অ্যালবার্ট অশোক

এলেইন ম্যারি ডি কুনিং (Elaine Marie Catherine de Kooning) তাঁর জন্মের সময় নাম ছিল Elaine Marie Catherine Fried. তিনি আমেরিকার মহিলা অ্যাবস্ট্রাক্ট এক্সপ্রেসনিস্টদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য শিল্পী। এবং বিখ্যাত। তিনি ১৯১৮ (২০) সালে জন্মান নিউইয়র্কের ফ্লাটবুশ (in Flatbush, New York/ Sheepshead Bay, Brooklyn) নামক স্থানে; তার মা আইরিশ ক্যাথলিক ম্যারি এলেন ও’ব্রায়েন, বাবা প্রোটেস্টান্ট ইহুদি রক্তের চার্লস ফ্রাঙ্ক ফ্রায়েড। এলেইন চার ভাইবোনের সবার বড়। তাঁর মা এলেইন যখন ৫ বছরের, তখন থেকেই মিউজিয়ামে নিয়ে যেতেন, ছবি আঁকা শেখান, এলেইনের ঘর সুন্দর করে সাজিয়ে দিতেন, ভাল ছবি প্রিন্ট করে দেওয়ালে আটকে দিতেন।

একটু বড় হলে, প্রাথমিক স্কুলে পড়ার সময় থেকেই তার সহপাঠী বন্ধুদের পোর্ট্রেট করে দিতেন, আবার বিক্রিও করতেন। তিনি খেলাধুলায়ও ছবি আঁকার মত ভাল করতেন। হাই স্কুল থেকে স্নাতক হবার পর, নিউইয়র্কের হান্টার কলেজে ভর্তি হন সেখানে কিছু অ্যাবস্ট্রাক্ট ও সোশ্যাল রিয়েলিস্ট পেইন্টারের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়। ১৯৩৭ সালে নিউইয়র্কের লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি আর্ট স্কুল ও আমেরিকান আর্টিস্ট স্কুল আর্ট নিয়ে ভর্তি হন। আর্ট কোর্স করার সময় থেকেই তিনি অনেক শিল্পীদের মডেল হিসাবে রোজগার শুরু করেন।

১৯৩৮ সালে এলেইনের এক শিক্ষক ম্যানহাটানের এক ক্যাফেটেরিয়াতে শিল্পী উইলেম ডি কুনিং-এর সঙ্গে পরিচয় করে দেন। এলেইনের বয়েস তখন ২০ আর উইলেমের বয়স ৩৪। এলেইন আগেই উইলেমের কাজ ছবি দেখেছিলেন, এবং ফ্যান হয়ে গেছিলেন। ফলে উইলেমের কাছে ছবি নিয়ে ক্যারিয়ার বানাতে ইচ্ছুক হন। উইলেমের বাড়ি কাম স্টুডিও ছিল 143 West 21st Street-এ। এলেইনের ছবি চর্চা উইলেম কড়া মনোভাবে এগিয়ে নিয়ে যান।

একই ছবি পারফেকশনের জন্য বার বার করতে দিতেন, কখনও রেগে ছিঁড়ে ফেলতেন। এলেইনের অনেক ছবি উইলেম শিক্ষক হিসাবে নষ্ট করে দেন। এলেইন তবু উইলেমের কাছেই থেকে যান, উইলেমের হাতের পুতুলের মত। (sternly requiring that she draw and redraw a figure or still life and insisting on fine, accurate, clear linear definition supported by precisely modulated shading. He even destroyed many of her drawings, but this impelled Elaine to strive for both precision and grace in her work) তাঁদের ৫ বছর প্রেমও এমন চলার পর ১৯৪৩ এ উইলেমকে বিয়ে করেন। হয়ে যান এলেইন ডি কুনিং।

তাঁদের বিয়েটা ছিল খোলাখুলি বিয়ে, যাকে বলে ওপেন ম্যারেজ। অর্থাৎ কেউ কারুর প্রতি দায়বদ্ধ নয়। যে যা খুশি করতে পারে। উইলেমের কয়েকজন মহিলা ভক্ত ছিল, যাদের সঙ্গে তাঁর যৌন সম্পর্ক ছিল। আর এলেইনের ছিল অগুনতি পুরুষ, যাদের সঙ্গে তিনি তার খেয়াল খুশি মতো যৌন সম্পর্ক করতেন।

