সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

‘থাকবার জন্য মারতে হবে এ কথা যারা বলে তারাই থাকে’
-রবীন্দ্রনাথ
না, বউ পালটান কোনো মতেই উচিত নয়। এ দেশের খানিক খানিক ইউরোপ, আমেরিকা হলেও বেশির ভাগটাই দরিদ্র ভারত। গামছাধারী বটু, খেঁটে শাড়ি পরিহিতা মুখরা বাতাসী, মুড়ো ঝ্যাঁটাধারী পদ্ম। দড়মার বেড়া, চাটর ঝালর, দুর্গন্ধী নালা-নর্দমা। পচা ডোবা, পানাপুকুর। শৌচ, স্নান, কাপড় কাঁচা, বাসন মাজা একই ডোবায়। সেই জলেই রন্ধন। পানেও আপত্তি নেই। বিকারহীন নির্বিকার এই দেশের মন্ত্র – ‘রাখে কেষ্ট মারে কে – মারে কেষ্ট রাখে কে!’

পলিটিক্স আর পোলিও অস্তিত্ব নামক মুদ্রাটির এ-পিঠ আর ও-পিঠ। ল্যাংল্যাং করে বেঁচে থাকাটাই ভবিতব্য। মুখরা, নিত্য ঝামটা মারা ঝুমুর কি ঝুমকি আর চারুভাষী ক্ষুদ্রকায়, দীর্ঘকায়, স্থূলকায়, শীর্ণকায় দেশনায়কদের মধ্যে তফাৎ ত দেখি না। কল ঘোরালেই ছবি, তর্জন-গর্জন, ওষ্ঠ চর্বন, ভ্রূযুগলের কুঞ্চিত-প্রসারিত খিল্বন, চকাচক বাক্যবাণ, কর্দম প্রক্ষেপণ, মারমার কাটকাট! মানুষকে মানুষ ভাবলে দেশ শাসন করা যায় না। শাসন সংক্রান্ত পাশাপাশি কতকগুলি শব্দ অনুধাবনযোগ্য, যেমন – শাসন, শাসানো, শাসানি, শাসিতা, শাস্তা, শাস্তি। সুতরাং এলাকাটা ভয়ংকর থমথমে! বাঘের খাঁচা। বোঁটকা গন্ধ, হাড় কড়মড়, চাবুকের সপাসপ, আর্তনাদ। রবীন্দ্রনাথের রক্তকরবীর অন্ধকার ঘরের রাজা – King of dark chamber.

‘নাট্যপরিচয়’-এ রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, ‘যক্ষপুরীর রাজার প্রকৃত নাম সম্বন্ধে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতের ঐক্য কেউ প্রত্যাশা করে না। এইটুকু জানি যে, এর একটি ডাকনাম আছে – মকররাজ।’ এরপরেই আছে, ‘রাজমহলের বাহির-দেয়ালে একটি জালের জানলা আছে। সেই জালের আড়াল থেকে মকররাজ তাঁর ইচ্ছামতো পরিমাণে মানুষের সঙ্গে দেখাশোনা করে থাকেন।’ এরপরে লিখছেন, ‘যক্ষপুরীর বিধিবিধানকে যদি কবির ভাষায় পূর্ণচন্দ্র বলা যায় তবে তার কলঙ্কবিভাগের ভারটাই প্রধানত মোড়লদের ’পরে।’

কবি একথাও জানাচ্ছেন, ‘এই নাটকটি সত্যমূলক। এর ঘটনাটি কোথাও ঘটেছে কিনা ঐতিহাসিকের ’পরে তার প্রমাণ সংগ্রহের ভার দিলে পাঠকদের বঞ্চিত হতে হবে। এইটুকু বললেই যথেষ্ট যে কবির জ্ঞানবিশ্বাস মতে এটি সম্পূর্ণ সত্য।

