গৌতম রায়
গৌতম রায়

সুরোলোকে প্রস্থানের কিছুদিন আগে রেডিওর জন্যে একটি গান রেকর্ড করেছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। “আমার শ্মশানে কতো লোক হবে”-গানটি হেমন্তদা বেঁচে থাকতেই ব্রডকাস্ট হয়েছিল রেডিওতে। হেমন্ত প্রেমীদের কাছে গানের কথা গুলোয় বুঝিবা একটু খটকাই লেগেছিল। শিল্পী কিন্তু পাত্তা দেননি। নিজেকে নিংড়ে দিয়ে গেয়েছিলেন। গানটি যে অল্প কিছুদিনের ভিতরেই কঠিন কঠোর উদ্ধত অসহায় বাস্তব হয়ে উঠবে– কে জানে তা উপলব্ধি করেছিলেন কী না তিনি। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের জীবনের শেষ এই রেডিও রেকর্ডিংটিকে ঘিরেও হেমন্তপ্রেমীদের ভিতরে আর একটি বেদনা রয়েছে। ১৯৮৭ সালের এই রেডিও রেকর্ডিংটি নাকি আর আকাশবাণীর কাছে নেই। যে-কোনো ভাবেই হোক গানের টেপটি নাকি তাঁদের কাছ থেকে নষ্ট হয়ে গিয়েছে। বাংলা গান হারিয়ে ফেলেছে তার একটি ইতিহাস।
হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুর লোকে প্রস্থান তো তাঁর বিদায় নয়।তাঁর রোগজীর্ণ শরীরটা থেকে মুক্ত হয়ে এখন তিনি প্রতিটি সঙ্গীত প্রেমী মানুষের নিত্য দিনের সঙ্গী। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়,”….টুটবে আগল বারে বারে তোমার দ্বারে, লাগবে আমায় ফিরে ফিরে ফিরে-আসার হাওয়া। “ভোরের আলোয় হেমন্ত তারা হারা হলেও সাঁজে আঁধার মাঝে সেই তারাটি তো প্রতিদিন নীরবে জ্বলতে থাকে।চেয়ে থাকে আমাদের সকলের দিকে।
যাঁরা হেমন্তদাকে খুব কাছ থেকে দেখবার সুযোগ পেয়েছিলেন তাঁদের এখনো নিভৃত মুহূর্তে মনে প্রশ্ন জাগে, কে বড়ো ছিলেন? শিল্পী হেমন্ত? নাকি মানুষ হেমন্ত? শিল্পী সত্তাকে অক্ষুন্ন রেখে কি করে একজন ভালো মানুষ হওয়া যায়, সত্যিকারের মানুষ হয়ে ওঠা যায়– হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের জীবন তার সাক্ষ্য বহন করে।
হেমন্তদাদের পারিবারিক দেবতা ছিলেন দধিমাধব। ছোটবেলায় ঠাকুমাকে দধিমাধব অন্ত প্রাণ দেখেছিলেন তিনি।ছোট হেমন্ত দেখলেন ঠাকুমাকে নিয়ে সব লোকজন খাটে শুইয়ে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে। সেদিন সকালেই বাড়িতে কী সব পুজো হয়েছে। সবাই বলছে “চন্দ্রায়ণ”। ছোট্ট হেমন্ত জানেন না চন্দ্রায়ণটা আবার কি পুজো। অবাক চোখে তিনি দেখলেন ঠাকুমার অন্তর্জলি যাত্রার আয়োজন। খানিক দূর চলে যাওয়ার পর হঠাৎ সেই বৃদ্ধার মনে হলো গাঁয়ের শিব কে পেন্নাম করা হলো না।অমনি তিনি অন্তর্জলী যাত্রার সঙ্গীদের বললেন ফিরে যেতে শিবের মন্দিরে। কাঁধে চড়ে খাটের উপর শুয়েইই তিনি চললেন শিবের দেউলে। সেভাবেই পেন্নাম করে গেলেন নদীতে। সেই রাতেই অর্ধ অঙ্গ গঙ্গা জলে অর্ধ অঙ্গ থাকবে স্থলে অবস্থায় প্রাণ ত্যাগ করলেন তিনি।
এমনটাই ছিল হেমন্তদার পারিবারিক পরিবেশ। তখন তিনি খ্যাতির শিখরে।সাবেক বম্বে, হালের মুম্বাই তে তখন প্রায় ডেলি প্যাসেনজারি করেন হেমন্তদা। টেলিফোনের আজকের সুবিধা তখন মানুষের কষ্টকল্পনা তেও আসে না। বম্বে থেকে রওনা হওয়ার সময়ে প্লেন ছাড়ার থেকে দমদমে ল্যান্ড করবার মুহূর্ত পর্যন্ত হেমন্তদার মা ঠাকুর ঘরে বসে থাকতেন ছেলের নিরাপদ অবতরণের কামনায়। অমন মা না হলে কি এমন ছেলে হয়?
