চণ্ডী মুখোপাধ্যায়

স্মৃতি আমার থাকার কথা নয়। কেননা তখন জন্মই হয়নি আমার। কিন্তু চলচ্চিত্র জগতের নানা নামিদামি ব্যক্তিত্বের লেখনীতে রয়েছে সেই আভাস। কীভাবে এক চলচ্চিত্র উৎসবের প্রভাবে পালটে গিয়েছিল বাংলা সিনেমার ক্লিশে জগৎ। ১৯৫২ সালের সেই উৎসবের প্রভাবেই বাংলা সিনেমা সাবালক হবার স্বপ্ন দেখেছিল। ১৯৯৫-তে কলকাতায় শুরু হল নিজস্ব চলচ্চিত্র উৎসব। এবার তার ২৫-এ পা। ফলে এবার যৌবনের স্পর্ধা নিয়েই সে উপস্থিত।

নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামের উদ্বোধন মঞ্চেও ছিল স্মৃতি। আন্ডি ম্যাকডোনাল্ড। অতীতে তার একটি ছবি তো কাঁপিয়েছিল কলকাতা শহর। সেক্স লাইজ অ্যান্ড ভিডিও টেপ। তখন এখানে তেমন ভাবে চালু হয়নি ইন্টারনেট বা ভিডিও সংস্কৃতি। ফলে নাম মাহাত্ম্যে নন্দনে মারকাটারি ভিড়। কিন্তু যে কারণে ভিড় তা কিছুই খুঁজে পান না দর্শকেরা। ছবিটি ছিল এক ক্লাসিক। অ্যাসেট নায়িকা ম্যাকডোনাল্ড-এর অসামান্য অভিনয়। সেই আন্ডি এবার উদ্বোধনী মঞ্চে। আরেক স্মৃতি– কলকাতায় এক চলচ্চিত্র উৎসবেই তো দেখানো হয়েছিল গুন্টার গ্রাসের উপন্যাস অবলম্বনে তোরি চলচ্চিত্র ‘টিন ড্রাম’।

সে ছবির পরিচালক ছিলেন ভলকার স্কলনডর্ফ। তিনিও তো এবার ‘কিফ-২৫’-এর মঞ্চে। অসুস্থতার জন্যে অমিতাভ শেষ মুহূর্তে আসতে পারেননি। কিন্তু তাতে কি উদ্বোধনের খুব একটা তাল কেটেছে? এবার শাহরুখ খানের পাশে ছিলেন মহারাজা সৌরভ গাঙ্গুলি এবং বাংলার মেয়ে রাখি। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠেও ছিল স্মৃতিময়তা। তাঁর দাবি যথার্থ। এবারের চলচ্চিত্র উৎসব সব অর্থেই সেরা।


স্বাধীনতার পর ফিল্ম ডিভিশনের উদ্যোগে ভারতে দেশবিদেশের চলচ্চিত্রের মেলা বসে ১৯৫২ সালে। পৃথিবীর নানা দেশ থেকে অত্যন্ত বাছাই করা ছবি এসেছিল সেই উৎসবে। বোম্বাইতে উৎসব হয়ে যাবার পর ভারতের প্রধান প্রধান শহরে এই উৎসবকে ঘোরানো হয়। কলকাতাতেও হয়েছিল। সেই প্রথম কলকাতায় সিনেমা উৎসব। কলকাতার অন্য ধারার চলচ্চিত্রকারেদের মধ্যে দারুণ প্রভাব ফেলেছিল ৫২-র এই চলচ্চিত্র মেলা।

সিনেমা হল ছাড়াও ইডেন গার্ডেন এবং ওয়েলিংটনের এক পার্কে বিশাল দর্শকদের সামনে দেশ বিদেশের সিনেমা দেখানো হয়। স্বয়ং সত্যজিৎ রায় এই উৎসব প্রসঙ্গে ১৯৮২ সালে এক স্মৃতিচারণে লেখেন, “১৯৫২সালে কলকাতায় যে আন্তর্জাতিক ফিল্মোৎসব হয়েছিল, তার তুলনায় পরের সব কটি ফিল্মোৎসবকেই বেশ ম্লান মনে হয়। সত্যি বলতে কী, এতগুলি ভাল ছবি একসঙ্গে পৃথিবীর কোনও দেশের কোনও উৎসবেই দেখানো হয়েছে কিনা সে বিষয়ে সন্দেহ আছে।”

