Himadri-Dutta

 তাঁদের দু’জনের জন্মকাহিনি একই রকম৷ দুই আলাদা সমাজে জন্ম হলেও, যে অাবহে জন্ম তাও যেন এক৷ দুজনের শিক্ষা দেওয়ার পদ্ধতিও এক৷ গীতা ও নিউ টেস্টামেন্টের উপদেশাবলীতে অদ্ভুত সাদৃশ্য লক্ষ করেছেন স্বয়ং আচার্য স্বামী বিবেকানন্দ৷ তবে কি সত্যিই খ্রিস্টে আর কৃষ্টে কোনও প্রভেদ নেই৷ আলোকপাতে হিমাদ্রীশেখর দত্ত

মাত্র দু’দিন আগে ধুম ধাম করে পালন হল বড়দিন। মহামানব আর অবতার প্রভু যীশুর জন্মদিন। খ্রীষ্টানদের সারা বছরের  শ্রেষ্ঠ উৎসব ও আনন্দের দিন। যীশু জন্মেছিলেন (?) বলে ওই দিনটিকে বড়দিন বলা হয় না, দক্ষিণ গোলকে দিনের দৈর্ঘ্য হিসেবে লম্বা দিন বলে সবার আগে ২৫শে ডিসেম্বরকে ওখানে বড়দিন বা লম্বা দিন আখ্যা দেওয়া হয়। তারপরে সাত সমুদ্র আর তেরো নদী পেরিয়ে আজ ২৫শে ডিসেম্বর–যীশুর জন্ম দিন-বড়দিন পূড় গোলোকে সমার্থক হয়ে  গেছে। মতান্তরে যীশুর জন্ম ৪-৭ বি.সি.ই-র আগষ্ট মাসের কোন এক সময়। এ্যাস্ট্রোনমিকালি ২১ বা ২২ শে ডিসেম্বরে সূর্য্যের কৌণিক দূরত্ব সৌরমন্ডলীয় বিষুবরেখা (celestial equator) থেকে সবচেয়ে বেশী থাকে। তারপরে থেকে সূর্যের পথ উত্তরায়ণ বা দক্ষিণায়ন নির্দিষ্ট হয়। প্রথমটি কর্কট সংক্রান্তি আর দ্বিতীয়টি মকর সংক্রান্তি। যাকে ইংরাজীতে Solstice বলে। ডিসেম্বরের ২১ বা ২২ তারিখ হল শীতকালীন সলসটিস, যেদিন এক নির্দিষ্ট সময়ে সূর্যের  অবস্থান দক্ষিণায়ন হয়। এ বছরে (২০১৫ তে) সেটা ছিল ২২ শে ডিসেম্বর ভোর ৪-৪৮ মিনিটে।

                                    যাই হোক এই সব কঠিন আলোচনা থেকে বেরিয়ে আসি আপাতত। যীশুখ্রীষ্টের কথা মনে হতেই, আমার শ্রীকৃষ্ণের কথা মনে পড়ে গেল। খ্রীষ্ট আর কৃষ্ট (মতান্তরে কিষ্ট) প্রায় সমার্থক শব্দ। এই সব নিয়ে নাড়া চাড়া করতে করতেই   একটা অসাধারণ সমাপাতন চোখে এলো। আমার আজকের নিবন্ধ সেটাই।

