শুভ চট্টোপাধ্যায়

এই না সেদিন শীত ছিল! গরমজল, কাঁথা-কম্বলের ওম, শাল-সোয়েটার, বাগানে ডালিয়া, চন্দ্রমল্লিকা, জলখাবারে কড়াইশুঁটির কচুরি? ধ্যুৎ, মিথ্যে সব বানানো গালগপ্পো। আর তা না হলে বড়জোর স্বপ্নের মতন গোলমেলে সত্যি। তা-ও কতটুকু তার আয়ু? যেমন পরের রেশমি স্বপ্নটুকুরও। পথভোলা এক পথিক, ঘরছাড়া পাগল উদাসী। এল, রঙে রং রাঙাল, কবে যেন চলে গেল।

তারপর জ্বলতে শুরু করেছে আগুন। এই একমাত্র সত্য। সূর্যের গর্জন, রোদপোড়া গন্ধ, নোনাঘামে নিস্তেজ উদ্যম। রাতে তাপ নামে একটু। স্নিগ্ধ মতন হাওয়াও থাকে। কিন্তু অগ্রাহ্য করা যায় কি মিশে থাকা ঘুমন্ত দীর্ঘশ্বাসের হলকাগুলোকে?

আবার সকাল। সূর্য, রোদ, বেলা দশটা, বারোটা, দুটো, ছাতা, রোদচশমা,শসাচাকতি, তরমুজ ফালি, ঘোললস্যি– কিন্তু বৃষ্টি? চাতকিনী, তৃষিতা হাহাকারে মাটির বুক ফেটে যায়, জহ্লাদী হাসি হিংস্র রোদের, আর তখনই…

অন্যদিন তখনও কেউ ঘরদোরে আলো জ্বালায় না। বিকেল পাঁচটা। এই সেদিন বৈশাখ এসেছে। আজ মেঘকালোয় ঢাকা পড়ল বিকেলসূর্য। ঘন হতে থাকল শ্যাওলাসবুজ কালচে আঁধার। নোনা মাটির সোঁদা গন্ধ। বিদ্যুৎঝলতক, মেঘ গুড়গুড়। এবার হাওয়ার পর হাওয়াকে ধাওয়ার পর ধাওয়া করতে করতে এসে পড়ল দলে দলে কৃষ্ণকেশর পাগলা ঘোড়ার দল। শহর জুড়ে লেগে গেল দাপাদাপি, মাতামাতি।

ঝড় উঠেছে, ঝড় উঠেছে।

ঝনঝন করে কোথায় যেন ভেঙ্গে পড়ল জানালার শার্সি। দুমদাম দরজাপাল্লার ধাক্কাধাক্কি। “ওরে ছাদ থেকে শুকনো জামাকাপড়গুলো শিগগীর নীচে নামা।” “ওমা দেখোদেখো কাতুপিসির থানটা সরকারদের বাগানের দিকে উড়ে গেল গো।” হয়ত এমন কিছু দেখেছিলেন কবি বিশ্বদীপ। তখন তাঁর কৈশোর। প্রথম কবিতার বই “বলাকার ডানা”। “জানালা খোলা, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাব্যি হচ্ছে? একখুনি আটকা, একদিকে রাজ্যের ধুলোবালির ছড়াছড়ি, তাপ্পর বৃষ্টি এল বলে, জলেকাদায় একাকার হবে।” যেমনি বলা তেমনি হওয়া। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামল। রাস্তায় হুড়োহুড়ি, দৌড়োদৌড়ি। কোথায় একটু মাথা গোঁজার আড়াল পাওয়া যায়? খোঁজ, খোঁজ। তবে যা হাওয়ার তোড়, ভিজে একসা-ই হতে হবে। যাহোক্, প্রথমটায় একটু অপ্রস্তুত হলেও, পরে সকলে স্বস্তির, আরামের নিঃশ্বাস ফেলছে। জানে অনেকেই আজ বাড়ি ফেরায় কত ঝামেলা, মুশকিল। ট্রেনের তার ছিঁড়বে, রাস্তায় গাছ উপড়োবে, গাড়িঘোড়া কমে যাবে। তবু, তবু হোক্ বৃষ্টি। ওই তো কতজনে নেমেও পড়েছে রাস্তায়, হাসতে হাসতে ভিজছে। চেনা অচেনায় ভাবসাবও হযে যাচ্ছে।

এই বছরের প্রথম কালবৈশাখি। টিভি চ্যানেলে চ্যানেলে হাড্ডাহাড্ডি কভারেজ। আনমনে দেখছেন মৃত্তিকা বসু। বিখ্যাত কবি বিশ্বদীপ বসুর মা। ছেলের প্রথম কবিতার বই “বলাকার ডানা” প্রকাশিত হতে দেননি কোনওদিন। নিজে আগলে রেখেছেন। এবার ভাবছেন প্রকাশনের কথা। বই জুড়ে পনের বছর বয়সী কিশোর কালবৈশাখির কবিতা। দু’বছর আগে কালবৈশাখির ঝড়ে গাছ চাপা পড়ে থেঁতলে যান কবি ও তাঁর গাড়ি।

মৃত্তিকা বসু মা। তিনি নারী। তিনি প্রকৃতিও তো।