বাঁশের থেকে কঞ্চি দড় প্রবাদটি যে মিথ্যে নয়, সাম্প্রতিক অসহিষ্ণুতা ইস্যুর দিকে তাকালে তা আরও একবার প্রমাণিত হয়৷ অসহিষ্ণুতা বাঁশকে ছাপিয়ে যখন পুরস্কার ফেরানো কি না ফেরানো কিংবা টুইটে কে কী বলেছেন সে কঞ্চি  দড় হয়ে ওঠে, তখন উদ্দেশ্য ও বিধেয়টাই গুলিয়ে যায়৷ আসলে এই গুলিয়ে দেওয়ার খেলাটাই বোধহয় খেলেন রাজনীতির কারবারীরা৷ আর ছাইচাপা আগুনের মতো থেকে যায় অসহিষ্ণুতা৷ মাঝে মধ্যে হাওয়া লেগে ছাই সরে গেলেই আগুনের আঁচ পাওয়া যায়, ছ্যাঁকা লাগে সভ্যতার৷

আগে ছিল না?

অসহিষ্ণুতা প্রসঙ্গে সাম্প্রতিক বিতর্কের ভিতর যে প্রশ্নটি সবথেকে বেশি মাথাচাড়া দিয়েছে তা হল, অসহিষ্ণুতা কি আগে ছিল না? এই কি প্রথম সেটির স্বরূপ দেখা গেল৷ তার্কিকরা দেশ-বিদেশের ইতিহাস থেকে হাজারো নিদর্শন টেনে দেখান, অসহিষ্ণুতা চিরকালই ছিল৷ সময়ে সময়ে বিশেষ প্রয়োজনে ট্রাম্পকার্ডটি একবার করে খেলা হয় এই যা৷ তাঁদের যুক্তি মিথ্যে নেয়৷ ভিনদেশ নয়, আমাদের নিজেদের দেশেই যেদিন যুদ্ধপ্রিয় আর্যরা এসে intolerenceনিজেদের প্রাধান্য বিস্তার করছিল, নিজেদের সংস্কৃতির আগ্রাসন চালাচ্ছিল, বংশবিস্তারের মাধ্যমে নিজেদের শিকড়কে এ ভূমিতে গভীরভাবে প্রোথিত করছিল, সেদিনও তা একপ্রকারের অসহিষ্ণুতাই ছিল৷ ছিল যে তা অস্বীকারের কোনও জায়গা নেই৷ কিন্তু সেই থাকার সূত্রেই আবার রোপিত হয়েছে বহুত্ববাদের বীজ৷  আর্যরা নিজেদের সংস্কৃতি, নিজেদের সমাজগঠনের মডেল এদেশের অধিবাসীদের উপর চাপিয়ে দিয়েছে সত্যি, কিন্তু তারপরেও একটি পরিসর ছিল৷ অনার্যদের রীতিনীতির উপর নিজেদের আধিপত্য স্থাপন করেও তাঁদের সবকিছুকে একেবারে ফেলে দেননি আর্যরা৷ নিজেদের দেবতাদের বাহন করে হলেও অনার্য সংস্কৃতিকে জায়গা করে দিয়েছিল৷ এবং কোনও কোনও ক্ষেত্রে গুরুত্ব স্বীকার করে নিয়েও নিজেদের দেবপুত্রের মাথার উপরেও প্রাণীর মস্তককে জায়গা দিতে হয়েছে৷ পরাজিত অনার্যরা এই পাওয়াটুকুই মেনে নিয়েছিলেন৷ ফলত এক মিশ্র সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল৷ আর্যদের প্রবর্তিত রীতি যখন শাস্ত্রীয় বিধান হল, তখন অনার্যদের রীতিনীতিগুলি লোকাচার হয়ে থেকে গেল৷ উত্তরকালে দুটোরই পালন দেখা যায়৷ কোনওটিই বাদ পড়েনি৷ বস্তুত সেই কয়েক হাজার বছর আগে আর্যরা যে সুশৃঙ্খল সমাজ গঠনের প্রয়াসী চেয়েছিলেন, তা