সংকল্প সরকার

বন্ধু সুমন্ত্র গায়ে সামান্য ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, ”কি রে উঠবি না? বেলা ক’টা বাজে দেখেছিস?”

চোখ রগড়ে ঘড়ির দিকে তাকেতেই দেখি আটটা বেজে গেছে। এ মা! কুয়াশায় কুয়াশায় বেলা যে এতটা বেড়ে গিয়েছে বুঝতেই পারিনি। তড়িঘড়ি বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ি।

”ঝটপট ফ্রেশ হয়ে নে। গরম গরম চা করে আনছি আমি,” বলে সুমন্ত্র কিচেনের দিকে চলে গেল।

সুমন্ত্র আমার ছেলেবেলার বন্ধু। সদ্য উত্তরবঙ্গের নামকরা একটি চা-বাগানে চাকরি পেয়েছে। ওরই আমন্ত্রণে গতকাল সন্ধেবেলা ওর কোয়ার্টারে বেড়াতে এসেছি।

ফ্রেশ হতেই সুমন্ত্র আমার হাতে ধোঁয়া ওঠা এক কাপ গরম চা ধরিয়ে দিয়ে বলল, ”চল, চা-বাগানের সামনে দাঁড়িয়ে চা খেতে খেতে গল্প করি।”

দুজনেই চায়ের পেয়ালা হাতে পায়ে পায়ে এগিয়ে যাই চা-বাগানের দিকে।

এই শীত-সকালে চা-বাগিচার সামনে দাঁড়িয়ে চায়ে চুমুক দিতে দিতে নৈসর্গিক দৃশ্য উপভোগ করা সত্যিই সৌভাগ্যের ব্যাপার! কী সুন্দর হালকা কুয়াশার চাদরে ঢেকে আছে চারদিক! সবুজ মখমলের মতো শিশিরস্নাত চা-বাগান রোদ্দুরে সর্বাঙ্গ শুকিয়ে নেওয়ার অপেক্ষায়। দূরে দিগন্তের একটু উপরে অস্পষ্টভাবে সূর্যদেব ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হচ্ছে। অদূরে পাহাড়ের পাদদেশ ঘেঁষে আঁকাবাঁকা যে রাস্তাটি আমাদের দিকে এসেছে সেই রাস্তা ধরে কয়েকজন মহিলা চা-শ্রমিক হেঁটে হেঁটে এগিয়ে আসছে।

সুমন্ত্র ধূমায়িত চায়ের কাপে একটা ছোট চুমুক দিয়ে বলল,”এই যে ঢেউ খেলানো আদিগন্তবিস্তৃত চা-বাগান দেখছিস এতে লুকোনো রয়েছে শ্রমিকের মর্মন্তুদ জীবন- কথা।তোর নিশ্চয়ই মনে আছে একটা সময় এই চা-শ্রমিকদের দুর্দশার কথা রোজ খবরের কাগজে বেরত?”

আমি বললাম,’থাকবে না কেন!আলবাত আছে। ২০০২ সালের পরপর।ঠিক তো? সেসময় প্রায় দিনই এক একটা চা-বাগান বন্ধ হয়ে যাচ্ছে আর চা-শ্রমিকরা কাজ হারিয়ে অনাহারে, অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে।’

সুমন্ত্র যোগ করল, ‘সেই ধারা কিন্তু অনেকদিন অব্যাহত ছিল।এই তিন-চার বছর আগেও তো রেডব্যাংক-সহ বিভিন্ন চা-বাগানের শ্রমিকরা অর্থাভাবে চা-গাছের ফুল ও ফল সেদ্ধ করে খেত। ফলে একটু একটু করে বিষাক্ত কীটনাশক প্রবেশ করত শ্রমিকদের শরীরে। এটা কিন্তু খুবই উদ্বেগজনক, স্বাস্থ্যের পক্ষে ভয়ানক হুমকি। অপুষ্টি, অনাহার, অর্ধাহারে কত লোক যে মরেছে তার গোনাগুনতি নেই।”

আমি প্রশ্ন করি, “আচ্ছা ওরা তো এই কাজ ছেড়ে দিয়ে বিকল্প কোন কাজ বেছে নিতে পারে?”