                                  আমাদের আদি তিন দেবতা বলতে যাদের আমরা জানি, শ্রীবিষ্ণু তাদের মধ্যে দ্বিতীয় জন বা মধ্যমণি। হিন্দু বিধাতা   বলতে আমরা ব্রক্ষ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর বলেই জানি ও মানি। এই কৃষ্ণ হলেন বিষ্ণুর এক অবতার। পুরানো স্ক্রিপচার (লিপি) আর এ্যাস্ট্রলজিক্যাল গণনার হিসেবে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ জন্ম সময় ৩২২৮ বি.সি.ই, আগষ্ট মাসে। আর  ন্যাজারেথের জেশুহা বা আমাদের যীশু বেথলেহেমে জন্মেছিলেন ৪-৭ বি.সি.ই-তে, ঐ আগষ্ট মাসেই। মূলগত ভাবে দুই মতের মধ্যে মৌলিক ব্যবধান থাকলেও, এই দুই ধর্ম-মতের দুই কেন্দ্রিক চরিত্র যীশু ও কৃষ্ণের জীবনযাত্রা ও জন সাধারণকে শিক্ষা বা জ্ঞানী করে  তোলার পদ্ধতির মধ্যে বেশ মিল পাওয়া যায়। এই মিলের পরিমান নানা ভাবে নানা সময়ে বিদ্বজনেরা অধ্যয়ন  করেছেন- আর তাতে এমন একটি মতও উঠে আসছে- বস্তুত পক্ষে এঁরা দুজনে হয়তো বা একই ব্যাক্তি- যদিও ঐতিহাসিক ভাবে তা প্রমাণ সাপেক্ষ। জন্ম বৃত্তান্ত থেকে তাদের তিরোধান পর্যন্ত সর্বক্ষেত্রে এই সমাপাতন বা মিল উল্লেখযোগ্য ভাবে একই রকম। বেশ কিছু  মিল তো অবাক করে দেবার মত।

                             jesus-and-lord-krishna jesus-and-lord-krishna   ন্যাজারেথের যীশু আর মথুরার শ্রীকৃষ্ণ দুজনেরই আগমনের পূর্বাভাস ও আগমনের উদ্দেশ্য তাদের আবির্ভুত হওয়ার  আগে থেকেই ঘোষিত হয়েছিল। সেটা আকাশবানী রূপেই হোক বা বিদগ্ধ জ্ঞানী জনের বক্তব্যের মধ্যে দিয়েই  হোক। কখন কবে আসবেন, কীভাবে আসবেন দু’ ক্ষেত্রেই সেটা সাধারণের জ্ঞাত ছিল।

                               দুজনেরই জন্ম স্থান অকুস্থলে – একজন সরাই খানায়, একজন বন্দিশালায়। মাতা পিতার সাথে তাদের ঘরে নয়। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মানুষবেশে দেবকির গর্ভে জন্মেছিলেন (তার ‎পিতা বসুদেবের যোগদান ব্যতিরেকে)৷ আর যীশু  জন্মেছিলেন পিতা ছাড়াই ঈশ্বরের কথিত মহাশক্তিবলে। এক অত্যাচারি রাজা (কংস) তার পিতাকে বন্দি করে (আওরঙ্গজেবের মতো) রাজ সিংহাসনে বসে প্রজাদের উপর ‎‎জোরজুলুম চালিয়েই যাচ্ছিল। ভগবান বিষ্ণু  স্থির করলেন কংসকে শায়েস্তা ‎করতে হলে তাকে জন্ম নিতে হবে। যাহোক রাজা তার একমাত্র বোন দেবকিকে বিয়ে ‎দিল এবং বোনকে তার নতুন জামাইসহ (বসুদেব) বাসর গৃহে এগিয়ে দিতে যাচ্ছিলো। পথিমথ্যে হঠাৎ রাজা দৈববাণী  শুনতে ‎‎পেলো, “এর গর্ভে যে সন্তান হবে (৮ নম্বর সন্তান) সে তোমাকে হত্যা করবে।” এখানে লক্ষণীয়, এর গর্ভে যে সন্তান হবে বলে বলা হয়েছে, এদের অষ্টম সন্তান বলা হয় নি। অর্থাৎ এই সন্তান জাগতিক উপায়ে লব্ধ নয়। হঠাৎ এরূপ দৈববাণী ‎শুনে রাজা তরবারি বের করলো আদরের বোনকে হত্যা করার জন্য তা দেখে নতুন জামাই এবং বোন ভয় পেয়ে জিজ্ঞেস করলো কেন সে নিজের বোনকে হত্যা করতে চাচ্ছে। তখন ‎রাজা দৈববাণীর কথা বললো, পরে এরা দুজন প্রাণ ভিক্ষা চাইলে রাজা একটি শর্তে রাজি হলো। শর্তটি ‎হলো তার বোনের যতো সন্তান হবে তা রাজার হাতে তুলে দিতে হবে। বিশেষ করে ৮ নম্বর সন্তান এবং ‎তাদেরকে বন্দি জীবন-যাপন করতে হবে। বন্দিখানার গেট সব সময় বন্ধ থাকে এবং পাহারাদার থাকে ‎যাতে ওরা পালিয়ে যেতে না পারে বা সন্তান হলে যাতে তাকে বাইরে পাচার করতে না পারে।‎

