অ্যালবার্ট অশোক

যামিনী রায় (১৮৮৭ -১৯৭২) ১৯০৩/৪ সালে গভর্নমেন্ট কলেজ অফ আর্টে অবন ঠাকুরের উপাধ্যক্ষ থাকার সময় পশ্চিমী ধারায় চর্চা করেও বাংলার নিজস্ব যে রূপবন্ধ আছে, তা আবিষ্কারের নিরন্তর প্রচেষ্টা করেন। যামিনী রায়ের ছবি দেখে বোঝা যায়, এ বাংলায় জন্ম, কিন্তু অবন ঠাকুরের ছবিতে এত পরিশীলিত রূপ আমার কাছে কিছু ভিন রাজ্যের মনে হয়।

যামিনী রায় ১৮৮৭ সালের ১১ সালে, বেলিয়াতোড় গ্রাম, বাঁকুড়া জেলা, পশ্চিমবঙ্গে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯০৩ সালে, গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্ট এন্ড ক্র্যাফট এ ছবি নিয়ে পড়াশুনা করেন। অ্যাকাডেমিক পেইন্টিং ও পোট্রেইচারে মাস্টার ডিগ্রী করেন। ব্রিটিশ স্টাইলে ছবি আঁকা, পোস্ট ইম্প্রেশনিস্টদের মতো কাজ ছিল তার প্রথম দিকে। Viceroy’s gold medal in 1934 তিনি ভাইসরয়ের সোনার পদক পান ১৯৩৪ সালে এবং the Padma Bhushan in 1954. পদ্মভূষণ পান ১৯৫৪ সালে। তার ব্যক্তিগত বিষয়, জীবন যাপনে তেমন কিছুই বলার মত ছিল না, নেই। সাধারণ জীবন যাপন ও বিষয়ী বা অহংকারী ছিলেন না। ২০১৮তে ১৩১ বছর হয়ে গেল তার জন্মের।

তিনি পশ্চিমী ধারায় শিক্ষাকাল ও তরুণ বয়স কাটালেও তিনি পুবের দেশগুলির মতো, দ্বিমাত্রিক পটে স্থানীয় বা বাংলার লোকচিত্রকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরেন। তার ছবির বিষয় অনেক কিছুই। ধর্মীয়, পৌরাণিক কাহিনী থেকে শুরু করে, জন্তু জানোয়ার, শহরের জীবন ইত্যাদি অনেক কিছুই তার আঁকার বিষয় ছিল। আঁকার স্টাইল ছিল, নকশা বা কোন প্যাটার্ন। ফ্ল্যাট করে রং লাগানো।

অল্প কয়েকটি রঙে, কালো ছন্দিল রেখা, তুলির সরুমোটা দাগ। আর বিষয়ের সরলীকরণ চিত্র। ১৯২৫ সালে, ৩৮ বছর সময় নাগাদ তিনি কালীঘাটের পটের অনুকরণে বাজারি ছবিও আঁকেন। ১৯৩০ সাল নাগাদ একেবারে তিনি দেশীয় পটুয়াদের মতো করে তার ছবিতে, লোকচিত্রের আদল নিয়ে আসেন। ক্যানভাস ছেড়ে, দেশীয় কাপড় ও কাঠের উপর আঁকা শুরু করেন।

সারা পৃথিবীতেই তার কাজের নমুনা ছড়িয়ে পড়েছে। দেশবিদেশের মানুষের ব্যক্তিগত সংগ্রহ বা যাদুগরের সংগ্রহে আছে। যামিনী রায় অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছাত্র ছিলেন। বেঙ্গল স্কুলের ঘরানা ও ব্রিটিশ স্টাইলের ছবি আঁকা পদ্ধতি তিনি ত্যাগ করেন। তিনি ইউরোপীয় রং ব্যবহারও ছেড়ে দেন। যাতে নিজের দেশজ রং, শাকসব্জি থেকে তৈরি রং, তেঁতুলের বিচি থেকে, ও নীল থেকে রং সংগ্রহ করতেন। তার প্রথম প্রদর্শনী হয় ১৯২৯ সালে কলকাতায়, বিদেশে প্রথম হয় ১৯৪৬ সালে, লন্ডনে ও নিউইয়র্কে ১৯৫৩ সালে। এছাড়াও তার ছবি সারা পৃথিবী জুড়ে ব্যক্তিগত সংগ্রহশালায় আছে। ১৯৭২ সালে, ৮৫ বছর বয়সে তিনি মারা যান।

বসন্ত জানা, মেদিনীপুর জেলার জগন্নাথপুর গ্রামে জন্মান। তিনি কবে জন্মেছেন সে তারিখ জানা যায় না, ২০০৯ সালে বলা হচ্ছে ৯৩ বছর বয়সে মারা যান।ধরে নিতে পারি তিনি ১৯১৬ সালে জন্মান। তিনি যামিনী রায়ের ছাত্র ছিলেন। ১৯৪৯ সালে তিনি যামিনী রায়ের সংস্পর্শে আসেন।

যামিনী রায়ের বয়স প্রায় ৬২ বছর। আর বসন্ত জানার বয়স ৩৩ বছর। যুবক বয়েসের নন। যামিনী রায় থেকে ২৯/৩০ বছরের ছোট বসন্ত জানা। কিছু মানুষের অভিযোগ, বসন্ত জানা ৩০০০ ছবি যামিনী রায়কে দিয়েছিলেন, যামিনী রায় সেগুলি নিজের বলে বিক্রি করেছেন। বয়স হলে মানুষের স্মরণ শক্তি কমে আসে। তিলকে তাল বলে আত্মতৃপ্তি পান। এরকম কিছু বসন্ত জানার হয়নি তো? কারণ, যখন এই সব বিতর্ক দেখা দেয়, সেই সময় তিনি যথেষ্ট বৃদ্ধ।