শুধু সত্যজিৎ নন, পরবর্তীকালের আরও দুই বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক মৃণাল সেন এবং ঋত্বিক ঘটকের ওপরও বিশেষ করে প্রভাব ফেলেছিল এই ফিল্মোৎসব। বাংলা ছবির জগতে তৈরি হয়েছিল এক সমান্তরাল শৈল্পিক ধারা। আর এই ধারার পাইনীয়র ছিলেন সত্যজিৎ, ঋত্বিক এবং মৃণালই। এই উৎসবের দৌলতেই বাংলা ছবির পরিচালক কলাকুশলী এবং দর্শকেরা পরিচালকেরা পরিচিত হয়েছিলেন চলচ্চিত্রের এক নতুনতর ভাষার সঙ্গে। এই উৎসবেই দেখানো হয় ইটালি সিনেমার নব-বাস্তবতার পথিকৃৎ ভিক্টোরিয়া ডে সিকার ‘মিরাকেল ইন মিলান’, আকিরা কুরোশাওয়ার ‘রশোমন’, রসোলিনির ‘ওপেন সিটি রোম’, তাতির ‘জুর দ্য ফেত’।

সত্যজিৎ পথের পাঁচালী নির্মাণের অন্যতম অনুপ্রেরণা ডে সিকার ‘বাইসাইকেল থিফস’। যা তিনি দেখেছিলেন বিদেশ ভ্রমণকালে। তবে ৫২-র চলচিত্রোৎসবে আবার ডে সিকার অন্য ছবি দেখে ছবি তথা ‘পথের পাঁচালী’ নির্মাণে আরও বেশি করে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। তাছাড়া ৫২-র চলচ্চিত্রোৎসবে সাধারণ মানুষের তুমুল আগ্রহ দেখে সত্যজিতের বুঝতে পারেন ভাল ছবি দেখার ব্যাপারে এখানকার সাধারণ মানুষের যথেষ্ট আগ্রহ আছে। কিন্তু ভাল ছবির চাহিদা থাকলেও ভাল ছবির তেমন যোগান নেই এই বাংলায়। ভাল ছবির যোগান তৈরি করতে হবে।

সত্যজিৎ পাকাপাকিভাবে চলচ্চিত্র পরিচালক হবেন বলে ঠিক করে ফেললেন। সত্যজিৎ লিখছেন, “চলচ্চিত্র উৎসব শেষ হবার পর আর আমার মনে আর কোনও সংশ্রয় থেকে না যে আমি ছবিই তুলব। ‘পথের পাঁচালী’ হবে আমার প্রথম ছবি। ছবি যদি ভাল না হয় তো মাথা নিচু করে ফিরে যাব কিমারের কাছে। আর যদি উতরে যায় তো একটার পর একটা ছবি করে যাব।” বাংলার চলচ্চিত্রকারদের মধ্যে আমূল প্রভাব ফেলল এই চলচ্চিত্রোৎসব। শুধু সত্যজিৎ নয়, ঋত্বিক ঘটকও নেমে পড়লেন ছবি নির্মাণে। ১৯৫৩ সালে তৈরি হল ঋত্বিকের ‘নাগরিক’।

যদিও চজবিটি মুক্তি পায় ১৯৭৭সালে। এর আগেই অবশ্য সত্যজিৎ রায়, চিদানন্দ দাশগুপ্ত প্রমুখের উদ্যোগে কলকাতা ফিল্ম সোসাইটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেই সূত্রে বিদেশের কিছু কিছু ভাল ছবি এই ফিলম সোসাইটির সদস্যরা দেখার সুযোগ পাচ্ছেন। সেই সূত্রেই দেখানো হল আইজেনস্টাইনের ‘ব্যাটলশীপ পটেমকিন’। সিনেমা দুনিয়ার এই সাড়া জাগানো ছবিটি নিয়ে আলোচনাচক্র বসালো ফিলম সোসাইটি। প্রথম চলচ্চিত্র উৎসবের বছর তিনেক আগে থেকেই দেশ বিদেশের ছবি নিয়ে এক চলচ্চিত্র চর্চার পরিবেশ নির্মিত হচ্ছে কলকাতায়।