কলকাতার কোথাও এইরকম যক্ষপুরী আছে নাকি। জালের গবাক্ষে দুটি চোখ। রাজ্যজুড়ে মোড়লদের সুনিপুণ তৎপরতা। জেলায় জেলায় মানুষের হৃদয় ফোঁড়াফুঁড়ি। ক্ষমতার স্বর্ণখনি পল্লীতে পল্লীতে। খোদাইকারদের ছেনি-হাতুড়ি, গাঁইতির বিরামহীন শব্দ। এই নাটকের অধ্যাপক নন্দিনীকে বলছেন, ‘আমাদের মরাধনের প্রেতের যেমন ভয়ংকর শক্তি, আমাদের মানুষছাঁকা রাজারও তেমনি ভয়ংকর প্রতাপ।’ নন্দিনী বললে, ‘এসব তোমাদের বানিয়ে-তোলা কথা।’ অধ্যাপক বলছেন, ‘বানিয়ে-তোলাই তো। উলঙ্গের কোনো পরিচয় নেই, বানিয়ে-তোলা কাপড়েই কেউ-বা রাজা, কেউ-বা ভিখিরী। …আমরা নিরেট নিরবকাশ গর্তের পতঙ্গ।’

‘আমি তপ্ত, আমি রিক্ত, আমি ক্লান্ত!’ কে বলছেন? অন্ধকারেররাজা। ‘একদিন দূরদেশে আমারই মতো একটা ক্লান্ত পাহাড় দেখেছিলুম। বাইরে থেকে বুঝতেই পারি নি তার সমস্ত পথের ভিতরে ভিতরে ব্যথিয়ে উঠেছে। একদিন গভীর রাতে ভীষণ শব্দ শুনলুম, যেন কোন দৈত্যের দুঃস্বপ্ন গুমরে গুমরে হঠাৎ ভেস্তে গেল। সকালে দেখি পাহাড়টা ভূমিকম্পের টানে মাটির নিচে তলিয়ে গেছে। শক্তির ভার নিজের অগোচরে কেমন করে নিজেকে পিষে ফেলে সেই পাহাড়টাকে দেখে বুঝেছিলুম।’ এই রাজার দর্শন হল, ‘পুরাণ বলে কিছু নেই। বর্তমান কালটাই কেবল বেড়ে বেড়ে চলেছে।’

‘পুরাণ যদি নেই তা-হলে কিছু আছে কি করে! পিছন যদি না থাকে তো সামনেটা কি থাকতে পারে।’

রাজা বলেন, ‘মহাকাল নবীনকে সম্মুখে প্রকাশ করে চলেছে, পণ্ডিত সেই কথাটাকে চাপা দিয়ে বলে, মহাকাল পুরাতনকে পিছনে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে।’

যক্ষপুরীতে চিরসবুজের দূত নন্দিনী। তার প্রিয় ফুল কিন্তু রক্তকরবী। মল্লিকা, মালতী নয়। সে খোলা আকাশের নক্ষত্র। সে পরিবর্তনের বসন্ত বাতাস। রাজা তাকে ভয় পায়। পারলে ডালিমের মতো নিঙড়য়। পাঁচ আঙুলের ফাঁক দিয়ে রক্তের মতো রসের ধারা চুঁইয়ে পড়বে। আমি কতটা নিষ্ঠুর তুমি জান না। নন্দিনী ভয় জানে না।

নাটকের অধ্যাপক চরিত্রটি এইবার যে-কথাটি বলছেন, তা যেম এই মুহূর্তে এই দুর্ভাগা প্রেতপুরীরই কথা, ‘নন্দিনীর নিবিড় যৌবনের ছায়াবীথিকায় নবীনের মায়ামৃগীকে রাজা চকিতে চকিতে দেখতে পাচ্ছেন, ধরতে পারছেন না, রেগে উঠছেন…’

হঠাৎ সেদিন প্রেতপুরীর দরজা খুলে গেছে। নন্দিনী আতঙ্কিত, ‘সর্দার সর্দার ওকি! ও কারা! …চেয়ে দ্যাখো, ও কী ভয়ানক দৃশ্য। প্রেতপুরির দরজা খুলে গেছে নাকি। ওই কারা চলেছে প্রহরীদের সঙ্গে? ওই যে বেরিয়ে আসছে রাজার মহলের খিড়কি দরজা দিয়ে!’

