঁ স্বপন একটি বাম্পার দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে একটি প্রচণ্ড দুই মারলেন কাশিবিশু। অপূর্ব দুই। কাশি বিশু ভালই লম্বা। মিড উইকেট দিয়ে ঘুরিয়ে দিইয়েছিলেন একেবারে মিউনিসিপ্ল্যালেটির টাইম কলের পাশে। এ হে পরের বলেই ক্যাচ দিলেন স্লিপে। মোটা মোটা আঙুল দিয়ে ধরতে গিয়ে সেটি ফসকালেন অধিনায়ক গোদা বিভূতি। বলটি তাঁর পিছন দিকে চলে যাওয়ার পর গোদা বিভূতি হেলে দুলে বলটির পিছনে হেঁটে গিয়ে বলটি ঘুরিয়ে ফেরত দিলেন বোলারকে। একটি রান হল। বোলার প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন, বিভূতিদ্যাঁও, এ কী ছেলেখেল্যাঁও? পরের বলটি বোলারের হাত থেকে ফস্কে গেছে। বোলার বললেন, যাঃ, শাল্যাঁও। বলটি দুটি ড্রপ খেয়ে ধীরে ধীরে মুক্তি বিশুর দিকে আসছে। আসছে। মুক্তি বিশু মে-রে-ছে-ন। এঃ হে, হ্যান্ডলের কাছে লেগে উঠে গেছে। কা-ছে-ই পড়েছে। শর্ট মিডউইকেটে। ওখানে কে? বোলারের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে : লি-ভি-ট্যাঁ-অ্যাঁও। ইশ-প-শ-শাল্যাঁও উফফ! বোলার উঁচু ক্যাচ ধরতে গিয়ে লিভ ইট কল দিলেন তারপর হুমড়ি খেয়ে পড়লেন মাঠে। ক্যাচ মিস। একটি রান। হৃদয়নাথ ব্যায়ামাগারের রান বিনা উইকেটে চার। অভেরের আর একটি বল বাকি। ব্যাট করবেন কাশী বিশু। কাশী বিশু আর মুক্তি বিশু-র মধ্যেও ওপেনিং ব্যাটসম্যান হিসেবে খুবই সুন্দর বোঝাপড়া। তাঁরা চারটি মহামুল্যবান রান কুড়িয়ে নিতে পেরেছেন প্রথম ওভারেই। ইতিমধ্যে ওভারের শেষ বলটি হয়ে গেল। ব্যাটসম্যানের কাঁধের পাশ দিয়ে বল চলে গেল উইকেটকীপার নির্মলের হাতে। এ বলে কোনও রান হল না। ওভার শেষ। প্রথম ওভারের শেষে হৃদয়নাথ ব্যায়ামাগারের রান বিনা উইকেটে চার। বলা দরকার, নেবু ফিল্ডিং দিচ্ছেন না। তিনি বাড়ি চলে গেছেন। ফলে সাতজনে ফিল্ডিং খাটতে হচ্ছে বাজারপাড়াকে। দ্বিতীয় ওভার শুরু হবে। নর্দমা প্রান্ত থেকে বল করতে আসবেন সম্ভবত ব্যাঙা। ব্যাঙা আর অ্যাঁও অ্যাঁও স্বপন-ই সাধারণত বাজারপাড়ার বোলিং ওপেন করেন। ব্যাঙা আগের ওভারে হাইড্রেনের ধারে ডিপ ফাইন লেগে ফিল্ডিং দিচ্ছিলেন। ওখানে ফিল্ডিং দেওয়াটার একটা বাড়তি দায়িত্ব আছে। যাতে নর্দমায় বল পড়ে না যায় সেটা দেখতে হয়। শুধু বাউন্ডারি বাঁচালেই হয় না। যেমন হৃদয়নাথ ব্যায়ামাগার ওদিকটায় রেখেছিল কুচো বিভুতিকে। তিনি বয়সে সবচেয়ে ছোট হলেও ছুটতে খুবই পটু।

মাঠের শেষের ওই নালাটিই টাউনের প্রধান হাইড্রেন। নদীতে গিয়ে মিশছে। মাঠের পরেই নদী। একটু ঢালু দিয়ে নামতে হয়। এই ক্লাবহাউসের পিছনে গেলেই নদী দেখা যায়। সুন্দর বাতাস আসছে নদী থেকে। আর ব্যাঙাও এগিয়ে এসেছেন, গোদা বিভূতি নিশ্চয়ই ব্যাঙাকেই বল করতে ডাকবেন।
