সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়

চার বছর অন্তর অন্তর বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর বসে৷ কিন্তু কোথায় বসবে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের আসর – তা কিন্তু সহজে নির্ধারণ হয় না৷ আবার এই আয়োজন ঘিরে ক্ষোভ বিক্ষোভের জেরে মাঝে মাঝেই কিছু দেশ বয়কট করে ফুটবলের বিশ্ব সেরার প্রতিযোগিতা৷

প্রথমদিকের বিশ্বকাপের আয়োজক ফিফা কংগ্রেসের সভাতে নির্ধারণ করা হত। এসব নির্বাচন ছিল চরম বিতর্কিত কারণ এই আয়োজনের দায়িত্ব পাওয়া নিয়ে দক্ষিণ আমেরিকা ও ইউরোপের লবি মধ্যে সংঘাত চলত৷ আবার এটাও ঠিক ইউরোপ থেকে দক্ষিণ আমেরিকায় যাতায়াতের জন্য বেশ ভালই কড়ি গুণতে হত ৷ তাছাড়া সেই সময় দুই প্রান্তে জাহাজযোগে যাতায়াত করতে প্রায় তিন-সপ্তাহ সময় লেগে যেত। তারই জেরে ইউরোপে হলে আমেরিকার এবং আমেরিকায় হলে ইউরোপের দলগুলি অংশ না নেওয়া প্রবণতা ছিল৷

১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে প্রথম বিশ্বকাপের আয়োজন করা হলে মাত্র চারটি ইউরোপীয় দেশ সেবার অংশ নিয়েছিল।এর ঠিক পরের দুটি বিশ্বকাপ ১৯৩৪ এবং ১৯৩৮ সালে ইউরোপে অনুষ্ঠিত হয়। পরপর দুটি বিশ্বকাপের দ্বিতীয়টি অর্থাৎ ১৯৩৮ ফিফা বিশ্বকাপ ফ্রান্সে অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্তটি নিয়ে সেই সময় বিতর্ক দানা বেধেছিল।কারণ আমেরিকান দেশগুলো মনে করেছিল বিশ্বকাপ একবার ইউরোপ এবং একবার আমেরিকা এভাবে দুটি মহাদেশের মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে। তাই প্রতিবাদে আর্জেন্টিনা ও উরুগুয়ে উভয়েই ১৯৩৮ সালের বিশ্বকাপ বর্জন করেছিল।

বিশ্বযুদ্ধের জন্য অবশ্য বিশ্বকাপ বন্ধ রাখা হয়েছিল ১৯৪২ এবং ১৯৪৬ সালে৷ এদিকে ১৯৫৮ ফিফা বিশ্বকাপের পর থেকে আর কোন সম্ভাব্য বিতর্ক এড়াতে ফিফা ইউরোপ ও আমেরিকার মধ্যে পালাক্রমে বিশ্বকাপ আয়োজনের একটি নকশা প্রণয়ন করে, যেটি ১৯৯৮ ফিফা বিশ্বকাপ পর্যন্ত চলেছে। তবে তার মধ্যেও মাঝে মাঝে বিশ্বকাপ বয়কট করেছে যেমন ১৯৬৪ সালে ফিফার দেওয়া শর্ত আফ্রিকার দেশগুলির গ্রহণযোগ্য মনে না হওয়ায় ১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ডে আয়োজিত বিশ্বকাপ বয়কট করেছিল আফ্রিকার দেশগুলি৷

২০০২ ফিফা বিশ্বকাপ যৌথ ভাবে আয়োজন করে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া, যা ছিল এশিয়া মহাদেশে অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্বকাপ (এই প্রতিযোগিতাই প্রথম ও এখন পর্যন্ত একমাত্র প্রতিযোগিতা যা একাধিক দেশ মিলে আয়োজন করেছে)। ২০১০ সালের বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয় দক্ষিণ আফ্রিকায় ফলে তা হল আফ্রিকা মহাদেশে অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্বকাপ।

বর্তমানে আয়োজক দেশ ফিফার নির্বাহী কমিটির ভোটের মাধ্যমে নির্বাচন করা হয়। যে দেশ বিশ্বকাপ আয়োজন করতে ইচ্ছুক তাদের জাতীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন ফিফার কাছ থেকে “আয়োজনের নীতিমালা” সংগ্রহ করে। এই নীতিমালায় বিশ্বকাপ আয়োজনে করনীয় সকল ধাপ ও চাহিদার বিস্তারিত বিবরন আছে। এই সব শর্তগুলি পূরণে সক্ষম হলে সেই দেশ ফিফার কাছ থেকে আয়োজক নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বীতার কাগজপত্র সংগ্রহ করে জমা দেয়। ফিফার একটি প্রতিনিধিদল ঐ দেশ ভ্রমণ করে ফিফার চাহিদা কতটুকু পূরণ হয়েছে তা পর্যবেক্ষণ করে একটি রিপোর্ট তৈরি করে দেয়। বর্তমানে আয়োজক নির্বাচন বিশ্বকাপের ছয় বছর আগে ঠিক হয়ে যায়।

এক নজরে বিশ্বকাপ ফুটবলের আয়োজক দেশ

সাল      আয়োজক দেশ
১৯৩০   উরুগুয়ে
১৯৩৪   ইতালি
১৯৩৮   ফ্রান্স
১৯৪২   দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে স্থগিত
১৯৪৬   দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে স্থগিত
১৯৫০   ব্রাজিল
১৯৫৪   সুইজারল্যান্ড
১৯৫৮   সুইডেন
১৯৬২   চিলি
১৯৬৬   ইংল্যান্ড
১৯৭০   মেক্সিকো
১৯৭৪   পশ্চিম জার্মানি
১৯৭৮   আর্জেন্টিনা
১৯৮২   স্পেন
১৯৮৬   মেক্সিকো
১৯৯০   ইতালি
১৯৯৪   যুক্তরাষ্ট্র
১৯৯৮   ফ্রান্স
২০০২   দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান
২০০৬   জার্মানি
২০১০   দক্ষিণ আফ্রিকা
২০১৪   ব্রাজিল
২০১৮   রাশিয়া
২০২২   কাতার