তপন মল্লিক চৌধুরী

সদ্য শেষ হল রজত জয়ন্তী বর্ষের কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচিত্র উৎসব। দেখতে দেখতে ২৫ বছর নয় ২৫ টি মহাযঙ্গের সাক্ষী হল শহর ও সিনেমাপ্রেমীরা। বাম জমানাতে শুরু হয়ে পরিবর্তনের জমানাতে এসেও এই উৎসব আজও কিন্তু সম্পূর্ণভাবেই সরকারি নিয়ন্ত্রণে রয়ে গিয়েছে। এক সময় যা বুদ্ধবাবুর বা দাদার বলে প্রচারিত ছিল এখন তা দিদির হয়েছে। এক সময় যে উৎসবের পুরোটাই ছিল সিনে আঁতেলদের দখলে তাকে জনতার উৎসব বলে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী জনমানসে খুব সফল ভাবেই প্রচার করেছিলেন এবং সেটা সত্যি একটা নজির হয়ে উঠেছিল।

নেতাজি ইন্ডোরে হাজার হাজার শাহরুখ-অমিতাভদের ভক্ত সমাগম থেকে শুরু করে নন্দন-রবীন্দ্রসদন চত্বরে সাধারন মানুষের ভিড়। বাংলা ছবির প্রযোজক, পরিচালক, কলাকুশলীদের ব্যস্ত চলাফেরা। ছবি শুরুর আগে-পরে টলিউড পাড়ার মানুষজন, স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি, তথ্যচিত্র এমনকি নানা ধরনের আলোচনা সভাতেও তাঁদের সক্রিয়তা, সব মিলিয়েই তথাকথিত ফিল্ম বোদ্ধাদের একচেটিয়া উৎসব রাতারাতি জনতার উৎসব হয়ে গিয়েছে। প্রশ্ন এখনও কি চলচ্চিত্র উৎসব থেকে রাজ্য সরকারের নিয়ন্ত্রণ গুটিয়ে নেওয়ার সময় আসেনি?

এমনিতেই কোনও সিনেমা-উৎসব সরকারি উদ্যোগে হওয়ার কথা নয়। কান, বার্লিন, ভেনিস, টরন্টো থেকে বুসান কোথাও হয়ও না। পাড়ার দোকানে বার্গম্যান, কুরোসাওয়ার ডিভিডিগুলিতে ধুলো জমেছে। ঘরে বসে ‘টরেন্ট’ থেকে বিদেশি ছবি ডাউনলোডিং। ‘ইউটিভি ওয়ার্ল্ড মুভিজ’ চ্যানেলে লাতিন আমেরিকা, ইউরোপ, এশিয়ার ছবি- এই বাজারেও সরকারি ফিল্মোৎসব কেন? আসল কথা ক্ষমতা। আর সব কিছুর মতো উৎসব, ছবি দেখানোর মধ্যেও এক ধরণের ক্ষমতা থাকে, সেটা কি হাতছাড়া করা যায়? ফিল্মোৎসব আসলে রাজনীতির একটা ছক। সেই ছকেই সরকারের হাতে নন্দন, ফিল্মোৎসব, টেকনিশিয়ান্স স্টুডিয়ো, কলাকুশলীদের ইউনিয়ন, রুগ্ণ-ভগ্ন কালার ল্যাব রূপায়ণ, চলচ্চিত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রূপকলা, অথচ শহরে অগুনতি সিনেমা হল বন্ধ। কিন্তু টেকনিশিয়ান্স স্টুডিয়ো, কলাকুশলীদের ইউনিয়ান, নন্দন, ফিল্মোৎসব নিয়েই সরকারের কাজ কারবার। আর ভাল সিনেমা, চলচ্চিত্রশিক্ষার প্রসার, বন্ধ সিনেমা হল, তার দায়-দায়িত্ব?

