উৎসবের ভালো সিনেমার সুলুক সন্ধান

মানবেন্দ্রনাথ সাহা

১৭ নভেম্বর ২০১৭ শেষ হল ২৩ তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব। দেখানো হল ১৬০-এর বেশি দেশ -বিদেশের সিনেমা। উৎসবের উদ্বোধন ঘটা করে হয়েছে নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে। বিনোদনধর্মী তারকাখচিত উৎসব। অমিতাভ বচ্চন থেকে কমল হাসান, শাহরুখ খান থেকে মহেশ ভাট সকলেই ছিলেন। যদিও এই ধারার সিনেমার সঙ্গে এঁদের যোগ সামান্য মাত্র! অমিতাভ বচ্চনের সিনেমায় গানের ব্যবহার নিয়ে বলা নাতিদীর্ঘ রচনাটি প্রাঞ্জল ও তাঁর কণ্ঠে অনবদ্য
মঞ্চে কাজল, দেব, সাবিত্রীদেবীর সঙ্গে কুমার সানু কেন বোঝা গেল না! সকলের মধ্যমণি হয়ে বসেছিলেন মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী। উৎসবের উদ্বোধনী ছবি ছিল ইরানের। মোস্তাফা তাঘিজাদে পরিচালিত ‘ইয়েলো’।

এবারের চলচ্চিত্র উৎসবের জন্য প্রদর্শিত ছবিগুলি নানা ক্যাটাগরিতে বিভক্ত ছিল। যার ভিতর উল্লেখ্য: ইন্টারন্যাশানল কম্পিটিসন, এশিয়ান সিলেক্ট, কনটেম্পোরারি মোরোকান সিনেমা, মাইকেল উইন্টারবটম রেট্রোস্পেকটিভ, সিনেমা ইন্টারন্যাশানাল, স্পেশাল ট্রিবিউট, ন্যাশনাল বেস্ট, সেন্টেনারি ট্রিবিউট প্রভৃতি। এই বিভাগগুলির মধ্যে মোরাকানের ছবি, উইন্টারবটমের ছবি আর কন্টেমপরারি ইন্টারন্যাশানাল ছবিগুলি বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করে আগত দর্শকদের কাছে। ২০১৭-তে তৈরি নন-হলিউড বিদেশি ছবিগুলি দেখার জন্য এই উৎসবের দিকে তাকিয়ে থাকে কলকাতা ও মফস্বলের দর্শকেরা।

কন্টেমপোরারি সিনেমা ইন্টারন্যাশানালের এক ঝাঁক টাটকা ছবির মধ্যে আছে: দ্য স্কোয়ার, ওয়াজিব, দ্য গডেস, মোর, সুইট কান্ট্রি, অন দ্য বডি এন্ড সোল প্রভৃতি।

মোরাকোর সিনেমাগুলির ভিতর উল্লেখ্য: ফরগটন, জিরো, রাজিয়া। উইন্টরবটমের রেট্রো-তে তাঁর রোড মুভিসগুলি অন্য মাত্রা এনেছে। যেমন: ওয়েলকাম টু সেরেজাভো, দ্য রোড টু গুয়ান্তানামো, তৃষ্ণা, এভরিডে প্রভৃতি।

আন্তর্জাতিক এই চলচ্চিত্র উৎসবে কয়েক বছর ধরে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। এবারে তা আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। এই পর্যায়ে আমার নির্বাচিত ছবিগুলি হল: ডেথ অব এ পোয়েট, এ সর্ট ফ্যামিলি, সন অব সোফিয়া, কুপাল, বার্ডস আর সিংগিং ইন কিগালি, সাউন্ড অব সাইলেন্স, এ লেটার টু দি প্রেসিডেন্ট, ব্যালাড ফর্ম টিবেট, গুডবাই কাঠমান্ডু, দ্য লাস্ট ম্যুরাল।

স্পেসাল ট্রিবিউট আর স্ক্রিনিং হিসেবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ছবি দেখালো এই উৎসব। যার ভিতর আছে: আন্দ্রে ভাইদার ছবি আফটার ইমেজ, গোদারের ছবি গ্রানজার এন্ড ডিকেডেন্স অব এ স্মল ফিল্ম বিজনেস, উস্তাওলোর ক্লেয়ার অবস্কিওর প্রভৃতি।

