গৌতম রায়

নয়ের দশকের শেষের দিক। দীর্ঘকালব্যাপী পাকিস্তানের ছায়া উপনিবেশ থেকে উত্তরীত হয়ে বাংলাদেশ তখন সবে মাত্র গণতন্ত্রে আবার ফিরে এসেছে। শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। সেদেশের সংখ্যালঘু হিন্দুদের প্রত্যাশা তখন একটা চরম পর্যায়ে। বায়তুল মোকাররমের পাশ দিয়ে হাঁটছিলাম। শীতের সন্ধে। এক ক্লান্ত, শ্রান্ত, বৃদ্ধ দইওয়ালা বাঁকে করে দই বিক্রি করছেন। আমাকে তাঁর জানা দূরের কথা, চেনেন ও না। হঠাৎই এগিয়ে এসে বললেন; দই নেবেন? ভালো বগুড়ার দই। আমি হিন্দু, খেয়েই দেখুন খাঁটি বগুড়ার দই।

গৌতম রায়

বগুড়ার শেরপুরের গৌরগোপালের দইয়ের ভুবনজোড়া খ্যাতি। অমন দই বুঝি গোটা বিশ্ব ঢুড়ে মেলে না। সেই দই খাওয়ার ইচ্ছে থেকে আমাকে সেই শীতের সন্ধ্যেতে হতবাক করে দিল প্রতিবেশি দেশের এক সংখ্যালঘু নাগরিক, যে দেশ বেশ কিছু দিন আগে তাঁদের ধর্মনিরপেক্ষ ‘৭২ সালের সংবিধানের সমাধি সৌধের উপরে নোতুন সংবিধানে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্মের স্বীকৃতি দিয়েছে, সেই দেশের এক হত দরিদ্র সংখ্যালঘু হিন্দু নাগরিক প্রকাশ্যে পেটের ভাত জোগারের তাগিদে নিজের ধর্ম পরিচয় দিয়ে ফলছে; আমার দই কিনুন, আমি হিন্দু!

আমার পোশাক বা চেহারা দেখে তো বোঝার উপায় নেই আমার পিতৃকূলের ধর্ম বিশ্বাস। তাহলে? এত উত্থান-পতনের ভিতরেও বাংলাদেশের সংখ্যাগুরু মুসলমানদের বিশ্বাস; সংখ্যালঘু হিন্দুরা সৎ। তাই ওই গরিব দইওয়ালা নিজের সংখ্যালঘু পরিচয়টিকে তুলে ধরে কাঁধের বোঝা কমাতে।

সংখ্যালঘুর এই স্বরূপের সঙ্কট বা আইডেন্টিটি ক্রাইসিসের কঠিন-কঠোর-উদ্ধত-অসহায় বাস্তব ছবি ‘৭৯-এর জামশেদপুর দাঙ্গা থেকে ব্যক্তি জীবনে দেখতে শুরু করেছিলাম। সেই ছবি ভয়াবহ হয়ে ওঠার অশনি সঙ্কেত পেয়েছিলাম আজ থেকে ঠিক তিরিশ বছর আগে ‘৮৯-এর ভাগলপুর দাঙ্গাতে। সেই অশনি সঙ্কেত নগ্ন বাস্তব দেখেছিলাম ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর। মেটিয়াবুরুজের কাশ্যপপাড়ার সেই মানুষটি, যিনি পোড়া বেনারসি আর সহজ পাঠের ধ্বংস স্তূপের ভিতর মাথায় হাত দিয়ে বসেছিলেন ফ্যালফ্যালে চোখে, তাঁর ধর্ম পরিচয় জানি না। তিনি হিন্দু, না মুসলিম জানার চেষ্টাও করি না। কিন্তু সেই মানুষটি আজ ও অনেক না ঘুমানো রাতে আমার চোখের সামনে ফুটে ওঠেন। জেগে ওঠেন আরো ভয়ঙ্কর ব্যথাতুর চোখ নিয়ে, না বলা কথা নিয়ে।