আমরা দেখতে পাচ্ছি ব্যাঙা নয়, গোদা বিভূতি নিজেই বল করতে যাচ্ছেন। গোদা বিভূতি একজন স্পিনার। ছুঁড়ে তো বটেই, না-ছুঁড়েও তিনি বল ঘোরাতে পারেন। না-ছোঁড়া স্পিনগুলির মধ্যে হটাৎ একটি ছোঁড়া বল, বিদ্যুৎগতিতে এসে ব্যাটসম্যানকে ভেবড়ে দেয়। এই শিবু সরকার টুর্নামেন্টে দুবার চার উইকেট নেবার রেকর্ড একমাত্র গোদা বিভুতিরই দখলে। সাতটি উইকেটের মধ্যে চারটি একাই নিয়েছেন তিনি। একে ফাইভ উইকেট হাউল বলা যায়। এবং দুবার বোলার হিসেবে এই অনন্য কৃতিত্বের অধিকারী হওয়ার জন্যই তিনি এবার কাপ্টেন হয়েছেন। ব্যাঙা মুখ চুন করে লঙ অনে চলে যাচ্ছেন।  গোদা বিভূতি বল করবেন মুক্তি-বিশুকে। গোদা বিভুতির প্রায়-কোনও রান আপ নেই। তিনি মোটাসোটা বলে প্রায় ক্রিজে দাঁড়িয়েই বল দিয়ে দেন। বল লাট্টুর মতো ঘোরে।

প্রথম বল। বো-ও-ল্ড। মুক্তি বিশু বোল্ড। অফ স্টিক হেলে গেছে। বলটি বুঝতেই পারেননি মুক্তি বিশু। এটি একটি লেগ স্পিন। গোদা বিভুতির বিখ্যাত ছোঁড়া লেগ স্পিন। আম্পায়ার বিমল স্যার নো ডাকেন না, কারণ এই শিবু সরকার টুর্নামেন্টে ছোঁড়া অ্যালাউ। মুক্তি বিশু ফিরে যাচ্ছেন। নামছেন মোটা বাবলু। ফিল্ডিং-এ সুনাম না-থাকলেও দশ ওভারের টুর্নামেন্টে তিনিই একমাত্র কোয়ার্টার সেঞ্ছুরি করেছেন। এবং দুবার। একবার ২৫। একবার ২৬। গ্রেট হিটার। গোদা বিভূতি অত্যন্ত বিছক্ষন অধিনায়াক। প্রথম থেকেই নিজে আক্রমাণে এসেছেন।  এই বলটি গোদা বিভূতি হাওয়ায় ভাসিয়ে দিয়েছেন। এগিয়ে এসে মোটা বাবলু মেরেছেন। বল সম্ভবত ওভার বাউন্ডারি হতে যাচ্ছে। অপূর্ব ক্যাচ। লঙ অনে। ব্যাঙা ধরেছেন। দুর্দান্ত ক্যাচ। অনেকটা ছুটে গিয়ে ধরে নিয়েছেন ব্যাঙা। মোটা বাবলু ফিরে যাচ্ছেন কোনও রান না-করেই। হৃদয়নাথ ব্যায়ামাগারে দু উইকেটে চার। স্কোরার ভেবু জানাচ্ছেন পরপর দুটি বলে দুটি উইকেটই নিয়েছেন গোদা বিভূতি। সুতরাং গোদা বিভূতির সামনে হ্যাটট্রিকের সুযোগ। মাঠে নামছেন অধিনায়ক খ্যাংড়া। খ্যাংড়া নিশ্চয়ই চাইবেন না গোদা বিভূতির হ্যাটট্রিক হোক। অধিনায়ক বনাম অধিনায়ক। মাঠে রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনা। কি হয় কি হয়! ব্যাট ধরে প্রস্তুত  খ্যাংড়া। না, হ্যাটট্রিক হয়নি। বলটি লেনথে ছিল। কভারে ঠেলে দিয়েই চোলে আয় বলে ছুটতে শুরু করেছেন খ্যাংড়া। আফিম-তপন কভার থেকে তুলে সোজা এক-টিপে ছুঁড়ে ভেঙে দিয়েছেন উইকেট। সা-আ-ংঘাতিক থ্রো-ও। কাশী বিশু রান আউট। তিন উইকেটে চার হৃদয়নাথ ব্যায়ামাগার।
