ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়
ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

ছোটবেলায় একটি ছড়া লিখেছিলাম।

“ছ” এ ছুটি পেরিয়ে গেল তেপান্তরের মাঠ
“ছ” এ ছবি উঠল ফুটে দূরের নদীর ঘাট।
“ছ” এ ছুটি ছ্যাকরাগাড়ি ছুট্টে গড়ের মাঠ
“ছ” এ ছিপ ফেলার দুপুর দিদার পুকুর ঘাট।

হ্যাঁ, ছুটি এমনি। আমাদের একরত্তি আলসেমি মাখা, একটু স্পেশ্যাল চায়ের পিরিচ-পেয়ালা নিয়ে গড়িমসি, একমুঠো ভালোলাগার আবেশ আর সামান্য অবসর।

ছুটির বুঝি সব ভাল। তার কোনো খুঁত ধরতে নেই। ছুটি যেন আমাদের আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রাখে। অনাবিল এক ভালবাসা তার জন্যে।
ছুটির দিনে বিছানা ছেড়ে ঘুমজড়ানো চোখ বলে ওঠে নো মর্ণিংওয়াক, নো জিম, নো যোগব্যায়াম।
কি তাই তো মন? মন বলে, ঠিক বলেছিস।
এই তো চাই রে ছুটি। ছুটি বলে নে এবার ধোঁয়াওঠা, দুধ-চিনির চা-বিলাস।
মন বলে, চুলোয় যাক ক্যালরি, নো ইস্যু, আজ যে ছুটি।
ছুটি বলে, এবার খবরের কাগজ পড়লেই বেলা কাবার, চল্‌, চল্‌ বাজারের ব্যাগ হাতে বেরিয়ে পড়ি।
মন বলে, হরেক কিসিম আমিষ আনব, রান্নাবান্না হোক জমিয়ে, আজ যে স্পেশ্যাল দিন।

হ্যাঁ, বাধাগতের রোজনামচা থেকে বেরিয়ে এসে ছুটির প্রতি আমরা সকলেই কমবেশী দুর্বল। তার একমাত্র কারণ হল ছুটির বিশেষত্বতে। কাজ নেই। অথবা ইচ্ছেমত কাজ, খেয়ালখুশির দিনযাপন।
রবিঠাকুর ছুটি চেয়েছেন বারেবারে। স্কুল যেতে চাইতেন না তাই। বাঁধাধরা জীবন ছিল তাঁর অপছন্দের।

” তোমার ছুটি নীল আকাশে ,
তোমার ছুটি মাঠে,
তোমার ছুটি থইহারা ওই
দিঘির ঘাটে ঘাটে ।
তোমার ছুটি তেঁতুলতলায় ,
গোলাবাড়ির কোণে ,
তোমার ছুটি ঝোপেঝাপে
পারুলডাঙার বনে ।
তোমার ছুটির আশা কাঁপে
কাঁচা ধানের খেতে ,
তোমার ছুটির খুশি নাচে
নদীর তরঙ্গেতে ।”

আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই কিন্তু এমন রবিকবির মনোভাব প্রচ্ছন্ন রয়েছে। কেউ প্রকাশ করি, কেউ করি না।

জীবনের সবকিছুকেই নিয়ে বাঁচা আমাদের। সেখানে কাজের ফাঁকে ছুটি খুঁজে নিয়ে প্রকৃতির সাথে মিশে যাওয়াটাও কিন্তু বিশেষ পাওয়া। আমার অন্তত তাই হয়। কারণ আমি ছুটি পেলেই চোখ মেলে তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করি প্রকৃতির সৌন্দর্য্যকে। ছুটি আছে বলেই পরের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারি। স্কুলে পড়াকালীন আমাদের অবস্থা ছিল হাত পা বাঁধা। বছরের নির্ধারিত ক’টা দিন ছুটি পাওয়া যাবে সেই মর্মে বুক বেঁধে পড়াশুনোয় মন । গরমের ছুটি, পুজোর ছুটি আর শীতের ছুটি বেশীদিনের। আর প্রতি রোববার একটু অন্যরকম। তা হল পাঁঠার মাংস-ভাতের, একটু গান নিয়ে মায়ের সাথে বসার, মায়ের পরিচর্যায় ছাদবাগানে কি ফুল ফুটল অথবা দিদার সাথে মামারবাড়ির পুকুরে ছিপ ফেলে মাছ ধরা, কিংবা ট্রামে চেপে জ্যাঠার সঙ্গে গড়ের মাঠ, অথবা দূরদর্শণের পর্দায় একঘর অন্ধকারে হৈ হৈ করে ছায়াছবি।

