ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়
ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

ঋতুচক্রের নির্ঘন্ট মেনে বসন্ত এসে গেছে। শীত পড়বে কি পড়বে না এই শুনতে শুনতে সুপর্ণারাও হাঁফিয়ে উঠেছে আর সেই ফাঁকে সব শত্রুমুখে ছাই দিয়ে মাঘের মধ্যিখনেই বিদায়ী শীতের পাততাড়ি গুটিয়ে নিয়ে ফিরে যাবার তোড়জোড়। আর আমাদেরো লেপ-বালাপোষ-লাইসেম্পি আর যাবতীয় শখের শীত পোষাকদের ন্যাপথলিন বলের আড়ালে মুখ লুকোনো।
শান্তিনিকতনি ঘরাণায় কলকাতার বাঙালীর মাঘোত্সব যেন ব‌ইমেলা। আর সেই ব‌ইমেলার ফুরিয়ে যাওয়া মানেই শীতের যাই যাই ভাব। তখন স্মরণে, মননে বসন্ত জাগ্রত তার ঘরে। যেন এইটুকুনির পথ চেয়ে সারাটা বছর বসে থাকা। আর যদি শীত বাই বাই করে নাকের ডগা দিয়ে চলেই যায়, তাকে অলবিদা জানিয়ে বসন্তকে ওয়েলকাম করাটাই আমাদের একমাত্র লুকিং ফরওয়ার্ড, গোল অফ লাইফ। বসন্ত এসে গেছে।
যাই দেখি কোকিলার প্রসব বেদনা উঠল কি না! কোকিলগুলো ঠিক বুঝতে পারে। ওদের বাসা বানানোর চাপ নেই। স্বার্থপরের মত কাকের বাসায় ডিমটা পেড়েই খালাস। করণটা বসন্ত। এখন আর সময় নেই বাসা বাঁধবার। অলস কোকিল এর পত্নী আসন্নপ্রসবা। এখন সময় নষ্ট না করে প্রাণ উজাড় করে তাকে ভালোবাসা দাও। ট্যাঁপোর টোপর কোকিল বৌ টির থৈ থৈ রূপ তায় আবার সে বিয়োবে। অতএব এক্সট্রা কেয়ার নাও। বাসা বাঁধতে গিয়ে যদি বৌটা হাতছাড়া হয়ে যায়! অগত্যা বরিষ্ঠ পক্ষী বাসিন্দা কাকেশ্বরই ভরসা।
এ বসন্তের প্রতিটি মূহুর্ত বাঁচো নতুন করে। প্রেমে প্রেমে, নূতন রতনে স্বাগত জানাও। বাদাম গাছের পাতাগুলো ঝরে গিয়ে কেমন বৈধব্য পর্ব চলছিল। হঠাত তাকিয়ে দেখি তার পাতার অগ্রভাগ থেকে মুকুলোদ্গম হয়েছে। কচি পাতা সবে গজাতে শুরু করেছে। কমল মুকুলদল খুলিল বুঝি! আগুণ রং তার। পাতাশূন্য, রিক্ত গাছ সেই আগুণ রঙে সিক্ত। সেই গাছের শুকনো ডালে বসে কোকিল তার সন্তানসম্ভবা প্রণয়ীকে খোঁজে আর শিস্‌ দেয়। বসন্তের হিম জোছনায় ভোররাত থেকে কোকিলটা প্রহর গোনে। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই তার সঙ্গীটিকে কাছে পাবার আশায় ডাকতেই থাকে সে। পুরুষ হয়ে স্ত্রী টির ওপর গুরু দায়িত্ব পালন করেছে সে। সর্বশক্তি দিয়ে গলা ফাটিয়ে চিত্কার করে বলেছে, আমি তোমায় বড় ভালবাসি। কিন্তু তারপর? আরো বড় কাজটি করেছে। তাকে ইমপ্রেগনেট করেছে। অথচ তারপর সে কোথায় বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে সংসার পাতবে তা নিয়ে একটুও মাথাব্যাথা নেই তার। একেই বলে উদাসী বসন্ত। কবির কথায় সেই উদাসী বসন্তের হাওয়াতেই পথে পথে মুকুল ঝরে।
-এই কোকিল ডাকিস কেন রে ? তোর জীবনে এত্ত বোলবোলা কিসের?