সিনেমা উৎসবের জন্য সরকারের কমিটি তৈরি করে দেওয়ার দরকার আছে কি? অভিনেতা, প্রযোজক, পরিচালক, কলাকুশলী, ফিল্ম সোসাইটি, ফিল্ম স্কুল, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট সংস্থা, বিজ্ঞাপন সংস্থা মিলে তৈরি করলে ক্ষতি কোথায়। কী ছবি দেখানো হবে, কোথা থেকে টাকা আসবে সে দায়ও নিক তারা। পরিবেশকদের থাকাটা খুব দরকার। একটা ছবি পুরস্কার পেলে একটি সংস্থা তার প্রদর্শন-স্বত্ব কিনতে পারে। উৎসবের বিভিন্ন বিভাগের জন্য স্পনসর খোঁজা যেতে পারে। স্পনসরদের অনুদানে তো নাট্যোৎসব হয়। কলকাতা ফিল্মোৎসবের স্পনসর পাবে না?

সরকারি নিয়ন্ত্রণ থেকে বেরিয়ে বাণিজ্যের রাস্তা খুঁজলে উৎসবের মান খুব কমে যাবে? ভাঁড়ে মা ভবানী সরকার কেন কয়েক কোটি টাকা উৎসবে ঢালবে। সরকার পানীয় জল, পরিষ্কার রাস্তা থেকে দমকল, পুলিশ প্রভৃতি পরিষেবা দিক। বহু বিদেশি আসেন, পরিষেবা দিয়ে রাজ্য সরকার রাজস্ব আদায় করুক। বাংলা ছবি, আঞ্চলিক ছবিকে তুলে ধরা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের উদ্দেশ্য কি, নাকি সারা বিশ্বে হালফিলে যেসব চলচ্চিত্র তৈরি হচ্ছে, যা আলোচিত হচ্ছে বিশ্বজুড়ে, সেগুলো নিয়ে নিজেদের আরও ঋদ্ধ করাটা লক্ষ্য।

বাংলা ছবিকে প্রচারে আনার জন্য আলাদা করে বাংলা চলচ্চিত্রের উৎসব করলেই তো হয়! না কি আমার হাতে মঞ্চ আছে বলেই গুণমানের তোয়াক্কা করব না। বাংলা ছবির প্রদর্শনী করিয়ে বিশ্বের কাছে আদৌ মুখ উজ্জ্বল করব। কিন্তু তা হয় কি? যেখানে অন্যান্য আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলা ছবি নির্বাচিত হয় কালেভদ্রে৷ সে ছবি দর্শক-সমালোচকদের কাছে সমাদৃত হওয়া, বা উৎসবের প্রতিযোগিতা বিভাগে পুরস্কৃত হওয়ার ঘটনা আরও বহু যোজন দূরের ব্যাপার!‌ তা হলে কেন এমন অদ্ভুত সিদ্ধান্ত?

সরকারের আদব কায়দাকে বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের সঙ্গে যুক্ত অনেকেই অবশ্য সাধু বলছেন। তাঁদের কথা শুনে মনে হচ্ছে, এর ফলে বাংলা ছবি যেন অচিরেই ‘জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ আসন লবে’! কিন্তু শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার হতে গেলে, আন্তর্জাতিক পরিচিতি পেতে গেলে যে অন্তত আন্তর্জাতিক মানের সমকক্ষ হতে হয়, সেই প্রাথমিক শর্তটা তাঁরা যেন বুঝেও না বোঝার ভান করছেন৷ ভালো ছবি বানাতে গেলে যে চর্চা, যে নিবিড় অনুশীলনের প্রয়োজন, গত এক দশকে বাংলার চলচ্চিত্র চর্চায় তার ছাপ কোথায়, সে প্রশ্নও এঁদের কারেও মাথায় আসছে না৷ সারা বিশ্বে এখন যে ধরনের ছবি তৈরি হচ্ছে, আধুনিক বাংলা ছবির একটাও সেই সব ছবির ধারেকাছে যেতে পারবে কিনা, সেই সমীক্ষাও হচ্ছে না৷ উল্টে, নিজের শহরে চলচ্চিত্র উৎসবে ভালো ছবি দেখার সুযোগ ক্রমশই সঙ্কুচিত হয়ে আসছে।

*মতামত লেখকের ব্যক্তিগত