পূর্ণেন্দু দে

পিপহোল-এর কাজ শুরু করার কয়েক মাস আগেই আমার মাথাই টুকরো টুকরো ভাবে ভাবনাগুলি আসতে থাকে। তারপর নানা পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে ধীরে ধীরে এই ছবির গল্পটি একটি অবয়ব পায়। এমনকি শুটিং চলাকালীনও প্রয়োজনের সঙ্গে আপোষ করতে তাৎক্ষণিক কিছু পরিবর্তন আনতে হয়েছে গল্পের স্বার্থে। কি রয়েছে পিপহোল-এর গল্পে? আসলে আমরা জানি যে, বর্তমান ব্যবস্থায় যে কোন শহরে একটি স্বাধীনচেতা-– আধুনিকা মেয়ের পক্ষে থাকার জন্য একটি ঘর খুঁজে পাওয়া কতটা দুঃসাধ্য! যদিও গল্পের নায়িকা বহু চেষ্টায় তার প্রেমিকের সহযোগিতায় একটি ঘর খুঁজে পায়। সুসজ্জিত পরিপাটি একটি ঘর। সে বোধহয় এমনই একটা ঘর খুঁজছিল। প্রথম দর্শনেই ঘরটি তার ভীষণ পছন্দ হয়। সে ভেবেছিল ঘরটি তার পক্ষে নিরাপদ এবং একেবারেই ঠিকঠাক। তার এই নির্বাচন কি সঠিক ছিল? একদিকে বাইরের ধোপ্ দুরস্ত ব্যস্ত শহুরে জীবন, অপরদিকে ইঁট-কাঠ-পাথরে তৈরী ফ্লাটের শক্ত নিরুদ্ধ দরজার অন্তরালে লুকিয়ে থাকা অন্য এক কাহিনি। এখান থেকেই বাঁক নিতে থাকে গল্পটি। একলা নায়িকার পক্ষে সেখানে বসবাস করা কি ঝুঁকি হয়ে উঠেছিল? ঠিক কি হয়েছিল তার সঙ্গে? এটা আমার দর্শক বন্ধুদের কাছে আপাতত কৌতুহল হিসাবে থাকুক।

পিপহোল-এর সঙ্গে যুক্ত প্রতিটি সদস্য বন্ধুর ঐকান্তিক চেষ্টায় আমরা চারদিন ব্যাপি শুটিং এর কাজ শেষ করি। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। এই অপেক্ষা শুধু আমার একার নয়, সমগ্র টিমের। যে উত্তেজনাপূর্ণ অনুভূতি নিয়ে আমি কাজ শুরু করেছিলাম সে উত্তেজনা সংক্রমিত হয়েছে সকল টিম মেম্বারদের মধ্যে। এক কথায় আমরা সবাই এখন উদগ্রীব।

অনেকেই আমার অতীতের কাজগুলি দেখে মনে করেন এবং অনেকক্ষেত্রে প্রশ্ন করেন যে, আমার কাজের মধ্যে নাকি অন্ধকার প্রবণতা থাকে। কথাটা একেবারে অসত্য নয়। যদিও আমার এর আগের ছবি ‘বাস্তুর খোঁজে’-তে এর ব্যতিক্রম রয়েছে বলে আমি মনে করি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে অন্ধকার আমাদের কাছে অবহেলিত। কারণ অন্ধকার নিরাপদ নয়– এটাই হইতো সকলে মনে করে। কিন্তু আমি মনে করি আলোর থেকে অন্ধকার বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বীজের অন্ধকারে লুকিয়ে থাকে প্রাণের স্পন্দন, যা কিনা অংকুর হিসাবে বহিঃপ্রকাশ হয়ে একদিন শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে মহীরূহ হয়। আবার মাতৃজঠরের কুঞ্চিত অন্ধকারে নিরাপদ-নিশ্চিন্তে থাকা শিশুটি অপেক্ষা করে আলোর পথগামী হতে। অর্থাৎ অন্ধকার থেকেই আলো। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বলেছেন–
“অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত আলো
সেইতো তোমার আলো”।
সেই অন্ধকারকে ভুলে গেলে চলবে না। আমাদের বিশ্ব সংসারেও রয়েছে ব্ল্যাকহোল তত্ত্ব। আবার পৃথিবীর কেন্দ্রেও অন্ধকার। তবে এই অন্ধকার থেকেই আমরা আলোর অভিমুখে ধাবিত হই, যেটা আমার ছবিতেও রয়েছে। মনের গভীর অন্ধকারে যে ক্রিয়া চলে আমরা সেখান থেকেই শক্তি সঞ্চয়ই করি বাইরের জগতের জন্য। তাই পিপহোল-এর পশ্চাৎ ও সম্মুখে টিকে থাকার নামই হল জীবন।

পিপহোল-এর মুখ্য চরিত্রে রয়েছেন রুচিকা চক্রবর্তী ও যুধাজিৎ সরকার। অসাধারণ কাজ করেছেন দু’জনেই। অনিকেত হালদার ও শুভারতী পালের অভিনয়ও চোখে পড়ার মত। এই ছবিতে আমার বাড়তি পাওনা সৌরভ দাসকে। জার তুলির ছোঁয়াই প্রাণবন্ত হতে চলেছে ছবির ফ্রেমগুলি। এছাড়া অভি চক্রবর্তী, কুশল সিনহা রায়, চিরঞ্জিৎ বিশ্বাস, রবিশংকর চৌধুরী, অস্মিতা গুপ্ত, স্নেহা মণ্ডল চট্টোপাধ্যায়, দেবজিৎ বাগচী, শ্রীমন্ত বোস, দেবজ্যোতি গাঙ্গুলী, কুমকুম চ্যাটার্জী, রাহুল তালুকদার, সৌমেন চক্রবর্তী, গার্গী ঘোষ সহ অন্যান্যদের আন্তরিক প্রচেষ্টা ও ঐকান্তিক সহযোগিতায় পিপহোল ভাবনার অন্ধকার থেকে মুক্তির আলো দেখতে চলেছে। আমার পক্ষ থেকে এই ছবির টিম মেম্বারদের জানাই রূপোলি অভিনন্দন। আশা করি এই বছরের শেষ বা ২০১৯-এর শুরুতেই আমাদের ছবির ফেস্টিভ্যাল রিলিস সম্ভব হবে। আপনাদের শুভকামনা ও ভালবাসা আমাদের এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে।

ছবি: গার্গী ঘোষ