এই উৎসব শ্রদ্ধা জানিয়েছে বেশ কয়েকজন ভারতীয় চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বকে। তাঁদের ছবি দেখিয়ে।

দেখানো হয়েছে ওম পুরী অভিনীত ছবি সদগতি, নব্যেন্দু ঘোষ পরিচালিত ছবি তৃষ্ণা, রবিন মজুমদার অভিনীত ছবি কবি, রামানন্দ সেনগুপ্তর চিত্রগৃহীত ছবি হেডমাস্টার, টম অলটার অভিনীত ছবি শতরঞ্জ কে খিলাড়ি।

বাংলা সাহিত্যে একটি উল্লেখ্য নাম ও প্রখ্যাত চিত্রনাট্যকার নবেন্দু ঘোষ। চিত্রনাট্যকার হিসেবে তিনি খ্যাতি অর্জন করেছেন সুজাতা, বন্দিনী, দেবদাস, তিসরি কসম প্রভৃতি ছবিতে এই উৎসবে তাঁর পরিচালিত জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্ত বিতর্কিত ছবি তৃষাগ্নি দেখানো হল। রবিন মজুমদার এবছর শতবর্ষে। মুর্শিদাবাদে জন্মগ্রহণ করা চারের দশকের এই অভিনেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দেখানো হল কবি সিনেমাটি।

পরিচালক, চিত্রনাট্যকার, অভিনেতা রাজেন তরফদার। তাঁর পরিচালিত গঙ্গা দেখানো হল।
জোলতান ফাবরি হাঙ্গেরির একজন গুরুত্বপূর্ণ পরিচালক। তাঁর জন্ম শতবর্ষে কয়েকটি ছবি দেখানো হল। যার মধ্যে আছে সামার ক্লাউডস, হার্ড সামার, দ্য লাস্ট গোল।

উৎসবে এইগুলি গুরুত্ববাহী প্রাপ্তি।

চলচ্চিত্র উৎসবের আরেকটি আকর্ষেণের জায়গা হল সেমিনার, পরিচালক/ অভিনেতার মুখোমুখি, অতিথি আর আড্ডা। এটাও ছিল জমজমাট। শেষ দুদিনের বৃষ্টি তাতে কিছু বিঘ্ন ঘটিয়েছে এবার। সেমিনারে আর সাংবাদিক সম্মেলনে, ফেস টু ফেস-এ মাতিয়েছেন উইন্টারবটম, কারিম দুকলি, প্রকাশ ঝাঁ, নামন রামচন্দ্রন, অশোক বিশ্বনাথন, অনুরাগ বাসু, সালমা বারগাস, ইমা জামালি, দিয়েগো, শেখর দাস।

এই চলচ্চিত্র উৎসবে এবারের অভিনবত্ব হল প্রখ্যাত ভারতীয় পরিচালক প্রকাশ ঝাঁর ক্লাস, বলিউডে বাঙালি শীর্ষক সোমনাথ রায়ের প্রদর্শনী। ভাললাগেনি কারওরই তবু শুনে যেতেই হয়েছে ফেস্টিভ্যাল সিগনেচার টিউন। ভীষণ বিরক্তিকর। উৎসব অধিকর্তা যাদববাবু একটু ভেবে দেখবেন। ভাললাগেনি ছবি শুরুর আগে দেখানে পিকাচার কোলাজটিও।

উৎসবের আড্ডায় টলিউডের অভিনেতা অভিনেত্রীদের সঙ্গে বলিউডের পুরনো নায়ক নায়িকা মৌসুমি-বিশ্বজিৎ জমিয়ে দিয়েছেন। বাংলা আকাদেমির সভাঘরে ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজ আয়োজিত ফেস টু ফেস জমে যায় প্রতিদিন দুপুরে। বই আর সিনেমার পত্রিকা বিক্রির আড্ডা জমত ভবানীপুর ফিল্ম সোসাইটির স্টলে।

