এই ক’দিন আগেও ‘হোম ডেলিভারি’ শব্দের এতখানি রমরমা ছিল না৷কিন্তু তখনও এমন অনেক জিনিস ছিল যা বাড়িsaroj-darbar বয়েই চলে আসত৷ ফিলহাল দিনকালে হোম ডেলিভারির বাড়বাড়ন্ত সুবিধার কারণে তো বটেই, অহংয়ের পরিতৃপ্ততিতেও বটে৷ দিনে দিনে সার্ভিস থেকে এখন এ এক প্রবণতাও বটে৷ লিখলেন সরোজ দরবার

আসার কথা ছিল মোবাইল ফোন, এসে হাজির হল ইট-পাটকেল বাছাধন। রুমাল, বেড়াল হলে সুকুমারীয় শ্লেষ, কিন্তু ট্যাঁক থেকে রেস্ত এরকম বেকায়দায় খসে গেলে মাথা গরমের একশেষ। সব রাগ তখন গিয়ে পড়ে হোম ডেলিভারি সিস্টেমের উপর। অনলাইন শপিংয়ের রমরমার পর এ ব্যবস্থার খানিকটা চরিত্রনাশ হয়েছে সন্দেহ নেই, তবু বাড়ি বয়ে আধ ঘণ্টায় পিজ্জা, কিংবা তিন দিনে ‘দ্য কোম্পানি অফ ওম্যান’ এসে পৌঁছলে যে মধ্যবিত্ত চিত্তে গুপ্ত বাবুয়ানি বাসনার প্রশমন হয়, তাও তো ফেলনা নয়। ইট আসুক আর পাটকেল, যত বিটকেলই হোক না কেন, হোম ডেলিভারি তাই দিব্য আছে।

ফেরিওলার ডাক

‘হরেক মাল তিরিশ টাকা’…নিঝুম পাড়ায় এ ডাক ভেসে আসা মানেই ঘরে ঘরে একটা তোড়জোড় পড়ে যেত এই সেদিনও।  অনলাইন শপিং তখন দূর অস্ত। রোজকার বাজারও যে মফসসলে বসর তেমন নয়। হাটের রেওয়াজে সপ্তাহের দুটো দিনই চিহ্নিত হয়ে যেত হাটবার হিসেবে। এরকম Feriwalaদিনকালে সকালের রোদ একটু গড়ালে পাড়াজুড়ে এই হাঁক ভেসে আসা মানেই হাতের সামনে রকমারী জিনিসের আমদানি। হোম ডেলিভারির এই বোধহয় আদি ফর্ম। বিশেষত বাড়ির মেয়েদের জন্য। হেঁসেল ঠেলার নৈমিত্তিক দায়িত্বে হাটে যাওয়া যাঁদের হয়ে উঠত না, পছন্দ করে থালাটি, বাটিটি তাঁরা এখান থেকেই কিনতেন। বাচ্চারা হাপিত্যেশ করে থাকত কখন ‘বুড়ির চুল’ওয়ালার ঘণ্টা টুন টুন করে বেজে উঠবে। সমঝদারে জন্য ইশারাই কাফি, আর বাচ্চাদের জন্য ওই ঘণ্টাধ্বনি। অঙ্ক বইয়ের কড়া নাগপাশ থেকে ক্ষণিকের মুক্তি। আর এক ডাক আসত, ‘অ্যায়য়য় রং সিঁদুর মালা ঘুমসে…’। ছোট্ট একটা ডালা। কী নেই তাতে। ঘুমসি, চুলের কাঁটা থেকে আলতা, সিঁদুর, হরেক টিপের পাতা। মধ্যবয়স্ক ‘রং সিঁদুর মালা’ওয়ালা দরকারে পুচকিদের কান-নাক ফুঁড়িয়ে দেওয়ার কাজটিও করে দিতে পারতেন। ঘর সাজানোর ফুলদানি, মাটির মূর্তি আসত, কখনও আবার তার বিনিময় ছিল পুরনো কাপড়। এক এক দিন পুরো পাড়াকে চমকে দিয়ে এক ছোকরা গোছের ফেরিওয়ালা হাঁক দিত, ‘এই বউদি খাচ্ছে, বউদির খাচ্ছে’। নাহ, খাবার জিনিস নয়, তার সামগ্রী ছিল ইঁদুর মারা বিষ। তা এমন হাঁক কেন? ফেরিওয়ালা বলতেন, সংসারের ভিতর এই বিষ থাকে, সংসার যাতে না ফুটো হয়, তাই সেই বিষেই ইঁদুর মারো। এমন উদ্ভাবনী শক্তির জন্য তাঁর কপালে যে কেন পুরস্কার জোটেনি কে জানে!  যাকগে, ফেরিওয়ালার নস্ট্যালজিয়া নয়, মোদ্দা কথা, যখন হোম ডেলিভারি কথাটারও তেমন চল ছিল না, তখন এরকমই ছিল তার রূপ।

