অ্যালবার্ট অশোক

বাংলা তথা ভারতের আকাশে, এক স্বতন্ত্র গরিমায় উজ্জ্বল নক্ষত্র, গণেশ পাইন। তাঁকে বাংলা মনে রাখবে, অবচেতন মনের, রোমান্টিক প্রকৃতির ছবির দ্রষ্টা হিসাবে। মানুষের মনে ঘোরে যে স্বপ্ন চাপা থাকে তাকে তিনি তুলে এনেছেন ক্যানভাস ও কাগজের পটে। মূলত মোটা টেম্পেরায় একজন নকশাবাজ বা মুসাবিদাকারী। তার ছোট ছোট পেইন্টিংয়ে মূর্তি ও প্রতীক থাকত। তিনি প্রতিষ্ঠানের নির্মাণ হলেও বাংলার এক শিল্প আন্দোলন, বেঙ্গল স্কুলের শেষ মাইল ফলক। যখন তার ছবি বাংলা তথা ভারতের মধ্যগগনে বিরাজ মান, তখন কিছু মানুষ তাকে ক্লোন করে বিখ্যাত হবার স্বপ্ন দেখা শুরু করেছিল। কিন্তু ক্লোন তো উপরের আকৃতিটা, ভেতরটা তো নয়। আর হওয়াও সম্ভব নয়।

আমাদের ছোটবেলায়, আমাদের ঠাকুরমা বা দাদুরা নানা কল্প গল্প– যেমন, রাক্ষস খোক্কস, ভূতপেত্নী, নীতিমূলক বা পৌরাণিক অনেক গল্প বলত, জানি না আজও সেইদিন আছে কিনা। গণেশ পাইনের দিদিমা নন্দরাণী, এরকম নানা গল্প শোনাতেন যার ফলে গণেশ পাইনের ছোটবেলাতেই নানা অলীক কল্পজগতের সৃষ্টি হয়েছিল। ফলে গণেশ পাইন তাঁর ছোটবেলার অভিজ্ঞতা ও নানা গল্প মিশিয়ে দৃশ্য জগতের কথকের মতো বাঁদরকে রাজকুমার বানিয়ে, গঙ্গাফড়িং কথা বলছে, বালক যাদুকর, ইত্যাদির ছবি বানাতেন। বাঁদরের নাম দিয়েছিলেন ‘বীর বাহাদুর’। মানে সমস্ত কিছুর ওস্তাদ। বাঁদরকে, রাজার পারিষদদের মতো পোশাক পরানো, আবার গলায় একটা দড়ি দিয়ে বাঁধা, এসব কাল্পনিক বিষয়– যা আমাদের অবচেতন মনে ধাক্কা দেয়। সাধারণ মানুষকূল তো বাঁদরের মতোই, দামী দামী জামা পোশাক পরি। কিন্তু আমাদের অস্তিত্ব কোথাও বাঁধা আছে, ফলে মুক্ত নই যা কিছু করার বা স্বাধীনতার।

আরেকটা কাজ, যেখানে তিনি একটি মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ দেখানো হচ্ছে। গণেশ পাইনের ছোটবেলায় তার পৈত্রিক ভিটে বাড়ি, কবিরাজ রো-র উল্টোদিকে একটা মন্দির ভাঙা ছিল। মন্দিরটায় তিনি এক সুন্দরতা খোঁজে পান। মন্দিরটা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, গণেশ পাইন তার কল্পনার জালকে সুন্দর করে মন্দিরটাকে মহান ভাবে উদ্ভাসিত করতে চান। যেমন the shrine নামক ছবিটি।

কিন্তু তিনি যাই আঁকুন, তাঁর ছবির যে মেজাজ ও চরিত্র তা হল, নিঃসঙ্গতা, ভাবালুতা, ও বিষাদের আবহ। তিনি বাস্তবিক নিঃসঙ্গ মানুষ ছিলেন, মিডিয়া পরিহার করে চলতেন, এমনকি তার প্রদর্শনীর সময়েও। তিনি সাংঘাতিক দাম্ভিকও ছিলেন, আন্তর্জাতিক নীলাম ব্যবসায়ী সোথবী ও ক্রিস্টির থেকে তাঁর ছবি তুলে নিয়েছিলেন। বিক্রি করতে দেননি।

গণেশ পাইন, বেঙ্গল স্কুলের অবন ঠাকুর ও গগণ ঠাকুরের প্রভাব পেয়েছিলেন ছোটবেলায়। এবং অতি যত্ন সহকারে নকশাকারীর মতো তিনি রং লাগাতেন। প্রথম দিকে জল রং করতে ভালবাসতেন। পরে গুয়াশ এবং তারপর টেম্পেরা পদ্ধতিতে। পঞ্চদশ শতাব্দীর ইউরোপের জনপ্রিয় মাধ্যম। এইভাবে তার নিজস্ব স্টাইল তৈরি হয় ও স্টাইলের সঙ্গে সঙ্গে ছবিতে অন্ধকারও নেমে আসে।