                               lord-jesus-and-lord-krishna-sundara-fawnযখন আট নম্বর সন্তানটি হতে যাচ্ছে, অর্থাৎ ওই নারীর প্রসব ব্যাথ্যা ওঠে তখন পাহারাদারেরা ঘুমিয়ে ‎পড়ে আর এই  ফাঁকে এক দেবদূত কারাগারের তালা খুলে মধ্যে এসে হঠাৎ হাজির এবং সে তাদের ‎বললেন গোকূলে এক নারীর (যশোদা) এক সন্তান হচ্ছে তাকে এখানে এনে রাখবে এবং তোমাদের সন্তান সেখানে রেখে আসবে। এজন্যই বোধকরি আমরা প্রায়ই এই শ্লোকটি বলি যে, “তোমারে ‎বধিবে যে গোকূলে বাড়িছে সে।” যাহোক, দেবদূতের কথামত সন্তান জন্ম  নেবার পর মা তখনও অজ্ঞান ‎হয়ে পড়ে আছে, পিতা সন্তানটিকে নিয়ে বেরিয়ে যায় এবং গোকূলে গিয়ে সেখানে যেভাবে দেবদূত ‎বলেছিলো সেইভাবে দেখতে পায় এক মহিলা সন্তান জন্ম দিয়েছে এবং ঘুমিয়ে আছে। কৃষ্ণর পিতা ‎কৃষ্ণকে ওই মহিলার পাশে রেখে তার সন্তানটিকে নিয়ে আসে। সেটি ছিল কন্যা সন্তান। কিছুক্ষণ পর ‎‎দারোয়ানের ঘুম ভাঙ্গলে দেখতে পায় একটি সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়েছে। তখন রাজাকে খবর দিলে রাজা এসে ‎সন্তানটিকে তার মায়ের কোল থেকে কেড়ে নিয়ে দূরে ছুঁড়ে মারে। কিন্তু অন্য ‎আর ৭টি সন্তানকে যেভাবে মারা হয়েছিলো, সেই ভাবে এই শিশুটির মৃত্যু ঘটে না। সে আকাশ পথে বিলীন হয়ে যায়- আর বলে যায় “তোমারে ‎বধিবে যে গোকূলে বাড়িছে সে।” এই কন্যা সন্তান ছিলেন স্বয়ং মা ভগবতী- যোগমায়া। কিন্তু শ্রী কৃষ্ণের জন্ম ঘটনা প্রথমতঃ অন্তত সাতটি শিশুর মৃত্যুর পশ্চাতে। আর অষ্টম গর্ভের শিশুটিকে মারতে না পেরে কংস তার পরে সমগ্র মথুরাতে ঐ একই সময় বা তার কাছা কাছি সময়ে যত শিশু জন্ম গ্রহণ করেছে, তাদের সকলকে হত্যা করে, নিজের জীবন সুরক্ষিত করতে।  ‎

