সুনীলদার সান্নিধ্য পাওয়া আমাদের কাছে বিস্ময়ের। নতুন বছরের ক্যালেন্ডার হাতে এলেই আমরা কয়েকজন বিশেষ কিছু বিষয়ের সঙ্গে দেখে নিতাম এবারে ৭ সেপ্টেম্বর কী বার পড়েছে, সুনীলদার জন্মদিন, তাঁকে কেন্দ্র করে তাঁর বাড়িতে সকালে অজস্র গুণমুগ্ধের জমায়েত, বিকেলে অনুষ্ঠান, প্রায় গোটা দিন জুড়েই আমরা তাঁর সঙ্গে। আমরা বলতে এখানে রোববারের আড্ডাবাজের দল এবং তার বাইরে আরও অনেকে।

ধনঞ্জয় ঘোষাল

সুনীলদার বাড়িতে রোববারের আড্ডা ছিল আমাদের মুক্তির ঢেউ, দূরে কোথাও বেরিয়ে যাবার আজান এবং একই সঙ্গে তর্কে-বিতর্কে অন্যান্যদের সঙ্গে পরিচিত হয়ে ওঠার নতুন বইএর প্রচ্ছদের মতো টানটান উত্তেজনা। আমি সেই রোববারের আড্ডাবাজদের একজন, মনে পড়ছে রূপক, চিরঞ্জিত, পাপড়ি, সেবন্তী, শ্রীজাত, টিনা, জয়দেবদা, এবং মাঝে মাঝে রফিকুলদা, পিনাকীদা, বীথিদি, সুবোধদা-সহ আরও অনেকের উপস্থিতি।

আমার সঙ্গে সুনীলদার প্রথম আলাপ এমনই এক রবিবারে প্রায় বছর পনেরো আগে তাঁর বাড়িতেই এক সকালে। তখন নদিয়ার একটি পত্রিকা সুনীলদাকে নিয়ে সংখ্যা করবে, আমাকে লেখার জন্য বলেছে, কী লিখবো কী লিখবো করে কিছু মাথায় এল না, অবশেষে একটা কাল্পনিক সংলাপ গোছের বিষয় দাঁড় করালাম, সেখানে নীরা ও সুনীল দুটি চরিত্র। লেখার পর মনে হল যে, ছাপতে দেবার আগে এমন এক কাণ্ডের বিষয়টি সুনীলদাকে জানানো দরকার। তখন মোবাইল আসেনি, ল্যান্ডলাইনে ফোন করলাম, তিনিই ফোন ধরলেন, বিষয়টি শুনে রবিবারে আসতে বললেন। সেই প্রথম যাওয়া, ঘর ভর্তি তরুণ কবির দল, চেনা অচেনায় আমি কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত, তিনি গোটা লেখাটা শুনলেন, ছাপার অনুমতি দিলেন। পরিচয়ের সেই শুরু।

সেই পত্রিকাটির নাম চেতনা, তার উদ্ব্বোধন উপলক্ষে আমাদের মুড়াগাছা যাওয়া, সুনীলদা ও স্বাতীদির সঙ্গে সেই প্রথম লংড্রাইভ, যাত্রাপথে আমার বাড়িতে তাঁদের একটু থামতে হল। নন-এসি সাদা অ্যাম্বাসাডার, এর বেশী যোগাড় করার ক্ষমতা নেই আমাদের, সুনীলদা বিরক্ত হলেন না, আমাদের এতটুকু লজ্জিত হতে দিলেন না। যেতে যেতে সুনীলদাকে আমার অজস্র প্রশ্ন, এমন সময় বিকট শব্দে গাড়িতে একটা আওয়াজ হল, সুনীলদা বললেন- সাবধানে নামো, গাড়ি থেকে নামার আগেই মৃদু স্বরে ড্রাইভার জানালেন- চাকা হয়তো… সুনীলদা বললেন, এটা কারও হাতে নয়, অত চিন্তার দরকার নেই। যাই হোক তেমন কিছু ঘটেনি, কিন্তু আশ্চর্য ভাবে দেখেছি যে, মানুষটা কখনো বিরক্ত বা বিব্রত বোধ করেননি এবং তাঁর ব্যবহারে যেন কেউ আঘাত না পায়, সেটাই ছিল সুনীলদার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক।