উৎসবের দশটি সিনেমা আমার চোখে
১. অন বডি এন্ড সোল: পরিচালক এনয়েদি। হাঙ্গেরির ছবি। বার্লিনে স্বর্ণ ভালুক পুরস্কার জয়ী এই ছবি জীবনের অন্য গান শুনিয়েছে। কসাইখানার স্বাস্থ্য পরিদর্শক মারিয়ার এক অদ্ভুত ও নৃসংশ প্রেম কাহিনি নির্মাণ করেছেন পরিচালক। পরাবাস্তব মন্তাজ ব্যবহারে বাস্তব এক অন্য মাত্রা পেয়েছে তাঁর ছবিতে।

২. কুপাল: ইরানের এই ছবিটি একেবার অন্যরকম। বর্তমান ভোগবাদী সমাজে আমরা নিজের নিরাপদ ভোগ দুর্গে নিজেরাই বন্দি। সেখান থেকে মুক্তি পেতে প্রিয়জনকে হত্যা করে আলোর সন্ধান চায়। কিন্তু সে আলো চিরমুক্তি দিতে পারে না।

৩. আফটার ইমেজ: স্তালিন সমর্থক কমিউনিস্ট পোল্যান্ডে একজন চিত্রকার সরকারের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে পড়ে। নিজের স্বাধীন শৈল্পিক চেতনার জন্য কীভাবে কমিউনিস্টদের কুনজরে পড়ে, অনাহারে দুঃখে তাকে প্রাণ দিতে হয় সেটাই ভাইদার ছবিতে দেখানো হয়েছে।

৪. ডেথ অব এ পোয়েট: বাংলাদেশের ছবি। একজন কবির মৃত্যুর পর তার জীবনদর্শনের আলোয় সমকালকে তুলে ধরা হয়েছে সুররিয়ালিস্টিক নানা ইমেজের দ্বারা। শুধু ঢাকার পরিবেশ বিষাক্ত নয়, মনও বিষাক্ত হচ্ছে। কবি তাই প্রকৃতির ভিতরেই আরাম চান। ছবিটির পরিচালক আবু সঈদ।
৫. ক্লেয়ার অবস্কিওর: তুরস্কের ছবি। আধুনিক মনের এক মানসিক চিকিৎসক ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের শিকার থেকে একটি মেয়েকে উদ্ধার করতে গিয়ে দেখে মেয়েটি বাবার দ্বারা দীর্ঘদিন ধরে ধর্ষিতা। তার মনের সুলুক সন্ধানে এগিয়ে দেখে তার স্বামীর দ্বারা সেও এক ভায়োলেন্সের শিকার। শেষ পর্যন্ত তার এক সহকারী হয়ে ওঠে তার মন ও যৌনমুক্তির জায়গা।

৬. অ্যালানিস: আর্জেন্টিনার ছবি। যৌনতা কখনো আর্ট হয়েছে কখনও, কখনও বা বাঁচার মাধ্যম। যৌনকর্মীদের এই পেশা সমাজে নিন্দিত হলেও আধুনিক সভ্যতায় এর কদর বেড়েই চলেছে। চক্ষু লজ্জার আবেগকে ঝেড়ে ফেলে, নীতিকথা ছেড়ে দৃঢ়ভাবে আধুনিক সভ্যতার নগ্ন পেশাকে কটাক্ষ করে এই ছবি।

৭. দ্য স্কোয়ার: জার্মানির ছবি। পরিচালক রুবেন ওয়েস্টল্যান্ড। জঁর কমেডি ড্রামা। সম্প্রদায়গত বিবাদ, নৈতিক সাহসিকতা, আত্মকেন্দ্রিক ধনীর চাহিদা অসম্ভব বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে গোটা বিশ্বজুড়ে। তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এই ছবি। তীক্ষ্ণ বিদ্রুপে ভরা এই ছবি যেন সমকালের ক্যানভাসে আঁকা।