                               হেরোদ যখন রাজা ছিলেন, সেই সময় যিহূদিয়ার বেথলেহেমে যীশুর জন্ম হয়৷সেই সময় প্রাচ্য থেকে কয়েকজন পণ্ডিত জেরুশালেমে এসে যীশুর খোঁজ করতে লাগলেন৷  তাঁরা এসে জিজ্ঞেস করলেন, “ইহুদীদের যে নতুন রাজা জন্মেছেন তিনি কোথায়? কারণ পূর্ব দিকে আকাশে আমরা তাঁর তারা দেখে তাঁকে প্রণাম জানাতে এসেছি৷” রাজা হেরোদ একথা শুনে খুব বিচলিত হলেন (নতুন রাজা ?) এবং তাঁর সঙ্গে জেরুশালেমের সব লোক আশান্বিত হল৷  তখন হেরোদ সেই পণ্ডিতদের সঙ্গে একান্তে দেখা করার জন্য তাঁদের ডেকে পাঠালেন৷ তিনি তাঁদের কাছ থেকে জেনে নিলেন ঠিক কোন সময় তারাটা দেখা গিযেছিল৷ এরপর হেরোদ তাদের বৈত্‌লেহমে পাঠিযে দিলেন আর বললেন, “দেখ, তোমরা সেখানে গিযে ভাল করে সেই শিশুর খোঁজ কর; আর খোঁজ পেলে, আমাকে জানিযে যেও, যেন আমিও সেখানে গিযে তাঁকে প্রণাম করতে পারি৷” এরপর ঈশ্বর স্বপ্নে তাঁদের সাবধান করে দিলেন যেন তাঁরা হেরোদের কাছে ফিরে না যান, তাই তাঁরা অন্য পথে নিজেদের দেশে ফিরে গেলেন৷ তাঁরা চলে যাবার পর প্রভুর এক দূত স্বপ্নে য়োষেফকে দেখা দিযে বললেন, “ওঠো!” শিশুটি ও তাঁর মাকে নিযে মিশরে পালিযে যাও৷ যতদিন না আমি তোমাদের বলি, তোমরা সেখানেই থেকো, কারণ এই শিশুটিকে মেরে ফেলার জন্য হেরোদ এর খোঁজ করবে।”  তখন য়োষেফ উঠে সেই শিশু ও তাঁর মাকে নিযে রাতে মিশরে রওনা হলেন৷  আর হেরোদের মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত সেখানে থাকলেন৷ হেরোদ যখন দেখলেন যে সেই পণ্ডিতরা তাঁকে বোকা বানিযেছে, তখন তিনি প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ হলেন৷ তিনি সেই পণ্ডিতদের কাছ থেকে যে সমযের কথা জেনেছিলেন, সেই হিসাব মতো “দুবছর ও তার কম বয়সের যত ছেলে বৈত্‌লেহম ও তার আশেপাশের অঞ্চলে ছিল, সকলকে হত্যা করার হুকুম দিলেন৷

                               এদের দুজনেরই জন্মের ‎সময় বহু শিশু হত্যা হয়েছিলো। কৃষ্ণ ও ঈসার জন্ম কাহিনিতে আশ্চর্যরকমের মিল এবং অলৌকিক কাহিনির ছোঁয়া।

                               হেরোদ মারা যাবার পর প্রভুর এক দূত মিশরে যোসেফকে স্বপ্নে দেখা দিযে বললেন, “ওঠো! এই শিশু ও তাঁর মাকে সঙ্গে নিযে ইস্রাযেল দেশে ফিরে যাও, কারণ যাঁরা এই ছেলের প্রাণ নাশের চেষ্টা করেছিল তারা সকলে মারা গেছে৷”  তখন য়োষেফ উঠে সেই শিশু ও তাঁর মাকে নিযে ইস্রাযেল দেশে গেলেন৷               কিন্তু যোসেফ যখন শুনলেন যে হেরোদের জায়গায় তাঁর পুত্র আর্খিলায় যিহূদিয়ার রাজা হয়েছে, তখন তিনি সেখানে ফিরে যেতে ভয় পেলেন৷ পরে আর এক স্বপ্নে তাঁকে সাবধান করে দেওয়া হল,  তখন তিনি গালীলে ফিরে নাসরত্ নগরে (মতান্তরে ন্যাজারেথ) বসবাস করতে লাগলেন৷ [সূত্র ঃ (Mathew) মথি 2: 1-23]

                               দুজনকেই জন্ম মুহূর্তের পরে ঈশ্বরদত্ত সাহায্যে তাদের মৃত্যুর কবল থেকে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছিল।jesusandkrsna1 দুজনের  জন্যেই সেই রাজ্যের রাজা ( মথুরায় কংস, আর ন্যাজারেথে হেরদ) তাদের মারবার জন্য সব রকম ছক বানিয়ে   রেখেছিলেন। ঘোষণা করা হয়েছিল রাজ্য জুড়ে, যেন দেখতে পেলেই সাথে সাথে নিধন করা হয়। দুই রাজার কাছেই খবর ছিল, যে শিশু জন্মেছে সে তাদের পতনের কারণ হবে, এমনকি মৃত্যুরও কারণ হতে পারে।

