ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

পুজো এলেই আমার সেই কিশোরীবেলার পুজোর খাওয়াদাওয়ার কথা খুব মনে পড়ে। পুজোর বাজার করতে গিয়ে বাইরের খাওয়া মানেই আগলহীন আনন্দ। দুষ্প্রাপ্য ফাস্ট ফুড ছিল আমাদের সময়ে বিশাল প্রাপ্তি।

ইন্দ্রমহলের ছোলে-ভাটুরে, র‍্যালিসের রঙিন সিরাপ আর ফালুদার যুগলবন্দীতে কুলফি মালাইতে জিভ দিলেই মনে হত পুজো এসে গেছে। কত রং সেখানে। কিন্তু আমাদের কোন নিষেধাজ্ঞা নেই সেই রঙের রঙ্গে।

পুজোর বাজার সেরে চা খেতে অনাদি কেবিন? সেখানকার স্পেশাল মোগলাই পরোটা ছাড়া পুজোর বাজার নৈব নৈব চ। কোনও বার দিলখুশা কেবিনের ফাউল কাটলেট। সন্ধের ঝুলে বাড়ী ফেরার পথে চাইনিজ রেস্তোরাঁ কারকো তে অথবা জিমিস কিচেনে। কলকাতা সবে চিনে খাবার শিখছে তখন।
পুজোর ভিড়ে আমাদের আর মফস্বল থেকে ‘কলকাতা’ যাওয়া হবে না তাই সেদিন সারাদিনের বাইরে খাওয়ার পেট চুক্তি।

ষষ্ঠীর দিনে মায়ের উপোষ। সেইসঙ্গে আমাদেরও। সেই ছুতোয় পুজোর সূচনায় আমাদের ঘটি বাড়ীর লুচির খোলা নিভত না। সকালের জলখাবারে লুচি বেগুণ ভাজা, দুপুরে লুচি, আলুরদম, ছোলার ডাল। রাতেও লুচি। উনুনের পিঠে লুচির ঝুড়ি। আমরা নিতাম আর খেতাম শুধু। তারপর দৌড়ে প্যন্ডেলে ছুটতাম।

সপ্তমীর দিন বাড়ীতে বিশেষ আমিষ পদের এলাহি আয়োজন। মাছের মাথা দিয়ে ভাজা মুগডাল, ফুলকপি দিয়ে ভেটকি মাছ , চিংড়ির মালাইকারী এই সব। বিকেলে ঠাকুর দেখে এসে পরোটা আলুর দম কিংবা ছোলা দেওয়া কুমড়োর ছক্কা। এখনকার মতো রোল বা চাউমিনের চল দেখিনি।

পুজোর অষ্টমীর দিন ভোর থেকে উঠে অঞ্জলির প্রস্তুতি । অতএব উপবাসের জোয়ারে বাড়িসুদ্ধ বলি হওয়া।
আবারো মন উচাটন। অঞ্জলির দিয়ে এসে কখন খাওয়া হবে ফুলকো লুচি, লম্বা বেগুণ ভাজা আর আলুর দম অথবা নারকেল কুচি দিয়ে ছোলার ডাল।

মা কে দেখতাম এক কড়া আলুর দম, এক প্রেশার কুকার ছোলার ডাল নামিয়ে রেখেই দিতেন সারাদিন উনুন পাড়ে। যে আসছে তাকেই গরম লুচি ভেজে তাই দিয়ে দিচ্ছেন সারাদিন ধরে ।
সারাদিনমান লুচি খেয়েও সেসময় অম্বলের আক্রমণ হত না। শরীরের গ্যাস্ট্রতন্ত্র তখন গ্যারেন্টি পিরিয়ডে। অতএব অন্ত্র তখনও অম্লের হানা বোঝে না।

নবমীর দিন একটু একটু করে মনখারাপ গ্রাস করতে না করতেই বাবা বাজারের থলি নামিয়ে রাখলেই কচি পাঁঠার ঝোলের আগাম সুঘ্রাণ যেন সব মনখারাপের অবসান ঘটিয়ে দিত। মায়ের হাতের সেই বড় বড় আলু দেওয়া মাংসের সাদামাটা লাল ঝোলের হুইসল বেজে উঠত। চিরকালই পাঁঠার নলি নিয়ে যখন কাড়াকাড়ি পড়ে তখন তুলতুলে মাংস সেই লাল তেলঝোলের মধ্যে ভাসমান। ফুরফুরে জুঁইফুলের ভাত বাগিচায় ঝোল নিচ্ছি আর খেয়েই চলেছি। এখন পুজোয় আর তেমন আমাপা খাওয়া আর হবেনা এ জীবনে। লাল মাংসের নিষেধাজ্ঞায় শরীর তন্ত্রও অবগত। সেও জেহাদ ঘোষণা করে বসে।

দশমীর দিনে ঠাকুমার হাতের বিরিয়ানির আয়োজন হবে ভাবলেই শিহরিত হই এখনো। বিশাল হাঁড়িতে করে চাল আর মাংস একত্রে সব মশলাপাতি ঘিয়ে ভেজে কষে মেপে আখনির জল দিয়ে দমে বসাতেন তিনি। আঙুলের মাপ ছিল ঠাম্মার। জলের ওপর থেকে চার আঙ্গুল মাপ। কি করে যে অমন সুন্দর ঝরঝরে বিরিয়ানি হত তার রহস্য একমাত্র ঠাম্মাই জানত।