কৈশোরে মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক গন্ডী পেরোয় ছুটিগুলোয় কর্মযজ্ঞে সামিল হয়ে। কোথায় ছুটি? শুধুই কাজ। ওয়ার্ক এডুকেশন, খাতায় মলাট, কেডস রঙ করো, প্র্যাকটিকাল খাতা ভরো, আরো এমন কতকিছু। তার ফাঁকেই ছুটির দিনে মায়ের হাতের স্পেশ্যাল রেসিপি, ছুটির রসনা বিলাস। মন তখন কানায় কানায়। তাই তো আজ ছুটির দিন। ছুটির ব্রেকফাস্ট, ছুটির লাঞ্চ, ছুটির ডিনার, সবেতেই স্পেশ্যাল টাচ।

সদ্য টিন পেরিয়ে মুকুলিত যৌবনে ছুটির সংজ্ঞা অন্য ধাঁচের। স্বাধীনতার পাসপোর্ট বগলে তবে আগল আছে তার। কলেজ জীবন। আগাম প্ল্যানিং। বন্ধু চল্‌। কোথায়? গরমকালে মেট্রো সিনেমা, নিউমার্কেটে পয়লাবৈশাখের ড্রেসের ঝুলে আর তারপর? ইন্দ্রমহলের কুলফির ঠাণ্ডায় গরমের উত্তাপ প্রশমনে । বর্ষাকালে ভূতের গল্পের ব‌ই, ঝমঝম বৃষ্টিতে তেলেভাজা মুড়ি অথবা প্ল্যানচেট। আর আকাশভাঙ্গা বৃষ্টির উপচে পড়া জমা জলে নৌকো ভাসানো? আছি আছি অপ্রত্যাশিত রেনিডে” র ছুটিতেও ছিলাম ছোটবেলার নৌকা বানানোর কারিগর হয়ে আবার যৌবনে আছি অনেক কিছুতে, বৃষ্টির কবিতায়, লুকিয়েচুরিয়ে প্রেমের গল্প পাঠের ভালোলাগায়।
শরত এলেই মন উচাটন। ধুস্‌ কলেজ। ভাল্লাগেনা। বেজায় চাপ, ছুটি কবে পড়বে বন্ধু? হাতীবাগান, কলেজস্ট্রীট সফরে আর কবে যাব? নতুন ফ্যাশান, শাড়ীর চমক সব যে ফুরোয় মা। ছুটি পেলেই পুজো শপিং, রাদুর দোকান, নতুন চটী, খড়কে ডুরে শাড়ি, বাটিক সিল্ক, পুজোর নতুন গানের রেকর্ড।
হেমন্তে কোন্‌ বসন্তেরি বাণী ! মনখারাপ? কিছু না পাওয়া? মেয়েবেলায় অমন হয় বুঝি? প্রেম আসেনি তো কি? ছুটি তুই ভরিয়ে রাখিস। চলোনা মা, আজ আমরা বাইরে খাই। অনাদির মোগলাই কিম্বা বসন্তকেবিনের ফাউল কাটলেট্? অথবা সিলভারভ্যালির মুচমুচে চিকেন কবিরাজী? ফেরার পথে অমৃতর পয়োধি কিম্বা দ্বারিকের ক্ষীরের চপ? এর নাম‌ ই কি ছুটি? সব মনখারাপের ঢেউ গিয়ে আছড়ে পড়ত স্বাদকোরকে। লকলকে টেষ্টবাড ছুটির রসনাতৃপ্তিতে টৈটুম্বুর।
শীত এলেই মন উশখুশ। ছুটির দুপুর, মাদুরে উপুড় অমৃত কমলার, মায়ের উলকাঁটার। আর সোনাগলা রোদ্দুর মাখব বলে কুয়াশার পরত ছিঁড়েখুঁড়ে চড়ুইভাতি কিম্বা সরস্বতীপুজোর ।