                               যীশুকে নিয়ে তার বাব মা যোসেফ ও মেরী যেখানে পালিয়ে যান সেই জায়গাটির নাম মুতুরি। আর বাসুদেব আর দেবকি কৃষ্ণকে দৈববলে যমুনা পার করে গোকুলে নন্দ রাজার ঘরে সকলের অগোচরে পালিয়ে গিয়ে রেখে আসেন, যা কিনা মথুরায়। মুতুরি আর মথুরা প্রায় একই রকম নাম।

                               যীশুকে প্রায়শই মেষ পালক হিসাবে ডাকা বা বলা হয়েছে, যখন শ্রীকৃষ্ণকে আমরা সকলেই রাখাল রাজা বেশে চিনি।

                               দুজনেই তাদের নিজের নিজের দেশে এক ভয়ানক অনাচার আর অশান্ত সমাজ ব্যাবস্থার মধ্যে জন্মেছিলেন। সে দেশের অনাচার ও পাপ রোধ করাই তাদের জন্মের সেটাই প্রধান কারণ ছিল।

                               দুজনেরই মৃত্যু বা নির্বান হয়েছিল কোন ধারালো অস্ত্রের দ্বারা। যীশু যেখানে পেরেক বিদ্ধ হোন, কৃষ্ণ সেখানে ব্যাধের দ্বারা তীর বিদ্ধ হোন। সূচালো লৌহ শলাকা তাদের দুজনেরই মৃত্যুর কারণ।

                               দুজনেই মানব হিসাবে জন্ম গ্রহণ করেন তথাপি দুজনেই ছিলেন স্বর্গীয়। সম্পূর্ণ মানব কিন্তু সম্পূর্ণ ডিভাইন।

                               খ্রীষ্টিয় জাগুরকতার দক্ষিণ আমেরিকার একটি চার্চ গ্রুপ- এই গ্রুপের সভ্যদের কোয়েকার (Quaker) বলা হয়। এই গ্রুপের সভ্য মিঃ কারসি গ্রেভস, লেখক (১৮১৩-১৮৮৩), ইণ্ডিয়ানায় থাকতেন, তিনি যীশু আর শ্রীকৃষ্ণের সমগ্র জীবন ও কর্ম পর্যালোচনা করে দেখে, ৩৪৬ টি মৌলিক চূড়ান্ত মিল দুজনের মধ্যে খুঁজে পান সেই মিল  এতটাই অদ্ভুত, যে তিনি বলেছেন যেন মনে হয় যীশুর জীবন হল শ্রীকৃষ্ণের জীবনেরই কার্বন কপি।

গ্রেভস যা মিল দেখেছেন তার কয়েকটি এখানে উল্লেখ করি।

যিশু ও কৃষ্ণ দুজনকেই ভগবান ও ভগবানের সন্তান একই সাথে বলা হয়েছে।

দুজনেই স্বর্গ থেকে অবতরণ করেছেন মানবের রুপে।

দুজনেই পরিত্রাতা হিসেবে নিজেকে বলেছেন।

দুজনেই ঘোষণা করেছেন- আমাতে আশ্রয় নাও- আর তাতেই চিরমুক্তি।

দুজনেই বলেছেন- যে তারা এই পৃথিবী সৃষ্টির আরও অনেক আগে থেকে আছেন।

দুজনেই সম্পূর্ণ পাপ হীন।

দুজনেই স্বর্গীয় মানব- পৃথিবীর মানুষ কিন্তু স্বর্গীয়

দুজনেই সদা পরিব্যাপ্ত, সদা উপস্থিত, সদা উদ্ভুত।

দুজনেই নানা অদ্ভুত কার্য্য করেছেন- তা সে মৃতকে জীবিত করা হোক, কাউকে মারণ ব্যাধি থেকে মুক্তি দেওয়া  হোক, কিংবা কোন দুরাত্মা কে নিধন করাই হোক।

ChristKrishnaComposite6-600x324দুজনেই সাধারণ পদ্ধতিতে জন্ম গ্রহণ করেন নি- দুজনেরই মা সেই হিসেবে কুমারী মাতা। যদিও ভগবান শ্রীকৃষ্ণ  দেবকির অষ্টম গর্ভ, কিন্তু তাঁর এই জন্ম জাগতিক সাধারন জ্ঞাত নিয়ম অনুযায়ী হয় নি। ভগবান বিষ্ণু দেবকির জঠরে নিজে থেকেই জন্ম নিয়েছিলেন। যীশুও মাতা মেরি-র পেটে স্বর্গের তারাপথ থেকে নেমে এসেছিলেন।