দেখছিস্‌ না? বাইরে পৃথিবীটা কত অশান্ত? তবুও এত্ত স্বার্থপরের মত ফূর্তি তোদের? ভোর থেকেই ডেকেই চলেছিস তোরা। আহাম্মক!
কোকিল সাড়া দিয়ে আবার বলে, কুহু। কু-কু…উউউউ ।
-আ মলো যা! আবার ডাকে! এই ডাক ঝালাপালা করে দেবে চৈত্রের শেষদিন পর্যন্ত। বাইরের বিশ্বে কি হচ্ছে তার কোনো হেলদোল নেই, ডেকেই চলেছে। তোর কর্কশ স্বর বৌটাকে ভাল লাগিয়েই ছাড়বি? আমাদের জীবন থেকে বসন্ত বিদায় নিয়েছে রে মুখপোড়া। তবুও বসন্ত এসেছে বুঝতে পারি তোর জন্যে। এই কোকিল, রাগ করলি?
কোকিল বলে পি—-উ..উ ।
-এবার অন্য সুর? তার মানে বুঝেছিস আমার কথা? ধরে নিলাম আগেরটা ছিল বসন্তরাগ। এবার ধরলি বেহাগ…কি তাই তো?
কোকিল বলে কু-উ-উ-উ।
-কি মিষ্টি ডাকছিস রে! নে, তোরা বরং প্রেম কর। আমি একটা পাতলা চাদর জড়িয়ে আসি। বসন্ত আর কোকিল বিলাস করতে করতে যদি ঠান্ডা লেগে যায়! নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু ডেঞ্জারাস বুঝলি কোকিলা? তোদের নেই কো উত্তরপুব তাই তোদের মনে সদাই সুখ।
শীতের অন্তিম নিঃশ্বাসটুকুনি থাকতে থাকতেই ভুঁইচাঁপা গাছগুলো কেমন শ্রীহীন। কেন বলতো? ওরাও ফুল ফোটাবে এইবারে। পাতাগুলো কেমন মন মরা তাই। সারাটা বছর যেমন তেমন পড়ে থাকে এই সময়টার অপেক্ষায়। তার পরেই বসন্তের দখিণা হাওয়া গায়ে মেখে মাটির মধ্যে থেকে ওদের স্টকগুলো বিকশিত হয়ে সদর্পে ঘোষণা করে তাদের অস্তিত্ব। আম্মো পারি ওদের মত। মানে বাগানের আর পাঁচটা ফুলগাছের মত।
শীতের অবসান মানেই বাঙালীর ঘরে নিম বেগুণের গন্ধ। কাঁচা আম দিয়ে টকের ডাল আর সজনে ডাঁটা দিয়ে চচ্চড়ি, টোপাকুলের অম্বল । এসব নাকি খেতেই হয় এসময় । “রুড ফুড অফ বেঙ্গল”… নাম করা ফুড জার্নালিষ্ট ভীর সাঙ্ঘভির দেওয়া অনবদ্য নাম। সিম্পলি অসাম এই সময়। শীতের পার্টির অবসান। তেল-ঝাল-গরগরে রান্নাবাটির বিরাম। বসন্তে চাই হালকাপুলকা মানে সহজপাচ্য। কারণ পেট ঠান্ডা রাখো নয়ত রোগের প্রকোপে পড়বে বাপু! জন্মেছ ট্রপিকাল দেশে, মরিবে কি অবশেষে? তাই বুঝি এদেশের আমগাছে বউল এসেই গেছে আর চিরুনির মত সারে সারে সজনে ডাঁটা ঝুলছে তো ঝুলাছেই। বাতাসে সজনে ফুলের ঘ্রাণ। নিমগাছে কচি কচি সবুজ নিমপাতা ধরেছে মনের সুখে। আবার কোকিলটা সেই নিমগাছটাতেই বসে দোলা খাচ্ছে। কারণ বসন্ত এসে গেছে।
-ও কোকিলা, তোরে শুধাই রে? আবার সেই এক কথা। কেন রে তোর কোকিলটা বাসা বাঁধে না?