অনার্যরা মেনেই নিয়েছিলেন৷ গোঁড়ামি ও জাতপাতের শ্যাওলা ধরার আগে অবধি বর্ণাশ্রমের গঠনতন্ত্র তাই গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল৷ এক বর্ণ থেকে গুণবিচারে আর এক বর্ণে উত্তরণের যে সুবিধাটুকু ছিল তা সদর্থক হিসেবেই দেখেছিলেন সমাজেরinky-face.jpg.size.xxlarge.letterbox সব শ্রেণির মানুষ৷ এবং এই সমাজগঠনের প্রয়াসই কিছু প্রাণীকে অন্যদের তুলনায় সামনের সারিতে এনেছিল৷ কৃষিপ্রধান দেশে যার অন্যতম উদাহরণ গরু৷ নির্মলকুমার বসু তাঁর ‘হিন্দুমাজের গড়ন’-‘এ তাই বলছেন, ‘‘বর্ণগত সমাজের অন্তরে যে অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড বর্তমান ছিল, এবং স্বধর্ম পালনের যে আশ্বাস বহু জাতি লাভ করিয়াছিল, তাহারই কারণে ভারতীয় সমাজে বিজিতের বিদ্রোহ দেখা দেয় নাই৷ অথবা দেখা দিলেও বেশি দূর পর্যন্ত তাহা অগ্রসর হইতে পারে নাই৷অথচ ব্রাহ্মণশাসিত সমাজে আপত্তি বা বিদ্রোহের কোনও কারণ ছিল না, এমন মনে করিবার কোনও হেতু নাই৷’’ এই ‘সংশ্লেষ’ই হিন্দু তথা ভারতীয় সমাজকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি দান করিয়াছিল৷’’ সংশ্লেষের এই আদর্শ হিন্দুসমাজের মজ্জাগত৷ এই বহুত্বকে স্বীকার করে নিয়ে যে অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড সমাজকে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করেছিল তা এতটাই শক্ত ছিল যে বহু বিপর্যয়েও নষ্ট হয়নি৷ প্রশ্ন উঠবে মুসলমান শাসনকালে বহু হিন্দুই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন৷ এক্ষেত্রে লক্ষ্যণীয় জাতিভেদ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য ইসলাম বাছলেও, সে সমাজেও বৃত্তিগত ভেদাভেদ কিন্তু বজায় ছিল৷ অর্থাৎ শুধু এটাই কারণ নয়৷ হাজার বছর আগের হিন্দুসমাজ বহুত্বকে স্বীকৃতি দিয়ে শক্ত অর্থনৈতিক ভিতের উপর যে সমাজকে দাঁড় করিয়েছিলেন, সেখানে সমাজ ও মানুষের সম্পর্কের মূলকথা ছিল এরকম, ‘সমাজকে তাহারা দেখে, সমাজ তাহাদের দেখে৷ অধিকার ও দায় অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত৷ তদুপরি বিভিন্ন জাতির , বিভিন্ন কুলের, এমনকি বিভিন্ন মানুষের স্বধর্ম পালনের অধিকার আছে৷ এই দুইটি মূলনীতির উপরে রচিত হিন্দুসমাজ সংশ্লেষের দ্বারা ভারতবর্ষকে উন্নত ও সমৃদ্ধ করিয়াছিল, তাহাতে কোনও সংশয় নাই৷’