ছোটবেলাকার বন্ধু এস কে নন্দন অতি সাধারণ চাকরি করেন কলকাতা পোর্ট ট্রাস্টে। রাণার,পাল্কির গানের হেমন্তদা তখন বম্বেতে নাগিন করে সুপার ডুপার হিট। কলকাতায় গাড়ি করে যাচ্ছেন হেমন্তদা। চালকের আসনে সেই চির পরিচিত সনৎবাবু। হঠাৎ হেমন্তদা দেখলেন রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন ছোট বেলাকার বন্ধু নন্দন। সনৎবাবুকে বললেন গাড়ি থামাতে। নন্দন দেখলেন হঠাৎ ব্রেক কষে তাঁর পাশে একটা গাড়ি দাঁড়ালো। তিনি একটু সরে দাঁড়ানো মাত্রই দেখেন গাড়ির জানলা খুলে তাঁকে ডাকছেন ছোটবেলাকার বন্ধু হেমন্ত, আজকের বিখ্যাত শিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। কিছুটা বিস্ময় বিমূঢ় হয়ে পড়েছেন এস কে নন্দন।
কি রে কোথায় যাচ্ছিস?-বন্ধু হেমন্তের আন্তরিকতা এক মুহূর্তে নন্দনের সমস্ত সংকোচকে উড়িয়ে দিল।
বন্ধুর গন্তব্য যানবার পর তাঁকে আর একটি কথাও বাড়াতে দিলেন না হেমন্ত। প্রায় জোর করেই বন্ধুকে গাড়িতে তুলে গন্তব্যে পৌঁছে দিলেন।
বাল্য বন্ধু কোনো সেলিব্রেটি নন। সেলিব্রেটি তখন হেমন্তদা।কিন্তু বন্ধুর কাছে তো তিনি কেবলই ‘হেমন্ত’। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মতো স্বনামধন্য বন্ধুর কাছে ও তিনি যেমন আবার পোর্ট ট্রাস্টের একজন সাধারণ কর্মীর কাছেও তেমন। মানুষ হেমন্তের এই অনিন্দ্যসুন্দর কান্তি সমসাময়িক শিল্পীদের ভিতরে বড়ো একটা ছিল না। এই মহৎ প্রাণ মানুষটির বিষয়ে আর একটি কথা বিশেষ ভাবে বলা জরুরি যে, জানা অজানা কতো মানুষকে যে তিনি আর্থিক ভাবে সাহায্য করতেন তা বোধহয় তাঁর বাঁ হাত ও জানতে পারতো না। এতোটাই নীরবে, নিভৃতে ছিল হেমন্তদার মানুষের প্রতি হাত বাড়িয়ে দেওয়ার রীতি নীতি। বলা বৌদিও জানতেন না কতো মানুষের কতো বিপদে কী ভাবে বুক দিয়ে আগলাতেন হেমন্তদা। জানতেন বুঝি শুধু একজন। সনৎবাবু। এঁর হাত দিয়েই সাহায্যের খাম গুলি সাধারণত তিনি পাঠাতেন।
উৎপলা সেনের কাছে শোনা একটি ঘটনা। তখনো সনৎবাবু হেমন্তদার গাড়ির স্টিয়ারিং ধরেননি। ছাত্রদের অনুরোধে হেমন্তদা গিয়েছেন হুগলী মহসীন কলেজের একটি অনুষ্ঠানে গান গাইতে। সঙ্গে রয়েছেন উৎপলা সেন, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, আলপনা বন্দ্যোপাধ্যায়। গানের আসরের শেষে সকলের সম্মানদক্ষিণাটা আয়োজক ছাত্রেরা এক সঙ্গে একটি খামে করে হেমন্তদার হাতে দিয়েছে।
অত্যন্ত পরিশীলিত মানুষ হেমন্তদা একটি বারের জন্যেও খামটা খুলে দেখেননি।গাড়ি খানিকটা এগিয়ে গিয়েছে। সবাইকে টাকা বুঝিয়ে দেওয়ার জন্যে খামটা খুলে তো হেমন্তদার মাথায় হাত। মাত্র দুটো কি তিনটে দশ টাকার নোট। আর একটা চিরকুট। ছাত্রদের লেখা। তারা লিখেছে, এর বেশি কিছুতেই আমরা জোগার করতে পারলাম না। দয়াকরে আমাদের ক্ষমা করে দেবেন। উৎপলা সেন তো সব দেখে শুনে ভয়ানক উত্তেজিত। বললেন, এক্ষুনি গাড়ি ঘুরিয়ে কলেজে চলুন হেমন্তদা। এ ভাবে ঠকাবে?
হেমন্তদা নিশ্চুপ। সামনে দেখলেন একটা ছোট্ট দোকানে আলুর চপ ভাজছে। উৎপলাকে একটা কথা না বলে প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বললেন,
চল, ভারি সুন্দর আলুর চপ ভাজছে।ওই দশটাকাগুলোর সদব্যবহার করে ব্যাপারটা সেলিব্রেট করি।
উৎপলার দিকে এবার ফিরে তাকিয়ে বললেন, ছাড় না বেলুন(উৎপলার ডাকনাম), ছাত্ররাই তো করেছে। ওরা কোথায় অতো টাকা পাবে বল তো?