তিনি ফিরিয়ে দিতে জানেন না, যথারীতি তাই হল, তাঁকে দেখার জন্য সেখানে জনস্রোত, অধীর অপেক্ষা মানুষের, তিনি মুখোমুখি হবেন শ্রোতাদের প্রশ্নের, আমি সঞ্চালক, প্রশ্নের ঢেউ দেখে ভাবলাম আজ বোধহয় আর ফেরা যাবে না, সুনীলদাকে বললাম কী করবেন? উনি হেসে বললেন, দেরী হয় হবে, এ আর এমন কী… মাঝরাত্তিরে রওনা হয়ে রাত তিনটেয় বাড়ি ফেরা।

সেই সময় ঠিক করেছিলাম যে, ‘কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়’ বিষয়ক একটা সংখ্যা করবো, সেটা হবে কবি-সুনীলের ওপরই, তাঁর গদ্যের আলোচনা থাকবে না, সেই সময়টা ২০০৭, নন্দীগ্রাম হয়েছে, বাংলার রাজনীতি তোলপাড়, তাঁর ও বুদ্ধবাবুর সম্পর্ক তখন মুখ্য আলোচ্য বিষয়, আমি বলাকার ইন্টারভিউতে সরাসরি প্রশ্ন করলাম এই নিয়ে, তিনি উত্তরে বলেছিলেন-‘ … আমি যেটা লিখেছিলাম পরবর্তী যারা আমার সমালোচনা করেছেন যে তারা আমার লেখার প্রথম ভাগটাকে একেবারে বাদ দিয়েছেন যেন আমি নন্দীগ্রামে কোনো সহানুভূতি দেখায় নি, মত্যু নিয়ে কোনো কিছু বলিনি… সেগুলো ওনারা বাদ দিয়ে বলেছেন সুনীল তো বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে আড়াল করার চেষ্টা করেছে।’

শিশির মঞ্চে বলাকা পত্রিকার সুনীলদার ওপর সংখ্যা প্রকাশ পেয়েছিল ২০০৭-এ তাঁর জন্মদিনে, প্রেক্ষাগহ পূর্ণ, মঞ্চে কে নেই? অনুষ্ঠান শেষে আমরা কয়েকজন কথা বলছি, সুনীলদা দাঁড়িয়ে, এমন সময় তরুণ একটি ছেলে এসে সুনীলদাকে প্রণাম করে বললো, আমার আপনাকে একটা জিনিস দিতে ইচ্ছে করছে আপনার জন্মদিনে। সুনীলদা তার দিকে তাকিয়ে, সে বললো আমার কিছুটা আয়ু যদি দিতে পারতাম আপনাকে… আমরা সবাই স্তম্ভিত, সুনীলদা তাকে আশীর্বাদ করে বললেন- এমন কথা বলতে নেই, ভালো থেকো, কেমন?

আমরা ভাবলাম এর চেয়ে ভালবাসা ও শ্রদ্ধার বড় নিদর্শন আর কী হতে পারে। কেন তিনি সবার প্রিয় ছিলেন এতো? রোববারের আড্ডায় তিনি কাউকে থামিয়ে দিয়ে কোনোদিন কথা বলেননি, যে যখন যেমন ভাবে তাঁর সাহায্য চেয়েছে, পেয়েছে। আমাদের স্বপ্নের উড়োজাহাজ তিনি, তিনি ছিলেন বলেই আমরা অনেকেই ভারতটাকে দেখতে পেয়েছি, ভারতের বাইরেটা দেখতে পেয়েছি, শুধু বাঙালি না থেকে ভারতীয় হয়ে ওঠার কথা ভাবতে পেরেছি। এক জন মানুষ কতো সহানুভূতিশীল হতে পারেন সুনীলদা তার নমুনা।