দশমী এলেই মনে পড়ে যায় দুপুর থেকে কাঠের জ্বালে মায়ের দুধ ঘন করা । তলা লেগে যাওয়া ঘন দুধের গন্ধে ম ম করত ঘরবাড়ি। সেই সঙ্গে মায়ের এলোঝেলো, কুচো নিমকি, নারকেল নাড়ু আর চন্দ্রপুলি বানানো? ঠাম্মা আগেভাগে নাড়ু, চন্দ্রপুলি বানিয়ে তুলে রাখত কোজাগরী লক্ষীপুজোর জন্য আলাদা করে ।

আগের দিন রাতে ভেজানো মটর একটা পেল্লায় প্রেশারকুকারে সেদ্ধ করে নিয়ে একটা উনুনে ঘুগনি বসাত মা। ডুমো ডুমো করে আলু আর নারকোল কুচিয়ে রাখত। সরষের তেলে পিঁয়াজ ভেজে, আদা, রসুন বাটা দিয়ে কষিয়ে, টমেটো কুচি দিয়ে আলু, নারকেল দিত, সব শেষে সেদ্ধ মটর। সামান্য চিনি, নুন, হলুদ, লংকা গুঁড়ো আর নামানোর আগে বেশ খানিকটা তেঁতুলের ক্বাথ।
কেউ বিজয়া করতে এলে গরম ঘুগনির ওপরে জিরেভাজার গুঁড়ো ছড়িয়ে, ঝিরিঝিরি করে কাটা পেঁয়াজ, ধনেপাতা, লঙ্কাকুচি আর লেবুর রস দিয়ে সেই ঘুগনি পরিবেশন করা হত নিমকি আর নাড়ুর সঙ্গে । আখের গুড় জাল দিয়ে কড়াপাকের বাদামী নাড়ু হত। তার মধ্যে ছোট এলাচ আর এক ফোঁটা কর্পূরের গন্ধ যেন এখনো নাকে লেগে রয়েছে।

মামারবাড়িতে দিদিমার রান্নাঘরে সে এক হই হই কাণ্ড বিজয়ার দিনে। বিশাল রান্নাঘরের মধ্যে কয়লার উনুন জ্বলছে গাঁকগাঁক করে। কেউ কাঠের বার্কোশে কলাপাতা বিছিয়ে নারকেল কুরছে। উনুনে কালো লোহার কাড়াইতে দুধ ঘন হচ্ছে। নারকেল কোরা নিয়ে শিলে বাটতে বসেছে কেউ। দুধ আধা ঘন হয়ে এলে নারকেল বাটা দিয়ে যাচ্ছে একজন। আর দিদা বসে কাঠের খুন্তি দিয়ে দুধ আর নারকেল পাক দিচ্ছে। দুধের ক্ষীর আর নারকেল বাটার মিশ্রণটি মসৃণ করে এবং সমানভাবে মিশিয়ে দিয়েই চলেছেন তিনি। এবার ছোটএলাচের গুঁড়ো, চিনি, বড়এলাচের দানা আর কিশমিশ। সারাবাড়ি ম ম করছে চন্দ্রপুলির আগাম আগমনীবার্তায় বিজয়ায় মনখারাপ নিমেষে উধাও। চিনি পড়ল কড়াইতে। মনযোগ আর অধ্যাবসায় একাত্ম হয়ে ঘনীভূত হল
চিনি-নারকেল-ক্ষীরের সমুদ্রে। এবার অপেক্ষা। কড়াইয়ের গায়ে লাগালাগা গন্ধর জন্য। একটু বুঝি তলা ধরল। সোনার মতো চকচকে করে মাজা পেতলের পরাতে ঘি মাখিয়ে ঢালা হল চন্দ্রপুলির এহেন পুর। এবার গড়ার পালা। হাতের তেলোয় একফোঁটা ঘি মাখিয়ে তেলতেলে করে নেওয়া আর ছাঁচে ফেলে একে একে সুদৃশ্য চন্দ্রপুলি গড়ে ফেলা। মাথায় একটা করে বড় এলাচের দানা আর একটা করে কিশমিশ গুঁজে দেওয়া। ব্যাস্! এই চন্দ্রপুলি যেন শিল্প একটা। কোনটা অর্ধচন্দ্রের মত, কোনটা হরতনী, কোনটা কলকা, কোনটা আবার চৌকো। কাঠের ছাঁচ, কালো পাথরের ছাঁচ কত কি ছিল দিদার কাছে!

আমাদের আড়িয়াদহের বাড়িতে বিজয়া মানেই সিদ্ধির শরবত। দুধে ভেজানো কাঁচা চীনেবাদাম, পেস্তা, গোলমরিচ আর মৌরি একসাথে শিলে বেটে নেওয়া হত। আগের দিন রাতে ভিজিয়ে রাখা শুকনো সবজেটে সিদ্ধিপাতা শিলে পিষে নিয়ে বিশাল হাঁড়ির মধ্যে একসাথে সব মেশানো হত দুধের সঙ্গে। তারপর চিনি, ক্ষীরের পেঁড়া গুলে দেওয়া হত সেই মিশ্রণে। তবে ছোটদের জন্য ছিল রেশনিং। আমাদের বরাতে জুটত অতি সামান্য মহার্ঘ সেই শরবত আজকাল যার নাম ঠাণ্ডাই।