এই ছিলেন মানুষ হেমন্তদা। ওঁর বড়দা তারাজ্যোতির সঙ্গে বিয়ে হয়েছে নৈহাটির রঘুনাথ চট্টোপাধ্যায়ের মেয়ের। তারাজ্যোতি অল্পবিস্তর লিখতেন। দেব সাহিত্য কুটিরের এক পূজা বার্ষিকীতে “ঠোঙা বাবা ” নামে ভারি সুন্দর গল্প লিখেছিলেন। বড়বৌদির ভাই তাপসকে গানের জগতে প্রতিষ্ঠিত করতে এগিয়ে এসেছিলেন হেমন্তদা।
তাঁর মৃত্যুর পর এক শিল্পী একটি দৈনিক পত্রিকায় হেমন্তদা সম্পর্কে অনেক বিষোদগার করলেন। অথচ হেমন্তদা বা বেলা বৌদি বেঁচে থাকতে একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি।
নচিকেতা ঘোষকে হেমন্তদাই বম্বে নিয়ে গিয়েছিলেন। আজও বেঁচে থাকা কোনো কোনো লোক বলে বেড়ান, হেমন্তদা নাকি নচিবাবুকে কিছু করতে না দেওয়ার উদ্দেশ্য নিয়েই বম্বে নিয়ে গিয়েছিলেন। রফি সাহেবের “স্বপনা লেকে আয়ে চান্দা”র আদলে নচিবাবু তখন কলকাতায় বাংলা গানে সুর দিলেন। গানটি সুপার হিট হয়েছিল। যাঁরা হেমন্ত বিদূষণ না করে আজ ও জলগ্রহণ করেন না তাঁরাই হয়তো বলতে পারবেন বম্বেতে চুক্তিবদ্ধ অবস্থায় কলকাতায় কি ভাবে গান করেছিলেন নচিবাবু।
আসলে কোনো কোনো লোক থাকেন যাঁদের স্বভাবটাই পরনিন্দা পরচর্চা।তাই তাঁরা বেলা বৌদির শখের শাড়ির ব্যবসা নিয়ে গবেষণা করতে বসে যান।তবে এতে হেমন্তের মন্তর এতোটুকুনিও ম্লান হয় না।
মহালয়ার সকালে রেডিও তে “মহিষাসুরমর্দিনী “,যা আম বাঙালি এক ডাকে “মহালয়া” বলে,তাতে প্রথম দিকে বেশ কয়েক বছর অংশ নিয়েছিলেন।তখন লাইভ ব্রডকাস্টিং হতো অনুষ্ঠানটির। এখন যে রেকর্ডটি বাজানো হয় জীবন সায়হ্নে এসে বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র বর্তমান কলমচি কে বলেছিলেন ,সেটি পাঁচের দশকের গোড়ার রেকর্ডিং।হেমন্তদার বড়বৌদির বাপের বাড়িতে শ্রীরামকৃষ্ণের একটি জন্ম জয়ন্তীর অনুষ্ঠানে বীরেনদার কাছে শোনা ঘটনা,মহালয়ার অনুষ্ঠানের সময় সবাইকে সেই ভোরে চান করে আসতে হতো।যে ঘরে অনুষ্ঠানটি হতো সেই ঘরে বীরেনদা নিজের হাতে ধূপ জ্বেলে দিতেন।হেমন্তদা মহালয়ার অনুষ্ঠান নিয়ে নিজের গানের কথা না বলে বলতেন পঙ্কজ কুমার মল্লিকের কথা।বলতেন,পঙ্কজদা যখন অর্গলাস্ত্রোত্রের জয়ন্তী মঙ্গলা কালী ভদ্র কালী কৃপালিনী,দুর্গা শিবা ক্ষমা ধাত্রী স্বহাঃ স্বধা নমস্তুতে ধরতেন পরিবেশটা কেমন যেন অন্য রকম হয়ে যেত।গান শেষের পরেও অনেকটা সময় লাগতো পঙ্কজবাবুর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে।যেন একটা ঈশ্বরীয় আবেশ হতো তাঁর ভিতরে–এসব অকপটে বলতেন হেমন্তদা।
কারো ভিতরে এতোটুকু সম্ভাবনা দেখলে স্পষ্ট ভাষায় বলতেন তিনি।স্পষ্ট অথচ কটুত্বহীন কথা ছিল তাঁর চরিত্রের সব থেকে বড়ো বৈশিষ্ট। একটা সময়ে সঙ্গীত জীবনের শুরুতে পঙ্কজ মল্লিক কে কিছুটা অনুসরণ করতেন।ওঁকে তখন বলা হতো “ছোট পঙ্কজ” । তুলসীদাস ফিল্মে ওঁর গাওয়া “আমি তনু চন্দন বাটি রাম নাম পাষাণে”শুনলে অএটা বোঝা যায়। এটিকে তিনি খুব অল্প সময়ের ভিতরেই কাটিয়ে স্বকীয় হয়ে উঠেছিলেন।