কৃষ্ণ যখন জন্ম নেন তখন তার পালক পিতা (নন্দ রাজ) রাজকোষে কর প্রদানে গেছিলেন। ঠিক তেমনই যীশুর  জন্মের সময় জোসেফ বেথলেহেমে গেছিলেন রাজা লিউকের দরবারে কর প্রদান করতে।

দুজনেরই পালক পিতা ছিলেন অত্যন্ত সাধারণ মানুষ- একজন ছুতোর আর একজন গোয়ালা।

তিন হাজারের কিছু বেশী সময়ের ব্যবধানে এই দুই মহাপুরুষ আমাদের এই গ্রহে এসেছিলেন আমাদেরই জন্য। তাদের দুজনের প্রিচিং বা শিক্ষা দেবার প্রথা ও বিষয় বস্তু প্রায় একই রকম। শ্রীমদভাগবত গীতায় নবম অধ্যায়ে  শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, সমস্ত জাগতিক পৃথিবী তিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনিই পালন করছেন। দশম অধ্যায়ে তিনি বলছেন  তিনিই একমাত্র সব কিছুর মূল এবং হোতা। ‘আমি সকল প্রাণের বীজ, আমায় ছাড়া কোন কিছুই জন্মাতে বা মৃত হতে পারে না’।

নিঊ টেস্টামেন্টে, যীশু বলছেন, ‘আমি জগতের শুরু, আর আমিই তার ঈশ্বরের শুরু। এই ঈশ্বর সকল কিছু সৃষ্টি  করেছেন, তোমাদের সৃষ্টি করেছেন। তোমাদের রক্ত মাংসের তৈরী করেছেন তাঁর গুণ প্রচারের জন্য, তার সত্যতা প্রচারের জন্য। আর আমিই সেই সত্যতা আর গৌরব।

গীতা বলছে, যার মধ্যে কৃষ্ণে সম্পুর্ণ সমর্পণ জাগরিত হবে, সে চির জীবনের অধিকারী হবে- তাকে আর কখনও মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে না।

নিউ টেস্টামেন্টেও, যীশু বলছেন, যারা আমাতে বিশ্বাস করবে, তাদের আর কখনও মরতে হবে না। তারা পাবে চির কালীন জীবন।

                               এই যে দুজনের একই প্রকার বিচার ও প্রশিক্ষণ এটা রীতিমত চমকে দেবার মতো। এই দুজন সম্পূর্ণ ভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পট ভুমিতে ৩২০০ বছরের ব্যবধানে জন্ম নিয়েছেন আর একই প্রকার কর্ম করেছেন সমগ্র মানব প্রজাতির জন্য।525798_178943612250811_1174212554_n তারা দুজনেই নিজেদের ঈশ্বর ও ঈশ্বরের সন্তান বলে ঘোষণা করেছেন। যুক্তি দিয়ে এই ধাঁধার সমাধান খুঁজতে গেলে দুটি কথা উঠে আসে। একঃ এরা দুজনেই হয়তো বা ফ্রড। দুইঃ অথবা দুজনে একই পুণ্যবান ব্যাক্তি, যাদের কথা ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে আলাদা আলাদা  সময়ে আলাদা আলাদা দেশ কাল পাত্র ভেদে প্রদর্শিত হয়েছে। আজ আরব সাগরের নীচে দ্বারকার ধ্বংসাবশেষ (যা একদা শ্রীকৃষ্ণের রাজধানী ছিল), শ্রীমদ ভাগবত গীতার শ্লোক ও বাণী ও বাইবেলের উপস্থিতি এই সমস্ত কিছু এই দুই মহা মানবের উপস্থিতি এবং একদা পার্থিব অস্তিত্ব সম্বন্ধে বিশ্বাস যোগায়।

