‘I can say without hesitation or exaggeration that Ravi Shankar is the godfather, the mother and the father of what is called world music today….What is more striking is the breadth and depth of Ravi Shankar’s influence. It can be felt not only in art and experimental music but also in popular music and in jazz. I have only to mention the Beatles, John Coltrane and countless others who have benefited from his teachings. I certainly count myself among those whose musical bearing was forever changed by Ravi Shankar.’

কস্তুরী সেন

রবিশঙ্কর প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে এ কথা লিখছেন যুক্তরাষ্ট্রের আঁভা গার্দ সঙ্গীতবিদ ফিলিপ গ্লাস, জনক, জননী ও পথপ্রদর্শক, ভারতীয় সঙ্গীতের, একইসঙ্গে একজন। বহির্বিশ্বে তো বটেই, সমসময়ে দিকপাল অন্যান্য সঙ্গীতপ্রতিভার উপস্থিতি সত্ত্বেও রবিশংকর যে আদতেই ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক অতীতে একটি প্রায় অবিকল্প আসন অধিকার করেছিলেন উপমহাদেশের মধ্যেও, এ কথা তর্কাতীত ভাবেই সত্য।

প্রথাসিদ্ধভাবে রবিশঙ্করের তালিম শুরু মইহারে, অবিসংবাদী সঙ্গীতাচার্য বাবা আলাউদ্দিন খান সাহেবের কাছে হলেও, তাঁর কাছে শিষ্যত্বগ্রহণের অনেকটা আগে থেকেই দাদা উদয়শঙ্করের দলের সূত্রে তাঁর তালিম শুরু হয়ে যাচ্ছে প্রত্যক্ষে ও পরোক্ষে আরও অনেকের কাছেই। ১৯৩০ এ ট্রুপের প্যারিসযাত্রার সময় থেকে রবিশঙ্কর শিখছেন দাদার দলের প্রখ্যাত সরোদিয়া শ্রীতিমিরবরণ ভট্টাচার্যের কাছে, যাঁকে ডাকতেন তিমিরদা বলে।

কলকাতায় এঁদের বাড়িটি ছিল সঙ্গীতচর্চার মন্দির প্রায়। তিমিরবরণের ভাইয়েরা, শিশিরশোভন এবং প্রধানত অমিয়কান্ত ভট্টাচার্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন রবিশংকরের প্রথমজীবনের সঙ্গীতচর্চায়। শিশিরশোভন, যিনি পরে উদয়শঙ্করের দলে যোগ দেন, বাজাতেন তবলা, এঁর গুরু ছিলেন লখ্নৌয়ের খলিফা আবুল হোসেন। অমিয়কান্ত বাজাতেন সেতার, রবিশংকরের এই প্রিয় বন্ধু শিষ্য ছিলেন ওস্তাদ এনায়েত খাঁ সাহেবের, পরবর্তীতে যাঁর পুত্র বিলায়েত খান সাহেব হয়ে উঠবেন রবিশংকরের সতীর্থ এবং অন্যতম সুহৃদ।

এনায়েৎ খান সম্পর্কে শঙ্করলাল ভট্টাচার্যকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রবিশংকর বলছেন ‘তখন কতটাই বা বুঝতাম, কিন্তু ওঁর সেতার আর সুরবাহার শুনে মনে হল এই বুঝি আলটিমেট।’ ঠিক করে ফেলেছিলেন মাড়া বাঁধবেন তাঁর কাছেই, অসুস্থতার কারণে সে পরিকল্পনা ভেস্তে যায়, নিয়তি তাঁর জন্য নির্দিষ্ট করেছিল অন্য পথ বলেও হয়ত। এনায়েৎ খাঁ সাহেবের বাদনের যে রোম্যান্টিক লিরিসিজম তার দ্বারা প্রবলভাবে আচ্ছন্ন হয়ে পরে রবিশংকর নিজেই স্বীকার করেছেন, এনায়েৎ খান সাহেবের চেয়ে ভিন্নতর বাজানোর চেষ্টাও সে সময় থেকেই প্রবল ছিল তাঁর।

উস্তাদ আলাউদ্দিন তাঁর প্রতিভা ঢেলে দিয়েছিলেন ছাত্রের তালিমে, রবিশংকরকে তিনি শেখাতেন গান গেয়ে, নয়ত সরোদে, বা সুরবাহারে। ফলত এ ছিল ছাত্রের পক্ষে পরিশ্রমের বিষয়। পরবর্তীতে রবিশংকর নিজে যখন বাজানো শুরু করলেন, এবং আলাপ জোড়, বিলম্বিত গৎ, তান, মধ্য এবং দ্রুত লয়ের গৎ তোড়া, ঝালা, ঠুংরি এবং ধুন সবেরই একটা সঙ্গম ঘটালেন যখন, তা সমাদরও পেল যেমন, তেমনই ওস্তাদ মহলের কেউ কেউ এও বলতে ছাড়লেন না, এ আসলে বিশুদ্ধ সেতারই নয়, সরোদেরই বাজ মাত্র।

