সংকল্প সরকার

‘খেলব হোলি, রঙ দেব না তাই কখনো হয়…’

তা-ও হয়।হচ্ছে।

এই তো সেদিন পাশের ফ্ল্যাটের প্রমিতদার সঙ্গে রাস্তায় দেখা।
জিজ্ঞেস করলাম,’কি প্রমিতদা, এবার হোলিতে রং খেলছ না?’
প্রমিতদা একচিলতে হাসি ঠোটের কোণে ঝুলিয়ে বললেন,’না রে ভাই,এবার আর খেলছি না। ‘
আমি বললাম,’কেন!বছরে তো একবারই দোল আসে।খেলছ না কেন?’
‘আর বলিস না, গেলবছর রং খেলে যা অবস্থা!অবাধ্য বাঁদুরে রং এমনভাবে মুখে,চুলে জাঁকিয়ে বসেছিল,তিন-চারদিন অফিসে যেতে পারিনি।’প্রমিতদার চোখেমুখে বিমুখতার ছাপ।
আমি বললাম, ‘তাহলে..’
প্রমিতদা আমার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললেন,’তাই বলে ভাবিস না হোলি সেলিব্রেট করছি না।দোলের রাতে পার্টি আছে।দেদার খাওয়া-দাওয়া -হুল্লোড় হবে।’

প্রমিতদার মতো হয়তো অনেকেই রঙ খেলছে না।এই রং না ছুঁয়ে রঙিন হওয়ার উদযাপন এই প্রজন্মের মধ্যে বেশ দেখা যাচ্ছে।রং স্পর্শ করছে না কিন্তু ইন্টারনেট ঘেঁটে ঠিক বের করছে ভাঙ-ককটেল-ভাজাভুজির নিত্যনতুন রেসিপি।

অনেকের হয়তো পেশাগত কারণে সুযোগ মিলছে না। নাই বা মিলল, তাতে কী?উৎসবের আনন্দে সামিল হচ্ছে কিন্তু সকলেই।শুধু উদযাপনের ভিন্নতা। জেন ওয়াই কিন্তু রং-আবির ছাড়াই রংবাজিতে মাতছে। বন্ধুরা দূরে? তাতে কী?একটা স্মার্টফোন থাকলেই হল। হোয়াটস্‌অ্যাপে বা ফেসবুকে —রং না মেখেই ‘হ্যাপি হলি ‘।দোলের কয়েকদিন আগে থেকেই রঙ ছড়াতে থাকে নেট দুনিয়া।আপনি রং মাখুন আর নাই বা মাখুন, আপনার মোবাইলের নেট অন করুন, দেখবেন মোবাইল কিন্তু নিজেকে ঠিক রাঙিয়ে তুলেছে রঙে।

কর্মসূত্রে ছড়িয়েছিটিয়ে যাওয়া বন্ধুদের একজোট হওয়ার অজুহাতও তো দোল।সকলে দূরদূরান্তের নানান শহরে।ছুটি তো মাত্র একদিনের।কিন্তু সেটা আবার সমস্যা নাকি !এক বন্ধু তৈরি করে ফেলল হোলি স্পেশাল চ্যাট গ্রুপ।বাকি বন্ধুদের যোগ করা হল।এরপর সবাই আঁতিপাঁতি করে খুঁজছে কলেজ জীবনের,ছোটবেলার হোলির ছবি।তারপর হোলির কয়েকদিন আগে থেকেই চ্যাট গ্রুপে আপলোড হতে থাকল নিজেদের রং মাখা বাঁদুড়ে অবতার। আর সঙ্গে রংচঙে বার্তা তো আছেই!

বিয়ের পর প্রথম রঙের উৎসবে আমার রুমমেট বাড়ির বাইরে।পেশায় কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মী।একদিনের ছুটি ।দোলের দিনটি স্ত্রীর জন্য রঙিন করে তুলতে নানারকম উজ্জ্বল রং দিয়ে তৈরি করে ফেলেছে ই-কার্ড।তারপর রং মেলানোর শুভক্ষণে স্ত্রীর ফেবুর টাইমলাইনে পোস্ট করবে সেটাই।আর বন্ধুদের জন্যও তৈরি নানা রঙের পিচকিরি, বেলুন।

বাঙালি কিন্তু দিনদিন অনেকটাই প্রফেশনাল হয়ে যাচ্ছে!দোলের পরদিন কি আর লাল লাল রং মাখা মুখ নিয়ে ক্লায়েন্ট মিটিং-এ যাওয়া যায়?তাই ছেলেবেলার মত পাড়ায় রংচঙ মেখে ভূত হওয়ার বদলে অনেকের এখন আবিরটাই পছন্দ।

অনেকে আবার স্বাস্থ্য সচেতন হয়ে রাসায়নিক রং-আবিরের পরিবর্তে ভেষজ আবিরের দিকেই ঝুঁকছে।

যুগ বদলেছে, হোলি বদলাবে না!