বেঙ্গল স্কুল হল একটা শিল্প আন্দোলন, তখনকার দিনে এক জাতীয়তাবাদী ভাবনা থেকে সৃষ্ট, ভারতীয় ঐতিহ্যের শিকর ধরে, নান্দনিক ভাবনায়, মুঘল মিনিয়েচা্র, অজন্তা ইলোরার ঘরানায় এবং ভারতীয় ম্যূরাল থেকে অনুপ্রাণিত, অবন ঠাকুরের নেতৃত্বে আধুনিক ভারতীয় ছবি নির্মাণের জন্য।

তাঁর ছবিতে কঙ্কাল নেমে আসে, দেখা যায় নৌকা, আর এক ক্ষয়িষ্ণু জগত। মনে হয় কোন পৌরাণিক কাহিনীর অবতারণা। একবার তিনি বলেছিলেন, অন্ধকার হয়ত কাউকে নিরাপত্তাহীন করে দেয়, ভয় জাগায়, কিন্তু এটারও সৌন্দর্য আছে, গভীর রহস্যময় এক অলৌকিক পরীর দেশে নিয়ে যায়।

এই ছায়াময় জগতে, গণেশ পাইন এক আকৃতির প্রতীকী ভাষা তৈরি করেছেন, যা মানুষের অস্তিত্ববাদের আতঙ্ক বা অবস্থা। তিনি যে আলো ছায়ার জগত তৈরি করেছেন তাতে এক অদ্ভুত আলো তাঁর ছবির চরিত্রগুলিতে পড়ে, তাতে এক মায়াজাল বিস্তৃত হয়, এক রহস্যের চাদরে ঢাকা থাকে অনেক গভীর কৌতূহলের কথা।

গণেশ পাইন উত্তর কলকাতার কবিরাজ রো-তে জন্মেছিলেন ১৯৩৭ সালের ১১ জুন। চার বছর বয়েসে সিটি কলেজিয়েট স্কুলে (City Collegiate School) ইনফ্যান্ট ক্লাসে ভর্তি হন। সেখান থেকেই মেট্রিকুলেশন পরীক্ষায় পাশ করেন। তাঁর ছোট বেলায় শিশু পত্রিকা মৌচাকে অবন ঠাকুরের ড্রয়িং দেখে উদ্বুদ্ধ হন। কালো স্লেটে খড়ি দিয়ে সেই ছবি মন দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আঁকতেন। ১৯৪৬ সালে তাঁর বাবা মারা যান, ও সাম্প্রদায়িক অশান্তি, দেশভাগ, স্বাধীনতা, ইত্যাদি তার মনে দাগ কাটে। তখন তাঁর বয়েস ৯ বছর। সেই সময় গণেশ পাইনদের পৈত্রিক ভিটে উৎখাত হয়, তাঁদের রাস্তায় নামতে হয়েছিল। তখন শহরে এদিক ওদিক ঘুরতে ঘুরতে মৃতদেহের স্তূপ দেখেন। একটা স্তূপের উপরে এক মহিলার নগ্ন শরীর ছিল, তার স্তনে আঘাতের চিহ্ন, ইত্যাদি। সেই ভয়ঙ্কর দৃশ্য তাঁকে সারা জীবন তাড়িয়ে গেছে। তিনি মৃত্যুর ছবি আঁকার রসদ পান।

১৯৫২ সালে, ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামে, অবন ঠাকুরের এক বড় প্রদর্শনী হয়, গণেশ পাইনের তখন বয়েস ১৫, তিনি সে প্রদর্শনী দেখে ভীষণ অনুপ্রাণিত হন। গণেশ পাইনের জীবনে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রভাব ছাড়াও রেমবান্ড ও পল ক্লের (Rembrandt and Paul Klee.) প্রভাব ছিল।

তিনি স্থির করেন, তিনি বড় হয়ে ছবি আঁকবেন। বাদ সাধল বাড়ির লোকেরা। তাঁরা চান গণেশ, অন্য কোনও বিষয় নিয়ে পড়াশুনা করে চাকরি করুক। বাড়ির উপর তিনি খুব রেগে যান, শেষে তাঁর কাকা, মনোহর পাইন, গভর্নমেন্ট আর্ট স্কুলে ভর্তি করে দেন। গণেশ পাইন আর্ট কলেজে ওয়েস্টার্ন আর্ট নিয়ে পড়াশুনা করেন, যদিও ওরিয়েন্টাল আর্টের প্রতি তার অনুরাগ ছিল। ১৯৫৫ সালে, তখন তিনি জলরঙে ছবি আঁকতেন, তিনি ‘Winter’s Morning’ নামে একটি সুন্দর জলরঙের ছবি আঁকেন। তাতে অবন ঠাকুরের পরিষ্কার ছাপ ছিল। ছবিটা এত সুন্দর হয়েছিল তখনই বোঝা গেছিল, গণেশ পাইনের দক্ষতা ও তাঁর ভবিষ্যৎ। সেটাই ছিল গণেশ পাইনের প্রথম পেইন্টিং।