বিনা উইকেটে চার থেকে তিন উইকেটে চার। তাও পরপর তিন বলে। আসলে কাশী বিশু ঠিক রেডি ছিলেন না। রানের কলটা আসতে কাশী বিশু দৌড় শুরু করতে একটু দেরি করে ফেলে ছিলেন। তাঁর মূল্য দিতে হল।

ব্যাট করতে নামছেন উইকেটরক্ষক পটকা। ক্যাপ্টেন খ্যাংড়া চিন্তিত মুখে এগিয়ে গেছেন নতুন ব্যাটসম্যান পটকার দিকে। খ্যাংড়া কিছু সময়োচিত পরামর্শ দিতে দিতে আসছেন পটকাকে, পটকা মাথা নিচু করে ঘাড় নাড়ছেন। মাত্র এগারো রান হাতে নিয়ে যে এইরকম সংগ্রাম করা যায় সেটা গোদা বিভূতিই দেখালেন। পটকা ব্যাট ধরে দাঁড়িয়েছিলেন। ফিল্ডিং সামান্য অদল বদল করেছেন গোদা বিভূতি। পটকা একজন মারকুটে ব্যাটসম্যান হিসেবে প্রসিদ্ধ। তিনি বেশ কয়েকবার তেরো চোদ্দ বা পনেরো করেছেন। কোয়ার্টার সেঞ্ছুরির অর্ধেক ধরা যায় তেরো রানকে।

সুতরাং পটকার তেরো চোদ্দ পনেরগুলিকে আমরা অনায়াসেই অর্ধশত রান বলতে পারি। পঁচিশ কে যদি কোয়ার্টার সেঞ্ছুরি বলা যায়.. পরের বল, পটকা সোজা বোলারের হাতে ঠেলে দিয়েছেন। কিন্তু নিচু হলেও বলটা আটকাতে পারলেন না গোদা বিভূতি। কারণ গোদা বিভূতি বিশেষ নিচু হতে পারেন না। নড়াছড়া করতে মুস্কিল হয় তাঁর। গোদা বিভূতির পেটটি কিছু বেশি বড়। বল সোজা বিভূতির হাতে লেগে বোলারের ঠিক পিছনের দিকে গেছে। ব্যাঙা লঙ অন থেকে দৌড়ে এসে ছুঁড়লেন। বোলার প্রান্তের উইকেট ভাঙ্গল কিন্তু কেউ আউট হলেন না। বলটি ঠেলেই পটকা দৌড়তে শুরু করেছিলেন  আর খ্যাংরা অধিনায়কোচিত ক্ষিপ্রতায় দ্রুত অপরপ্রান্তে পৌছে গেছেন। রান তিন উইকেটে পাঁচ। আমি বুঝতে পারছি না হৃদয়নাথ ব্যায়ামাগার এত তাড়াহুড়ো করছে কেন? এই তো মাত্র দ্বিতীয় ওভার চলছে। দশ ওভারের খেলা। হাতে এখনও আট ওভার। ধীরে সুস্থে খেলে, সিংগলস নিলেই তো রান কভার হয়ে যায়। যাই হোক, আবার ফিল্ডিং এর একটু অদল বদল ঘটাচ্ছেন গোদা বিভূতি। বল করছেন। ফুলটস। খ্যাংড়া উঁচু করে মে-রে-ছেন। ব্যাঙা লঙ অনে পিছোচ্ছেন। বল সীমানার বাইরে। ওভার বাউন্ডারি। দুই। তিন উইকেটে  সাত। পরের বল। নো বল। নো ডেকেছেন গোপেন মামা। ফলে সবাই শুনতে পেয়েছে। গোদা বিভূতি গপেনমামাকে কিছু জিগ্যেস করছেন। গপেনমামা আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছেন কোথায় পা পড়েছে। এ কি! পরের বল আবার নো! দুটি বলেই ব্যাট চালিয়ে পারাস্ত হয়েছেন অধিনায়ক খ্যাংরা। এই একটি ওভার বড় নাটকীয়। এক্ষুনি বাজারপাড়া লড়াই করে কোণঠাসা করে দিয়েছিলো। হৃদয়নাথ ব্যায়ামাগারকে। আবার কয়েক বল পরেই এখন যা দাঁড়িয়েছে তাতে হৃদয়নাথ ব্যায়ামাগারের হাতে চার উইকেট। জয়ের জন্য দরকার তিন রান। আট ওভার। জয়ের আশা তাদেরই উজ্জ্বল।

