আইন বলছে, বিয়ের পর জোর করে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন হলেও তা ধর্ষণ নয়৷পুরুষ বলছে, নারীরা ভুল অভিযোগ করছে৷আর সেই মেয়েটি? অসমে, বিহারে, দিল্লিতে যে মেয়েটি ভিন্ন ভিন্ন নামে স্বামীর হাতে হাতে রাতের পর রাত ধর্ষিত হয়েছে-সেtannistha কী বলতে পারল তার মনের কথা? যৌন আকাঙ্খা মেটাতে স্ত্রী’র উপর অত্যাচার করাটা একজন পুরুষের অধিকারের মধ্যে পড়ে। তবে কি উইমেন এমপাওয়ারমেন্ট স্রেফ ফাঁকা বুলি? লিখলেন তন্নিষ্ঠা ভাণ্ডারী

ট্রাম-বাসে(পুরুষ কন্ঠ)

-কি দিনকাল পড়ল দাদা… মেয়েরা বলছে বিয়ের পরও নাকি ধর্ষণ হয়

-বলেন কি মশায়? এরকম আবার হয় নাকি?

-তাই তো শুনছি। সেই নিয়ে হেব্বি চেঁচামেচি হচ্ছে দেশ জুড়ে।

-সব বিলিতি কালচার ছাড়া আর কিছু নয়, বুঝলেন মশায়। মেয়েগুলোর মাথায় যত বিলিতি পোকা ঢুকেছে

অফিস(সহকর্মী)

-জানিস দিয়া বলেছে বিয়ের পর ওর বর নাকি ওকে ‘রেপ’ করেছে।

– ও মাই গড! বলিস কি?

-হ্যাঁ রে সবাই বলছে, লেসবো টেসবো হবে বোধহয়…

মন্ত্রীমশায়

-ভারতে কোনোদিন বৈবাহিক ধর্ষণ সংক্রান্ত কোনও আইন প্রনয়ন করা সম্ভব নয়। কারণ এদেশে বিয়ে একটি পবিত্র সংস্কার হসেবে চিহ্নিত। তাই এদেশে বৈবাহিক ধর্ষণ শব্দটার কোনো মূল্য নেই।

আদালত

-নির্বাক! এমন কোনো আইনই নেই শাস্তি কি করে দিই বলুন তো বস।আর তাছাড়া এগুলোকে ধর্ষণ বলে না। বিয়ের পর এরকম তো হয়েই থাকে। স্বাভাবিক ব্যাপার।

প্রশাসন

-বাইরের দেশগুলি থেকে বারবার চাপ দিচ্ছে যাতে এদেশে বৈবাহিক ধর্ষণের জন্য আইন প্রণয়ন করা হয়। বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে নাকি খুব মাতামাতি করছি মানে, এক্ষেত্রেও বিদেশের পথেই? নৈব নৈব চ! আমাদের দেশে এসব হয় নাকি?

আর সেই মেয়েটি

-বিয়ে ভেঙে যাওয়ার আসল কারণটা কাউকে বলতেই পারিনি। কেউ বিশ্বাসই করত না। আদালতেও না। মিথ্যা কথা বলে বিয়ে ভেঙছি।রাতের পর রাত আমার স্বামী আমাকে ধর্ষণ করেছে।


ভারতীয় আইনের ৩৭৫ ধারা অনুযায়ী, কোনও পুরুষ যদি তাঁর স্ত্রী’র সঙ্গে যৌন সংসর্গে লিপ্ত হন আর স্ত্রী’র বয়স যদি ১৫ বছরের উপরে হয়, তাহলে তা কখনই ধর্ষণের অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে না।


এতগুলো লোক একরকম কথা বলছে আর মেয়েটি একরকম।হ্যাঁ দাদা আপনারাই ঠিক। মেয়েটিই ভুল।জানেন তো এরা এরকমই। ছোটবেলায় ‘বড্ড ছিঁচকাদুঁনে’, যৌবনে ‘ভীষণ সিনক্রেয়েট করে’, আর সব শেষে নিজের স্বামীকে ধর্ষক বলে! বড্ড নিষ্ঠুর। আসলে যন্ত্রণাগুলো খুব তাড়াতাড় বিঁধে যায়। কী করা যাবে বলুন। সবই সৃষ্টিকর্তার দোষ। আপনাদের নয়, বালাই ষাট। তবু এত গুলো লোকরে মধ্যে মেয়েটা বড্ড একা। তাই ওর ভুলটা নিয়েই একটু লিখতে বসলুম।

মেয়েটা কি সত্যিই একা? পরিসংখ্যান বলছে- ভারতের দুই-তৃতীয়াংশ বিবাহিত মেয়ে স্বামীর ধর্ষণের শিকার। ৪০ শতাংশ মহিলাই শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনের শিকার।দেশের ২৯ টা রাজ্যের মোট ১ লক্ষ ২৫ হাজার মেয়েই এই ‘ভুল’ অভিযোগ করে।আর আপনারা যারা ‘কেন্দ্রে’ বসে আছেন, হাজার হাজার প্রান্ত থেকে এই কন্ঠস্বরগুলো বোধহয় আপনার কান পর্যন্ত পৌঁছয় না, না?