বাংলাদেশের সংখ্যাগুরু ইসলামীয় মৌলবাদীরা তাদের দেশের সংখ্যালঘু হিন্দুদের উপহাস করে বলে ‘মালাউন’। উপহাস, অসম্মান, লজ্জার উদ্রেকবোধক এই আরবি শব্দটির ভিতরেই বোধহয় দেশ-কালের ভূগোল কে অতিক্রম করে সংখ্যালঘুর হৃদয় নিংড়ানো ব্যথার বেহাগ সুরটি বাঁধা আছে। আরবিতে ‘মালাউন’ মানে ‘অভিশপ্ত’। ভারত- বাংলাদেশ-পাকিস্তান-শ্রীলঙ্কা যা প্রতীচ্যের যে দেশই হোক না কেন, সংখ্যালঘু মানেই বোধহয় এখন ‘অভিশপ্ত’! এই অভিশপ্ত যাপনচিত্রের ছবিটা বাবরি মসজিদ ধ্বংসের কাল থেকে আজ এই ৩৭০ নম্বর ধারার অবলুপ্তির সময়কাল পর্যন্ত কেবল ধ্বস্তই হয়েছে, হয়েই চলেছে। জানি না এর শেষ কোথায়!

সাতের দশক। তখন ও সাম্প্রদায়িক বিভাজন আজকের চেহারার ধারে কাছে আসেনি। দেশভাগ জনিত ভুল বোঝাবুঝির ক্ষতে খানিকটা প্রলেপ পড়েছে। তেমন একটা সময় কালে হুগলি শহরের ইমামবারা সন্নিহিত হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় ছোট ছোট ছেলেদের খেলার সময়ের ছড়া কাটা শুনে যন্ত্রণায় নীল হয়ে গিয়েছিলাম। ছড়টা ছিল; “মুসলমান বেইমান দাড়ি কুটকুট করে/ একটা দাড়ি পড়ে গেলে আল্লা আল্লা করে।” হ্যাঁ, দানবীর হাজি মহম্মদ মহসীনের অমর কীর্তি হুগলি ইমামবারার ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে এটা ছিল সংখ্যাগুরুর বাড়ির নওলকিশোরদের সংখ্যালঘু বাড়ির ‘নেড়ে’দের প্রতি মানসিকতা।

এই ‘নেড়ে’ বাড়ির ছেলেরা যদি বড়ো হয়ে তাঁর পড়শির প্রতি শৈশবের সেই চরম অপমানের স্মৃতিকে মনে রাখেন, তাহলেই তো সেই ‘নেড়ের বাচ্চা’র দেশপ্রেম, জাতীয়তাবাদ (থুড়ি মোদি-শাহের নেতৃত্বে ব্রিটিশ বিতাড়নের এই সুতিকা শব্দবন্ধ ও এখন ‘রাষ্ট্রবাদে’ রূপান্তরিত) ইত্যাদি নিয়ে ট্রেনে, বাসে, পাড়ার মোড়ের বড়োর দোকান বা বাজারের কলাপাতার ঠেকে আমরা শীবাকীর্তন গাইতে ঢপের দল বের করে দেব। সংখ্যায় যাঁরা কম, তাঁদের উদ্দেশে সংখ্যায় যাঁরা বেশি, তাঁরা তো আস্ফালন করবেনই, তা সে আইনসভার ভিতরেই হোক আর সামাজিক জীবনেই হোক, বাঁয়ের রাজনীতির লোকই হোক আর হালকা ডান কিংবা ঘন ডানের লোকই হোক।