তিনি সাহিত্য অকাদেমির সভাপতি হয়েছেন, ঠিক করলাম ‘মুখোমুখি-সুনীল’ শীর্ষক একটা সন্ধে করবো, জীবনানন্দ সভাঘর, মধ্যমণি তিনি, রয়েছেন যোগেন চৌধুরী, কথায় কথায় সুনীলদাকে আমরা প্রায় আটকে দিয়েছি, এমন সময় একজন বললো- পরের জন্মে কী হতে চান? সুনীলদা বললেন যে, পরজন্মে বিশ্বাস নেই তবে যদি থাকে তাহলে মেয়ে হয়ে জন্মে সঙ্গমের স্বাদ নিতে চাই, এ জন্মে তো পুরুষ হয়ে পেয়েছি… আমরা বললাম এখন কী পেলে আপনার ভাল লাগবে? কী পেতে চান আর? তিনি বললেন যে, যৌবন ফিরে পেতে চাই, ওটা পেলেই ভাল লাগবেচিল

এমনই অকপট তিনি, কোনো লুকোচাপা নেই, আমরা দ্বিধাহীন ভাবে তাঁর সামনেই সিগারেট টানতাম, একই সঙ্গে ভোডকা নিয়ে চীয়ার্স করতেও সংশয় ছিল না। তিনি বলতেন আড্ডায় বয়স ও দূরত্বের কথা ভাবলে আড্ডা দেওয়াই উচিত নয়। তাই আমরাও আমাদের সব কিছু তাঁকে বলতে পারতাম, তিনি কল্পতরু, তাঁর কাছেই চাইতে পারতাম, তাঁর কাছেই ছিল আমাদের কনফেশন, তাঁর কাছেই নতজানু হয়ে থাকা ভালবাসার গভীর টানে।

আমাদের প্রায় তখন সব কিছুতেই সুনীলদা, একবার আমার বাড়িতে, অর্থাৎ সোদপুরে সন্ধেবেলায় পান-ভোজনের আয়োজন, আমরা অপেক্ষায়, সুনীলদা দেরী করছেন, তাহলে কি আসবেন না? এতো দূর, কোথায় ম্যান্ডেভিল গার্ডেন কোথায় সোদপুর, তিনি জানালেন যেতে একটু দেরী হবে, আটকে পড়েছেন। অবশেষ এলেন তিনি, পরিকল্পনা অনুযায়ী সঙ্গে এলেন বাদল বসু, চিত্রা লাহিড়ী, শ্রীজাত, মোনালিসা ঘোষ ও স্বাতীদি। এসেই বললেন- তাড়াহুড়ো কোরো না, আমার বাড়ি ফেরার তাড়া নেই, আর ওদেরও আমি ঠিক পৌঁছে দেব, কারণ দেরী আমিই করেছি, আমার জন্যেই দেরী হয়েছে।

সুনীলদাকে সেই সান্ধ্য আড্ডায় নিশ্চিত ভাবে পাবার জন্য বলেছিলাম, আমি কি গাড়ি পাঠিয়ে দেব? উনি বললেন- আড্ডায় সবাই যে যার উদ্যোগেই যায়, তুমি আর গাড়ি পাঠাবে কেন, বরং আমায় কী নিয়ে যেতে হবে বলো, সব আয়োজন তুমি একা করবে? বলতে পারিনি যে, আপনি আর স্বাতীদি এলেই আমরা ধন্য, আপনার উপস্থিতির চেয়ে আর বড় কী হয়?

সুনীলদাকে আমি একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনি যখন শুনতে পান আপনার নাম ভাঙিয়ে কেউ… সুনীলদা বলেছিলেন – কেউ যদি আমার নাম বলে কিছু সুবিধা কোথাও পেয়ে যায়, তাতে আমার কোনো আপত্তি নেই। এটা হতেই পারে। শুধু লেখা ছাপানোর ক্ষেত্রে উমেদারি আমার পছন্দের নয়।

দোল উপলক্ষে তিনি শান্তিনিকেতনে যেতেন, দোলের দিন সকালে তাঁকে ঘিরে ভিড়, কখনো কলাভবনের বেদীতে আবার কখনো মাটির চৈতির সামনে, দোলে আমারও বোলপুর যাওয়া ছিল ফি বছর, তাঁর সঙ্গে পরিচয়ের পর দোলের দিনটা তাঁর সঙ্গ নিয়েই কাটাতে পেরে ভাগ্যবান মনে হয়েছে আমাদের, সত্যি কথা বলতে কি, সুনীলদা চলে যাবার পর দোলে এখন আর প্রয়োজন ছাড়া বোলপুরে যেতে মন টানে না।

