সায়ন্তনী বসু চৌধুরী

প্রতি বছর নভেম্বরের শেষ পর্যায়ে হৈহল্লা করতে করতে শীতকাল এসে পড়ে। গৃহস্থের ঘরে আলমারির তাক থেকে একে একে বেরিয়ে আসে উল দিয়ে বোনা রংবেরঙের জামাকাপড়। মনে হয় যেন নরম নরম আদুরে বিল্লিরা ঘুম ভেঙে ধীরে ধীরে জেগে উঠছে। ডিসেম্বরের শুরুতে কুয়াশা ছেঁড়া হলুদ সকাল, উষ্ণ কফির ঘ্রাণ, টাটকা সব্জি আর নলেন গুড়ে মাখামাখি মিষ্টি দেখলেই নাকে চড়ুইভাতির গন্ধ এসে লাগে। মনে হয়, গতানুগতিক জীবন থেকে একটা দিনের ছুটি নিয়ে কোনও এক ঝিলের ধারে আরাম করে মাদুর পেতে বসি। জড়ো করে আনি ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আপনজনদের। সকলে মিলে গলা ছেড়ে গাই আনন্দের গান। খোলা আকাশের নীচে হোক এক অপূর্ব জমায়েত। হোক, রান্নাবান্না আর মিলেমিশে খাওয়াদাওয়া।

পিকনিক একটি ফ্রেঞ্চ শব্দ। এর অর্থ প্রকৃতির কোলে বসে খাওয়া দাওয়া আর হইহুল্লোড় করা। খাওয়াদাওয়া বলতে রোজকার সাধারণ খাবারের পরিবর্তে একটু অন্যধরনের খাওয়ার কথাই বলা হয়। যাইহোক, সেটা ব্যক্তিগত রুচির ব্যাপার। নদীতীর, পার্ক, গ্রামের প্রান্তে একটুকরো ময়দান অথবা সবুজে ঘেরা বনভূমিই চড়ুইভাতি অথবা বনভোজনের আদর্শ জায়গা। বিগত কয়েক দশক ধরে আমরা বাঙালিরা পিকনিক বলতে বুঝি একটা শীতকালীন গেটটোগেদার। আত্মীয়স্বজনের পিকনিক, পড়ার ব্যাচের পিকনিক, বন্ধুদের পিকনিক আমাদের ছেলেবেলার সেই চড়ুইভাতির এখন কতোই না রকমফের!

বিদেশি সভ্যতায় যা পিকনিক তাইতো আমাদের দেশের চড়ুইভাতি। আজকালকার মডার্ন কিশোর কিশরীরা হয়ত বনভোজন বা চড়ুইভাতির নামই শোনেনি। তদের কাছে শীতকাল মানে পিক এবং নিক। আমরা বরং জেনে নিই কেমন ছিল তখনকার চড়ুইভাতি। কেনই বা পিকনিকের নাম চড়ুইভাতি! শীতের দিনে পাড়ার কচিকাঁচারা একজোট হয়ে নিজের নিজের বাড়ি থেকে চাল, ডাল, তেল, আলু, নুন আর অন্যান্য কাঁচামাল সংগ্রহ করে আনত। তারপর গাছপালার ছায়ায় একটু নিরিবিলি জায়গা দেখে শুরু হত তাদের রান্নার তোড়জোড়। একদল শুকনো ডালপালা, পাতা, কাঠ, খড় জোগাড় করতে ছুটত।

একদল হৈহৈ করে কুটনো কেটে বাটনা বেটে ফেলত। রান্নার সরঞ্জাম দেখলে মনে হত সে যেন খেলনা বাটি খেলার এলাহি এক আয়োজন! কচি কচি অপটু হাতে, পাতার আগুনে তৈরি সেইসব পদ খাওয়া হত কলার পাতায়। এই ছিল আদর্শ বনভোজন অথবা চড়ুইভাতি। ছোটবেলায় আমরাও করতাম। বেশিরভাগ সময় খিচুড়ি আর ডিম ভাজাতেই আমাদের আনন্দ তুঙ্গে উঠত তখন। তবে মায়ের বানিয়ে দেওয়া লুচি আর আলুর দমেও আমাদের পিকনিক জমে উঠত। এখন প্রশ্ন আসতেই পারে, চড়ুইভাতি কেন? তবে কি চড়ুইপাখির সঙ্গে কোন সম্পর্ক আছে?

