ড. অরিজিৎ ভট্টাচার্য
ড. অরিজিৎ ভট্টাচার্য

কলকাতা ২৪x৭-এর রোববার-এর পাঠকের জন্য যখন এই লেখাটি লিখতে বসেছি ততক্ষণে আমার মতো আরও অনেকেরই হয়তো জানা হয়ে গেছে যে এবছর অর্থাৎ ২০১৭ সালে শিশু সাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার পাচ্ছেন পাণ্ডব গোয়েন্দার স্রষ্টা ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায় । এই বিশিষ্ট শিশু সাহিত্যিককে শ্রদ্ধা জানিয়েই রহস্য নিয়ে আমাদের জানা-অজানা দু-চার কথা আলোচনা করা যেতে পারে ।

রহস্যের প্রতি যে কোনো মানুষের আকর্ষণ দুর্নিবার । কিছুটা হয়ত জন্মগত । শিক্ষিত অর্ধ শিক্ষিত আমজনতার মধ্যে খুব কম ব্যক্তিই আছেন যিনি রহস্য কাহিনিতে কৌতূহলী নন, কিংবা রহস্য কাহিনিতে মগ্ন হয়ে যাননি । গোয়েন্দা গল্পের সর্ব প্রথম স্রষ্টা কে বলা শক্ত, তবে এটা হলফ করে বলা যায় যে হাজার হাজার বছর আগে যখন মানুষের জন্ম হয়েছিল অপরাধ বোধের সূচনাও হয়েছিল একই সাথে । আর মানুষের মধ্যে যখন প্রথম অপরাধ বোধ জাগল সমাজে ঠিক তখনই নির্ঘাত ভাবে আবির্ভাব হয়েছিল একাধিক গোয়েন্দার । আর সেই গোয়েন্দাদের ওপর গোয়েন্দাগিরি করার জন্য পায়ে পায়ে এগিয়ে এসেছিল আর এক দল লোক । এনারাই হলেন গোয়েন্দা গল্পের লেখক ।

সমাজের সব মানুষই গোয়েন্দা গল্পের পাঠক কিন্তু সাহিত্যের সব সেবক এর লেখক নন । গোয়েন্দা কাহিনির রূপরেখা অনুগমন করলে দেখা যাবে যে এই ধরনের গল্পের নিজস্ব এক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বা ছক আছে এবং সেই ছকটি অন্য সব গল্প আর উপন্যাসের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা । ক্লাসিকাল সাহিত্যের সেবকরা ঘোরাফেরা করেন মানুষের মনের সদর রাস্তা দিয়ে। যদি বা কখন ভুল করে সরু কোন গলিতে ঢুকেও পড়েন তা হলেও সেই গলি থাকে আলো দিয়ে সাজানো । গোয়েন্দা কাহিনির লেখকদের ঘোরাফেরা মানুষের মনের সঙ্কীর্ণ গুপ্ত গলিতে যেখানে থাকে শুধু অন্ধকার । কদর্যতা, নোংরা, বিপজ্জনক এবং কুৎসিত এর আবরণে ঢাকা এই গলির ভিতরে যে বিস্ময় লুকিয়ে আছে তাকে অন্ধকার থেকে আলোয় টেনে বের করে আনার অসাধ্য সাধন করাই হল গোয়েন্দা কাহিনির লেখকের মূলমন্ত্র । এই মূলমন্ত্রে পৌছনোর আগে পশ্চাৎ-পটভূমিতে লেখক আর পাঠকের মধ্যে চলে প্রতিযোগিতামূলক এক বুদ্ধির লড়াই । এই প্রতিযোগিতায় জয়ের ওপরেই নির্ভর করে লেখকের সার্থকতা ।

