শাশ্বত কর

ফান্টা করে শীত যখন পড়েছে, সান্টার ঘণ্টা কি আর না বেজে পারে? কত পোলাপান বলে সেই ডিসেম্বর পরা ইস্তক সান্টাদাদু আসবে, সান্টাদাদু আসবে বলে হা পিত্যেশ করে বসে আছে! আর বলি, হা পিত্যেশ করবে নাই বা কেন শুনি? এমন মনের কাছের মরমিয়া বন্ধু আর কে আছে ওদের? কে আর অমন করে ঠিক মনের মত উপহারটি টুকুস করে দিয়ে যায়? বদলে কী, না বদলে সাদা ফুটফুটে মনের এক ঝুড়ি খুশি, এক হাঁড়ি হাসি আর পরিচ্ছন্ন মোজায় একটু খড়– এই তো দেওয়ার! ও তো ছেলেপুলেদের কাছে জলভাত।

তবে বাপু, এট্টু খিঁচ এখানেও আছে! সান্টাদাদু কিন্তু হিসাবে দারুণ পাকা! এই দামাল দুনিয়ার তামাম বাচ্চে লোগোকা দুষ্টুমি শিষ্টামির ডেবিট ক্রেডিট- পাকা লেজার দাদুর কাছে যাকে বলে একেবারে পারফেক্টলি মেইন্টেইন্ড। সব সময় আপডেটেড। সেই হিসেব বুঝেই তো দাদুর পক্ষ থেকে কারও জন্যে ঝকঝকে গিফ্টের মেলা, তো কারো জন্যে কয়লার কুচকুচে ডেলা! দুঃখু পেলে না কি? কুছ পরোয়া নেহি মাই দুরন্ত দোস্ত, আসছে বছর আবার হবে। দাদু ফের আসবেনই স্লেজের সওয়ারি হয়ে।হুড়হুড় করে আকাশে পথে ছুটবে স্লেজ– ফিনফিনে সাদা দাড়ি নবীন মেঘের মতো উড়বে রাতের আকাশে। কাঁধে থাকবে আনন্দের ঝোলা আর মুখে থাকবে ‘হোঃ হোঃ হোঃ’! কাজেই হে দুরন্ত বাচ্চা, বছরটা না হয় না ঢিলিয়ে, না কিলিয়ে, তাল মিলিয়ে কাটিয়েই দাও– তারপর ডিসেম্বর কড়া নাড়লেই কাগজ পেনসিল নিয়ে বসে যেও আদরের সান্টা দাদুকে চিঠি লিখতে।

তবে বাপু, ফদ্দ বেশি বাড়িয়ো নি! বোঝো তো দাদুরও তো বয়স হয়েছে। নেহাত সারা বছর ঠান্ডার দেশে থাকেন, সুখাদ্য খান, বোধ হয় শরীর চর্চাও করেন, সর্বোপরি ঈশ্বরের স্নেহধন্য, তাই না এই বয়সেও পৃথিবী জুড়ে স্লেজ ছুটিয়ে বেড়াতে পারেন। তবে বাপু, তোমাদের শহরে যা ধুলো ধোঁয়া আর দূষণ, তাতে বেশি সময় থাকতে হলে সান্টাদাদুরও হাঁচি কাশি শ্বাসকষ্ট অস্বাভাবিক নয়! বলো তো, মাস্ক দিয়ে যদি সান্টা দাদুর মুখ ঢাকা থাকে, অমন সরল মুখের মিষ্টি হাসিটাই যদি মাস্ক চাপা থাকে, তবে দুধেল দাড়ি উড়বে বা কী করে আর তোমাদের মনটাও খুশিতে ভরবেই বা কী করে? কাজেই লিস্টিটাই বাপু ছোটো কোরো, যাতে উপহার নামাতে দাদুর পরিশ্রম কমে, সময়ও কম লাগে। আর যদি দাদুকে বেশি সময় চাও তবে বলি কি, সব থেকে ভালো হয় যদি ধোঁয়া ধুলো কমানোর জন্য তোমরা মা বাবাকে বছর ভরে বোঝাও। তোমরা ঠিকঠাক বোঝাতে পারলে যতই বিষ ধোঁয়ায় মাথা মুটিয়ে যাক না কেন, বাবা, মা, মেজো জ্যাঠা, ছোটো পিসে, ন মেসো, জামাইবাবু– সব্বাই বুঝতে পারবেন। তাতে করে দূষণের থাবা ছোটো হবে আর শীতও পরবে যাকে বলে যার পর নাই জাঁকিয়ে। কাজেই সান্টা ক্লজ দাদুরও আর অসুবিধা হবে না শহরে আসার। যেই না চব্বিশের রাতে ঘুমিয়ে পঁচিশের শিশির ভেজা ভোরে ঘুমন্ত চোখে ঝুলন্ত মোজায় হাতড়াবে, গিফ্ট একেবারে বাঁধা।