চিঠি আছে, কেউ আছে…

নারী-পুরুষ নির্বিশেষে তখনও এমন ‘মেইল’ নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি শুরু হয়নি। সেই সময় এই ডাক আসা মানেই উঠোনে ছড়িয়ে পড়া একরাশ খুশীর হাওয়া, অন্তত বেশীরভাগ ক্ষেত্রে তাইই৷ হয়তো পাটনায় কাজ করতে যাওয়া স্বামী দুটো একান্ত কথা লিখে পাঠিয়েছেন স্ত্রীকে৷ তার মধ্যে বাড়ির আর কার কার কথা কী লেখা আছে সেই নিয়ে ছিল আগ্রহ৷ সকলেই তো আর সে চিঠি পড়ে না৷ কখনও বা একটা মানি অর্ডার পাঠিয়েছে শহরে কাজ করতে যাওয়া ছেলে৷ ক’টা টাকা হাতে পেয়ে বিধবা মায়ের চোখে চিকচিকে জল৷ কখনও আবার কিছুই নয়, হয়তো কোনও বড় মেশোমশাই সক্কলের কুশল জানতে চেয়ে একখানা পোস্টকার্ড পাঠিয়েছেন৷ আত্মীয়তার যে টানটুকু সে ছোট্ট পোস্টকার্ডে লেগে থাকত, তা হয়তো এখনকার হাই টেক যুগে মেইলেও মিলবে না ৷ এও এক হোম ডেলিভারি যা বয়ে আনত খুশির হাওয়া৷ কষ্ট, দুঃখ, হতাশা, তাও কি আনত না? সে ইতিহাস বরং গোপন থাকাই ভালো৷

হপ্তায় হপ্তায় চিকেন, মাটন মাসকাবারি

ফিনফিনে সরু চালের ভাত, সঙ্গে ডাল, ভাজাভুজি, তরকারি, বেশ বড়সড় একখানা মাছের গাদা, Home-delivery-1এছাড়াও চাটনি ও পাঁপড়- তিন-থাকি টিফিন ক্যারিয়ার নামিয়ে রেখে ‘হোম ডেলিভারি’ দাদা তাঁর ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপন দিয়ে বলেছিলেন, খেয়ে ভালো লাগলে তবে পাকাপাকি বন্দোবস্ত৷ সপ্তাহে একদিন চিকেন, মাসে একবার মাটন৷ প্রতি মিল ৪০ টাকা৷ এক দাম৷ তবে চিকেন-মাটনের দিন দাম বেশী৷ এই খেয়েই নাকি কত ছেলে ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে বিদেশে পাড়ি দিয়েছে৷ পড়াশোনার পাশাপাশি খাদ্যগুণও যে একটা বড় ফ্যাক্টর, কে অস্বীকার করে! এরপরেই পরতে পরতে ছোটগল্পের মোচড়৷ দিনে দিনে কেমন করে টিফিনের কোটর থেকে হাওয়া হয়ে গেল ভাজা, কেমন করে সুস্বাদু তরকারী একদিন মুখে তোলার অযোগ্য হয়ে গেল, আর কেমন করে চিকেন-মাটনের প্রতিশ্রুতি ভোটঅন্তে প্রতিশ্রুতি পালনের মডেলকে মনে রেখে রাঁধুনির শরীর খারাপের অছিলা খুঁজে নিল- সে ইতিহাস আজ নির্ঘাৎ বহু প্রতিষ্ঠিত ইঞ্জিনিয়ারের কাছেই মিলবে৷ তবে এই ঘরোয়া খাবারই যে ছাত্রাবস্থায় কিংবা মেসজীবনে বহু বঙ্গসন্তানকে বাঁচিয়ে দিয়েছে এ কথা বিন্দুমাত্র অস্বীকার করা যাবে না৷ যখন পরীক্ষার হলে নিজেই নিজের পারফর্মেন্সে হতাশ হয়ে বাড়ি ফেরা, কিংবা  চাকরীর ইন্টারভিউ শেষে প্রবল টেনশনে ঘেমে নেয়ে একশেষ হয়ে ঘরে এসে বসা, তখন হাতের সামনে খাবারটা পাওয়া যেত এবং যায় এই ‘হোম ডেলিভারি’ দাদাদের সৌজন্যেই৷