গণনাট্যের অনেক শিল্পীই সিনেমা শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছেন। ঋত্বিক ঘটকও তো গণনাট্য থেকেই ক্রমে সিনেমা আগ্রহী হয়ে উঠলেন। কলকাতায় প্রথম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব হবার বছর দুয়েক আগেই ১৯৫০ সালে ছবি করার জন্যে কলকাতায় আসেন বিখ্যাত ফরাসি চলচ্চিত্র পরিচালক জঁ রেনোয়া। বাংলার পটভূমিতে তৈরি ছবির নাম ‘দি রিভার’। দি স্টেটসম্যান পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে রেনোয়া জানালেন তার ছবিতে কাজ করতে যারা আগ্রহী তারা গ্রেট ইস্টার্ন হোটেলে রেনোয়ার সঙ্গে দেখা করতে পারেন। এই বিজ্ঞাপনের সূত্র ধরে সত্যজিৎ কাজ করার জন্যে নয় রিনোয়ার সঙ্গে সঙ্গে মুখোমুখি দেখা করার জন্যেই গেলেন।

চলচ্চিত্র নিয়েই কথা হল দুজনের মধ্যে। সরাসরি ছবির সঙ্গে জড়িয়ে না পড়লেও লোকেশন নির্বাচনে সারাক্ষণ রেনোয়ার সঙ্গে রইলেন সত্যজিৎ। ছবির শুটিঙয়েও মাঝেমধ্যেই অবসরভার হিসেবে উপস্থিত থাকতেন তিনি। বিদেশে ডি সিকার ‘বাইসাইকেল থিফস’ দেখে যেমন অভিজ্ঞতা ছবি নির্মাণের এক নতুন পথ খুঁজে পান তিনি, তেমনি রেনোয়ায় ‘দি রিভার’ ছবির শুটিং থেকে ছবি তৈরির বাস্তব অভিজ্ঞতা হল। রেনোয়ার সঙ্গে সরাসরি কাজ করলেন বংশী চন্দ্র গুপ্ত এবং সুব্রত মিত্র। যারা পরে ‘পথের পাঁচালী’ ছবির যথাক্রেমে শিল্প নির্দেশক এবং আলোকচিত্রী হিসেবে কাজ করেন।

ক্যালকাটা ফিলম সোসাইটি-র সুবাদে রেনোয়ার সঙ্গে আলাপচারিতার সুযোগ হয় কলকাতার চলচ্চিত্র আগ্রহীদের। বাংলায় শুটিং হওয়া জঁ রেনোয়ার ‘দি রিভার’ ছবিটিও দেখানো হল কলকাতায় প্রথম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে। এখান থেকেও এক ধরনের অভিজ্ঞতা পেলেন কলকাতার চলচ্চিত্রকারেরা। ঋত্বিক বা মৃণালও বলেন সেই উৎসব থেকে তাঁরা শিখেছেন অনেক।

ব্যক্তিগত স্তরে যে স্মৃতি তাতেও তো রয়েছে নানা মণিমাণিক্য। ১৯৯৫ সালে কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব শুরু হবার ঠিক আগের বছর, ১৯৯৪ সালের চলচ্চিত্র উৎসবে কলকাতায় এলেন প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার মাইকেলঞ্জেলো আন্তনিয়নি। এর আগে অবশ্য তিনি ভারতে এসেছেন– ১৯৭৭সালে। কলকাতায় এই প্রথম। কলকাতার চলচ্চিত্র আগ্রহীদের কাছে ভীষণ কাছের পরিচালক। তার বিখ্যাত তিন ছবি ‘ব্লো আপ’, ‘জারবিস্কি পয়েন্ট’, এবং ‘প্যাসেঞ্জার’ বাণিজ্যিকভাবেই মুক্তি পেয়েছে। আরও কিছু ছবি যেমন ‘লা নত্তে’, লা আভেঞ্চুরা প্রমুখ আরও বেশ কিছু ছবি বাংলার দর্শক দেখে নিয়েছে ফিলম সোসাইটি সার্কিটে।