ভারতবর্ষে বসবাসকারী একজন ও সংখ্যালঘু মুসলমান মানুষ আছেন কি, যাঁকে তাঁর জীবনের কোনো না পর্বে তাঁর ধর্ম বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে সংখ্যাগুরু হিন্দু সমাজের কোনো না কোনো মানুষের কাছ থেকে অপমানজনক কথা শুনতে হয়নি? অমর্যাদাকর শব্দ তাঁর কানে গরম সিসের মতো ঢেলে দেয়নি তাঁরই পড়শি? শুনতে হয় নি মুসলমান হওয়ার ‘অপরাধে’ গর্বিত ‘হিন্দু’র বিদ্রূপ? ভারতে বসবাসকারী ধনী, দরিদ্র, আশরাফ-আতরাফ, শিক্ষিত-নিরক্ষর নির্বিশেষে একজন মুসলমান ও আছেন, যিনি তাঁর প্রতিবেশি সমাজের কোনো না কোনো লোকের কাছ থেকে তাঁর ধর্ম বিশ্বাস নিয়ে হাসি, মশকরা, হ্যাটাকরা শুনে কখনো না কখনো নীরবে চোখের জল ফেলেননি? যে মানুষটি নাস্তিক, প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মে যাঁর আস্থা নেই, সেইরকম একজন জন্মসূত্রে মুসলমান ভারতীয় ও কি বলতে পারেন, কেবলমাত্র সৈয়দ, মহম্মদ, আনসারি, খাতুন– এ ধরনের কোনো শব্দ, যা থেকে মানুষটির জন্মসূত্রে অর্জিত পারিবারিক ধর্ম বিশ্বাস টি বোঝা যায়, তাঁকে সেই ধর্মীয় পরিচয় বাহী নামটির জন্যে প্রতিবেশি হিন্দু সমাজের কোনো না কোনো লোকের কাছ থেকে কখনো না কখনো গঞ্জনা, তাচ্ছিল্য, ঘৃণা, অশ্রদ্ধা, অসম্মান পেতে হয়নি? অপমান সইতে হয়নি?

দুর্ভাগ্যজনক হলেও এটা কঠিন সত্য যে রবীন্দ্রনাথের মতো মানুষ, যাঁর যাপনে মুসলিম বিদ্বেষের লেশটুকু ও ছিল না, তিনি ও ‘রাজর্ষি’ উপন্যাসে মুসলমানদের উদ্দেশে ‘নেড়ে’ শব্দ ব্যবহার করেছেন। ‘রামকানাইয়ের নির্বুদ্ধিতা’ নামক ছোট গল্পে ‘মুসলমানের মুরগী প্রেম’– এমন শব্দ লিখেছেন। তাই যখন আজ ৩৭০ অবলুপ্ত হওয়ার পর এক পত্রিকা সম্পাদককে বলতে শুনি; শিক্ষকতার জীবনে শঙ্খ ঘোষ রবীন্দ্রনাথের নাম, জীবনানন্দের নাম যে কোনো সূত্রে জপ করলেও নজরুলের নাম উচ্চারণ করেননি, তখন সেই সম্পাদকের অজ্ঞতায় রাগ হয় না, যন্ত্রণা হয়। ভাবি সংখ্যালঘু মানুষ আজ নিজেদের অস্তিত্ব নিয়ে এতটাই আতঙ্কের ভূগোলের সাম্রাজ্যের অধিবাসী হয়ে পড়েছেন যে, তাঁদেরই একজন প্রতিনিধি হিশেবে ওই সম্পাদক ব্যক্তি জীবনে কখনো সরাসরি শঙ্খ ঘোষের ক্লাস না করেও ,শঙ্খ ঘোষ ক্লাসে কখনো নজরুলের নাম উচ্চারণ করেন না– এমন একটি নির্জলা মিথ্যে সগৌরবে বলার মতো মানসিক অবস্থায় নিজেকে নিয়ে গেছেন। তাঁকে এই চরম ভুল, অসত্য বোধে উপনীত হতে সাহায্য করেছে তারই প্রতিবেশি, সংখ্যাগুরু সমাজ।