‘ওদের আমরা বলি রাজার এঁটো।’

এ কী চেহারা, এরা কি মানুষ! মাংস-মজ্জা মন-প্রাণ কিছু কি আছে! হয়তো ছিল, বর্তমানে নেই। সব যেন ছায়া! ‘অধ্যাপক, লোহাটা ক্ষয়ে গেছে, কালো মরচেটাই বাকি! এমন কেন হল।’

‘নন্দিনী, যে-দিকটাতে ছাই, তোমার দৃষ্টি আজ সেই দিকটাতেই পড়ছে। একবার শিখার দিকে তাকাও, দেখবে তার জিহ্বা লকলক করছে। ওই ছোটগুলো হতে থাকে ছাই আর ওই বড়টা জ্বলতে থাকে শিখা। এই হচ্ছে বড় হবার তত্ত্ব।’

‘ও তো রাক্ষসের তত্ত্ব।’

‘তত্ত্বের ওপর রাগ করা মিছে। সে ভালোও নয়, মন্দও নয়। যেটা হয় সেটা হয়, তার বিরুদ্ধে যাও তো হওয়ারই বিরুদ্ধে যাবে।’

‘এই যদি মানুষের হওয়ার রাস্তা হয়, তা হলে চাইনে আমি হওয়া। আমি ওই ছায়াদের সঙ্গে চলে যাব। আমাকে রাস্তা দেখিয়ে দাও।’

যক্ষপুরীর মকররাজের মনুষ্য-প্রাণ-রস নিষ্কাশনী যন্ত্র হতে যারা আখের ছিবড়ের মতো বেরিয়ে আসছে তাদের দেখে চিরশ্যামল, জীবনপূজারী নন্দিনী অতি কাতর। পোড় খাওয়া অধ্যাপক যেন পরিবর্তনের কথা শোনাচ্ছেন – ‘Old order changeth yielding place to new’ – ‘রাস্তা দেখাবার দিন এলে এরাই দেখাবে, তার আগে রাস্তা বলে কোনো বালাই নেই।’ আপাতত বেড়াজালে ঘেরা মানুষের পালাবার পথ কোথায়! ‘বেড়াজাল এখান থেকে শুরু করে বহু যোজন দূর পর্যন্ত খুঁটিতে খুঁটিতে বাঁধা।’ অধ্যাপক নন্দিনীকে বলছেন, ‘রাগ করছ কেন? তোমার কপোলে রক্তকরবীর গুচ্ছ আজ প্রলয়গোধূলির মেঘের মতো দেখাচ্ছে।’

যারা ফাঁদ পাতে, ফাঁদেরই তদারকি করে সারাটা জীবন কোনো এক শক্তি ঘোঁটের দাস হয়ে, আর যারা ফাঁদে পড়ে জীবন্মৃত – তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বিদ্রোহী নন্দিনীর প্রশ্ন, ‘দিনরাত এই মানুষধরা ফাঁদের খবরদারি করে এরা একটুও কি ভালো থাকে?’

তখন অধ্যাপকের উত্তর, যেন তিনি এই মুহূর্তে আমাদেরই খুব কাছে কোথাও বসে আছেন। বলছেন, ‘ভালোর কথাটা এর মধ্যে নেই থাকার কথাটাই আছে। এদের সেই থাকাটা এত ভয়ংকর বেড়ে গেছে যে লাখো-লাখো মানুষের উপর চাপ না দিলে এদের ভার সামলাবে কে? জাল তাই বেড়েই চলেছে। ওদের যে থাকতেই হবে।’

নন্দিনীর চোখা উত্তর, ‘থাকতেই হবে? মানুষ হয়ে থাকবার জন্যে যদি মরতেই হয়, তাতেই বা দোষ কী।’

এইবার অধ্যাপকের সেই মোক্ষম কথা, চিরকালের ‘দেয়াল লিখন’ – ‘খুব মধুর, তবু যা সত্য তা সত্য। থাকবার জন্যে মরতে হবে, এ কথা বলে সুখ পাও তো বলো। কিন্তু থাকবার জন্যে মরতে হবে এ কথা যারা বলে তারাই থাকে। তোমরা বল এত মনুষ্যত্বের ত্রুটি হয়, রাগের মাথায় ভুলে যাও এইটেই মনুষ্যত্ব। বাঘকে খেয়ে বাঘ বড়ো হয় না, কেবল মানুষই মানুষকে খেয়ে ফুলে ওঠে।’