শুধু গঠনে নয়, এ দেশে বাদনের ধরনেও শরীরী পরিবর্তন পরবর্তীতে প্রথম ঘটে রবিশংকরের হাত ধরেই। এর আগে বিলম্বিত আলাপ-জোড়-ঝালা-বিলম্বিত গৎ, মধ্যলয় গৎ-পুনরায় ঝালা, এই বিন্যাসটি অনুপস্থিত ছিল। পুরনো যন্ত্রীদের দক্ষতা ছিল ভিন্ন ভিন্ন অংশের বাদনে। কেউ শুধু মধ্যলয় গৎ বাজাতেন, কেউ শুধুই আলাপ। রবিশংকরই সে অর্থে প্রথম, এক ঘণ্টা বা দেড় ঘণ্টার বাদনে এই সবগুলির সমন্বয় ঘটিয়ে মঞ্চপরিবেশনা শুরু করেন। আলাপের শুরুতে তবলাবাদক বা অন্যান্য যন্ত্রীদের সঙ্গে ‘সওয়াল-জবাব’ পর্বটিও রবিশংকরের পূর্বে প্রচলিত ছিল না তত।

অনবদ্য লয়কার ছিলেন রবিশংকর। নৃত্য তাঁর প্রেক্ষিতে থাকলেও মনে রাখতে হবে দাদার ট্রুপে রবিশংকর নিজে নাচের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না কখনওই তেমন, যে তালজ্ঞান তাঁর সহজাত বলে বিষয়টি লঘু করে দেখা যাবে। রাগ পরমেশ্বরী, রাগ গঙ্গেশ্বরীর মতো নতুন রাগ সৃষ্টির পাশাপাশি রবিশংকরের সৃষ্টিক্ষমতা ভারত ও বহির্বিশ্বকে মন্ত্রমুগ্ধ করেছিল আরও যে পথগুলির মাধ্যমে, IPTA তার মধ্যে প্রধান।

আমরা অতি অল্প মানুষই আজ দ্রুত মনে করতে পারি ‘সারে জাঁহা সে আচ্ছা’ গানটির সুরকার তিনি যা পরে পর্যবসিত হয় ভারতীয় দূরদর্শনেরও সিগনেচার টিউনে। পরবর্তীতে ALL INDIA RADIO থেকে আমন্ত্রিত হয়ে তিনিই প্রথম একটি ন্যাশনাল অর্কেস্ট্রা তৈরি করেন সেসময়ে, যার নাম ছিল ‘আকাশবাণী বাদ্য বৃন্দ’।

১৯৬০ এর পর থেকে আন্তর্জাতিক সঙ্গীতবিশ্বে তাঁর উত্থ্বান একটি নির্দিষ্ট গতি লাভ করে বলা চলে। ইহুদি মেনুইনের সঙ্গে একত্রে অ্যালবাম এবং সেই সূত্রে গ্র‍্যামি প্রাপ্তি অথবা বিটলসদের মধ্যে জর্জ হ্যারিসন প্রমুখের সঙ্গে সাঙ্গীতিক আদানপ্রদান ও কনসার্টের বিষয়গুলি এর খানিকটা পরের কথা হলেও, এর আগেই রবিশংকর এবং সত্যজিৎ রায় মিলে উপমহাদেশের সঙ্গীতকে উপহার দিয়েছেন সেই অলৌকিক যা পরে হয়ে দাঁড়াবে ইতিহাস।

১৯৫৫তে মুক্তি পায় পথের পাঁচালি, রবিশংকরের সঙ্গীতপরিচালনায় শ্রীঅলোকনাথ দে’র বাঁশিতে, পা-শুদ্ধ ধা-তার সপ্তকের সা-শুদ্ধ ধা-শুদ্ধ মধ্যম-শুদ্ধ ধৈবত, পঞ্চম…এই ক্রমে তৈরি এই সুর আনখশির চমকিত করেছিল সারা বিশ্বের সঙ্গীত সমঝদার শ্রোতাদের। তার সপ্তকের সা ছাড়া এই সুরের প্রতিটি স্বর মধ্য সপ্তকে। এমন কোন সুরপরিচালককেই আর পাওয়া যায় না যিনি খামাজ ঠাট এড়িয়ে, গ্রামবাংলার বুকের সুরটি ধরার চেষ্টা করেছেন এমন; এই সুরটিতে কোমল নি’র বদলে শুদ্ধ নি ব্যবহার করে যা করতে চেয়েছিলেন এবং অমোঘভাবে পেরেছিলেন রবিশংকর।

সংগীতের জাদুবিদ্যাটিকে সম্পূর্ণ করে আয়ত্ত করেছিলেন রবিশংকর, জীবন ও সুর, উভয়ক্ষেত্রেই শেষবিন্দু পর্যন্ত নিষ্কাশন করেছেন তিনি তাঁর বিচিত্র বর্ণাঢ্য জীবৎকালে। ফিলিপ গ্লাসের উক্তিটিতে ফিরে গিয়ে, অতি সার্থকভাবেই তাঁকে বলা চলে তাই, সাম্প্রতিক অতীতে উপমহাদেশীয় সঙ্গীতের জন্মদাতা ও প্রসারক একইসঙ্গে। বিনাপ্রশ্নে ও দ্বিধায়।

তথ্যসূত্র ও ঋণ:
১ রাগ-অনুরাগ/ আনন্দ পাবলিশার্স: সম্পাদনা শঙ্করলাল ভট্টাচার্য
২ আনন্দবাজার পত্রিকা রবিবাসরীয় প্রবন্ধ ‘সুমনামি’: কবীর সুমন’