চার্চে প্যাস্টর ঘোষণা করেন, আদি হিন্দুত্বের শ্রীকৃষ্ণ-ই আধুনিক খ্রীষ্টিয়ানিটির যীশুখ্রৃষ্ট। ক্রাইস্ট শব্দটির উৎপত্তি হল গ্রীক শব্দ ক্রিস্টোস থেকে। আবার ক্রিস্টোস হল কৃষ্ণের গ্রীক প্রতিশব্দ। তিনি আরোও বলেন, যখন আমরা ঈশ্বরকে ডাকি- খ্রীষ্ট বা ক্রিস্ট বা কৃষ্ণ বলে, আমরা তখন সেই একই মহা ব্যাক্তিত্বকে ভজনা করি যিনি এক এবং অদ্বিতীয়।

যীশু বলেছেন, “আমাদের সকলের পিতা যিনি স্বর্গবাসী, যখন তোমাদের তাঁর নামে ডাকেন, তখন তিনি ‘খ্রীষ্ট’ বলেন, যা কিনা ‘ক্রিস্ট’ বলার সহজ পদ্ধতি, আর ‘ক্রিস্ট’ হল ‘কৃষ্ণ’ উচ্চারণ করার আরেকটি প্রকার ভেদ মাত্র। (ওল্ড টেস্টামেন্ট)। এখানে আমার ১৯৬৭ সালে মহানায়ক উত্তমা কুমারের একটি ছবির কথা বিশেষ করে সেই সিনেমায় ব্যবহৃত একটি গানের কয়েকটা লাইন মনে পড়ছে- ‘খৃষ্টে আর কৃষ্টে কোন তফাত নেই রে ভাই, ঐহিকে সব ভিন্ন ভিন্ন, অন্তিমে সব একাঙ্গী’। কী অসাধারণ কথা।

আধুনিক সময়ে মহাঋষি ও আচার্য স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর এক বক্তৃতায় এই দুই মহামানব সম্বন্ধে শেষ কথা বলে গেছেন। তিনি তাঁদের জীবনের সারা সাদৃশ্য নিয়েও যথেষ্ঠ ওয়াকিবহাল ছিলেন। নীচে তার তাঁর বক্তৃতার কিছুটা সার অংশ এই নিবন্ধের ইতি হেতু আপনাদের কাছে উপস্থাপন করছি।

                            যীশু এবং কৃষ্ণের জীবনের প্রচুর সাদৃশ্য আছে। কোন্ চরিত্রটিকে অপরটি হইতে ধার করা হইয়াছে—এ সম্বন্ধে আলোচনা চলিতেছে। উভয় ক্ষেত্রেই একজন অত্যাচারী রাজা ছিল। উভয়েরই জন্ম হইয়াছিল অনেকটা এক অবস্থায়। দুইজনেরই মাতাপিতাকে বন্দী করিয়া রাখা হয়। দুইজনকেই দেবদূতেরা রক্ষা করিয়াছিলেন। উভয় ক্ষেত্রেই তাঁহাদের জন্মবৎসরে যে শিশুগুলি ভূমিষ্ঠ হয়, তাহাদিগকে হত্যা করা হইয়াছিল। শৈশবাবস্থাও একই প্রকার। আবার পরিণামে উভয়েই নিহত হন। কৃষ্ণ নিহত হন একটি আকস্মিক দুর্ঘটনায়; তিনি তাঁহার হত্যাকারীকে স্বর্গে লইয়া যান। খ্রীষ্টকে হত্যা করা হয়; তিনি দস্যুর মঙ্গল কামনা করেন এবং তাহাকে স্বর্গে লইয়া যান।

                          নিউ টেষ্টামেণ্ট এবং গীতার উপদেশগুলিতেও অনেক মিল আছে। মানুষের চিন্তাধারা একই পথে অগ্রসর হয়। কৃষ্ণের নিজের কথায় আমি তোমাদিগকে ইহার উত্তর দিতেছিঃ ‘যখনই ধর্মের গ্লানি ও অধর্মের প্রাদুর্ভাব হয়, তখনই আমি অবতীর্ণ হই। বার বার আমি আসি। অতএব যখনই দেখিবে কোন মহাত্মা মানবজাতির উদ্ধারের জন্য সচেষ্ট, জানিবে আমার আবির্ভাব হইয়াছে এবং তাঁহার পূজা করিবে।

