“আমি তো নিজেকে দিতেই এসেছিলাম কিন্তু কিছুতেই আমাকে দিতে দিচ্ছে না”। বন্ধুক-বাজি, দাবা খেলা, সংস্কৃত সাহিত্য, ইংরেজি ভাষা, গান এইসব উপাচারে সাজিয়ে নিজেকে গড়ে তুলেছিল আধুনিকা হিসাবে। সনাতনী ধারনায় ছাপোষা ঘরণী হয়ে গোপাল সেবাতেও আগ্রহ সমান তালে। মন মন্দিরে বিগ্রহের তবুও মন পাওয়া ভার। তাই সে আসহায়। তাই আক্ষরিক অর্থেই ‘যোগাযোগ’-এর বহুমাত্রিক অর্থ নিয়ে বিহ্বল কুমু। ‘যোগাযোগ’ কুমুর সঙ্গে স্বামীর, আধুনিকতার সঙ্গে নিজের সত্ত্বার, দীর্ঘদিনের শত্রুর সঙ্গে আত্মীয়তার, বয়সের বৈষম্যে সঙ্গে ভালোবাসার। ১৫৫তম কবিগুরুর জন্মপক্ষে শেখর দাসের ক্যামেরায় নতুন করে জন্ম হল কুমুদিনীর। সেলুলয়েডে রবি প্রেমীদের সঙ্গে আবার ‘যোগাযোগ’।

শুরু যোগাযোগের

সাবেকি দুই বামুন পরিবার চাটু্জ্জে ও ঘোষাল। অতীতে চাটু্জ্জেদের দাপটে ভিটে-মাটি ছাড়া হতে হয়েছিল ঘোষালদের। আজ সেই ঘোষাল পরিবারের ছেলে মধুসূদন বড় ব্যবসায়ী। ভাগ্যের পরিহাসে আজ দেনার দায়ে চাটুজ্জেরা বিকিয়ে আছে ঘোষাল বাড়ির কাছে। এদিকে চাটুজ্জে বাড়ির ছোট মেয়ে কুমুতে মজেছে মধুসূদনের মন। ঋণের বোঝা থেকে দাদাকে মুক্ত করতে, ভগবানের ইচ্ছা মনে করে কুমু বিয়ে করে মধুসূধনকে। কিন্তু লক্ষ্মী-সরস্বতীর বিবাদ যে চিরকাল। হাজার চেষ্ঠা করে সে নাগাল পায়না স্বামীকে। ঘটনার প্রবাহে একদিন কুমু নারী থেকে হয়ে ওঠে সম্পূর্না। নতুন অতিথিতে সঙ্গে ‘যোগাযোগ’ মধ্যমে যে পায় নতুন পরিচয়ের সঙ্গে। কুল পায় সম্পর্কের ঠিকানার।

সম্পর্ক এখানেও ঘোরাল

ছবিতে মধুসূদন ও কুমুদিনী ছাড়াও আছে শ্যামাসুন্দরীও। কবি কোথাও যেন ‘যোগাযোগ’-এ ছায়া রেখেছেন ‘কাদম্বরী’র, শ্যামাসুন্দরী। ঘোষাল পরিবারের বড় বউ সে। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সে বিধবা। শ্যামা বৌঠানের ছিল মধুসূদনের। নামহীন সম্পর্কে জোর-জবরদস্তি, ভালোবাসা, চাওয়া-পাওয়া সব ছিল। কিন্তু বাড়িতে নতুন বউ আসায় আস্তে আস্তে নিঃস্ব হতে শুরু করে সে। সব হারিয়ে তাই শ্যামাও পায় কাদম্বরীর পথে হাঁটে।

সেলুলয়েডে ব্যাহত কবির সৃষ্টি

সাহিত্য যখন চলচ্চিত্রে আসে মূল সুরটুকু অক্ষুণ্ণ রাখার চেষ্টা করেন পরিচালক। চিত্রনাট্যের প্রয়োজনে গল্প বলার ধরনটা শুধু বদলে যায়। এখানেও ঘটেছে এই একই ঘটনা। পাল্টে গিয়েছে অনেক গল্পের প্লট, বাদ দেওয়া হয়েছে অনেক দৃশ্য। করির ধারণার সঙ্গে এখানেই সমঝোতা  পরিচালকের। শেখর দাসের কথায়, “ কবি কুমুদিনীর মহত্ত্ব তুলে ধরতে ছোট করেছেন শ্যামাসুন্দরীকে। কেন শ্যামা বিধবা বলে?” তাই শ্যামা আলাদা গুরুত্ব পেয়েছে তাঁর যোগাযোগে। কুমুর চরিত্রে শুভলগ্নার অভিনয় সত্যিই আসাধারণ। করির গল্পের কুমুর সঙ্গে হুবহু মিল পাওয়া যায় তাঁর। কুমুদিনীর সেই তেজ অথচ রূপে স্নিগ্ধতা রয়েছে তাঁর স্কিরন প্রেজেন্সে। তবে অভিনয়ে কোথায় যেন কমতি থেকে গিয়েছে ব্রাত্য বসুর। শ্যামাসুন্দরীর চরিত্রে অনন্যা চট্টোপাধ্যায় এককথায় অসাধারণ। অনন্যার বডি ল্যাংগুয়েজ থেকে শুরু করে এক্সপ্রেসন- সব কিছু প্রশংসনীয়।

গানে গানে কবি

ছবির গান গুলি সত্যিই শ্রুতিমধুর। সুর, কথা খুবই সুন্দর সেক্ষেত্রে সত্যিই প্রশংসার দাবী রাখে সঙ্গীত পরিচালক পন্ডিত দেবজ্যোতি বসু। তবে শ্রেয়া ঘোষালের কন্ঠে ভজন ‘মেরে তো গিরিধারি গোপাল’ এককথায় অসাধারণ।

সবকিছু মিলিয়ে ‘যোগাযোগ’-এর তালটা ঠিক বজিয়ে রেখেছেন পরিচালক। তাই এখন এই কবিপক্ষে শেখর দাস সিনেপ্রেমীদের সঙ্গে কতটা ‘যোগাযোগ’ করল সেটাই দেখার।

পরিচালক: শেখর দাস

রিভিউ- মানসী সাহা