ভাবছো বুঝি, রাত্তিরেই কেন সান্টা ক্লজ স্লেজ ছুটিয়ে আসেন? আমি বলি কী, একবার জেগে দেখার চেষ্টা করেই দেখো না! আমি যত বার চেষ্টা করেছি, প্রত্যেক বার রাত্তির বারোটা বাজলেই কোত্থেকে যেন রাজ্যের ঘুম চোখের পাতায়! এক বার হয়েছে কী, হরিণরা তখন সবে ছোটা জুড়ব জুড়ব করছে, অমনি আমার ঘুম গিয়েছে ভেঙে! চোখ খুলেই দে দৌড় ব্যালকনিতে! ব্যস! সান্টা ক্লজ ধরা পড়ে গেছেন! আমি তো তখন বাক হারা! দাদু বলল, ‘হোঃ হোঃ হোঃ! যাবে না কি আমার সঙ্গে উপহার বিলোতে?’

তারপর তো সেই স্লেজ না কি হাওয়া গাড়ি চেপে কত্ত জনকে উপহার দিলাম। শেষে যখন রাস্তার ধারে শুয়ে থাকা সার সার বাচ্চাদের উপহার দিতে যাবে, অমনি গির্জার ঘণ্টা বাজল ঢং ঢং ঢং ঢং! সান্টা ক্লজের হাসি গেল মিলিয়ে! উদাস মুখে বললেন, ‘আমার যে যাবার বেলা এসে গেল বেলো সোনা! তুমি ওদের উপহার দিয়ো কেমন?’ আমি ‘দাদু যেয়ো না!’ বলে চেঁচিয়ে উঠতেই মাথাটা কীসে ঠুকে গেল! উফ করে তাকিয়ে দেখি, কোথায় বা কী! মাথা তো ঠুকেছে খাটের কোণায়!

বাবাকে বলতেই বললেন, ‘বেশ তো! দাদু যখন বলেছেন, তুমি নিশ্চয়ই উপহার দেবে। আর বড় হলে দাদুর মতই গোপনে সাহায্য করবে, যাতে অহঙ্কার তোমায় ছুঁতে না পারে আর যাকে সাহায্য করছো সে লোকটিও যেন তোমার কাছে মাথা না নোয়ায়। ঈশ্বর তো তোমার আমার মাধ্যমেই যার দরকার তাঁকে সাহায্য করেন, তাই না!’

বাবা বলে চললেন, ‘এই যে তোমাদের সান্টাদাদু, ইনি কে জানো? ইনি হলেন সেন্ট নিকোলাস। খ্রিস্ট পূর্ব চতুর্থ শতকের মাইরার বিশপ। অগাধ তাঁর সম্পদ! তার চেয়েও বেশি তাঁর দয়া। কত গল্প তাঁর দয়ালু মনের! একটা বলি তোমায়। এক গরিব বাবার তিন মেয়ে। সামর্থ্য নেই মেয়েদের বিয়ে দেবার। কিন্তু যাঁর কিছু নেই, তাঁর জন্য তো ঈশ্বর আছেন। কাজেই বড় মেয়ের বিয়ের আগে চিমনি পথে নেমে এলো এক থলে। থলে ভরা সোনা। বিয়ের কাজ মিটল ভালো ভাবেই। দ্বিতীয় মেয়ের ক্ষেত্রেও এক কান্ড! ছোটোটার বেলায় তক্কে তক্কে রইলেন বাবা। যেই না চিমনি দিয়ে নেমে এলো থলে, অমনি তিনি ছুট্টে গিয়ে দেখে ফেললেন ঈশ্বরের মহান দূত সেন্ট নিকোলাসকে! তিনি নিষেধ করলেন কাউকে বলতে। কিন্তু ফুলের গন্ধের মতো সে কথা পড়ল ছড়িয়ে। আরও কত গপ্প! টার্কি নাবিকেরা তো তাঁকে পরিত্রাতা মানতেন। যাই হোক এই সেন্ট নিকোলাসই পৃথিবী জুড়ে ঘুরতে ঘুরতে লোকের মুখে মুখে নাম বদলাতে বদলাতে হয়ে গেছেন আজকের সান্টা ক্লজ!

বাবার কথা তো বাবা বললেন, এবার আমার কথা শোনো। যদি চাও তবে কিন্তু সান্টাদাদুকে মনের কথা জানিয়ে চিঠি দিতে পারো। ঠিকানা দেব? দিচ্ছি। লিখে নাও।

সান্টা ক্লজ, নর্থ পোল, কানাডা, হো হো হো!

আর যদি চিঠি দাওই, তবে আমার হয়ে একটা কথা জিজ্ঞেস কোরো তো, শীতের ছুটিতে নাহয় সান্টাদাদুর উপহার বিলোনোর কাজ, কিন্তু পুরো গরমের ছুটি জুড়ে তিনি থাকেন কোথায়? উত্তর পেলে আমায় জানিয়ো কিন্তু!