হুগলির হিন্দু শিশুদের উপহাসে নীল হয়ে যাওয়া মুসলমান শিশুদের পরিণত বয়সই যেন আমি খুঁজে পেয়েছিলাম সেই সম্পাদকের বেদনার্ত অনৃতবাদনের ভিতরে। শঙ্খ ঘোষকে ঘিরে এই নির্জলা মিথ্যের জন্যে সেই সম্পাদক, যিনি জন্মসূত্রে মুসলমান, তাঁকে তো দায়ী করা যায় না। দায়ী করতে হয় হুগলির সেই বাচ্চাদের মাথায় যারা মুসলমানদের সম্পর্কে চরম অপমান জনক ওই জঘন্য ছড়াটা গেঁথে দিয়েছিল তাদেরকে। দুঃখের হলেও স্বীকার করতে হয় সেই লোকগুলো ছিল হিন্দু। তারা হয়ত আজকের মতো ‘রাজনৈতিক হিন্দু’ ছিল না। কারণ, রাজনৈতিক হিন্দুত্বের বোধটা তখন আজকের মতো দানবীয় হয়ে ওঠেনি। তবু ও তারা ছিলেন, আজকের দানবীয় রাজনৈতিক হিন্দুত্ববোধের সলতে পাকাবার কারিগর। এই ভূমিকা তো হিন্দু সমাজের একটা সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ জেনে হোক, না জেনে হোক, বুঝে হোক, না বুঝে হোক করে গেছে। করেই গেছে।

বারাকপুর শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অধ্যুষিত এলাকায় দেহাতি শিশুদের খেলার লব্জ ছিল; “মিঞা টিঞা, বেল পাকায়া, আপনে খায়া, হিন্দুকে লায়া।” বিনা অর্থ বোধক এই শব্দগুলো দেহাতি হিন্দু শিশুরা তো আটের দশকে আকাশ থেকে শেখেনি। শ্রমিক সমাজের সামাজিক বিন্যাসে খিস্তি খেউর এক ধরনের সামাজিক মান্যতা পায় তাঁদের ভিতরে। আকন্ঠ মদ খেয়ে ফিরে বাপ পেটাচ্ছে মাকে, শ্রমিক এলাকায় হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে একজন শিশুর কাছে এ ছবি নতুন কিছু না। বাপ, মায়ের ঝগড়া-মারামারি থেকে দু’অক্ষর, চার অক্ষর শেখাটাও জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে শ্রমিক এলাকার একটি শিশুর কাছে আপনা আপনিই শিখে যাওয়াটার ভিতরেও আশ্চর্য হয়ে যাওয়ার মতো কোনো বিষয় নেই।

আশ্চর্য হয়ে যাওয়ার মতো বিষয় হচ্ছে, যে হিন্দু শিশুটি সকাল হলেই তার বস্তির মুসলমান শিশুটির সঙ্গে ল্যাংটো পোঁদে হাই ড্রেনে পাশাপাশি হাগতে বসছে, হাগতে হাগতে নিজেদের ভিতরেই ইটের টুকরো ছুঁড়ে খেলছে– সেই শিশু, যে হিন্দু কি, মুসলমান কি জানেই না, অথচ কেমন করে যেন জেনে যাচ্ছে, তার কোন বন্ধুটি মুসলমান। আর সেই বন্ধুকে নিয়ে চলেছে অসভ্য, বর্বর ইতরামো। সমাজের এই অংশের শিশুদের ধর্ম ভিত্তিক এই র‍্যাগিং নিয়ে আজ পর্যন্ত কোনো সমাজতত্ত্ববিদ একটি শব্দ ও খরচ করেছেন কি না জানি না। কিন্তু এই র‍্যাগিংয়ের ভিতরেই লুকিয়ে আছে মুসলমান সমাজে অর্থনৈতিক ভাবে একদম পিছিয়ে থাকা মানুষদের একটি অংশের ভিতরে ছোটখাটো চুরি, ছিনতাই ইত্যাদির মতো অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ার সামাজিক প্রেক্ষিতের একটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। এই অধ্যায়ের আখ্যানমালা এক এক জায়গাতে এক এক রকম। বারাকপুর শিল্পাঞ্চলের আখ্যানমালার স্থানিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মুম্বাইয়ের একটি শ্রমিক বস্তির স্থানিক বৈশিষ্ট্য কখনোই মিলবে না। কিন্তু মিলবে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। যে কোনো উপায়ে মুসলমানের বিরুদ্ধে ঘৃণাকে প্রলম্বিত করার এক পৈশাচিক উন্মত্ততা, উল্লাস।