এ বছরও ভাগ্যের শিকে ছিঁড়ল না হারুকি মুরাকামির। ২০১৯ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেলেন অস্ট্রিয়ান সাহিত্যিক পিটার হান্দকে। সেই সঙ্গে ২০১৮ সালের সাহিত্য নোবেল পুরস্কার পেলেন ওলগা তোকারচুক। যৌন কেলেঙ্কারির দায়ে গতবছর নোবেল প্রদান বন্ধ রেখেছিল সুইডিশ অ্যাকাডেমি। মজার বিষয় এই যে, যে হান্ডকে ২০১৪ সালে বলেছিলেন নোবেল পুরস্কার ‘ফলস ক্যানোনাইসেজশন’ তৈরি করে আর তাই এই পুরস্কার উঠিয়ে দেওয়া উচিত, সেই হান্দকে-কেই নোবেল কমিটি এ বছর বেছে নিল নোবেলজয়ী হিসেবে।

সৌমাভ

নব্বইয়ের দশক থেকে তিনি প্যারিসে বসবাস করছেন। ছিয়াত্তর বছর বর্ষীয় হান্দকে একজন বিশিষ্ট অস্ট্রিয়ান নাট্যকার, ঔপন্যাসিক ও অনুবাদক। নব্বইয়ের দশকে যুগোস্লোভিয়ান যুদ্ধে সার্বিয়ানদের সমর্থন করার জন্য এবং দু’হাজার ছয় সালে সার্বিয়ান নেতা মিলসেভিচের মৃত্যুর পর তাঁর সমর্থনে মতামত ব্যক্ত করায় বহুদিন ধরে তিনি একজন অত্যন্ত বিতর্কিত চরিত্র। ১৯৬৬ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম উপন্যাস The Hornets এবং ১৯৬৭তে প্রকাশিত হয় তাঁর নাটক Kaspar যেখানে দেখানো হচ্ছে কিভাবে প্রায় কথাহীন নিরীহ কাসপার হাউজার-এর উপর সমাজ জোরপূর্বক একটি rational ভাষা চাপানোর চেষ্টা করে।

তাঁর নাটকের অত্যন্ত আকর্ষণীয় বিষয় হল চরিত্রদের নিজস্ব ভাষা বা স্বর যা সমাজের ‘অফিসিয়াল’ ভাষাকে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাস Die Angst Tor manna being Elfmeter (1970. The Goalie’s Anxiety at the Penalty Kick); এই উপন্যাস একজন প্রাক্তন ফুটবলারের জীবনের পটভূমিতে লেখা যাকে সমালোচকেরা বলেছেন ‘imaginative thriller’.

১৯৭৬ সালে প্রকাশিত হয় Die linkshadinge Frau (The Left-handed Woman) যা একজন তরুণ মায়ের তাঁর স্বামীর কাছ থেকে সেপারেশনের পর প্রতিকূলতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার বেদনাময় গল্প। তাঁর Ungluck (A Sorrow Beyond Dreams, 1972) বইয়ের মূল বিষয় হল তিনি ও তাঁর মা এবং তাঁর ছোটবেলা। Nacht ging ich aus eminem stillen Haus (1997. On a Dark Night I Left My Silent House) একজন মানুষের লড়াই ও জীবন ওলট পালট করে দেওয়া জার্নির অপূর্ব বর্ণনা। তাঁর অন্যান্য কিছু উল্লেখযোগ্য উপন্যাস হল ‘Der grosse Fall’ (2011. The Greatest Fall; এটি একজন বৃদ্ধ অভিনেতার একদিনের গল্প); Die Obstdiebin (2017; The Fruit Thief) ইত্যাদি।

এছাড়াও রয়েছে তাঁর প্রচুর ছোটগল্প, প্রবন্ধ, রেডিও ড্রামা এবং আত্মজীবনীমূলক কাজ। তিনি চলচিত্র নির্মাণেও ছিলেন অত্যন্ত আগ্রহী এবং Wim Wenders দ্বারা নির্দেশিত নানান সিনেমার স্ক্রিন-প্লে তাঁরই লেখা। সুইডিশ অ্যাকাডেমি জানালেন হান্দকের সাহিত্যকীর্তি বর্ণনা/অতিক্রম করে ‘the periphery and the specificity of human experience’.

সাতান্নবর্ষীয় পোলিশ ঔপন্যাসিক তোকারচুক এই প্রজন্মের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পোলিশ সাহিত্যিক এবং গত তিন দশক জুড়ে পোল্যান্ডের একজন জনপ্রিয় কথাকার। ১১৬ জন নোবেলজয়ী সাহিত্যিকের মধ্যে তিনি ১৫তম মহিলা যিনি এই জনপ্রিয় পুরস্কারের শিরোপা পেলেন।

সুইডিশ অ্যাকাডেমির ভাষায় তাঁর কাজ জীবনের এক অংশ হিসেবে অতিক্রম করেছে জীবনের, দেশের সীমানা (‘crossing of boundaries as a form of life’). তাঁর প্রথম উপন্যাস প্রকাশিত হয় ১৯৯৩ সালে। যদিও তাঁর তিন বছর বাদে Primeval and Other Times. প্রকাশের পর তিনি রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে যান। এই উপন্যাস প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী তিরিশ বছরের পোলিশ ইতিহাসের দলিল যদিও একটি মিথিকাল গ্রাম এই উপন্যাসের পটভূমি।

লক্ষ্যণীয় ভাবে এই পুরস্কারের বিচারকেরা বললেন “She is a writer preoccupied by local life, but at the same time inspired by maps and speculative thought, looking at life from above”. নোবেল কমিটি তাঁর The Books of Jacob বইটির বিশেষ ভাবে উল্লেখ করেছেন; এই উপন্যাস অষ্টাদশ শতাব্দীর ইউরোপের পটভূমিতে রচিত। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, গত বছর তিনি ‘Flights’ উপন্যাসের জন্য ‘ম্যান বুকার ইন্টারন্যাশনাল’ পুরস্কার পেয়েছেন। তাঁর উপন্যাস অত্যন্ত মনোগ্রাহী ভাবে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন লয়েড জোন্স এবং জেনিফার ক্রফট।

স্মৃতি, ইতিহাস, পুরাণ, যুদ্ধ, মাইগ্রেশন, সাংস্কৃতিক পরিবর্তন প্রভৃতি তাঁর উপন্যাসের মূল উপজীব্য, আর তাই তাঁর উপন্যাস ভীষণভাবে মনে করিয়ে দেয় সলমন রুশদি কিংবা অমিতাভ ঘোষের উপন্যাসের কথা। তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য উপন্যাস হল E.E. ( 1995), Wardrobe (1997), House of Day, House of Night (1998) ইত্যাদি। ২০০৪ সালে প্রকাশিত The Last Stories তিন প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মৃত্যুর মনস্তাত্বিক বিনির্মাণ।

২০০৯ সালে প্রকাশিত ‘Drive Your Plow Over the Bones of the Dead’ রহস্য উপন্যাসের স্টাইলে লেখা; এই উপন্যাসের মূল চরিত্র Janina Duszejko একজন বয়স্কা মহিলা; এই উপাখ্যান প্রত্যন্ত জঙ্গলে মানুষ ও প্রাণী হত্যার রহস্য অনুসন্ধানের গল্প যা আসলে ক্ষমতা, টাকা ও পুরুতন্ত্রিক সমাজের সমালোচনা।