৮. এলিনা পসকোউর ছবি সন অব সোফিয়া। এবার প্রতিযোগিতা বিভাগে। স্বামীর মৃত্যুর পর সোফিয়া তার ছেলেকে মানুষ করতে মরিয়া। জীবনে নানা সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা করে না। কিন্তু ছেলে পালিয়ে বেড়ায়, বদ সঙ্গে পড়ে। তার নতুন বাবা তাকে রূপকথার গল্প শুনিয়ে ভালর পথে আনতে চায়। ছেলে বাবাকে সহ্য করতে পারে না, খুন করতে চাই। শেষ পর্যন্ত মা সোফিয়া তাকে ফিরিয়ে আনে আলোতে। সে ফেরা অয়দিপউড কমপ্লেক্সের অদ্ভুত অনুরাগ আর মমত্বে।

৯. দ্য ইয়ং কার্ল মার্কস: রাউল পেক পরিচালিত ফরাসি ছবি। ১৯৪৪ সালে মার্কেসের যৌবন বয়সে হয়ে ওঠার দিনগুলির কথা তুলে ধরেছে এই ছবি। পারিবারিক লড়াই, প্রেম, শোষণ মুক্তির তাত্ত্বিক পরিসরে তাঁর যৌবন বয়ে যায়। প্রদোঁর দ্য ফিলোসফি অব পভার্টির তীব্র বিরোধিতা করে তিনি লিখলেন দ্য পভার্টি অব ফিলোসফি। মার্কস আর এঙ্গেলস একজোট হয়ে ইউরোপ জুড়ে শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রামের কথা প্রচার করছেন। তত্ত্বের মধ্য দিয়ে নিয়ে নয় চাইছেন বাস্তবিকই দুনিয়া বদলাতে। ১৮৪৮, ২১ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত হল সেই বিখ্যাত স্মরণীয় গ্রন্থ দ্য কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো। এই ছবি সেই নির্মাণের দলিল।

১০. লেটার টু দ্য প্রেসিডেন্ট: আফগানিস্তানের ছবি। পরিচালক রোয়া সাদাত। আফগানিস্তানের একটি মেয়েকে মুখোমুখি হতে হচ্ছে এক ভয়ংকর বাস্তবের। সোরায়া কাজ করে এক পাবলিক অফিসে। সে বিরোধিতা করে একটি মেয়ের বিরুদ্ধে সংগঠিত হওয়া প্রাচীন পাশবিক আইনের বিরুদ্ধে। তাকে ভালোবেসে ছবি আঁকে এক তরুণ শিল্পী। সমাজ বিবাহিতা এই নারীর সোচ্চার হওয়া বা তাকে নিয়ে কোনও শিল্পীর ছবি আঁকা মেনে নিতে পারে না। শুধু দুই ছেলেমেয়ের কথা ভেবে স্বামীর শারীরিক লাঞ্ছনা সহ্য করে সোরায়া। একদিন পিস্তল দিয়ে তাকে হত্যা করতে যায় তার স্বামী আর গুলি ছিটকে মারা যায় সোরায়ার স্বামী। এবার তার বিরুদ্ধে নেমে আসে মৃত্যু দন্ড। সে জেলে বসে প্রেসিডেন্টকে চিঠি লেখে সব জানিয়ে। প্রেসিডেন্ট সেই চিঠি পড়ে কিছু করার আগেই ফাঁসি হয়ে যায় সোরায়ার। মৃত্যুর দড়ি গলায় পড়িয়ে দিচ্ছে যখন জল্লাদ তখন মৃত্যুর চোখে জল। সামনে ছেলেমেয়েদের মুখ ধূসরতর।

২৩ তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব সার্বিকভাবে সিনেমারই উৎসব। বিগত ১৭ বছর ধরে সেই ঐতিহ্য সে ধরে রাখার চেষ্টা করে আসছে। আরও ভাল পরিচালকের ছবি আনার খামতি আছে, কিছু বিচ্যুতিও আছে তবু এই উৎসব সিনেমারই জয়গান করে। তাই বার বার ফিরে আসা এই চলচ্চিত্র উৎসবের নন্দন কাননে।

কৃতজ্ঞতা :
১. সুদীপ ভট্টাচার্য
২. যাদব মন্ডল
৩. স্মরজিৎ প্রামাণিক
৪. মৌসুমি সেনগুপ্ত