এই বিশ্ববরেণ্য পরিচালক কলকাতায় আসার আগেই কলকাতার মানুষের প্রিয় হয়ে উঠেছেন। তাই স্বাভাবিক ভাবেই তাঁকে ঘিরে এক অন্য ক্রেজ। কলকাতায় নেমে তিনি তাজ হোটেলে উঠলেন। এই হোটেলে খুব স্বাভাবিক কারণেই সাংবাদিকদের ভিড়। এই প্রতিবেদকও তখন কলকাতার এক প্রথম সারির দৈনিক পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত। সব সাংবাদিকদের একটাই চেষ্টা কি করে আন্তনিয়নির একান্ত সাক্ষাৎকার পাওয়া যায়। কিন্তু আন্তনিয়নির মুখোমুখি হবার অভিজ্ঞতাটা খুব সুখের হল না। শুনেছিলাম আন্তনিয়নি বেশ অসুস্থ।

কিন্তু তাঁর অসুস্থতা যে এতদূর সেটা জানতে পারিনি। তিনি এখন মূলত হুইলচেয়ারেই বন্দি। কথা বলার শক্তি হারিয়েছেন। কিন্তু যেটা তার রয়ে গেছে তা হল চলচ্চিত্র-মেধা। সেই সময় আন্তনিয়নির সঙ্গে ছিলেন তাঁর তৎকালীন বান্ধবী পরবর্তীকালের স্ত্রী এনরিকা। কলকাতা থেকে ফিরে গিয়ে এনরিকাকে বিবাহ করেন তিনি। সাইন লাঙ্গুয়েজে তখন কথা বলতেন আন্তনিয়নি। সেই ভাষা একমাত্র বুঝত এনরিকাই। আন্তনিয়নির কাছে সাংবাদিকদের প্রশ্ন ব্যাখ্যা করত সে, আবার আন্তনিয়নির উত্তর সাংবাদিকদের কাছে ব্যাখ্যা করে দিত সেই।

আগেই বলেছি চলচ্চিত্রই একমাত্র ধ্যানজ্ঞান আন্তনিয়নির। তাঁকে একবার প্রশ্ন করা হয় যেখানে চলচ্চিত্রের কোনও অস্তিত্ব নেই এমন এক জায়গায় যদি নির্বাসন দেওয়া যায় তাহলে তিনি কি করবেন? আন্তনিয়নির উত্তর, “সেখানে গিয়ে চলচ্চিত্রই বানাব”। সঙ্গিনীর সহায়তায় চলচ্চিত্র উৎসব চলাকালীন সারা নন্দন চত্বর ঘুরে বেড়াতেন তিনি। সেবার ছিল আন্তনিয়নির সাতখানা ছবির এক প্যাকেজ। তার মধ্যে ছিল অসুস্থ হবার আগে ১৯৮২ সালে তৈরি ছবি ‘আইডেন্টিফিকেশন অফ আ উয়োম্যান’। এটিই তখনও অবধি তাঁর শেষ ছবি। কলকাতা থেকে ফিরে গিয়ে তিনি নতুন ছবিতে হাত দেন-‘বিয়োন্ড দ্য ক্লাউড’। আরেক প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক উইম উন্ডেডার তাঁকে এই চলচ্চিত্র নির্মাণে সক্রিয় ভাবে সাহায্য করেন।


এর বছর দুয়েক আগে ১৯৮২-তে চলচ্চিত্র উৎসবে ছিল আরেক সিনেমা কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবে এল ফরাসি সিনেমার কালাপাহাড় ফরাসি সিনেমার নবতরঙ্গের প্রাণপুরুষ জঁ লুক গোদারের এক ঝাঁক ছবি। ঘোষণা হবার সঙ্গে সঙ্গে কলকাতায় গোদার জ্বর। আগের দিন মাঝ রাত থেকে গোদারের ছবির টিকিট জোগারের জন্যে সোসাইটি সিনেমায় বিশাল লাইন। কিন্তু উৎসব শুরু হবার পর কলকাটা আবিষ্কার করল অন্য এক পরিচালকে। ইলমাজ গুনে। তুর্কির এই পরিচালকের বেশ কিছু ছবি দেখে মুগ্ধ হয়ে গেল কলকাতা।সেই উৎসবের আরেক আকর্ষণ ছিল। চিত্র সমালোচক জে. হোবারম্যন এই তুরস্কের খ্যাতিমান চলচ্চিত্রকার ইলমাজ গু’নে সম্পর্কে বলেছিলেন, “Something like Clint Eastwood, James Dean, and Che Guevara combined”.