ছুটি নেবে গো ছুটি? কত্ত ছুটি এই শীত এলে। বড়দিনের কেকের আনন্দে অবগাহন কলকাতার সাহেব পাড়ায়, শহরের প্রাণকেন্দ্রে, পার্কস্ট্রীটে । মানেই ফ্লুরিজ অথবা নিউমার্কেটের ফারপো, ডি গামা অথবা নাহুমস এ । শীতের ছুটি পড়া মানেই কোনো এক ছুটির উইকএন্ড এ একদিন দল বেঁধে ক’জনে মিলে। কারণ এমন কেমিস্ট্রি বারেবারে আসেনা । একে জমিয়ে ঠান্ডা তায় আবার ছুটি । গরমের ক্লান্তি ভুলে, তাপমাত্রা বৃদ্ধির ছুটিতে ।
তারপরেই তো শীতের আরো আরো ক্ষণস্থায়ী ছুটির দুপুরগুলো..পৌষপার্বণের, পিঠেপুলির। বসন্ত এসে যাবে। ওরে ছুটি যাস্‌ নে চলে। অনেক ছুটি আবার ছুটি বসন্তে। দোলের ছুটি, ইস্টারের লং উইকেন্ড… কত ছুটি। তবুও তাকে ধরে রাখতে পারিনে। ছুটি ফুরিয়ে যায়।
এখনো বদলে যায় নি ছুটির সংজ্ঞা। শুধু বদলেছে দৃশ্যপট, অনুভূতিগুলো।
এখন হঠাত ছুটি হলে আমি দেখি আলতাগোলা আকাশ । আকাশের সব রং টপটপ করে আমার গায়ে চুঁইয়ে পড়ে । হঠাত দ্বিতীয় হুগলী সেতু ডাক দেয় । অস্তরাগের আকাশ বয়ে খেয়ালী মন দেয়ালা করে ছুটির সাথে । হ্যালুসিনেটেড হাইওয়ের ধারে আমি দাঁড়াই ছুটির সাথে। ট্রেনের কু-ঝিকঝিক শুনি আমি ।
হঠাত কখনও ছুটি হলে নীল আকাশের পুবপারে ভাসাই আদরের নৌকোখানি যেখানে আছে উড়োজাহাজের ওঠানামা। বিশাল মহানগরকে নীচে একা ফেলে রেখে আমি পেরোই বাতাসপথ । উড়োজাহাজের ডানায় মেঘ সরে সরে যায় । আমি পৌঁছে যাই ভিনরাজ্যে । নদীনালা পেরিয়ে, পাহাড়মাটি ছাড়িয়ে, খাদের খতরনক বাঁক কিম্বা রোমহর্ষক মোড় পেরিয়ে আমি যাই ছুটির সাথে ঘর করতে । অচেনাফুলের যৌবনগন্ধ নিতে নিতে ছুটির সাথে দুদন্ড জিরেন হয় আমার ।
হঠাত চোখ মেলে দেখি ব্যস্ত মহানগর । আবার শহরের ভাঙাগড়া । আবার ছুটি । এভাবেই চলে জীবন । এভাবেই ছুটির সাথে ওঠাপড়া । মহানাগরিক ভীড়ে ছুটিকে চিঠিলেখা । আবারো হঠাত ছুটির পথ চেয়ে হাপিত্যেশ করে বসে থাকা । অঘোষিত, অপ্রত্যাশিত হঠাত ছুটির নিমন্ত্রণে বেরিয়ে পড়া । চেনা ছুটির চেয়ে সেটাই বোধহয় সবচেয়ে ভালো লাগে আমাদের, তাই না?
সবশেষে আবার স্মরণ করি রবীন্দ্রনাথ কে। ১৯১৪ সালে পুজোর ছুটির পর যিনি গয়া থেকে বেলা যাবার পথে রেলওয়ে ওয়েটিংরুমে বসে লিখেছিলেন পথের গান

“পান্থ তুমি পান্থজনের সখা হে,
পথে চলাই সেই তো তোমায় পাওয়া
যাত্রাপথের আনন্দগান যে গাহে
তারি কন্ঠে তোমারি গান গাওয়া”

আমার কাছে ছুটি মানে এমনি পথের পাঁচালি লেখা, সাহিত্যচর্চার নির্মল আনন্দ নিয়ে বেঁচে থাকা । জীবন তো একটাই…..ছুটি তো ফুরোয়।