দুটি বল পরপর নো হওয়ার ফলে দুটি বল বাড়তি পেয়েছেন  গোদা বিভূতি। তিনি আম্পায়ার গোপেন মামার পেছন থেকে এখন বল করবেন। গোদা বিভূতির গর্জন আমরা শুনেছি। বোলিং ক্রিজে যাবই না শালা। সঙ্গে সঙ্গে শালা বলার জন্যে লেগ আম্পায়ার বিমল স্যার কর্তৃক সতর্কিতও হয়েছেন তিনি। আম্পায়ারের পাশে দাঁড়িয়ে বল দিইয়েছেন গোদা বিভূতি। বোল্ড। অধিনায়ক খ্যাংরা বোল্ড। লাট্টুর মতো ঘুরল বল। গোদা বিভূতির সেই বিক্ষ্যাত ছোড়া লেগ ব্রেক। হতভম্ভ খ্যাংরা গোদা বিভূতির দিকে তাকিয়ে রিলেন কিছুক্ষন যেন কিছু বলতে চান। তারপার মাথা নিচু করে বেরিয়ে যেতে লাগলেন।
ব্যাট হাতে খাবলা নামছেন। এখন তাঁর পরনে পেন্টুল। যদিও সাদা নয়। সবুজ রঙের। তিনি চেচিয়ে চেচিয়ে কাকে যেন বলছেন— বাড়ি গিয়ে দেখলামতারে মেলে দেওয়া আমার পেন্টুল শুখিয়ে গেছে। ইসতিরি আর করা হল না। তাই কুঁচকে আছে। সেটা পরেই ব্যাট করতে চলে এলাম।

খাবলা দাঁড়িয়েছন ব্যাট হাতে। ওভারের শেষ বল। দু-পা এগিয়ে বোলারের মাথার ওপর দিয়ে তুলে দি-য়ে-ছেন খাবলা। ছুটে যাচ্ছেন ব্যাঙা লঙ অন থেকে। বল মাঠ পার হয়ে গেল। আবার বাউন্ডারি দুই। দু দলের রান সোওমান। দু দলই এগারো। মাঠে টান টান উত্তেজনা। বল করতে আসছেন অ্যাঁও অ্যাঁও স্বপন। স্বপন নার্ভাস হয়ে শট পিচ দিয়ে ফেলেছেন। পটকা বলটিকে কভারে থেলেই দ্রুত ১ রান। চার উইকেটে বারো। হৃদয়নাথ ব্যায়ামাগার তিন উইকেটে পরাজিত করল বাজারপাড়াকে। অধিনায়ক খ্যাংড়া এগিয়ে গিয়ে করমর্দন করছেন বিপক্ষ অধিনায়ক গোদা বিভুতির সঙ্গে। দু ওভারে রান কভার হয়ে গেল।

ফিল্ডার, আম্পায়ার, ব্যাটসম্যানরা চলে যাচ্ছেন মাঠের বাইরে। খেলা আজকের মতো শেষ। আপনাদের জানিয়ে রাখি পরের দিনের খেলা টাইগার স্পোর্টিং ও ষষ্ঠীতলা ইউথ ক্লাবের মধ্যে। আমি, বলরাম, যথারীতি হাজির থাকব আপনাদের কাছে। শিবু সরকার টুর্নামেন্টের ধারাবিবরণী দিতে। আজকের মতো আপনাদের আমরা যার যার বাড়িতে ফিরিয়ে দিচ্ছি। নমস্কার।


বলরামের ডায়েরি
আমি প্রত্যেকটা খেলার পর, রাত্রে একটি ডায়েরিতে খেলার কথা লিখে রাখি। আজ একটি ঘটনার কথা লিখব। দুপুর দুটোয় আজ বাজারপাড়া ও হৃদয়নাথ ব্যায়ামাগারের ম্যাচ শেষ হয়। চারটের সময় অচিন্ত্য স্যারের বাড়ি পড়তে যাই। ৭ টায় বাড়ি ঢুকতে মা বলল, ডিম, ময়দা, ব্যাসন, কলা আর একটা ছোট দেখে লাউ কিনে আনতে। আমি বললাম, তবে আমি কিন্তু দুটো কচুরি, আর দুটো পানতুয়া খেয়ে আসব। পয়সা দাও। মা গজ গজ করল, পয়সাও দিল। ভাবলাম, বাজারে ঢোকার আগে, হরিদাসবাবুর মিষ্টির দোকানটায় ঢুঁ মেরে যাই।