এই বসন্তটাকে আষ্টেপৃষ্টে সে গায়ে মেখে নিচ্ছে আর তুই কেবলি তাকে সিডিউস করছিস যাতে সে অন্য কারো দিকে না চলে যায়। আচ্ছা কোকিলা তুই সত্যি সত্যি ওকে খুব ভালোবাসিস না রে? কিন্তু তোর ডিম পাড়া হয়ে গেলে ঐ কোকিলটা আর তোর হয়ে থাকবে সারা জীবন? না কি আসছে বছর বসন্তে সে অন্য এক কোকিলার জন্য ডেকেই চলবে? আর ভুলে যাবে তোকে।
যাক আর ভ্যানতাড়া না করে সকলে বসন্তের পায়ে পড়ে থাকো দিন কয়েক। সে আসতে না আসতেই বন্ধু দিবস, গোলাপ দিন, প্রোপোজ দিন, চকোলেট দিন, জড়িয়ে ধরার দিন, চুমুর দিন…করতে করতেই ভালবাসাবাসির দিন। এবার সে যেতে না যেতেই দে দোল, দে দোল… দোলের দিন । রাধাকৃষ্ণের ফষ্টিনষ্টির দোহাই দিয়ে আমজনতার মাতামাতি ইত্যাদি। ওদিকে বসন্ত সমাগমে সারস্বত সমাজ হাইপার। সোশ্যাল নেটে সাহিত্যের ঝলক। আর কেন‌ই বা লিখবেনা তারা? মধুর বসন্ত এলে তারা ” কুহক লেখনী ছুটায়ে কুসুম তুলিছে ফুটায়ে, লিখিছে প্রণয়-কাহিনী বিবিধ বরন-ছটাতে…” রবিঠাকুরের কথা।
কি মহিমা এ বসন্তের! তবুও শান্ত হয়না পৃথিবী, সেটাই বড় কষ্টের।
একটু বিষাদ, একটু বিরহ, একটু প্রেম, একটু ভালোলাগা সব মিলিয়ে আমাদের বেশ একটা ফিল গুড ফ্যাক্টর কাজ করে এই সময়। ভোগ্য পণ্য সবেতেই অফ সিজন ডিসকাউন্ট। কেন রে ভাই? বসন্ত তোদের কাছে একটা অফ সিজন? ব্যবসায়িক কেমিষ্ট্রি অবিশ্যি আমরা বুঝব না। আসলে লোকটানার কৌশল। ছুতোয় নাতায় স্প্রিং ফেস্টের আকর্ষণ। ছলে বলে কৌশলে কখনো গোলাপ ফুল, কখনো চকোলেট, কখনো বা টেডি বেয়ার আর ভ্যালেন্টাইন গিফ্ট তো হাতের পাঁচ। বসন্তে মানুষের সম্পর্ক ঝালিয়ে নেবার পালা। সেই আবার নতুন করে পাব বলে।
কখনো হেঁটে পেরুব শিমূল বিছানো গালচের পথ, কখনো মহুয়া সরণী, কখনো পলাশ কুড়িয়ে নেব দুহাত ভরে । সেই রং চোখ থেকে মুছতে না মুছতেই আবার এসে পড়বে আমাদের বসন্তের রংয়ের উত্সব।
ছোটবেলায় বসন্তের খোলা জানলায় দাঁড়ালে বড়রা বলতেন বসন্ত কিন্তু ভয়ানক। যতটা দেয় ততটাই নেয় উশুল করে। সত্যি তো, ঘরে ঘরে অসুখ এই সময়ে। আর ঋতু পরিবর্তনে এই মারণ ব্যাধির থেকে মুক্তিলাভের আশায় আবার নতজানু আমরা নারীশক্তির কাছে। বাসন্তীপুজোর আয়োজন। কারণ যমদংষ্ট্রা বসন্ত ঋতুর রোগের প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে অতি প্রাচীনকাল থেকেই আমরা পরিচিত। ঋতুর নামে রোগ‌ও রয়েছে বটে। কি আর করি? ফাগুণ হাওয়ায় সব দান করেছি যে আজ। তাই তো আমার আপনহারা, বাঁধনহারা প্রাণ।