১৯৫৯ সালে, তিনি গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজ এন্ড ক্রাফট থেকে ডিপ্লোমা নিয়ে স্নাতক হন। এরপর কিছুদিন তিনি বিজ্ঞাপন জগতে অ্যানিমেশনের স্কেচ করেন পেশার জন্য। ১৯৬০ সাল থেকে তিনি বইয়ের অলংকারিক হিসাবে কাজ শুরু করেন। সেই সময় তাঁর আর্থিক অবস্থা এত খারাপ ছিল তিনি রং কেনার পয়সাও পেতেন না। ফলে কালি কলমে স্কেচ জাতীয় ছবি আঁকতেন। ১৯৬৩ সালে সোসাইটি অব কনটেম্পোরারি আর্টিস্টস’ গ্রুপে যোগদান করেন। সেখানে শ্যামল দত্ত রায়, বিকাশ ভট্টাচার্য, ধর্মনারায়ন দাশগুপ্ত ও গণেশ হালুই প্রমুখ সেই গ্রুপের সদস্য ছিলেন। Paris Biennale in 1969 তে তিনি অংশ নেন, এছাড়াও উত্তর আমেরিকায় এবং ইউরোপে তাঁর অনেক প্রদর্শনী হয়েছে।

গণেশ পাইন আজীবন অন্তর্মুখী ও লাজুক স্বভাবের। একবার গ্রুপে তাঁর প্রদর্শনী হয়েছিল, সেই প্রদর্শনীতে প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহরু এসেছিলেন। তিনি গণেশ পাইনের ছবি মন দিয়ে দেখছিলেন, লেডি রাণু মুখার্জী দেখলেন গণেশ পাইন আড়ালে লুকাচ্ছে, তিনি গণেশ পাইনকে ডেকে জহরলালের সঙ্গে পরিচয় করে দেন। জহরলাল তাঁর সঙ্গে করমর্দন করেন। এবং ছবি সম্পর্কে কিছু সাহস যুগিয়ে গণেশের ছবি প্রশংসা করে যান। সেই ছবি প্রথম পুরস্কার পেল।

গণেশ পাইন খুব কবিতা পড়তেন, পাঠ করতেন। তিনি কবি ও শিল্পীদের একটা সেতু রচনা করেছিলেন। ছবি এঁকে রোজগার করা খুব কঠিন। গণেশ পাইন বেশ কিছু কর্মখালিতে চাকরির আবেদন করেন। দুঃখের বিষয় কোথাও তাঁর চাকরি হয়নি। শেষে Kesoram Cotton Mills-এর ডিজাইনার পদ চেয়ে দরখাস্ত করেন, ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে শুনেন তাঁদের বড় কোনও শিল্পীর দরকার নেই। ভগ্ন মনোরথে বাড়ি ফিরছেন, হঠাৎ দেখেন একটি ভিখারি প্রায় বাচ্চা ছেলে একটা ঠোঙায় কিছু খাবার নিয়ে যাচ্ছে। সে ঠোংগা/প্যাকেটটা এমন করে ধরেছে যাতে তার এই খাবারটা যাতে না পড়ে যায় মাটিতে। এই ঘটনাটা গণেশ পাইনের জীবনের দর্শন পালটে দেয়। তিনি ভাবলেন তাঁর কাছে যেই মূল্যবান বস্তু আছে, শিল্প, তাঁকে আঁকড়েই তিনি বাঁচবেন। তাঁর আর চাকরির দরকার নেই। এরপর তিনি আর কোনওদিন চাকরির দরখাস্ত লেখেননি।

গণেশ পাইন খুব একটা প্রদর্শনী করতে পছন্দ করতেন না। গ্রুপে দুটো তিনটে ছবি দিতেন ও ছবির উপর নিরাপত্তা পেতেন না। কেননা ছবি তেমন বিক্রি হয় না। ছবি এঁকে রোজগার করা ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি প্রথম একক প্রদর্শনী করেন ১৯৯০ সালে। গোটা ৭ কিংবা ৮টি একক প্রদর্শনী করেছিলেন, তাঁর মধ্যে বড় করে করা ১৯৯৮ সালে সিমা আর্ট গ্যালারীতে (‘Ganesh Pyne : A Retrospective 1952-1998’, Centre for International Modern Art (CIMA), Kolkata).

জীবনের শেষ দিকে তিনি মহাভারতের চরিত্রের উপর কিছু ছবি আঁকেন। ৭৬ বছর বয়সে, বিষাদ বিলাসী মুকুটে গণেশ পাইন ২০১৩-র ১২ মার্চ ইহলোক ত্যাগ করে অমরত্বের পথে যান।