এই প্রসঙ্গে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎকার ও তাঁর মন্তব্যের নজির টানা খুবই দরকার । তিনি বলেছিলেন রহস্য রোমাঞ্চ সাহিত্য হিসেবে স্থান নিশ্চয়ই পেতে পারে । গল্পের বুনিয়াদ তো একই – মনুষ্য চরিত্র আর মানব ধর্ম । শুধু একটু রহস্যের গন্ধ আছে বলে সেটা নিম্ন মানের হবে কেন । নোবেল পুরস্কার পাওয়া অনেক লেখকও এই ধরনের গল্প লিখেছেন । ভাষা হল গল্পের মিডিয়াম, সেই মিডিয়াম যদি ভালো না হয় তবে গল্প বলাও ভালো হবে না । গোয়েন্দা গল্প হলেও সেটাও একটা গল্প বই তো নয় । সুতরাং গল্পকে মনোজ্ঞ করে বলতে হবে । ১৩৩৯ সালে সত্যান্বেষী দিয়ে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের জয়যাত্রা শুরু – ডিটেকটিভ ব্যোমকেশ বক্সী। শরদিন্দু ব্যোমকেশের বহু কাহিনি লিখিয়েছেন ব্যোমকেশের বন্ধু অজিতকে দিয়ে (শার্লক হোমস-এর ডক্টর ওয়াটসন বা হারকিউল পয়রো-র ক্যাপ্টেন হেস্টিংস-এর মতো)। কিন্তু শেষের অনেকগুলি গল্পে লেখক নিজেই কথকের ভূমিকা নিয়েছিলেন। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রসাদগুণে ব্যোমকেশের কাহিনিগুলি শুধু গোয়েন্দাগল্প নয়, সেটি হয়ে উঠেছে সাহিত্য। সুকুমার সেন লিখেছেন, “কাহিনিকে ভাসিয়ে তাঁর ভাষা যেন তর তর করে বয়ে গেছে সমাপ্তির সাগরসঙ্গমে। সে ভাষা সাধু না চলিত বলা মুস্কিল। —- শরদিন্দুবাবুর স্টাইল তাঁর নিজেরই – স্বচ্ছ, পরিমিত, অনায়াসসুন্দর ।”

বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত বাংলা গোয়েন্দাসাহিত্যে বড়দের জন্যে কিছু গল্প-উপন্যাস থাকলেও কিশোরদের জন্যে লেখার প্রাধান্যই সেখানে বেশি চোখে পড়ে। বড়দের গোয়েন্দাকাহিনির লেখক হিসেবে নীহাররঞ্জন গুপ্তের নাম অবশ্যই উল্লেখ করতে হয়। তাঁর গোয়েন্দা ছিলেন কিরীটি। তবে নীহাররঞ্জন কিশোরদের জন্যেও লিখেছিলেন। গজেন্দ্রকুমার মিত্রও ক্রাইম ও গোয়েন্দা কাহিনি দিয়ে লেখা শুরু করেছিলেন। পরে অবশ্য ঔপন্যাসিক ও গল্পকার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। কিশোরদের ক্রাইম থ্রিলার ‘মোহন সিরিজ’ লিখে শশধর দত্তের জনপ্রিয়তাও বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে তুঙ্গে ওঠে। এছাড়া চার দশকের মাঝামাঝি দেব সাহিত্য কুটিরের কাঞ্চনজঙ্ঘা, প্রহেলিকা, বিশ্বচক্র, পিরামিড ও কৃষ্ণা সিরিজ-এর দৌলতে নানা গল্প-উপন্যাসে কিশোর গোয়েন্দাসাহিত্য সম্বৃদ্ধ হয়েছে। এতে লেখক হিসেবে হেমেন্দ্রকুমার রায় ও নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়কে ছাড়াও আমরা পাই বুদ্ধদেব বসু, নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত, প্রভাবতী দেবী সরস্বতী ও শৈলবালা ঘোষজায়াকে। বড়দের গোয়েন্দা-বিষয়ক পত্র-পত্রিকাও ছিল। পূর্বোল্লেখিত ‘রোমাঞ্চ’ ছাড়াও ‘রহস্য পত্রিকা’, ‘গোয়েন্দা তদন্ত’ ইত্যাদি এবং অনেক নামকরা লেখকও সেখানে গোয়েন্দা কাহিনি লিখেছেন। কিন্তু তাঁদের সাহিত্যিক পরিচিতি গোয়েন্দা-কাহিনিকার হিসেবে নয়, ঔপন্যাসিক বা প্রবন্ধকার হিসেবে। তাঁদের সেই লেখাগুলো খানিকটা সখের লেখা। ফলে সেগুলির মধ্যে ঘটনার অভিনবত্ব, প্লটের জটিলতা, ঘটনাবলীর সম্ভাব্যতা, ফরেন্সিক বিজ্ঞান বিষয়ক জ্ঞান, অপরাধ-বিজ্ঞানের বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সঙ্গে পরিচিতি ও বিভিন্ন সম্ভাবনার সূক্ষ্ম বিচার-বিশ্লেষণ অনেক সময়েই অনুপস্থিত। এই প্রসঙ্গে প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত লিখেছিলেন, “একটি বহু-পঠিত উপন্যাসে একজন গোয়েন্দা হাওড়া স্টেশন ছাড়বার এক ঘণ্টা পরে ট্রেন থেকে পর্বতমালা ও ঝর্ণার শুভ্র রেখা দেখতে পেলেন। অন্য এক প্রাচীন লেখকের একটি উপন্যাসে আছে একজন গোয়েন্দা ‘বৃক্ষকোটরে অনুবীক্ষণ লাগাইয়া’ দূরবর্তীবাড়িতে ডাকাতির দুষ্কৃতি দেখতে পেলেন।” এগুলো অবশ্য বহুকাল আগেকার রচনা। কিন্তু পরবর্তী কালেও বিজ্ঞানের মাথায় ডাণ্ডা মেরে গোয়েন্দাকাহিনি তর তর করে এগিয়ে চলতে দেখা গেছে। যেমন, গোয়েন্দার সাবমেরিনে করে পুকুরে নেমে যাওয়া, কিংবা দুই হাতে পিস্তল আরেক হাতে টর্চ নিয়ে ঘোরা, অথবা ঘড়িতে ঢং ঢং করে একটা বাজা! কিশোর পাঠকদের ক্ষেত্রে যা চলে বড়দের অভিজ্ঞ চোখে তা হাস্যকর হয়ে উঠতে পারে। ভালো গোযেন্দাকাহিনি লিখতে হলে যে পরিমাণ পড়াশুনো বা পরিশ্রমের প্রয়োজন, নামিদামি লেখকরা তা হয়তো করতে চান না। যাঁরা করতে প্রস্তুত, তাঁরা কুশলী লেখক নন। সেইজন্যেই বোধহয় বাংলা সাহিত্যে উঁচুদরের মৌলিক গোয়েন্দাকাহিনির এতো অভাব।

বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে গোয়েন্দাসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ লেখক নিঃসন্দেহে সত্যজিৎ রায়। তবে গল্পের জটিলতা নয়, লেখার প্রসাদগুণই তার প্রধান কারণ। উনিও লিখেছেন কিশোরদের জন্যে, যদিও বড়দের কাছেও উনি সমান ভাবে প্রিয়। প্রদোষচন্দ্র মিত্র ওরফে ফেলুদা সত্যজিৎ রায় সৃষ্ট বাংলা সাহিত্যের একটি জনপ্রিয় কাল্পনিক গোয়েন্দা চরিত্র। ১৯৬৫ সালের ডিসেম্বর মাসের সন্দেশ পত্রিকায় ফেলুদা সিরিজের প্রথম গল্প ‘ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি’ প্রকাশিত হয়। ১৯৬৫ থেকে ১৯৯৭ পর্যন্ত এই সিরিজের মোট ৩৫টি সম্পূর্ণ ও চারটি অসম্পূর্ণ গল্প ও উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে। ফেলুদার প্রধান সহকারী তাঁর খুড়তুতো ভাই তপেশরঞ্জন মিত্র ওরফে তোপসে ও লেখক লালমোহন গাঙ্গুলি (ছদ্মনাম জটায়ু)। সত্যজিৎ রায় ও তাঁর পুত্র সন্দীপ রায়ের পরিচালনায় ফেলুদা কেন্দ্রিক রহস্যের সিনেমাগুলিও বেশ জনপ্রিয় হয়েছে ।

জনপ্রিয়তার নিরিখে পিছিয়ে নেই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সৃষ্ট রহস্য-রোমাঞ্চ সিরিজের কাকাবাবু চরিত্রটিও । রাজা রায়চৌধুরী ওরফে কাকাবাবুকে কেন্দ্র করে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছেন একাধিক গল্প-উপন্যাস । এর প্রত্যেকটিই বেশ জনপ্রিয় । সাম্প্রতিক সময়ে চলচ্চিত্র পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের নির্দেশনায় ‘মিশর রহস্য’ নামক সিনেমাটিও বিপুল সাফল্যের মুখ দেখেছে । কাকাবাবুর রহস্য অভিযান ঘিরে তিনি আরও একটি চলচ্চিত্র পরিচালনার কাজ শুরু করেছেন বলে জানা গেছে ।
পরিশেষে তাই একথা বলা যেতেই পারে যে, রহস্যের মায়াজাল ভেদে পাশ্চাত্য সাহিত্যের শার্লক হোমস কিংবা আগাথা ক্রিস্টির পাশাপাশি আমাদের বাংলা সাহিত্যের ব্যোমকেশ কিংবা ফেলু মিত্তির কোনো অংশেই পিছিয়ে নেই। আমরা আশা করতেই পারি যে, তরুণ প্রজন্মের সাহিত্যিকদের হাতে বাংলা রহস্য-রোমাঞ্চ ধারার সাহিত্য আরও পুষ্ট হবে ।

* তথ্য ঋণ – উইকিপিডিয়া।