আমাদের পৃথিবী হল পেশীর ক্ষমতার। ফলে নারী কর্তা ব্যক্তি হয়ে উঠেনি। পুরুষ সমাজ, রাষ্ট্র ও নিজের পরিবারের কর্তা ব্যক্তি। এছাড়া নারীর যৌনতা নেতিবাচক, সে নিস্ক্রিয়ভাবে যৌন উপভোগ করে। পুরুষের মত আগ্রাসী নয়। ফলে পুরুষ যদি তার স্ত্রীবাদে কোন কম পরিচিত/ পরিচিত মহিলার সঙ্গে যৌন সহবাস করে সেটা বীরত্বের সঙ্গে দেখা হয়। আর নারী যদি তার স্বামী বাদে অন্য কোন পুরুষের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক করে সেটা নিন্দনীয় দেখা হয়। এলেইন এই ভাবনাটা উলটে দিয়েছেন। তাঁর কাছে হল পুরুষ একটা ‘সেক্স অবজেক্ট’। ফলে পুরুষকে ব্যবহার করে তিনি বীরত্ব অনুভব করতেন।

তাঁর জীবনে তিনি শিল্পী ও মডেল, এবং একজন শিল্প সমালোচক হয়ে সমাজের উপরের তলার বহু ক্ষমতাশালী পুরুষকে বিছানায় নিয়ে গেছেন ও তাঁদের ব্যবহার করেছেন নিজের স্বার্থে। বিশেষ করে তার স্বামী উইলেমের কেরিয়ারে, তাঁর ছবির প্রচার, মিডিয়ার লোক ও গ্যালারীর মালিক বা ছবির বিক্রির লোকদের তিনি বেশি পছন্দ করতেন ও বিছানায় নিয়ে যেতেন। যদিও তিনি নিজেও একজন শিল্পী ছিলেন। (Mrs. de Kooning slept primarily with men who would advance her husband’s career. Elaine’s lovers included Harold Rosenberg, the influential art critic, Tom Hess, the trend-setting editor of Art News, and Charles Egan, a leading New York gallery owner. By sleeping with these men Elaine ensured that her husband was crowned the king of Abstract Expressionism.) যারা এলেইনের জীবনী গ্রন্থ লিখেছেন তাঁদের মধ্যে লি হল (Lee Hall) বলেছেন, (Elaine and Bill, Portrait of a Marriage: The Lives of Willem and Elaine De Kooning.) এলেইনের জীবন খুবই বিতর্কিত ও ভাবনা তপ্ত করার মতো।

তখনকার দিনে Artnews ম্যাগাজিন খুবই বিখ্যাত, নবীন প্রবীণ শিল্পীদের প্রদর্শনীর আলোচনা সমালোচনা থাকত। ১৯৪৮ সালে, এলেইন সেই পত্রিকাতে ১০০-র অধিক বিখ্যাত ও অপরিচিত শিল্পীর সমালোচনা লিখেছিলেন। তাঁর লেখার দৌলতে বহু শিল্পী তার সঙ্গে পরিচয় রাখতেন। ১৯৫০ সালে তিনিই প্রথম মহিলা শিল্প সমালোচক যার খ্যাতি শীর্ষে উঠেছিল। এছাড়া তিনি আর্ট স্কুলের শিক্ষকতাও করাতেন।

আমেরিকার বহু বড় বড় ইউনিভার্সিটিতে শিল্প শিক্ষক হিসাবে নিযুক্ত ছিলেন। (University of New Mexico in Albuquerque; the University of California in Davis; at Carnegie Mellon, at Southampton College on Long Island; at the Cooper Union and Pratt Institute in New York; at Yale; at RISD in Rhode Island; Bard College; the University of Georgia and the New York Studio School in Paris. Between 1976 and 1978, she served as the first Lamar Dodd Visiting Professor of Art at the University of Georgia (UGA) in Athens. In 1985 she was elected into the National Academy of Design as an Associate member, and became a full academician in 1988. ) সমস্ত কিছু করার পর তিনি নিজেকে একজন শিল্পী ভাবতেন। তিনি বহু প্রদর্শনী করেন।

তাঁকে ১২জন আমেরিকার মহিলা ‘Women of Abstract Expressionism’ শিল্পীদের মধ্যে ধরা হয়। পেইন্টিং ছিল তাঁর কাছে একটা ক্রিয়াপদ, বিশেষ্য নয়, তিনি পেইন্টিংকে একটা ঘটনা হিসাবে দেখতেন তারপর এটাকে ছবি ভাবতেন (A painting to me is primarily a verb, not a noun, an event first and only secondarily an image)

১৯৫১ সালে Sidney Janis Gallery-তে শিল্পী ও তাঁদের বৌদের এক শিল্প প্রদর্শনী হয়। বহু নামী শিল্পী (Jackson Pollock and Lee Krasner, Ben Nicholson and Barbara Hepworth, and Jean Arp and Sophie Taeuber-Arp) ছিলেন। এলেইন তাতে অংশ নিয়েছিলেন কিন্তু পরে বলেছেন এভাবে মেয়েদের তার স্বামীর নামে জুড়ে তুলে ধরা ঠিক নয়। মেয়েরা নিজেদের নামে নিজেদের ছবি নিয়ে দাঁড়াক।