হরিদাসবাবুর পানতুয়া বিখ্যাত। দূর দূরান্ত থেকে লোকে আসে কিনতে । বাজারের মধ্যে হরিদাসবাবুর দোকান। ঢুকলাম। ঢুকে দেখি একটু ভেতর দিক ঘেঁষে খ্যাংরা বসে আছে। একটা চেয়ারে। পাশের চেয়ারে বাজারপাড়া ক্লাবের প্রেসিডেন্ট অনাদিবাবু। আমারদিকে পিছন করে বসেছে পটকা। হৃদয়নাথের উইকেটকিপার। আর একদম কোনায় আমার দিকে পিছন করেই বসে থাকা ওই বড় গোল মাথাটা কার? অত বড় চেহারাই বা কার হবে? হ্যাঁ গোদা বিভূতিই বসে আছে। আর সবাই মিলে খাচ্ছে। খ্যাংরা আর পটকার সঙ্গে  অনাদিবাবু কেন? খ্যাংরা আমায় দেখতে পেয়েছে। হাত নেরে  ডাকল। ওদের সঙ্গে বসলাম। আমায় দেখে গোদা বিভূতি কেমন একটা হাসল। একটু কাচুমাচু হয়ে পড়ল যেন। এত গপগপ করে খাচ্ছে যে মুখে এই শীতকালেও ঘাম দেখা দিয়েছে। অনাদিবাবু কিছু খাচ্ছেন না। অর্ডার দিচ্ছেন। মানে দামও তিনি দেবেন। খ্যাংরা বলছে, তুই মাঠে যা শুরু করেছিলি বিভূতি, ভাবলাম কথাটা তোর মনে নেই। বিভূতি গব গব করে হিঙের কচুরি খেতে খেতে বলল, মনে থাকবে না কেন? ছোলার ডালটা আর একটু দিতে বল তো! অনাদিবাবু হাঁকেন, এই গৌর, একটু ছোলার ডাল এদিকে। পটকা বলল, তোর হাতে বল দিয়ে দৌড়চ্ছি, ভাবলাম রান আউট করে দিস যদি। ডাল এল। গোদা বিভূতি বলল, পা-গ-অল! বলেছিলাম না, সেকেন্ড ওভারের মধ্যে ম্যাচ তোদের হয়ে যাবে। একটা বল বেশি লেগেছে। খ্যাংরা বলল, প্রথম দুটো বল যেভাবে করলি, তাতে ভাবলাম হয়তো টিমকে জেতানোর চেষ্টা করছিস।
গোদা বিভূতি বলল। ওটা না করলে হয়? খ্যাংরা বলে আমায় ওরকম আচমকা বোল্ড করে দিবি? উইনিং রানটা আমার করা হল না। আমি ভাবছিলাম কোথায় একটা লুজ বল আসবে…! তা নয়…
মুখে কচুরি ঠেসে দিতে দিতে গোদা বিভূতি বলে বুঝিস না কেন, না-হলে তো আমায় ক্যাপ্টেন রাখবে না। টিম দেখলে আমি ফাইট করেছি, চেষ্টা করেছি। কি না? খ্যাংরা পটকা দুজনেই বলল, তা তো বটেই। তোর যা বুদ্ধি। গোদা বিভূতি বলল, পানতুয়া বল। চারটে। আমাকে খ্যাংরা বলল, কাউকে  বলিস না যেন। আমি বললাম, বলব না, কিন্তু খাওয়া! খাওয়াতে হবে আমাকে। খাওয়াচ্ছি, খাওয়াচ্ছি। কী খাবি বল! আমি বললাম, দুটো কচুরি।  দুটো পানতুয়া। আর পঞ্চাশ গ্রাম ছানার পোলাও ব্যাস।
পটকা উঠে গেল। দোকানের কাউন্টারের দিকে। ফিরে এসে বলল। আসছে। এখুনি আসছে। তোর কচুরি আর ছানার পোলাও।
আমি বললাম আর পানতুয়া।
পটকা বলল, আরে, তাও আসছে।
এল।  সবই এল। আমি খেতে লাগলাম।
এবার থেকে আমি তক্কে তক্কে থাকব। গোদা বিভূতিকে হাতে- নাতে ধরতে পারলেই বলব, খাওয়া! নইলে সব বলে দেব রিলে করার সময়। আমার রিলে তো জানিস!
না খাইয়ে ও যাবে কোথায়!