 অসম– আমি সাহানা(নাম পরিবর্তিত)। কাজের সূত্রে বিবেকের সঙ্গে পরিচয় হয়। তারপর দুর্দান্ত প্রেম। কিছুদিনের মধ্যেই আমরা বিয়ে করি। কয়েকদিনের মধ্যে সব কিছু পালটে যায়। নিবমিত শুরু হয় মারধর।একদিন যখন ও স্নান করতে গিয়েছে, চোখ পড়ল ওর মোবাইলে। দেখলাম একটি মেয়ের মেসেজ। কথোপকথনগুলো ওদের শারীরিক সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়। বাথরুম থেকে বেরোতে কথাটা বললাম। শুরু হল প্রচণ্ড মারধর।ও আমাকে ধর্ষণ করল। গোপনাঙ্গে আঘাতের পর আঘাত। রক্তাক্ত অবস্থায় ফেলে চলে গেল।

পুলিশে গেলাম, বলল এরকম হয়েই থাকে।মামলা তুলে নিতে বলা হল। আদালতে গেলাম। মাঝপথে মামলা ছেড়ে চলে গেল আইনজীবী। গেলাম সুপ্রিম কোর্টে। কোনো লাভ হল না। দীর্ঘ শুনানির পর মামলা ছেড়ে দিতে বাধ্য হলাম।আমার স্বামীকে শাস্তি দেওয়ার মর কোনো আইনই তো নেই।

দিল্লি– আমি ভগবতী(নাম পরিবর্তিত)। বিয়ের পর থেকে দিনের পর দিন অত্যাচারিত হয়েছি। খাবারে নুন কম হয়েছে, সপাটে গাল এক চড়। তারপরই বছিানায় শুরু অকথ্য অত্যাচার।মাঝে মাঝে মনে হত আমাকে নগ্ন করার জন্যই বোধহয় এই মারধর।এনজি-ও তে গিয়েছি কোনও লাভ হয়নি। এখন আমার কথা শুনলে সবাই হাসাহাসি করে। কেউ যদি একটু আমার কথা শুনত।

 বিহার– আমি সোনিয়া(নাম পরিবর্তিত)।বিয়ের পর থেকে আমার স্বামী কোনোদিন আমার সঙ্গে কোনও শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়নি।মাসখানেক পর পাহাড়ে গেলাম বেড়াতে। সেদিন হালকা বৃষ্টি পড়ছিল। মনটা ভীষন ভালো ছিল। রাতে হোটেলে ফিরলাম। ও আমার কাছে এল। অসাধারণ অনুভূতি হল। তারপর সারা রাত শুধুই কেঁদেছি। কারণ সেদিন আমার স্বামী আমাকে আদর নয়, ধর্ষণ করেছিল। কষ্টটা সহ্য করতে পারিনি। বিচ্ছেদের মামলা করলাম। কিন্তু, মিথ্যা কথা বলতে বাধ্য হলাম। বললাম আমার সঙ্গে খাপ খাচ্ছে না।আসল কারণ বললে মামলাটা তুলে নিতে হত।

আজও বন্ধুরা জিজ্ঞেস করলে বলি, আমি কোক খেতাম আর ও পেপসি। তাই আমাদের ডিভোর্স হয়ে গিয়েছে। বিয়ের পর তো সবাই শারীরিক সম্পর্কের বিষয়ে অনেক কথা জিজ্ঞেস করত। তার যে একটা খারাপ দিক আছে, সেকথাটা কেউ কোনোদিন আমাকে বলেনি!

 এতগুলো যা মেয়ে বলছে, সব মিথ্যা? হ্যাঁ, মিথ্যা বলেই ধরে নেওয়া হয়। তাই তো সেদিন রাজ্যসভায় দাঁড়িয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের রাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ভারতে এই অভিযোগের কোনও ভিত্তি নেই।বিশ শতক থেকে এক এক করে বহু দেশেই এই সংক্রান্ত আইন পাশ হয়েছে।অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। কিন্তু, ভারতে তা আজও সম্ভব হয়নি।

ভারতীয় আইনের ৩৭৫ ধারা অনুযায়ী, কোনও পুরুষ যদি তাঁর স্ত্রী’র সঙ্গে যৌন সংসর্গে লিপ্ত হন আর স্ত্রী’র বয়স যদি ১৫ বছরের উপরে হয়, তাহলে তা কখনই ধর্ষণের অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে না।

৩৭৬ ধারা অনুযায়ী ধর্ষণ হলে তার শাস্তি ৭ বছরের জেল, যা যাবজ্জীবন পর্যন্ত বর্ধিত হতে পারে।কিন্তু অভিযোকারিণী যদি তার স্ত্রী হয় আর তার বয়স ১২ বছরের নিচে হয় তাহলে তার সাজা আর মাত্র ২ বছর পর্যন্ত বর্ধিত হতে পারে। অর্থাৎ মোদ্দা কথাটা হল যৌন আকাঙ্খা মেটাতে স্ত্রী’র উপর অত্যাচার করাটা একজন পুরুষের অধিকারের মধ্যে পড়ে।

‘নারী স্বাধীনতা’, ‘women empoerment’-এর মত আপনাদের সব ভারী ভারী শব্দগুলোকে দিনে দিনে ম্লান করে দিচ্ছে এদের কান্না। মন্ত্রীমশায় আপনার নিজের মেয়ের সঙ্গে হলে বলতে পারতেন তো ‘এটা স্বাভাবিক’?