 বলাবাহুল্য ফিলহাল সময়ে এই সংশ্লেষের আদর্শ আর তেমন করে রক্ষিত হচ্ছে না৷ এবং নেই বিভিন্ন জাতির, বিভিন্ন কুলের, সর্বোপরি মানুষের স্বধর্ম পালনের অধিকারও৷ গোলমাল সেখানেই৷

মানুষের স্বাতন্ত্র, মানুষের স্বধর্ম

 আলাদা আলাদা ধর্ম তো অনেক পরের কথা, সবার আগে প্রতিটি মানুষ নিজস্ব ধর্মে আলাদা৷ব্যক্তিমাত্রই স্বতন্ত্র৷ ধর্ম একটা ‘ সেট’  হতে পারে৷ কিন্তু তার ভিতর প্রতিটি মানুষও আলাদা করে এক একটা ‘সাব-সেট’৷ প্রতিটি মানুষের নিজস্ব পরিচয় আছে৷ আলাদা পছন্দ আছে৷ একই ধর্মের ভিতর এক একজন মানুষের জীবযাপন, বই-গান-সিনেমার পছন্দ, খেলার ভালোলাগা মন্দ লাগা ইত্যাদি মিলিয়েই এক একজন মানুষের স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে protest_8cb164f2-852b-11e5-8fe0-54c761f0e0c7ওঠে৷ অবশ্যই ধর্ম এখানে একটি পরিচয়৷  মুশকিল বাঁধে যখন এই সব পরিচয় কেটেছেঁটে, মানুষকে এক পরিচয়ের গণ্ডিতে বেঁধে ফেলা হয়৷ কিংবা সব পরিচয় ছাপিয়ে একটি পরিচয় মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে৷ আর তা যদি ধর্ম হয় তবে তো কথাই নেই৷ ব্যক্তিস্বাতন্ত্রের এই বহুত্বকে, বৈচিত্রকে অস্বীকার করার মধ্যেই অসহিষ্ণুতার প্রথম বীজটি লুকিয়ে থাকে৷ মানুষের এই স্বধর্মকে অস্বীকার করলেই পরিচয় নিয়ে জামেলা বাঁধে৷ দেশ-কাল-ধর্ম-পছন্দ-বেড়ে ওঠার পরিবেশ ইত্যাদির সমম্বয়ে মানুষের পরিচয়ের যে জটিল নকশা,  যখন যে কোনও একটি উপাদানে খারিজ হয়ে যায়, তখন হিংসা বাঁধে৷ ব্যক্তি পরিচয় ও হিংসার কারণ বিস্তারিত ভাবে ব্যাখ্যা করেছেন অধ্যাপক অমর্ত্য সেন৷ ৪০’এর দশকের হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার কারণ সম্পর্কে তাই তিনি বলেন, ‘… the Massive identity Shifts that followed divisive politics. A great Many persons  identities as Indians, as Subcontinental Asians, or as members of the human race, seemed to give way-quite sudeenly-to secretarian identification with Hindu, Muslim, or Sikh communities. The carnage that followed had much to do with elementary herd behavior by which people were made to ‘discover’ their newly detected belligerent identitites, without subjecting the process to critical examination. The same people were suddenly different.’  সাম্প্রতিক অসহিষ্ণুতার দিকে তাকালেও দেখা যাবে ধর্মভিত্তিক এক পরিচয়ের ভূতই ঘাড়ে চেপেছে সভ্যতার৷ আর সেই সঙ্গে বিভেদের রাজনীতি তো আছেই৷ তাই তাঁর বক্তব্য, ‘Despite of our diverse diversities, the world is suddenly seen not as a collection of people, but as a federation of religions and civilizations.’  তিনি তাই জানান, ‘‘ The neglect of the plurality of our affiliations and of the need for choice and the reasoning obscure the world in which we live.’

বিভেদের রাজনীতি

 filmmakers-return-awards_ac6da96e-7daa-11e5-ba56-8cfa9414553dআলাদা আলাদা পরিচয়কে রেখে, ছেঁটে মোটামুটি একটা ছাঁচে ফেলে মানুষের সমাজ চলে৷ কিন্তু মাঝেমধ্যেই সেই ছাঁচের ভিতর থেকে একটি পরিচয়ের কাঁটা বেরিয়ে এসে রক্তপাত ঘটায়৷ আসলে কাঁটা নিজে তো বেরোয় না, বের করে এই বিভেদের রাজনীতি৷ বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক প্রয়োজনই এই বিভেদকে উসকে দেয়৷ আবার নতুন করে পরিচয় নিয়ে টানাটানি পড়ে৷ এবং কেবলই হিংসার জন্ম হয়৷  এই রাজনীতিই পুরস্কার প্রত্যাখানের মতো ঘটনাকেও অন্যভাবে দেখে৷ কোনও শিল্পীই অসহিষ্ণুতার পক্ষে নিশ্চয়ই নন, তবু শিল্পীমহলের বিভাজন হয়ে যায়, নেপথ্যে থাকে এই রাজনীতিই৷ এই মেরুকরণের রাজনীতিই কোনও লেখকের মুখে কালি লেপে৷ আবার তথাকথিত নিরপেক্ষতাও তো রাজনীতিরই এক মুখোশ৷ তাই ক্যামেরার সামনে গোমাংসে মুখ দেওয়া মুখোশরাও এক হিসেবে এই বিভেদের রাজনীতিকেই প্রশ্রয় দেয়৷আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে দেশের সুরক্ষা নিশ্চিতই রক্ষা করবে সরকার এবং সে কারণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও নিশ্চয়ই গ্রহণ করবে৷ কিন্তু দলীয় স্বার্থ যখন গণতন্ত্রের উর্ধে জায়গা পায় তখন দেশপ্রেম অপেক্ষা আদর্শের বদহজমটিই প্রকট হয়ে ওঠে৷ অন্তত শাহরুখ খানের মন্তব্য নিয়ে সাধ্বী প্রাচীরা যা করলেন, তাতে এইই মনে হয়৷ গণতন্ত্রের শিখণ্ডি খাড়া করে দলতন্ত্রের এই বিজয়রথা অব্যাহত থাকলে, সংবিধান স্বীকৃত বহুত্ববাদ নেহাতই কথার কথা হয়ে দাঁড়ায়৷

আসলে বিভেদের উৎস বোধহয় আরও গভীরে৷ সে রাজনীতি আমাদের নিজেদের মধ্যে, ব্যক্তিগত বেঁচে থাকায়৷ক্ষুদ্র পরিধিতে আমারা যদি বিভেদের বিষ থেকে নিজেদের মুক্ত করতে না পারি, তবে সামগ্রিক ক্ষেত্রে এ অসহিষ্ণুতার শেষ নেই৷

সরোজ দরবার