আসলে অনেকগুলো বাচ্চা ছেলেমেয়ে এক জায়গায় জড়ো হয়ে যখন কলকল করে কথা বলে, অনেকটা চড়ুইয়ের কিচিরমিচিরের মতই শুনতে লাগে। চড়ুই সবচেয়ে ছোট্ট পাখি কিন্তু সারাক্ষণ এক অদ্ভুত আহ্লাদে ওরা প্রাণ চঞ্চল হয়ে থাকে। চেঁচামেচি, ডাকাডাকি, ব্যস্ততা, মারামারি, কাড়াকাড়ি, ওড়াউড়ি কোনকিছুতেই ওদের জুড়ি মেলেনা। আর ছোট্ট বাচ্চারা একত্রিত হয়ে কোন কাজ করতে গেলেই চড়াইদের ডাকের মত কলকাকলিতে চারদিক ভরে যায়।

তবে এখন আমাদের সেই চড়ুইভাতি আমূল বদলে গিয়েছে। একটা সময় আমাদের পিকনিকের মেনু ছিল মাংস আর ভাত। ধোঁয়া ওঠা লাল মুরগীর ঝোল অথবা গরমাগরম কচি পাঁঠার কষা মাংস, আর জুঁই ফুলের মত সাদা ভাত। শীতের দুপুরে বাঙালির পাতে এর অতিরিক্ত আর কীইবা চাই? তবে এখন পিকনিকের মেনু কার্ডে হুড়োহুড়ি করে ঢুকে পড়েছে বার্বিকিউতে সেঁকা খাবার। গালভরা নাম শুনে মনে হতে পারে এসব সেঁকা, পোড়া খাদ্য বিদেশিদের অনুকরণে তৈরি; কিন্তু আসলে তা নয়।

আগুন আবিষ্কারের পর থেকেই মানুষ ঝলসানো খাবার তৈরি করে আসছে। মাছ, মাংস, আনাজ, মায় পনীর, তোফু প্রায় সব খাদ্যই মশলায় ম্যারিনেট করে আগুনে ঝলসে খেতে দারুণ লাগে। তবে আদ্যোপান্ত বাঙালি মন বলে, পিকনিকের খাবার হবে জাস্ট বাঙালি। কলার পাতায় জল টলটল তারই মধ্যে নুন, লেবু, লংকা নিজ নিজ স্থান দখল করে নেবে, পাশে এসে পড়বে ঝুরঝুরে সাদা ভাত, হলদে ডাল, বেগুনি আর শেষের দিকে ঝাল ঝাল মাংসের ঝোল। ফাটাফাটি!

কলকাতার আশেপাশে পিকনিকের জন্য আদর্শ জায়গার কোন অভাব নেই। উত্তর চব্বিশ পরগণার টাকি আমার ব্যক্তিগত পছন্দের জায়গা। এছাড়া বসিরহাট, ইছামতী পিকনিক গার্ডেন, হাওড়ার গাদিয়াড়া, হুগলীর ওয়ান্ডারল্যান্ড পার্ক, দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার জয়নগর, নিমপিঠ, ডায়মণ্ডহারবার, ডাবু, সুন্দরবন, রায়চক, বজবজের নিকটস্থ আছিপুর পার্ক পিকনিকের জন্য উল্লেখযোগ্য। তবে একটু দূরে যেতে চাইলে তাজপুর, দীঘা, হেনরি আইল্যান্ড, বকখালি, দুবলার চর এবং মৌসুনি দ্বীপেও যাওয়া যায়।

তবে সত্যি বলতে গেলে পিকনিক অথবা চড়ুইভাতি তো বাড়ির ছাদে কিংবা বাড়ির বাগানেও করা যেতে পারে। তার জন্য দূরবর্তী জায়গায় ছুটে যাওয়া কি সত্যিই খুব দরকারি? বোধহয় না। মনের আনন্দ আর ছুটির আমেজ এটুকুই বোধহয় আসল।