তুরস্কের রূপালি পর্দার জনপ্রিয় এই তারকা সত্তর দশকে একজন রাজনৈতিকভাবে সচেতন মানবিক চলচ্চিত্রকার হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করলেন। মার্ক্সীয় রাজনৈতিক আদর্শে উদ্বুদ্ধ, সুপারস্টার ইমেজ, ব্যক্তিগত জীবনে হত্যার দায়ে সাজাপ্রাপ্ত আসামী আবার সার্থক সংগ্রামী চলচ্চিত্র নির্মাতা– ইলমাজ গু’নে চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একজন বিরল ব্যক্তিত্ব। এই উৎসবে আরেকজন মুগ্ধ করেছিল- ইয়াঞ্চো। হাঙ্গেরীর এই পরিচালক ভারতে প্রায় অচেনাই ছিলেন। এই উৎসবের দৌলতে তাকে চিনল ভারতের চলচ্চিত্র দর্শকেরা।

কেন্দ্রীয় সরকার আয়োজিত ভারতের প্রধান প্রধান চলচ্চিত্র উৎসবগুলো যখন বিশ্ব চলচ্চিত্রের প্রতি ক্রমশ আগ্রহ বাড়িয়ে তুলছে, তখন পশ্চিমবঙ্গ সরকার পরিকল্পনা করল এমন এক চলচ্চিত্র কমপ্লেক্সের যেখানে এক ছাদের তলায় থাকবে অনেকগুলো সিনেমা হল, সেমিলার কক্ষ, চলচ্চিত্র লাইব্রেরি। নন্দন, পশ্চিমবঙ্গ চলচ্চিত্র কেন্দ্র  হয়ে উঠল এমন এক সরকারি প্রেক্ষাগৃহ ও চলচ্চিত্র উৎকর্ষ কেন্দ্র।

পশ্চিমবঙ্গের চলচ্চিত্র শিল্পের বিকাশ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে চলচ্চিত্র-সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দ্যেশ্যে ১৯৮৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর পশ্চিমবঙ্গ সরকার কর্তৃক নন্দন প্রতিষ্ঠিত হয়। নন্দনের সুদৃশ্য স্থাপত্যবিশিষ্ট ভবনটির দ্বারোদঘাটন করেছিলেন বিশিষ্ট চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায়। নন্দনের প্রতীকচিহ্নটিও তিনিই অঙ্কন করেন। কলকাতার অন্যতম প্রধান সংস্কৃতি কেন্দ্র নন্দন বর্তমানে শুধুমাত্র কলকাতা শহরই নয়, বরং সমগ্র পূর্ব ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় চলচ্চিত্র কেন্দ্র।‘নন্দন’ নকশা ও নির্মাণ পরিকল্পক ছিলেন বিখ্যাত স্থপতিকার অমিতাভ দাশগুপ্ত।


৮২-এর পর ৯০। নানা শহর ঘুরে দীর্ঘ আট বছর পর কলকাতায় আবার চলচ্চিত্র উৎসব এল। নজরুল মঞ্চে উদ্বোধন করলেন স্বয়ং সত্যজিৎ। উদ্বোধনের দিনই দেখা গেল গ্রিসের পরিচালক থিও আঞ্জেলোপুলিশের ‘ল্যান্ডস্কেপ ইন দ্য মিস্ট’। দুই ভাই বোনের গল্প। এ যেন গ্রীসের আরেক ‘পথের পাঁচালী’। এই উৎসবেই তো দেখলাম শোহেই ইমামুরার ‘ব্ল্যাক রেন’। মুগ্ধটার শুরু। একের পর এক। ৮০-র চলচ্চিত্র উৎসবে যেমন বাংলার দর্শকরা আবিষ্কার করে ইলমাজ গুনেকে ৯০-এর চলচ্চিত্র উৎসবে তেমনি তাভিয়ানি ব্রাদার্স-পাওলো এবং ভিট্রোরিও তাভিয়ানি ৮২-এর উৎসবে অবশ্যই সেরা ছবি ‘মেফিস্টো’। তেমনই ৯০-এ ত্রিস্তফ কিওসলস্কির ‘আ শট ফিল্ম আবাউট লাভ’ এবং ‘আ শট ফিলম আবাউট কিলিং’।