জবাবে সুমন্ত্র বলে, ”তাহলে তোকে ডুয়ার্সের চা-চাষের গোড়ার কথা জানতে হবে।”

চা-বাগানের একটি শেড ট্রির গায়ে হেলান দিয়ে বললাম, ‘বল।শুনছি।’

সুমন্ত্র বলে চলে, “ডুয়ার্সে চা-বাগানের গোড়াপত্তন হয় ১৮৭৫-এ। জনবসতি থেকে অনেক দূরে জঙ্গলাকীর্ণ অঞ্চলে গড়ে তোলা হয় বাগিচাগুলো।বাগিচায় কাজের জন্য শ্রমিক নিয়ে আসা হয় ছোটনাগপুর ও নেপাল থেকে। ফলে একবার এসে গেলে ফিরে যাওয়ার সুযোগ ছিল না। আর এর সুযোগ নিত চা-বাগানের মালিকরা। অকথ্য নির্যাতন চালাত শ্রমিকদের। শুনলে তুই অবাক হবি, বাগানের ম্যানেজাররা নিজস্ব আইনবলে অবাধ্য শ্রমিকদের বিনা ওয়ারেন্টে যখন-তখন গ্রেপ্তার করতে পারত।

মালিকপক্ষ এতটাই ক্ষমতাশালী ছিল যে বন দপ্তর বা রেল কোম্পানি শ্রমিকদের কাজে নিয়োগ করতে চাইলে মালিকেরা এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে।তাদের অভিযোগ ছিল, বন দপ্তর বা রেল কোম্পানি বেশি মজুরি দিলে চা-শিল্পে ক্ষতি হবে। আবার বিভিন্ন চা-বাগানের শ্রমিকদের মধ্যে যোগাযোগ গড়ে উঠে যাতে অসন্তোষ দানা বাঁধতে না পারে সেজন্য প্রত্যেকটি বাগানের জন্য আলাদা আলাদা হাটের ব্যবস্থা করা হয়।

আইন করে চা বাগানে চা ব্যতীত বিকল্প অর্থনীতি গড়ে উঠতে দেওয়া হয়নি। ফলে শ্রমিকরা রুটিরুজির জন্য একপ্রকার বাধ্য হয়েই এই শিল্পের উপর নির্ভরশীল হয়ে আছে। যুগ যুগ ধরে তাদের অন্য কাজ শিখতে না দেওয়া, বাইরের জগতের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে রাখা তাদের দুরবস্থার মূল কারণ। শ্রমিকদের জীবনে এখন সংকট কিছুটা কমলেও আহামরি কোন পরিবর্তন হয়নি।”

একটানা কথাগুলো বলে সুমন্ত্র চায়ের কাপে চুমুক দিতে গিয়ে দেখল চা ঠাণ্ডা হয়ে সরবৎ হয়ে গিয়েছে। কাপ উপুড় করে চা-টুকু ঢেলে ফেলে দিয়ে বলল, “এখন এইটুকুই থাক। পরে একসময় না হয় এদের নিয়ে আরও কথা হবে।”

ওর ঘরে ফিরে আসতে আসতে ভাবি, ক্লান্তি অপনোদনের জন্য পানীয় হিসেবে যে চায়ের জুড়ি মেলা ভার সেই চা উৎপাদনকারী শ্রমিকদের জীবনের ক্লান্তি দূর করবে কে? কে ফিরিয়ে আনবে তাদের আলোকবৃত্তে? আসুন আজ আন্তর্জাতিক চা দিবসে চায়ের আড্ডায় শুধু চায়ের আমেজে মেতে না থেকে চর্চা করি চা-শ্রমিকদের দুর্দশাগ্রস্ত জীবনের কথাও।