তাহলে কোথায় এসে মিশল সময় – রবীন্দ্রনাথ থেকে বর্তমানের সময়াবর্ত! সেই নর আর নরখাদক। শিকার ফস্‌কে গেলে বাঘ ল্যাজ আছড়ায়, হালুম হুলুম করে। বৃদ্ধ বাঘ পল্লীবধূর পাকশালে ঢুকে পান্তা খায়। বাঘের মা-ও নেই বাবা-ও নেই। শৈশবে থাকলেও বেশ পুরুষ্টু হবার পর – বাঘ একটা বাঘ ছাড়া আর কিছু নয়। তার ‘হালুম’এর যা অর্থ ‘হুলুম’এরও তাই অর্থ। আয়েগা, খায়েগা, গায়ে ঘা, ফুস্‌ হয়ে যায়েগা।

লক্ষ লোকের ঘাড়ে পোক্ত মাচায় বসে ‘প্যান্টোমাইম’ এই ‘হচ্ছে হবের দেশে’। প্রখ্যাত সাহিত্যিক, আই.সি.এস অন্নদাশঙ্কর রায়ের সেই কবিতা – ‘হচ্ছে হবের দেশে’

সব পেয়েছির দেশে হয়, হচ্ছে হবের দেশে
কাঁঠাল গাছে আম ধরেছে খাবে সবাই শেষে।
দুধের বাছা কাঁদো কেন! হচ্ছে হবের দেশে
গোরুর বাঁটে মদ নেমেছে খাবে সবাই হেসে।
হাত-পা কেউ নাড়বে নাকো হচ্ছে হবের দেশে
ফাইল জমে পাহাড় হলে প্ল্যানগুলো যায় ফেঁসে।
কারখানাতে ঝুলছে তালা হচ্ছে হবের দেশে
সবাই ভাবে পেয়ে যাবে সব কিছু অক্লেশে।
লক্ষ্মী সোনা, ভয় পেয়ো না হচ্ছে হবের দেশে
হাজারটা দল বাজায় মাদল বিপ্লবীর বেশে।

জীবনধারণের সহজ পাঠ – খেতে পেলে খাবে। হাঁটতে পারলে মিছিলে যাবে। মেরে ফেললে মরে যাবে। ভবলীলা সাঙ্গ হবে। অত কথা কীসের! ধেই নাচ! ঠ্যাং-ভাঙা যন্ত্র দিয়ে দেহের পায়া ভেঙে দেবো। তলপেটে গোঁত্তা মারবো। ব্যাটা বাঙালির বাচ্চা! হারব বললেই হারেগা! খামচে খুমচে মারেগা! এসব কি কথা! বাঙালির বাঙালিত্ব ঘুচে গেল নাকি! অল্প অল্প খাবে। বারেবারে যাবে। লম্বা লম্বা চুলে চিরুনি চালাবে। মিটিমিটি চাইবে। মিঠি মিঠি কবিতা লিখবে। নাকি সুরে গাইবে – বঁধুঁয়াঁ নিঁদঁ নাঁহি আঁখিঁপাঁতেঁ।

জীবিকার সন্ধানে হেথাহোথা ঘুরবে। ভারত জিতলে বোমা ফাটাবে, দুচারটে ‘গয়া’ হবে। দুর্গাপুজোয় চাঁদা তুলবে। বিসর্জনে ঘুরে ঘুরে নাচবে। সারা বছর হাঁচবে কাশবে। আউটডোরে দু’হাতে মাথা চেপে বসে থাকবে। মাঝেমাঝে বড় বড় কথা বলবে। বউকে বীরত্ব দেখাতে বাড়িছাড়া হবে। দীঘা যাবে, পুরী যাবে। প্রেমপত্তর লিখবে। পিতা-মাতাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাবে। ভায়ে ভায়ে মামলা করবে। তান্ত্রিকের দেওয়া কবচ পরবে। রাতে স্বপ্ন দেখবে ছেলে শচীন হয়েছে। টাকার বস্তা আসছে। চৌকির তলায় থরে থরে সোনার বাট। পাশে শুয়ে আছে হেলেন অব ট্রয়। রাতের স্লেজ গাড়ি নিঃশব্দে চলে যায়। ঘড়িতে বারোটা বাজতে বাজতে নিজের বারোটা বেজে যায়। ‘এপিটাফে’ অর্থাৎ মরণশিলায় লেখা থাক – মরেছে এক বাঙালি নাম তার যাই হোক পরে আছে পাঞ্জাবি, স্ট্র্যাপ ছেঁড়া চটি জোড়া পড়ে আছে বাইরে। কুকুরেও ছোঁয় না। টাকমাথা ছবিটা ট্যাং ট্যাং দেয়ালে। কে বটে!