পাবলিক ডিম্যান্ড। বছর দুয়েকের মধ্যে আবার কলকাতায় ফিল্ম উৎসব। এবারও কিওসলস্কির ‘থ্রি কালার্স ব্লু’ মুগ্ধ করে দিল।এই উৎসবেই তো আবার দেখলাম ফেদেরিকো ফেলিনির লা দোলচে ভিতা, কুরোশাওয়ার ‘মাদাদেও’ কলকাতা প্রথম দেখল। এই রকম আরও অনেক চলচ্চিত্র মুগ্ধতা।

আর নয় দিল্লির দিকে চেয়ে থাকা। ‘নন্দন’ তৈরির দশ বছরের মাথাতেই পশ্চিমবঙ্গ সকারের সিদ্ধান্ত এবার তাঁরা নিজেরাই করবে ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল। ৮৩ থেকেই প্রস্তুতিপর্ব। ৮৫-তে প্রথম স্বাধীনভাবে রাজ্যে শুরু হল আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব। বলা ভাল ফেস্টিভ্যাল অফ দ্য ফেস্টিভ্যাল। ভেনিস কান বার্লিন প্রমুখ চলচ্চিত্র উৎসব থেকে সেরা ছবি বাছাই করে এনে এক ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল। সত্যজিৎ রায় নন্দনকে কেন্দ্র করে এইরকম এক চলচ্চিত্র উৎসবের কথাই ভেবেছিলেন। তার মনে করতেন, “আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের যেটি সবচেয়ে মূল্যবান কাজ-অর্থাৎ দেশ-বিদেশের চলচ্চিত্রকারদের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের একটি সুযোগ করে দেওয়া-সেটা মনে হয় নানান বিশৃঙ্খলা সত্ত্বেও অটুট থাকবে।” সেই সূত্র ধরেই এই কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবের আয়োজন। শুধু বিদেশের স্বদেশের নানা রাজ্যের ছবি ও চলচ্চিত্রকারেদেরও যেন এল মিলন মেলা এই চলচ্চিত্র উৎসব।

রাজ্যে পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে চলচ্চিত্র উৎসবের মেজাজ পাল্টাল। নতুন সরকার এই চলচ্চিত্র উৎসবকে ছড়িয়ে দিলেন সাধারণ মানুষের মধ্যে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান আর ‘নন্দন’-এ সীমিত সংখ্যক নয় বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে নয়, বরং নয়ে যাওয়া হল নেতাজি ইন্দোর স্টেডিয়ামে- অগুনতি সাধারণ মানুষের মধ্যে। উৎসব হয়ে ইন্টেলেকচুয়াল কালচার থেকে সরে হয়ে উঠল পপুলিস্ট কালচার।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মঞ্চে এলেন বোম্বাই মাদ্রাজের জনপ্রিয় তারকারা। অমিতাভ বচ্চন, শাহরুখ খান, কমল হাসান, মিঠুন চক্রবর্তী প্রমুখেরা। এই জনপ্রিয় সংস্কৃতি আবহাওয়ার মধ্যেই পৃথিবীর সেরা ছবিগুলো দেখার সুযোগ পেল বাংলার দর্শকেরা। যেমন একের পর এক গোদারের সাম্প্রতিক ছবিগুলো তো দেখার সুযোগ হল এই উৎসবেতেই। পাশাপাশি এই উৎসব এখন প্রতিযোগিতামূলকও। কুক্ষিগত বুদ্ধিজীবী সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ল মাঠে ময়দানে। এবার চলচ্চিত্র উৎসব ২৫। দেশ বিদেশের সেরা ছবির মেলা।