ভালো এবং কালো

অনলাইন শপিংয়ের জমানা শুরু হওয়ার পর থেকে তো হোম ডেলিভারি জলভাত হয়ে গিয়েছে৷ sex homeও হ্যাঁ জল ভাতের জন্যও হোম ডেলিভারি আছে বটে৷ বড় রেস্তরাঁগুলো বাঙালির বাবুয়ানি বাসনাতে যারপরনাই সন্তুষ্টির তেল ঢেলে দিনে-দুপুরে-রাতে ঘরে পাঠিয়ে দিতে পারে মুরগির ঠ্যাং ইত্যাদি৷ বইয়ের জন্যেও বইপাড়ায় জুতোর শুকতলা খইয়ে পিঠ কুঁজো করে বিদ্যেবোঝাই বাবুমশাই হয়ে ফেরার দরকার নেই৷ নেটে অর্ডার দিয়ে দিলেই হল৷ যথাসময়ে হাজির হয়ে যাবে৷ তাতে অবিশ্যি নেড়েঘেঁটে বই দেখার আনন্দ কমে কি না, সে আলাদা তর্কের বিষয়৷ তবে বিশেষ বিশেষ দিনে যদি সকাল সকাল একরাশ শুভেচ্ছার ফুল বাড়ি বয়ে চলে আসে তবে আনন্দ কম কিছু হয় না৷ সে ব্যবস্থাও আছে ফিলহাল গিফট কর্ণারগুলোয়৷

সব ব্যবসায়ী যখন হোম ডেলিভারিকে ইউএসপি করছেন, তখন আদিম রিপুর ব্যবসাই বা বাদ থাকে কেন৷ ‘আশ্চর্য প্রদীপ’ ছবির ক্ল্যাইম্যাক্সটা মনে করুন৷ হোটেলের ঘরে পৌঁছে যাচ্ছে পছন্দসই নারী৷ আবার ‘খাদ’ ছবির কাহিনিতে যেমন পাওয়া গেল, ভেট হিসেবে ডাক্তারের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে নারীকে৷ এও হোম ডেলিভারির নিখাদ বাস্তবতা, যত রূঢ়ই হোক না কেন৷

অতঃপর

 হোম ডেলিভারির কদর তবু দিনে দিনে বাড়ছে বই কমছে না৷ সমাজের বদলে যাওয়া অর্থনৈতিক অবস্থানও তাতে ইন্ধন দিয়েছে৷ তাছাড়া হোম ডেলিভারির সাফল্য বোধহয় আমাদের অহং সন্তুষ্টিটেও৷ ‘বনপলাশীর পদাবলী’ ছবিতে ডাক্তাররূপী অনিল চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন, এভরি পার্সন হ্যাজ আ টেইল..প্রত্যেক মানুষের একটা করে লেজ আছে৷ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সেই লেজটিকেই সঠিক চিহ্নিত করেছেন ব্যবসায়ীরা৷ মুখের সামনে জিনিস তুলে দিয়ে বিলাসিতার সুপ্ত চাহিদাটিকেই মিটিয়ে চলেছে হোম ডেলিভারি ব্যবস্থা৷ কবে থেকে যেন হোম ডেলিভারি আর স্রেফ সার্ভিস নেই, হয়ে উঠেছে এক প্রবণতা৷ যে প্রবণতা ভুলিয়ে দেয় চাহিদা আর প্রাপ্তির মধ্যবর্তী পথটিকে৷ শর্টকার্টের রাস্তা চিনিয়ে দিয়ে করে তুলছে পরনির্ভর৷ অনেকাংশেই ভুলিয়ে দিচ্ছে খুঁজে পাওয়ার আনন্দ, খুঁজে ফেরার নিরন্তর চলাকেও৷ তাহলে আজ খ্যাপা কীভাবে পাবে পরশপাথর? নিরন্তর অণ্বেষণ না থাকলে কী তার দেখা মেলে, নাকি কোনও ‘হোম ডেলিভারি’ প্রথা পারে তা হাতে তুলে দিতে! ‘ Two roads diverged in a yellow wood,/And Sorry I could not travel both’

আমাদেরই তো ঠিক করে নিতে হবে, আমাদের পথ আসলে কোনটি৷