এই সব টুকরো টুকরো ঘটনা থেকে কতো ধরণের যে শিক্ষা পেয়েছি বলার নয়, সুযোগ পেলেই তাঁর কাছে শুনতাম প্রেমেন্দ্র মিত্র, বুদ্ধদেব বসু, নজরুল ইসলাম, শিশির ভাদুড়ি, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, প্রমুখ আরও কতো প্রবাদপ্রতিম মানুষের কথা, এ এক প্রাপ্তি আমাদের।

এই বাংলায় যেমন তাঁর জনপ্রিয়তা, তেমনি বিদেশেও তিনি সমান ভাবে বাঙ্গালিদের কাছে প্রিয় ছিলেন। রোববারের আড্ডায় এমন কত প্রবাসী মানুষের সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয়েছে, এই কথা লিখতে লিখতেই মনে পড়ে গেল বিখ্যাত চিত্রপরিচালক আশুতোষ গোয়ারিকরের প্রসঙ্গ। তিনি তখন সূর্য সেনের ওপর কিছু কাজ করবেন বলে ভেবেছেন, সুনীলদা উপদেষ্টা, একদিন সেই প্রসঙ্গে আলোচনার জন্যেই আশুতোষ হাজির সুনীলদার বাড়িতে, আমরা অবাক, স্নিগ্ধ মানুষ, তিনিও খুব খুশি এই সময়ের বাংলার কবিদের সঙ্গে কথোপকথনে।

এমনই এক রোববারের আড্ডায় ঠিক হয়ে গেল আমিও জার্মানি যাব, মনের মানুষের একটা শো, সঙ্গে সুনীলদার সঙ্গে সেখানকার মানুষের কথোপকথন আর সুনীলদার কবিতা নিয়ে প্রায় এক ঘন্টা আমার বক্তব্য, আমি আমন্ত্রিত ছিলাম যেহেতু সুনীলদার কাব্য-জীবন নিয়ে একটি অন্যরকম সংখ্যা করেছিলাম। তখন আগস্ট মাস, রোজা চলছে, বিকেলে অনুষ্ঠান শুরু হল, রোজা নিয়েই অজস্র মানুষ এসে হাজির শুধু সুনীলদাকে দেখবেন বলে, শুধু বার্লিনের মানুষেরাই নয়, আশেপাশের অন্যান্য জায়গা থেকেও কত মানুষের উপস্থিতি। অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করেছি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় নামক এক ব্যক্তিত্বের বৃত্ত।

এই ছোট্ট লেখা শেষের মুখে জানাই যে, সুনীলদা আমাদের বাংলায় একটা ভিন্ন ধরণের ট্রাডিশন তৈরী করেছেন, সেটা তিনি ইচ্ছাকৃত করেছেন এমন নয়, তাঁর ক্ষেত্রে হয়ে গেছে আপনা থেকেই। যে কোনো অনুষ্ঠানে কয়েকজনকে নিয়ে প্রবেশ করা, ক্ষমতার কেন্দ্রে থেকে যাওয়া, এটা-সেটা উদ্বোধন, একটা বাদশাহী মেজাজ ধরে রাখা, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উপদেষ্টা হওয়া, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের উচ্চ পদে আসীন হওয়া ইত্যাদি ইত্যাদি। এগুলি তিনি পাবেন বলে এগিয়েছিলেন এমন নয়, তাঁর প্রতিভা, যোগ্যতা, ভাগ্য, আন্তরিক ব্যবহার ইত্যাদির জন্যে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব থেকে সাধারণ মানুষের সব কিছুতেই তাঁকে স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে পেতে চাওয়ার ইচ্ছে ছিল, এই সব নানাবিধ কারণে ঘটে গিয়েছিল এমন একটি অবস্থা, আর সেখান থেকে তাঁর এই বিবিধ প্রাপ্তির আদলটিই হয়ে গেল সাহিত্য জগতে সফলতার সূচক বা প্রতিষ্ঠার ভর মাপার চূড়ান্ত মাপকাঠি।

সুনীলদা আমাদের লাইটহাউস, আমাদের দূরবীন, আমাদের রানওয়ে, আমাদের নির্জনে থেকে যাওয়া অনেক আড্ডার দিগন্তে দাঁড়িয়ে থাকা ম্যাজিশিয়ান।