১৯৫২ সালে এলেইনের প্রথম একক প্রদর্শনী হয় at Art dealer Leo Castelli’s house at The Hamptons. উইলেমের এক মিস্ট্রেস ছিল নাম জোয়ান ওয়ার্ড (Joan Ward), তিনি একজন ইলাস্ট্রেটর ছিলেন, তাঁর সঙ্গে যৌনসহবাসের ফলে উইলেমের এক কন্যা হয়, নাম লিসা ডি কুনিং। এলেইনের নিজের কোন সন্তান ছিল না। এলেইন ও উইলেম দুজনেই খুব মদ খেতেন, দুজনেই দুজনার সঙ্গে তুমুল ঝগড়া করতেন। এইভাবেই চলছিল জীবন। অশান্তি বাড়তে বাড়তে ১৯৫৭ সালে এলেইন ও উইলেম দুজন ছাড়াছাড়ি করে আলাদা থাকতে দুজন দুদিকে চলে যান। ডিভোর্স করেননি। ২০ বছর পর ১৯৭৬ সালে আবার দুজন পরস্পরের কাছে ফিরে এলেন।

এলেইনের আঁকা ছবির অনেক বৈশিষ্ট ছিল। তিনি উইলেমের একটা পোর্ট্রেট আঁকেন চোখ মুখ ছাড়া একটা ছবি। তার বক্তব্য ছিল, মানুষের মুখ আঁকলে লোকে পুরো ছবি দেখে না। পুরো ছবিতে অন্য রকম তাৎপর্যও থাকতে পারে। তার ৪০ বছর শিল্পী জীবনে তিনি বহু সাবজেক্ট নিয়ে ছবি আঁকেন (from bulls and basketball players to cave paintings and Bacchus statues) কিন্তু পোর্ট্রেট আঁকা ছিল তার খুশি। আর পুরুষের ছবি, আগেকার দিনে মহিলা শিল্পীরা মহিলাদের ছবিই আঁকত, যেমন: Élisabeth Vigée-Le Brun, Mary Cassatt, এলেইন পুরুষের ছবি শুরু করেন।

তাঁর কাছে বডি ল্যাঙ্গুয়েজ হল ছবির আসল বিষয়। তিনি কবি Frank O’Hara র একটা পোর্ট্রেট করেন, প্রথমে মুখ চোখ দিয়ে আঁকেন পরে মুখটা মুছে দেন, তাতে ফ্রাঙ্কের আসল পোর্ট্রেট ধরা পড়েছে। তাঁর কাছে একটা মানুষের পোর্ট্রেট তাঁর বডি ল্যাংগুয়েজে। আমরা দূরে কোন পরিচিত লোক হেঁটে চলে গেলে, মুখ না দেখেও তাঁর চলন দেখে বলতে পারি– কে সেই লোক। তিনি বলতেন পুরুষরা বিপরীত লিঙ্গের মানুষ আঁকতে ভালবাসে, অর্থাৎ মহিলা আঁকতে ভালবাসে, তিনি ও বিপরীত লিঙ্গের মানুষ, অর্থাৎ পুরুষের ছবি আঁকতে ভালবাসেন। তিনি পুরুষকে সেক্স অবজেক্ট হিসাবে ছবিতে দেখাতে ভালবাসতেন।

আমেরিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি এলেইনের পোর্ট্রেটের সুনাম শুনে তাকে দিয়ে কিছু পোর্ট্রেট বানান, সেগুলিতে অবশ্যই চোখ মুখ ছিল। কাজটা পান তার এক ছবি বিক্রেতা Robert Graham, যার সঙ্গে এলেইনের ভাল সম্পর্ক ছিল তাঁর সঙ্গে কেনেডির ভাইয়ের পরিচিতি ছিল। সেইভাবে তিনি কাজটা পেয়েছিলেন। এলেইনের পরিচিতি উচ্চ মহলে ছড়িয়ে পড়েছিল, তিনি বুদ্ধিদীপ্ত কথা বলতে পারতেন, সুন্দরী ও স্মার্ট শিল্পী। তাঁর কানেকশন সমাজের সব নামী লোকদের সঙ্গে। সমস্ত কিছুই তাঁকে আমেরিকার শিল্পের ইতিহাসে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল। এখানে আমেরিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্টে হ্যারি ট্রুম্যানের সঙ্গে এলেইন ডি কুনিং (Former President Harry S. Truman and Elaine de Kooning stand next to a painting of John F. Kennedy).

বিখ্যাতদের জীবন পাঠ আপনার জীবনকে আলোকিত করে। নিজেকে প্রতিষ্ঠা দিতে হলে বিখ্যাতদের জীবনী পড়ুন।