                          তিনিই যদি বুদ্ধ বা যীশুরূপে অবতীর্ণ হন, তবে ধর্মে ধর্মে কেন এত মতভেদ? তাঁহাদের উপদেশ অবশ্য পালনীয়। হিন্দু ভক্ত বলিবেনঃ স্বয়ং ঈশ্বর কৃষ্ণ, বুদ্ধ, খ্রীষ্ট এবং অন্যান্য আচার্য (লোকগুরু)-রূপে অবতীর্ণ হইয়াছেন। হিন্দু দার্শনিক বলিবেনঃ ইঁহারা মহাপুরুষ এবং নিত্যমুক্ত। অথচ সমস্ত জগৎ কষ্ট পাইতেছে বলিয়া ইঁহারা মুক্ত হইয়াও নিজেদের মুক্তি গ্রহণ করেন না। বার বার তাঁহারা আসেন, নরশরীর ধারণ করেন এবং মানবজাতির হিতসাধন করেন, আশৈশব জানেন—তাঁহারা কে এবং কি উদ্দেশ্যে অবতীর্ণ হইয়াছেন …। আমাদের মত বন্ধনের মধ্য দিয়া তাঁহাদিগকে দেহ ধারণ করিতে হয় না। … নিজেদের স্বাধীন ইচ্ছাতেই তাঁহারা আসেন। বিপুল আধ্যাত্মিক শক্তি স্বতই তাঁহাদিগের ভিতর সঞ্চিত থাকে। আমরা ঐ শক্তির প্রতিরোধ করিতে পারি না। সেই আধ্যাত্মিকতার ঘূর্ণাবর্ত অগণিত নরনারীকে টানিয়া আনে এবং ইহার গতি চলিতেই থাকে, কেননা এই মহাপুরুষদেরই একজন না একজন পিছন হইতে শক্তি সঞ্চার করিতেছেন। তাই যতদিন সমগ্র মানবজাতির মুক্তি না হয় এবং এই পৃথিবীর খেলা পরিসমাপ্ত না হয়, ততদিন ইহা চলিতে থাকে।

                           যাঁহাদের জীবন আমরা অনুধ্যান করিতেছি, সেই মহাপুরুষগণের নাম মহিমান্বিত হউক। তাঁহারাই তো জগতের জীবন্ত ঈশ্বর। তাঁহারাই তো আমাদের উপাস্য। ভগবান্‌ যদি মানবীয় রূপ পরিগ্রহ করিয়া আমাদের নিকট উপস্থিত হন, কেবল তখনই আমরা তাঁহাকে চিনিতে পারি। তিনি তো সর্বত্র বিরাজমান, কিন্তু আমরা কি তাঁহাকে দেখিতে পাইতেছি? মানবদেহে সীমাবদ্ধ হইলেই আমাদের পক্ষে তাঁহাকে দেখা সম্ভব। … যদি মানুষ ও … জীবসকলকে ঈশ্বরেরই বিভিন্ন প্রকাশ বলিয়া মানি, তবে এই আচার্যগণই মানবজাতির নেতা এবং গুরু। অতএব, হে দেববন্দিতচরণ মহাপুরুষগণ, তোমাদিগকে প্রণাম! হে মনুষ্যজাতির পথপ্রদর্শকগণ, তোমাদিগকে প্রণাম! হে মহান্ আচার্যগণ, তোমাদের প্রণাম! হে পৃথিকৃৎগণ, তোমাদের উদ্দেশ্যে আমাদের চির প্রণতি।

 

সূত্র : কৃষ্ণ ও তাঁহার শিক্ষা ঃ মূল বক্তৃতাটি স্বামী বিবেকানন্দ দ্বারা ১৯০০ খ্রীঃ ১ এপ্রিল আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিস্কো অঞ্চলে প্রদত্ত। 

                                এবার নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিন। আজকে পৃথিবীর নিকট সেই সময় উপস্থিত, যখন আমাদের মতপার্থক্য ও তার থেকে উদ্ভুত ছোট ছোট জাগতিক ক্রিয়া বা নিয়মের বাইরে বেরিয়ে এসে সমগ্র প্রজাতির কল্যাণ হেতু এই সব মহামানব অবতারদের দেখানো পথে পা ফেলতে হবে। এখন থেকে একটাই গোষ্ঠি- যার নাম মানব গোষ্ঠি।